অধ্যায় : দুই - ঈশ্বর এবং রাষ্ট্র - মিখাইল বাকুনিন

আমি ইতোপূর্বে বলেছি যে, জনতার মাঝে আজ অবধি যে ক্ষমতার চর্চা চলে এসেছে তার বাস্তব ভিত্তি মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস। হৃদয়ের অসন্তোষ থেকে মানুষের মনের যে বিকার সৃষ্টি হয় তাতেই এই রহস্যময় আচরণগুলো মানুষের মাঝে ঝেঁকে বসে। নিজেদের সকল প্রকার সংকীর্ণতা, বালখিল্যতা, জরাগ্রস্থতা এবং হতভাগ্য অস্তিত্বের লজ্জার বিরুদ্ধে এই বিশ্বাসগুলো যেন মানুষের দৃঢ় এবং সহজাত প্রতিরোধ। আমি আগেই বলেছি, এই ব্যাধির একটাই মহাষৌধÑ সামাজিক বিপ্লব।

এজন্য আমি মানুষের চিন্তার মধ্যে এই ধর্মীয় বিভ্রম সৃষ্টি এবং এর ক্রমবিকাশের কারণগুলো খুঁজে বের করে আপনাদের দেখাবো। এখানে প্রথমেই আমি হস্তক্ষেপ করতে চাই ঈশ্বরের অস্তিত্ব কিংবা মানুষের এই পৃথিবীর দৈব উৎপত্তির প্রশ্নে। এই দৈবত্বের নৈতিক ও সামাজিক উপযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে আমি কয়েকটি কিছু কথা বলবো। কথাগুলো এই বিশ্বাসের তত্ত্বগত ভিত্তির বুনিয়াদের উপর আমার চিন্তাধারাকে প্রকাশ করবে।

সকল ধর্ম, একই সাথে তাদের দেবতা, উপ দেবতা, নবী, মশীহ এবং সাধুসন্তদের সৃষ্টি হয়েছে সেই সমস্ত মানুষদের বিশ্বাস প্রবণ কল্পনা শক্তির দ্বারা যাদের এখনো পরিপূর্ণ বিকাশ হয় নি। এসব মানুষ তাদের কর্মক্ষমতার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে নি। নিয়ন্ত্রণ নাই বলেই এসব অশুভ চিন্তার বিকাশ ঘটছে। কাজেই ধর্মীয় স্বর্গ আদৌতে মরীচিকা ছাড়া কিছুই নয়। সেখানে অজ্ঞতা এবং বিশ্বাসের গৌরবে গৌরবান্বিত মানুষগুলো বৃহৎ পরিসরে তাদের নিজেদের প্রতিচ্ছবিই দেখতে পায়। বিনিময়ে যা পায় তা হলো- স্বর্গীয় প্রতারণা। ধর্মের ইতিহাস এবং মানুষের বিশ্বাস একের পর এক জাঁকিয়ে বসা দেবতাদের উত্থান, প্রতিষ্ঠা এবং পতন মানবজাতির সামগ্রিক বুদ্ধিমত্তা এবং চিন্তাকাঠামোর উন্নতি ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারায় মানুষ যখন তাদের নিজেদের সত্ত্বা আবিষ্কার করতে শুরু করলো কিংবা প্রকৃতির নিয়মগুলোকে বুঝতে শুরু করলো তখনই শিশুসুলভ ভঙ্গিমায় তারা সে ক্ষমতা, তাদের কোন গুণ বা দোষ যেটাই হোক সব কিছুকে ধর্মীয় উন্মাদনায় ঈশ্বরের দান ভাবতে শুরু করলো। ধর্মচারী এবং বিশ্বাসী মানুষদের ঈশ্বরের প্রতি এই ভক্তি এবং বিনয়কে ধন্যবাদ দিতেই হয়। বিশেষ করে স্বর্গ নামক কাল্পনিক জিনিসকে জমকালো করে উপস্থাপনের জন্য। তাদের এ সমস্ত বিশ্বাসে পৃথিবী যত বেশী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে যাচ্ছিলো স্বর্গের প্রাচুর্য ততই ফুলে ফেঁপে উঠছিল। অন্যদিকে স্বর্গের দেবতাদের ভাগ্য যত ফুল-চন্দন জুটছিল, মানবতা এবং পৃথিবী ততই হতভাগ্য হচ্ছিলো।

একটা সময় এসে মানুষজন ঈশ্বরকে পৃথিবী নামক যন্ত্রে ইনস্টল করে। ধীরে ধীরে অতি স্বাভাবিকভাবেই ঈশ্বর নিজেকে সকল ঘটনার কারণ, সর্বশক্তিমান এবং পরম নিয়ন্তা হিসেবে দাবী করে বসলেন। অতঃপর পৃথিবীর আর কিছুই রইলো না। ঈশ্বরই হয়ে উঠলেন সব; এবং তার ¯্রষ্টা মানে মানুষ, যারা ঈশ্বরকে অজান্তে শূণ্য থেকে এক সময় যাকে আমদানি করেছিল, তারাই ঈশ্বরের সামনে মাথা নত করলো। তারা ঈশ্বরের তরে নিজেদের সঁপে দিল এবং নিজেদের ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং ঈশ্বরের দাস হিসেবে প্রকাশ্যে ঘোষণা  করলো ।

অন্য সকল ধর্মের মধ্যে খ্রিষ্ট ধর্ম তার উৎকর্ষের দিক থেকে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। কারণ এটি সর্বতোক্রমে সকল ধর্মের সারমর্মকে এক সাথে চিত্রিত করে প্রচারে এনেছে। সেই প্রচারের বিষয়বস্তু আর কিছুই না- স্বর্গীয় দৈবত্বের বদৌলতে মানবতার দারিদ্রতা, দাসত্ব এবং বিনাশ।

তাদের মতে, ঈশ্বর হলেন সমস্ত কিছু। এই জগত এবং মানুষ কিছুই নয়। ঈশ্বর হলেন সত্য, ন্যায়বিচার, উৎকর্ষ, সৌন্দর্য, শক্তি এবং জীবনের প্রতীক। পক্ষান্তরে মানুষ হলো মিথ্যা, অপরাধ, মন্দ, কর্দমতা, দুর্বলতা এবং মৃত্যুর প্রতীক। ঈশ্বর হলেন প্রভু, মানুষ তার দাস। নিজের চেষ্টার দ্বারা মানুষ ন্যায় বিচার, সত্য এবং আত্মিক জীবনের সন্ধান পেতে অপারগ। কেবল মাত্র ঈশ্বরের দৈববাণীর মাধ্যমেই মানুষ এগুলো লাভ করতে পারে। যারা এই দৈববাণী প্রচার করবে তাদের ঈশ্বর কর্তৃক মনোনীত হতে হবে এবং তারা অবতার, মশীহ, নবী, পুরোহিত এবং বিধানকর্তা নামে পরিচিত হবেন। আর এভাবেই একবার পৃথিবীতে দেবতাদের প্রতিনিধি এবং মানবতার পবিত্র পথনির্দেশক হিসেবে স্বীকৃতি পাবার পর, মানবজাতির উদ্ধার কাজে ঈশ্বর কর্তৃক নিয়োজিত হবার পর, তারা পৃথিবীতে পরম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যান। প্রত্যেক মানুষই পরোক্ষভাবে তাদের প্রতি সীমাহীন আনুগত্য প্রকাশের জন্য বাধ্য থাকে। ঈশ্বরের ইচ্ছা ব্যতিরেকে তখন মানুষের কোন ইচ্ছা থাকে না। ঈশ্বরের বিচারের বাহিরে তখন পৃথিবীর মানুষের কোন বিচারও ফলপ্রসু হয় না। ঈশ্বরের দাস হবার সাথে সাথে মানুষকে চার্চ এবং রাষ্ট্রেরও দাস হতে হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রের উপরে চার্চের আধিপত্য থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের এই দাসত্বও বলবৎ থাকে।

খ্রিষ্টধর্ম এটি বুঝতে পেরেছিল যে, প্রাচীন মহাদেশীয় ধর্মগুলোর মত কেবলমাত্র স্বতস্ত্র এবং বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত জাতিগুলোর দিকে নজর দিলেই হবে না। তাই খ্রিষ্ট ধর্ম আরো উচ্চ বিলাসী হয়ে সমস্ত মানবতাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল। এটি শুধু নির্দিষ্ট মহাদেশে নয়, দুনিয়া জুড়ে কঠোর ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা চালিয়েছিল। এই কারণে খ্রিষ্ট ধর্ম একমাত্র পরম ধর্ম, সর্বশেষ ধর্ম। এ কারণেই ভাববাদী ধারায় পুষ্ট রোমান ক্যাথলিক চার্চই একমাত্র সঙ্গতিপূর্ণ, বৈধ এবং দৈব আশির্বাদপুষ্ট চার্চ। আর সব নাকি মিথ্যা!

সকল অধিবিদ্যাবিদ এবং ভাববাদী দার্শনিক, রাজনীতিবিদ কিংবা কবিদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি; ঈশ্বরের ধারণা মনুষ্য সমাজের কারণ ও বিচারের ধারণাকে অস্বীকার করে। এই ধারণা মানুষের স্বাধীনতার বিপরীতে অবস্থান করে এবং প্রয়োজনীয়ভাবেই তত্ত্ব এবং প্রয়োগগত উভয় অর্থেই মানুষকে দাসত্ব বরণ করানোর মধ্য দিয়েই কেবল এর অবসান ঘটে। একারণে আমরা মানুষের দাসত্ব এবং পতনের আশা করতে পারি না। যেমনটা আশা করেন মমাইরস, প্রাইটিস্ট কিংবা প্রোটেস্ট্যান্ট মেথডিস্টদের মত ভন্ড ব্যক্তিরা। কিন্তু আমরা সেটা পারবো না, কোনো ভাবেই না। এমনকি ধর্মতত্ত্বের ঈশ্বর কিংবা অধিবিদ্যার ঈশ্বর কাউকেই যৎসামান্য অনুমোদনও আমরা দিতে পারবো না। যেমনভাবে ইংরেজি অক্ষর অ দিয়ে শুরু হলে সেটা অনিবার্যভাবেই ত দিয়ে সমাপ্ত হয়। ঠিক সেরকমই  যিনি ঈশ্বরের অর্চনা করতে চান তাকে কেবল শিশু সুলভভাবে এই বিভ্রমগুলোর কাছে আশ্রয় নিলে চলবে না, দ্ব্যর্থকণ্ঠে তার স্বাধীনতা এবং মনুষ্যত্বকে অস্বীকার করতে হবে।

যদি ঈশ্বর থাকেন তবে মানুষ হবে দাস। তাহলে মানুষের মুক্ত হবার একমাত্র উপায় হলো ঈশ্বর না থাকা। এই চক্রকে কেউ এড়িয়ে যেতে পারবে না। তাই আমাদের সবাইকে এই দুটি পথের যেকোন একটিকে বেছে নিতে হবে। হয় ঈশ্বরকে স্বীকার করা, নয়তো অস্বীকার করা। স্বীকার করলে আমরা ঈশ্বরের দাস, অস্বীকার করলে আমরা মুক্ত।

এখন অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, ধর্মীয় রীতিনীতি মানুষকে অধঃপতিত ও নীতিভ্রষ্ট করেছে কিনা? করলে কি পরিমাণে করছে? এই বিষয়গুলো চিহ্নিত করা কী খুব জরুরি? হ্যাঁ, জরুরি। কারণ এই রীতিনীতিগুলো মানুষের কার্যকারণ অনুসন্ধানের ক্ষমতাকে নষ্ট করছে। এগুলো মানুষের মুক্তির পথে প্রধান অন্তরায়। এই রীতিনীতিগুলো মানুষকে ক্ষীণ বুদ্ধির অধিকারী করে তাদেরকে তথাকথিত ঈশ্বরের দাস বানিয়েছে। ধর্মবাদীরা মানুষের শ্রমকে অসম্মান করে সেটাকে ঈশ্বরের প্রতি বশ্যতার প্রতীক হিসেবে দেখে। মানুষের বিচার করার সক্ষমতাকে এগুলো গলা টিপে হত্যা করেছে। সর্বদা এই ধর্মীয় উন্মাদগুলো বিজয়ী দুর্বৃত্তদের পক্ষ নিয়েছে। বিনিময়ে পেয়েছে স্বর্গীয় জীবনের মতই বিশেষ সুবিধা। মানুষের সম্মান এবং মর্যাদাকে খুন করে তারা কেবল মাত্র বিনয়ী চাটুকাদের রক্ষার মহান দায়িত্ব নিয়েছে। এই দুর্বৃত্তদের দল প্রতিটি জাতির মান মানুষের মধ্যে মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন নষ্ট করে মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে স্বর্গীয় নিষ্ঠুরতা।

আসলে প্রতিটি ধর্মই এরকম নিষ্টুর রক্তগঙ্গার উপর প্রতিষ্টিত। ত্যাগের মহিমার কথা বলে তারা ভন্ডামি করে। স্বর্গের বাসনা দেখিয়ে তারা মানবতাকে বলি দেয়। তাদের ধর্মের এই  রক্তের হোলি খেলাতে মানুষ সর্বদাই বলি হয়। অন্যদিকে পুরোহিত নিজে একজন মানুষ হয়েও সৌভাগ্যবশত ঈশ্বরের কৃপাধন্য হয়ে পরিণত হয় সুবিধাবাদী স্বর্গীয় জল্লাদে। এই পৃথিবীতেই সে পায় স্বর্গীয় সুখ আর মানুষ পায় হাহাকার।

এই ঘটনার দ্বারা এটা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, কেন সকল ধর্মের পুরোহিতেরা সর্বোত্তম গুণের অধিকারী? কেন তারা সবচেয়ে বেশি ভদ্র? কেন তারা সব সময় ঈশ্বরের হৃদয়ের কাছাকাছি অবস্থান করেন?  কারণ যদি তাদের হৃদয়ে, তাদের চিন্তা চেতনায়, তাদের মনে ঈশ্বর না থাকেন তাহলে তারা এ সমস্ত ভন্ডামির কোন ব্যাখ্যা হাজির করতে পারবেন না (কারণ আমরা জানি সাধারণ মানুষই হোক আর পুরোহিতই হোক দুজনেরই হৃদয় আলাদা নয়)। এজন্য নিজের মনের মধ্যে ঈশ্বরকে ধারণ করে তারা ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের জাহির করেন। এভাবে ঈশ্বরকে সামনে রেখে তারা রক্তক্ষয়ী ও পাশবিক ঘটনাগুলো ঘটায়। যেটির জন্য পুরোহিতের হৃদয় প্রকারান্তে ঈশ্বরের হৃদয়ই দায়ী।

এই সমস্ত ছল চাতুরি আমাদের সমসাময়িক উন্মাদ ভাববাদীদের চেয়ে কেউই ভাল জানে না। তারা এমনই শিক্ষিত লোক যে ইতিহাসকে তারা জানার চেষ্টা করে হৃদয় দিয়ে! এর থেকে হাস্যকর আর কী হতে পারে! তারা তাদের অসাধারণ বাগ্মিতা দিয়ে ধর্মের সমস্ত অপকর্ম, সমস্ত অপরাধগুলো আমাদের কাছে জায়েজ করে। মানুষের সত্যিকারের মঙ্গলের জন্য যে ঈশ্বরের (মানে বিজ্ঞানকে বুঝানো হচ্ছে)  প্রয়োজন এই বক ধার্মিকরা সম্মিলিতভাবে তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে।

মানুষ যে ঈশ্বরের তারা পূজা করে কিংবা পূজা করার চিন্তা করে, তা ঐতিহাসিক ধারায় যে আসল ঈশ্বর আসার কথা ছিল (মানে বিজ্ঞান) সেটা থেকে ভিন্ন। তার মানে হচ্ছে ধর্মতাত্ত্বিক কিংবা অধিবিদ্যিক যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন তাদের প্রজিত ঈশ্বর আসলে ঈশ্বর নন। এই ঈশ্বরকে রোবেসপিরি কিংবা জে জে রুশোর চরম সত্ত্বাও বলা যায় না। কিংবা স্পিনোজারের সর্বশ্বেরবাদী ঈশ্বর বলেও আখ্যা দেয়া যায় না। আবার এই ঈশ্বর পূর্বে বর্ণিত হেগেলের অন্তর্যামী, অতিন্দ্রিয় এবং সন্দেহতীতভাবে প্রমাণিত বলেও ধরে নেয়া যায় না। ধর্মবাদীরা তাদের ঈশ্বরকে কোন সংজ্ঞার আওতাধীনে ফেলতে চান না। তাদের বদ্ধমূল ধারণা ঈশ্বরের কোন সংজ্ঞা দিলে তিনি নিন্দুকের সমালোচনার মুখে পড়ে যেতে পারেন। তারা এটাও বলতে চান না যে এই ঈশ্বর তাদের ব্যক্তিগত না সার্বজনীন। ঈশ্বর জগত সৃষ্টি করেছেন কি করেন নি এ ব্যাপারেও তাদের মুখ বন্ধ থাকে। ঈশ্বরের দৈব দূরদর্শিতার ব্যাপারেও তারা কথা বলতে নারাজ। তারা হয়তো মনে করেন এগুলো নিয়ে আলাপ করা ঈশ্বরকে ছোট করার সমান। তারা শুধুমাত্র “ঈশ্বর” শব্দটি বলার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চান এবং আর কোন কিছুই বলতে চান না। কিন্তু তারপর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দাঁড়ায় তাদের ঈশ্বর আসলে কী? তাদের ঈশ্বর একটি ধারণা মাত্র নয়; এই ঈশ্বর মানুষের একটা বিমূর্ত উচ্চাকাঙ্খা।

যা কিছু মহৎ, ভালো, সুন্দর, অভিজাত, মানবিক তার মধ্যেই ধর্মবাদীদের মতে ঈশ্বরের প্রকাশ। কিন্তু কেন? তারা কি মানুষ দেখে অভিভূত হয় না? মানুষের মধ্যে কি ভালো সুন্দর কিছু নেই? প্রুশিয়ার স¤্রাট উইলিয়াম, ৩য় নেপোলিয়ন এবং তাদের সমবয়সীরা মানুষের মতই দেখতে; কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা ধর্মবাদীদের ভাবনার কারণ হন কেন? আর ঈশ্বর সব ভালো কিছুতেই থাকেন কেন? খারাপে কি সমস্যা? মানবতা তো সকল প্রকার আমিত্বের সমন্বয়। সেখানে যেমন থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এবং মহিমান্বিত জিনিসগুলো, তেমনি থাকে সবচেয়ে ভয়ংকর এবং জঘণ্য জিনিসগুলোও। ধর্মবাদীরা কি আদৌ এগুলো অতিক্রম করতে পারে? কেন তারা একটিকে পুতপবিত্র এবং অন্যটিকে বীভৎস ভাবে? কোন উত্তর নেই। ফলাফলস্বরুপ যা হবার তাই হয়। পবিত্রতা এবং বর্বরতাকে সেতুর দুইপ্রান্তে রেখে মাঝখানে তারা স্থান দেয় মানবতাকে। তারা এটি বুঝতে পারে না কিংবা বুঝতে চায়ই না তিনটি এক এবং অভিন্ন। ফলে তারা এই তিনটিকে কাটাকাটি করে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। কী বীভৎস!

তাদের কেউই যুক্তিতে যথেষ্ট শক্তিশালী নন। হয়তো অনেকেই বলতে পারেন তাদের এটার কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু তাদের এই যুক্তিহীনতাই তাদেরকে সর্বেশ্বরবাদী আধিবিদ্যকদের থেকে পার্থক্য গড়ে দেয় এবং তাদের চিন্তাকে গোঁড়া ভাববাদী করে তোলে। চিন্তা গড়ে উঠার ঐতিহাসিক বিবর্তন প্রক্রিয়াকে বাদ দিয়ে তাদের ভাবনাগুলোর গোড়াপত্তন হয়। আবেগ, ইতিহাস, সমগ্রতা কিংবা জীবন সকল ক্ষেত্রেই তাদের এই চিন্তা পদ্ধতির কোন পরিবর্তন হয় না। তাদের দৃষ্টিতে দৈবভাবেই সম্পদ এবং ক্ষমতা মানুষের কুক্ষিগত হয়। তাদের এই আবির্ভূত চিন্তা যখন যুক্তির বেড়াজালে পড়ে তখন তা নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

তাদের চিন্তাগত দ্বন্দ্ব খানিকটা এরকম- তারা ঈশ্বরকে প্রত্যাশা করে আবার তারা মানুষকেও চায়। তারা এমন দুইটি ধারণাকে সংযুক্ত করতে চায়, যারা একে অপরকে ধ্বংস করা ছাড়া নিজের প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম নয়। তাদের এক নিঃশ্বাসে বলতে শোনা যায়-“ঈশ্বরকেই চাই, সাথে চাই মানুষের মুক্তি”, “ঈশ্বরকেই চাই এবং সাথে চাই মানুষের জন্য সম্মান, ন্যায়বিচার, সাম্য, সৌহার্দ এবং সমৃদ্ধি”Ñ গুণের মানদন্ডে এই ভয়ংকর যুক্তিকে বিচার করলে যেটা দাঁড়ায় তা হলো, যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকে, তাহলে অন্য সবগুলোই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যায় কিংবা সবগুলোর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। ইতিহাসের সমস্ত শিক্ষা এবং কান্ড জ্ঞানকে বিসর্জন দিয়ে তারা এটা বলতে চায়, তাদের কথিত ঈশ্বর মানুষের মুক্তির ¯েœহবৎসল পিতা: যিনি কিনা নিজেই প্রভু। আর মানুষ কিছুই না। অর্থাৎ ঈশ্বরের অস্তিত্বের মানেই হলো তার নিচে যারাই আছে সবার দাসত্ব। সুতরাং ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকলে মানুষের মুক্তি অসম্ভব। তাই এই অস্তিত্বকে বিলীন করে দেয়াই আমাদের কর্তব্য।

মানুষের মুক্তির একজন হিংসাপরায়ণ প্রেমিক হিসেবে এবং মানবতার পরম অবস্থার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান রেখে আমি ভলতেয়ারের প্রবাদটি আবারো বলতে চাই, “যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকেই, তবে অচিরেই তাকে বাতিল বলে ঘোষণা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবে।” এটি অনিবার্য। কারণ এটি ছাড়া মানুষের মুক্তি নেই।

তীব্র যুক্তিপূর্ণ এই কথাগুলো আরো আধুনিকীকরণ করতে হবে বলে আমি মনে করি। যুক্তির পরকাষ্ঠায় নিজেদের আসীন করতে হবে। তাহলে ধর্মবাদীরা আর উৎফুল্ল হওয়ার সুযোগ পাবে না। তারা মানুষের মুক্তির এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব এই দ্বন্দ্বগুলো একত্র করতে গিয়ে আর মোহের ঘূর্ণিচক্রে আবর্তিত হবে না।

অবশ্য ধর্মবাদীরাও কিন্তু সম্মান এবং ভালোবাসার সাথে মানুষের মুক্তির কথা বলে। সেটা আমাদের মত বস্তুবাদী এবং বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীদের মানুষের মুক্তি সংক্রান্ত ভাবনা থেকে অনেকটা ভিন্ন। কারণ তারা যখনই মুক্তির প্রসঙ্গটি আনে সাথে সাথেই তারা আরো একটি জিনিস সেখানে যুক্ত করে, তা হলো মুক্তি দানকারী কর্তৃপক্ষের কথা। সে কর্তৃপক্ষকে আমরা সমস্ত হৃদয় দিয়ে প্রত্যাখ্যান করি। প্রকৃতিতে আবার কর্তৃপক্ষ কিসের? কোন কর্তৃপক্ষ কী প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? প্রকৃতি তো একটা সিস্টেমেটিক বিষয়। কোনো কর্তৃপক্ষই একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতির এই নিয়মগুলোর সাথে বিদ্রোহ দেখানো শুধু নিষিদ্ধই নয়- এটা আমাদের পক্ষে অসম্ভবও বটে। আমরা এই নিয়মগুলো সম্বন্ধে ভুল জানতে পারি কিংবা কিছুই না জানতে পারি, কিন্তু এগুলোকে আমরা অসম্মান করতে পারি না- কারণ এগুলো আমাদের অস্তিত্বের মৌলিক ভিত্তি গড়ে দেয়। এগুলো আমাদের আচ্ছাদন করে। আমাদের সত্ত্বার ভেতরে প্রবেশ করে। আমাদের সমস্ত গতিবিধি, চিন্তা ও কর্ম নিয়ন্ত্রণ করে; এমনকি যখন আমরা মনে করি যে এগুলোকে আমরা মানি, তখনো আমরা সব জায়গায় এই জিনিসগুলোকেই দেখতে পাই।

হ্যাঁ, আমরা আসলে এই নিয়মগুলোরই গোলাম। যেকোন প্রকারের দাসত্বের বাহিরের একজন মনিব থাকে- যার আদেশে ব্যক্তির সমস্ত আইন নির্ধারিত হয়। কিন্তু এই নিয়মগুলো আমাদের কাছে বাহিরের কোন কিছু না; এগুলো আমাদের সহজাত, এগুলো দৈহিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সর্বোপরি নৈতিকভাবে আমাদের পূর্ণ সত্তা গঠন করে। এই নিয়মগুলোর দ্বারাই আমরা বাঁচতে পারি, নিঃশ্বাস নিতে পারি, কাজ করতে পারি, চিন্তা করতে পারি, নিজের ইচ্ছার কথা অন্যকে জানান দিতে পারি। এগুলো ছাড়া আমরা কিছুই না, আমরা হয়ে পড়ি অস্তিত্বহীন।

প্রকৃতির নিয়মগুলোর সাথে আমাদের এই নিবিড় সম্পর্কের কারণ কেবল মাত্র একটিই- সেটা হচ্ছে ব্যক্তিক এবং সামগ্রিক মুক্তির লক্ষ্যে কিংবা মানবতার মহান উদ্দেশ্যে এই নিয়মগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোকে প্রয়োগ করা। এই নিয়মগুলো একবার চিহ্নিত করা গেলে এর ব্যবহার নিয়ে মানুষের মাঝে কখনো বিতর্কের সৃষ্টি হয় না। তবে একজন স্থূল বুদ্ধির মানুষ, একজন ধর্মতাত্ত্বিক কিংবা একজন অধিবিদ্যাবিদ, নয়তো একজন আইনজ্ঞ কিংবা বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ, তারা দুই দুগুণে চারের মত সরল এই নিয়মগুলো মানতে চাইবেন না। সেজন্য তারা ইতিহাসের তলায় ঠাঁই পাবেন।

এজন্য কোন মানুষ যখন বিশ্বাসী হন, তখন তিনি ভাবেন যে আগুন হয়তো পোড়াবে না কিংবা পানিতে হয়তো মানুষ ভিজবে না। প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে তখন বিশ্বাসই হয় তার শেষ অস্ত্র। কিন্তু প্রকৃতির এই নিয়মের বিপক্ষে এই ধাঁচের বিদ্রোহ এক ধরনের বোকামি অথবা মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

সবচেয়ে হতাশার বিষয় এটা যে প্রকৃতির নিয়মকানুনের অনেকগুলোই ইতোমধ্যে বিজ্ঞানের দ্বারা স্বীকৃত। কিন্তু সেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে এখনো অচেনাই রয়ে গেছে। এর মূলে রয়েছে  জনতার রক্ষক হিসেবে পরিচিত সরকারগুলোর সতর্ক দৃষ্টি। তারা স্বইচ্ছায় মানুষকে এসব জ্ঞান থেকে সরিয়ে রেখেছে।

এখানে আরো একটি সমস্যা রয়েছে। প্রকৃতির নিয়মের অধিকাংশই মানবজাতির উন্নতির পর্যায়ের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো একদিকে যেমন প্রয়োজনীয়, আবার কখনো কখনো সেগুলো মারাত্মকও বটে। কারণ এই নিয়মগুলো বস্তুগত জগতকে নিয়ন্ত্রণ করে ঠিকই কিন্তু বিজ্ঞান আজো সে নিয়মগুলোর অনেক অংশই নিজের করায়ত্তে নিতে পারে নি।

যখন এই নিয়মগুলো বিজ্ঞান পুরোপুরি জানতে পারবে, বাহ্যিক শিক্ষা এবং দিকনির্দেশনার মাধ্যমে মানুষকে জানাতে পারবে, সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে সমর্থ হবে তখনই মানুষের মুক্তির প্রশ্ন পুরোপুরি সমাধান হবে। প্রচন্ড মাত্রার একগুঁয়ে কোন লোকও সেদিন মানতে বাধ্য হবে পৃথিবীতে রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা বিধিবিধান কিংবা আইনের কোন প্রয়োজন নেই। যে সমস্ত লোকেরা সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে কিংবা সার্বজনীন ভোটাধিকার প্রয়োগ করার মত সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা বলে তারাও সেদিন কেবলমাত্র প্রকৃতির নিয়মের কাছে বশ্যতা স্বীকার করবে।

মোদ্দাকথা মানুষ পুরোপুরিভাবেই প্রকৃতির নিয়মগুলো মেনে চলে। কারণ সে এগুলোর মাঝেই নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। সে ভালোভাবেই বুঝতে পারে এই নিয়মগুলো তার উপর বাইরে থেকে আরোপিত হয়নি। সেই আরোপিত বিষয় দৈব কিংবা মানবীয়, ব্যক্তিক কিংবা সামগ্রিক যাই হোক না কেন।

এবার একটি দক্ষ একাডেমির কথা ভাবুন। মনে করুন, একাডেমিটিতে যেখানে আছেন বিজ্ঞানের সবচেয়ে আলোকিত প্রতিনিধিরা। ধরুন, এই একাডেমি সমাজের কর্তৃপক্ষ এবং আইনের দ্বারা অস্বীকৃত। একাডেমিটি বিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে আইনকে সুসংবদ্ধভাবে প্রয়োগ করে। তখন আসলে কী দেখবো? তাহলে আসল দেখা যাবে দুটি কারণে এই আইন এবং সমাজ সংগঠনটি বিকট মূর্তি ধারণ করবে। প্রথমত মানুষের বিজ্ঞান সব সময়ই মানুষের প্রয়োজন অনুসারে নির্ভূল হয় না; বিজ্ঞান কি আবিষ্কার করেছে এবং কি আবিষ্কার করে নি এর দোলাচলে আমরা বলতে পারি এই ব্যবস্থাটি এখনো শিশুকাল পার করছে। তাহলে আমরা দেখবো আমরা বিজ্ঞানের নিত্যনতুন ধারণার কঠিন ও কঠোর নিয়মের মাঝে নিজেকে আটকে ফেলছি। আমরা কি সেটি চাই? অবশ্যই তা নয়। আমরা সমাজ কর্তৃক মানুষের উপর আরোপিত কঠোর নিয়মগুলোকে উচ্চস্বরে ধিক্কার জানাই এবং অচিরেই আমরা সেই নিয়মগুলোকে স্থানচ্যুত করে সেগুলোর কণ্ঠরোধ করতে চাই। জীবন সব সময়ের জন্যই বিজ্ঞান থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস হিসেবেই যেন থাকে। এটাই আমরা চাই।

বিশেষ সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তি এবং সুবিধা সম্বলিত পদ পদবিগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে এটি মানুষের হৃদয় এবং মনকে খুন করে ফেলে। বিশেষ সুবিধা প্রাপ্ত কোন লোক, সে সুবিধা রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক যেভাবেই তৈরি হোক না কেন এই ধরনের লোক মন এবং হৃদয় এই দুটি বস্তু হারিয়ে বসেন। আর এটা এমন একটা সামাজিক নিয়ম যাতে স্বাভাবিকভাবে কোন ব্যতিক্রম দেখা যায় না। শ্রেণী পেশা ব্যক্তি নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে এটা সমভাবে প্রযোজ্য।

বিজ্ঞানের বিষয়গুলো যখন সমাজের সরকারি চৌহদ্দিতে আটকে থাকে অচিরেই তার কাজের ক্ষেত্র বিজ্ঞান ছাড়া অন্যান্য বিষয়গুলোতে ভাগ হয়ে যায়। এই অন্যান্য বিষয়গুলো সমাজের প্রতিষ্টিত শক্তির কারণে বিজ্ঞান অচিরেই সমস্ত সমাজের হাস্যকর কাজগুলোতে বেশি মনোনিবেশ করে বসে। পর্যায়ক্রমে এটি সরকারের হুকুম তামিল করার একটা হাতিয়ারে পরিণত হয়। তখন দেখা যায় বৈজ্ঞানিক একাডেমিগুলোর আর আইসভাগুলোর মধ্যে কার্যত কোনো পার্থক্য থাকে না।

তাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে ব্যর্থ এসব কোনো কর্তৃপক্ষের সাথে আমি আলোচনায় বসবো না। এমনকি যদি বিশেষ কোন সমস্যা দেখা দেয় তবুও। তাদের সততা ও নিষ্টার জন্য যতটুকু সম্মান প্রাপ্য তা আমি অবশ্যই তাদের দিব। কিন্তু কোন ব্যক্তির মতামতের উপর আমার কোন পরম বিশ্বাস নেই। এই ধরনের বিশ্বাস আমার কার্যকারণ, মুক্তির প্রয়াস এমনকি আমার কাজের সফলতার ক্ষেত্রেও মারাত্মক হতে পারে। এটা আমাকে তৎক্ষণাৎ একজন বোকা দাসে পরিণত করবে। আমি হয়ে পড়বো অন্যের ইচ্ছা ও ভালো লাগার কেনা গোলাম।

আমি একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত যেকোন বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের কথা শুনবো এবং আমার কর্মতৎপরতা তাদের পরামর্শ মোতাবেক চালিয়ে যাব যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের ইঙ্গিত এবং দিকনির্দেশনাগুলো আমার কাছে প্রয়োজনীয় মনে হবে। এর কারণ তাদের নির্দেশনাগুলো আমার উপর মানুষ কিংবা দেবতা কারোরই আরোপ করা নয়। যদি আরোপ করা হত তাহলে আমি তাদের কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়া ছুঁড়ে ফেলে দিতাম। সেই শয়তানের সাথে এই মর্মে দেন দরবারে বসতাম যে, তার মত কর্তৃপক্ষগুলো কর্তাব্যক্তিদের বুদ্ধিমত্তা এবং দিকনির্দেশনা দেয়ার মত ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। ঐ দেন দরবারের পর আমার মুক্তির বাসনা এবং আত্মসম্মান হারানো সত্ত্বেও মিথ্যের চাদরে মোড়ানো সত্যের এই ঝুপকাষ্ঠা প্রজ্জলিত করার গুরুদায়িত্ব আমি নিজেই নিজের কাঁধে তুলে নিতাম।

আমার নিজের ভালোর জন্যই আমি বিশেষজ্ঞ লোকদের কর্তৃপক্ষের কাছে মাথা নত করবো। মানুষের জ্ঞান সমুদ্রের বিশালতা এবং জ্ঞান  ভান্ডারের ক্রমিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতার সমস্ত কিছু আমি হয়তো জানি না। কিন্তু জ্ঞান অন্বেষণে আমি সর্বদা সচেষ্ট থাকি। জ্ঞান জগতের সমস্ত কিছু জানার মত সক্ষমতা সবার এক রকম নয় তা আমি জানি। আর ঠিক সে কারণেই সময়ের পরিক্রমায় বিজ্ঞান এবং শিল্পের সমস্ত ক্ষেত্রে শ্রমের ঐক্য এবং বিভাজন উভয়েই বিভাজন দেখা দিয়েছে। আমি যা জানি তা আমি অপরকে প্রদান করি এবং যা জানি না অপর মানুষজন থেকে তা গ্রহণ করি- এইতো মানব জীবন। প্রত্যেক মানুষ অন্যকে পরিচালনা করে এবং নিজের জন্য অন্যান্য মানুষ দ্বারা পরিচালিত হয়। সুতরাং মানব সমাজে কোনো নির্ধারিত এবং স্থির কর্তৃপক্ষ নেই। বরঞ্চ সাময়িকভাবে পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে মানুষ স্বেচ্ছায় কিছু সময়ের জন্য অন্যের প্রতি নিবেদিত হয় এবং তাকে কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকার করে।

এই কারণে কোনো স্থির, নির্ধারিত এবং সার্বজনীন কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব স্বীকার করতে আমি ইচ্ছুক নই। কারণ কোনো পরম মানুষের অস্তিত্ব মানব সমাজে নেই। একা কোন মানুষই মানব জগতের সমস্ত সম্পদের ভোগ দখল নিতে পারে না। সে কারণেই বিজ্ঞানের ব্যবহার ছাড়া মানব জীবন অচল। কেবলমাত্র বিজ্ঞানই হলো মানব সমাজের একক এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি বিজ্ঞান নামক এই পরম সত্ত্বা কেবল মাত্র কোনো ব্যক্তি বিশেষের অধিকারে থাকে এবং সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তি যদি সেটার সুবিধা নিয়ে আমাদের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে চায় তাহলে তখন তাকে অবশ্যই লাথি মেরে সমাজ থেকে বের করে দিতে হবে। কারণ তার একক কর্তৃত্ব সমস্ত মানুষের জন্য বয়ে আনবে জড়তা এবং দাসত্বের করুণ অভিশাপ। আমি মনে করি না সমাজ এ যাবৎকালে প্রতিভাধর মানুষের সাথে অসদাচরণ করে এসেছে। কিন্তু আমি এটাও মনে করি না তাদের এই প্রতিভার বদৌলতে তারা সমাজ থেকে বিশেষ সুযোগ সুবিধা পাবার দাবি রাখে। তাদের এই সুবিধাগুলো না দেওয়ার পেছনে মূলত তিনটি কারণ উল্লেখ করা যায়: প্রথমত, তাহলে আমরা অনেক সময় একজন হাতুড়ে ডাক্তারকেই রোগের বিশেষজ্ঞ বলে মনে করবো। দ্বিতীয়ত, ঐ হাতুড়ে ডাক্তারটিকে তোষামোদ করে সমাজ থেকে অনেক সুযোগ সুবিধা দিতে থাকলে সেও নিজেকে কোন এক সময় বিশেষজ্ঞ মনে করতে পারে। তৃতীয়ত, তার এই ভ্রমের কারণে সমাজে সে অন্যান্যদের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে বসতে পারে।

সুতরাং সম্মিলিতভাবে আমরা এটাই বুঝতে পারি যে, বিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের মানসিক বিকাশ প্রক্রিয়ার পুণরুৎপাদন করা। এতে আমরা সবাই অবগত আছি যে, প্রকৃতির নিয়মগুলো সুবিবেচনা প্রসূত এবং সর্বতোভাবে মানুষের বস্তুজগত, বুদ্ধিবৃত্তিক জগত এবং নৈতিক জগতে প্রভাব বিস্তার করে। বিজ্ঞানের সাহায্যে মানুষ বাহ্যিক এবং সামাজিক এই দুই ভিন্ন জগতকে একত্রিত করে অনন্য এক জগত নির্মাণ করে। মানব সমাজের এই বৈধ কর্তৃপক্ষটি ছাড়া আমি অন্যান্য সমস্ত কর্তৃপক্ষকে মনে করি মিথ্যা, স্বৈরাচারী এবং মানব সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। কেবল মাত্র এই কর্তৃপক্ষই বৈধ কারণ এর অধীন হওয়া যুক্তিযুক্ত এবং তা মানবমুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অবশ্যই আমরা বিজ্ঞানকে পরম কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকার করি। কিন্তু এই সাথে আমরা তৎসংশ্লিষ্ট মহাপন্ডিতদের বিজ্ঞান বিষয়ক অমোঘ দাবি এবং সর্বব্যাপীতাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি। বিজ্ঞান নামক আমাদের চার্চে (আসলে আমি এই চার্চ শব্দটি অন্যভাবে ব্যবহার করার জন্য এখন মরিয়া হয়ে আছি; চার্চ এবং রাষ্ট্র শব্দ দুটি আমার হরিষে বিষাদের মত ঠেকে) প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের মতই একজন অদৃশ্য ঈশ্বর আছেন। কিন্তু প্রোটেস্ট্যান্টদের মত আমাদের কোন পোপ, কোন বিশপ, কোন পাদ্রী কিংবা অন্যান্য কাউন্সিলের কোন মহাপন্ডিতদের গুপ্ত আলোচনা শুনতে হয় না; তার একটাই কারণ আমাদের পন্ডিতেরা যুক্তি দিয়ে কথা বলে। তারা কোন অন্ধ বিশ্বাসে গা ভাসিয়ে দেয় না। আমাদের যীশু প্রোটেস্ট্যান্ট এবং খ্রিষ্টানদের যীশুর থেকে এই অর্থে ভিন্ন যে- খ্রিষ্টানদের যীশু ব্যক্তিমাত্র, আমাদের যীশু সামগ্রিক; খ্রিষ্টানদের যীশু ইতোমধ্যেই তার পূর্ববর্তী সমস্ত আত্মগ্লানি ভুলে নিজেকে একজন যথার্থ মানব হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু বিজ্ঞান নামক আমাদের এই যীশুর পরিপূর্ণ এবং যথার্থ হবার কাল অতীতে নয়, ভবিষ্যতের দিকে। এই ভবিষ্যতের কথা পূর্ববর্তী যীশুভক্ত অন্ধের দল চিন্তাতেও আনতে চান না। তাই, আমরা পরম সময়ের নিয়ন্তা বিজ্ঞানকেই আমাদের মুক্তির লক্ষ্যে পরম কর্তৃপক্ষ হিসেবে মনে করি।

আমার লেখায় আমি বিজ্ঞানকে যে “পরম সত্ত্বা” হিসেবে উল্লেখ করেছি, তার একমাত্র কারণ এটি অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে পরিপূর্ণ মাত্রায় বিকশিত হয়। এই বিজ্ঞান প্রাকৃতিক নিয়মের মিথস্ক্রিয়ায় গঠিত বিশ্বের অসীম জ্ঞান ভান্ডারের অবিরাম উন্নতির তত্ত্বের বিকাশ করতে থাকে। এটা সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান যে মানুষের সমস্ত চিন্তার প্রয়াসের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান নামক যে সুমহান বস্তুর সৃষ্টি হয় তা কখনোই পরিপূর্ণ রূপে সমগ্র সত্ত্বা নিয়ে বিকাশ লাভ করতে পারে না। আমাদের যীশু এজন্য অপূর্ণই থেকে যায় এবং যার কারণে আমাদের কাছে তার লাইসেন্সধারী প্রতিনিধিদের গর্ব করার মত কিছুই থাকে না। যেখানে প্রকৃত ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে যারা তার পুত্রের নাম করে আমাদের উপরে তাদের দাম্ভিক এবং গোঁড়ামিতে ভরপুর কর্তৃত্বপূর্ণ আচরণ চাপিয়ে দিতে চায় সেখানে আমরা আমাদের সত্যিকারের ঈশ্বরের কাছেই মাথা নত করি। আমাদের ঈশ্বর বস্তুজগতের ঈশ্বর। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে তার নিত্য চলাচল। অন্যদিকে ঈশ্বরের পুত্র নামে কল্পিত ঈশ্বরটি সেই বিশাল ঈশ্বরের বিশাল বস্তুর কিয়দাংশ মাত্র। প্রকৃত ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা মানুষেরা এই জগতেই বাস করি, কাজ করি, সংগ্রাম করি, ভালবাসি, এক অপরের সথে প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হই, আনন্দ উপভোগ  করি, এমনকি দুঃখ দুর্দশাও ভোগ করি।

বিজ্ঞানের পরম সার্বজনীন এবং অনিবার্য কর্তৃত্বকে অস্বীকার করলেও আমরা সদিচ্ছায় বিজ্ঞানের গ্রহণযোগ্য, তুলনামূলকভাবে প্রাসঙ্গিক, সমসাময়িক এবং আপাত দৃষ্টিতে স্থির শাখাগুলোর কাছে  মাথা নত করি। কারণ সময়ের পরিক্রমায় ঘুরে ফিরে বারবার আমাদের এই আলোচনাগুলোই করতে হয় এবং মানুষের দেয়া চমৎকার এ তথ্যগুলো আমাদের বিমোহিত করে। বিশেষজ্ঞ এবং আমাদের মধ্যে জ্ঞান আদান প্রদানের এই মিথস্ক্রিয়ার ফলে একটা সময় আমরা দক্ষতায় তাদের সমকক্ষ হয়ে উঠি কিংবা কখনো কখনো তাদেরকেও ছাড়িয়ে যাই। সাধারণভাবে, মানুষের বুদ্ধির দ্বারা অলঙ্কৃত সুমহান জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, চিন্তা, সর্বোপরি হৃদয়ের বিকাশ আমাদের আশাদীপ্ত করে। কেবলমাত্র প্রকৃতির এবং বৈধ কর্তৃপক্ষগুলোর অধীনতা স্বীকার করে নামী বেনামী, পার্থিব কিংবা অপার্থিব সমস্ত কর্তৃপক্ষকেই তারা তাদের মহান চিন্তার মধ্য দিয়ে নস্যাৎ করে দিতে পারে। একেবারে খাঁটি কিংবা বিশুদ্ধ এরকম সমস্ত কিছু বাদ দিয়ে আমরা কার্যকারণ বিচার করে প্রকৃতির কর্তৃত্ব স্বীকার করি। কারণ ধর্মবাদীরা যখনই বিশুদ্ধ কোনো জিনিস আমাদের সামনে উপস্থিত করেছে, মেকি ভ্রমের মায়াজালে তৎক্ষণাৎ তা শোষণের চাবি হয়ে উঠেছে।

এক কথায়, আমরা আমাদের কর্মকান্ডে সমস্ত কালাকানুন, সমস্ত কর্তৃপক্ষ এবং বিশেষ সুবিধাধারী, লাইসেন্স প্রাপ্ত ব্যক্তি কিংবা সরকারি কর্মচারিদের সমস্ত নগ্ন হস্তক্ষেপ অস্বীকার করি। এমনকি যদি এ সমস্ত ব্যক্তিরা সার্বজনীন ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়ে আসেন তবেও আমরা তাদের মানি না। কারণ আমরা মনে করি কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রিক এই ব্যবস্থা সংখ্যাগরিষ্ট শোষিতদের মাটি চাপা দিয়ে সংখ্যালঘিষ্ট শোষকদের শোষণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

ঠিক এই কারণেই আমরা নিজেদের নৈরাজ্যবাদী বলে থাকি।

আধুনিক ভাববাদীরা অবশ্য কর্তৃপক্ষের ধারণাটিকে একটু ভিন্নভাবে বুঝে। বিদ্যমান ধর্মগুলোর সাধারণ সব কুসংস্কার থেকে নিজেদের দূরে রাখার সাথে সাথে তারা পরম, স্বর্গীয় কোন কর্তৃপক্ষের ধারণাও খারিজ করে দেয়। দৈব প্রক্রিয়ায় হঠাৎ করে প্রকাশিত কিংবা বিজ্ঞানের দ্বারা অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণিত; দুটোর কোনটিকেই তারা কর্তৃপক্ষ হিসেবে মানতে নারাজ। তাদের স্বীকৃত কর্তৃপক্ষের ধারণা আপাত দৃষ্টিতে দার্শনিক। মোটা দাগে বলতে গেলে ভাবের দিক দিয়ে তাদের মেনে চলা এই কর্তৃপক্ষ তাদের বিমূর্ত হৃদয়ের কাব্যিক অনুভূতির উপর প্রতিষ্টিত। সে কারণেই তাদের মেনে চলা ধর্মও পূর্বেকার সমস্ত ধর্মগুলোর মত মানুষের মানবীয় সত্ত্বাকে স্বর্গীয় বাতাবরণে আভূষিত করতে চায়।

এর ঠিক বিপরীত কাজটিই করছি আমরা। মানুষের মুক্তি, সম্মান এবং উন্নতির পক্ষে নিজেদের রেখে আমরা বিশ্বাস করি স্বর্গ যে সমস্ত ধন সম্পদ পৃথিবী থেকে চুরি করে সরিয়ে নিয়ে গেছে সেগুলোকে পুণরুদ্ধার করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এর বিপরীতে ভাববাদীরা সব সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে পৃথিবীর সম্পদ স্বর্গে অপহরণ করে নিয়ে যাবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এখন সময় এসেছে মানুষের মহৎ, সুন্দর এবং উন্নত গুণাগুণের দ্বারা এই স্বর্গীয় ডাকাতদের মুখোশ খুলে দেয়ার। এখন সেই সময় যখন মুক্ত চিন্তকেরা তাদের স্পর্ধা এবং বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে স্বর্গ লুট করে সেখানকার সম্পদগুলো আবারো পৃথিবীতে নিয়ে আসবে।

ভাববাদীরা নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করে যে, মানুষের মধ্য থেকে কর্তৃপক্ষ হিসেবে নির্বাচিত হবার জন্য মানুষের সমস্ত চিন্তা এবং কর্মগুলোর স্বর্গীয় অনুমোদন লাভ অবশ্য প্রয়োজনীয়। এই অনুমোদন মানুষের পক্ষে কিভাবে পাওয়া সম্ভব? পূর্বের ধর্মগুলোর মত অবশ্যই দৈব কোন স্বপ্নে কিংবা অহীর মাধ্যমে এই স্বর্গীয় অনুমোদন মিলবে না। বর্তমানে এটা তখনই মিলবে যখন মানুষের সমস্ত চিন্তা ও কাজে পবিত্রতা বিরাজ করবে। সেই পবিত্রতার মূল কথা হলো যা কিছু মহান, যা কিছু সুন্দর, যা কিছু উন্নত সমস্ত কিছুই হলো স্বর্গীয়। এভাবেই তারা পবিত্রতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে।

নব্য প্রতিষ্টিত এইসব ধর্মমতে মানুষ যদি দৈব চিন্তা করে তার কর্ম করে যায় তাহলে সে ঈশ্বরকে পেয়ে যায়। আপনা আপনিই সে বনে যায় তার ধর্মের একজন প্রতিষ্টিত পুরোহিত কিংবা পাদ্রী। এখন প্রশ্ন হলো সে যে পুরোহিত কিংবা পাদ্রী হলো তার প্রমাণ কী? আদৌতে কোনো প্রমাণ নেই। যে সুমহান চিন্তাগুলো সে প্রকাশ করে কিংবা যে কর্মগুলো সে সম্পাদন করে সেটার জন্য তার কারো কাছে জবাবদিহি করার কোনো প্রয়োজন নেই। সে মনে করতে থাকে তার এই কাজগুলো এতটাই পুত পবিত্র যে ঈশ্বর ব্যতীত অন্য কেউ এর মর্মার্থ বুঝতে পারবে না। সুতরাং প্রমাণ দেয়ার কি প্রয়োজন!

তাই অল্প কথায় তাদের সমগ্র দর্শনটা হলো খানিকটা এরকম; একটা দর্শন যেখানে বাস্তব চিন্তা অপেক্ষা অনুভূতি বেশি প্রাধান্য পায়। মোদ্দাকথায় তাদের এই দর্শন আধিবিদ্যিক ভাব ভক্তির উপর প্রতিষ্টিত। এটাকে আপাত দৃষ্টিতে ভাল মনে হলেও এটি মোটেই তা নয়। সুস্পষ্টাবে এটা এমন এক সংকীর্ণ এবং নিষ্টুর মতবাদ যার অধরা-অস্পষ্ট কাব্যিক রূপও পূর্বেকার সমস্ত ধর্মগুলোর মতই বিপদজনক। এটি পূর্বের ধর্মগুলোর মতই মানুষের মুক্তি এবং সম্মানের আকাঙ্খাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে।

স্বর্গীয় সমস্ত কিছুকে মহৎ, অভিজাত এবং সুন্দর মানার অর্থ হচ্ছে মানুষ এগুলো তৈরি করতে অসমর্থ। তার মানে দাঁড়ায়, মানুষ তখন বাধ্য হয়ে স্বেচ্ছায় এই অন্যায়ের কাছে, অস্পষ্টতার কাছে, কুৎসিত এই জিনিসটার কাছে নিজেকে সঁপে দিবে। এটাই হলো সমস্ত ধর্মের মূল কথা। এটি স্বর্গের সমস্ত বিজয়োলাøাসের কাছে মানুষের ভূমিকাকে পদদলিত করে। আর যে মুহূর্ত থেকে মানুষ তার স্বাভাবিকতা হারায়, যখন থেকে স্বর্গীয় ধারণাগুলোকে সত্য বলে মেনে নেয়, তখন প্রশ্নাতীতভাবেই পূর্ববর্তী ধর্মগুলোর সমস্ত ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরম্পরা মানুষ মেনে নিতে বাধ্য হয়। স্বর্গীয় দালালেরা মানব জাতিকে ঈশ্বরের নাম নিয়ে আলোকিত করে স্বর্গের ভিসা প্রদান করার মাধ্যমে তাদের উপর খবরদারি করতে শুরু করে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সমস্ত মানুষই কি সমানভাবে ঈশ্বরের কৃপাধন্য হয়? যদি হয় তাহলে এটা তো নিশ্চিতভাবেই বলা যায় পৃথিবীতে স্বর্গীয় দালালদের কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু সমাজে এমন কিছু কারণ বিরাজমান যার জন্য এই দালালদের সমাজ থেকে অপসারণ করার চিন্তাও অনেক সময় মাথায় আনা যায় না। সমাজের বিদ্যমান এই কারণগুলো ধর্মের সমস্ত হাস্যকর ও ভ্রান্তিমূলক তত্ত্বগুলোকে অনুমোদন দিতে আমাদের বাধ্য করে। এর কারণে তাদের সমস্ত মূর্খতা, তাদের সৃষ্ট সমস্ত ভয়ভীতি এবং কাপুরোষিত আচরণ সমাজে প্রতিষ্টা পেয়ে যায়। ইতালীয় নাগরিক জিওসিপ্পি মাজ্জিনি এরকমই একজন ছিলেন। ঈশ্বরের কৃপাধন্য হবার পরপরই গণমানুষের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে তিনি সেই সময়ে ইতালিতে সরকার গঠন করেছিলেন। তাহলে সবাই সমানভাবে কৃপাধন্য হলো কিভাবে? কৃপার বড় অংশ তো মাজ্জিনির দিকেই চলে গেলো। ঈশ্বরের কৃপা আসলে এভাবেই বন্টিত হয়।

এখানে আমরা আবারো চার্চ এবং রাষ্ট্রের বেড়াজালে আটকা পড়ে যাই। এই সংস্থাগুলো অন্যান্য সকল রাজনৈতিক সংস্থার মতো আমাদের ঋণগ্রস্থ করে তোলে। যদিও এই আধুনিক যুগে এটি মানুষদের কর্তৃত্ব খানিকটা অনুমোদন দিয়েছে, কিন্তু এটার প্রস্তাবনা তৃতীয় নেপোলিয়নের সা¤্রাজ্যবাদী ফরমানগুলোর মতই। সুতরাং নিজের ভোল পাল্টে নবগঠিত এই চার্চ যদি কিছুটা হলেও মানুষের ইচ্ছাতে চলে তবে একে চার্চ না বলে জনমানুষের বিদ্যালয় বলাই এই মুহূর্তে শ্রেয় হবে। কিন্তু তাতে কী আসে যায়? নতুন এই বিদ্যালয়ের ব্রেঞ্চগুলোতে তো কেবলমাত্র শিশুরা বসবে না। এখানে স্থান হবে তথাকথিত ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত চিরস্থায়ী ছোটলোকদেরও। এদের দৌরাত্ম থামাবে কে?

যে মানুষগুলো স্বর্গের পরীক্ষায় কখনোই পাশ করতে পারে না, যে মানুষগুলো স্বর্গীয় দূত কর্তৃক পঠিত জ্ঞান আত্মস্থ করতে পারে না, যারা স্বর্গীয় নিয়মশৃঙ্খলার প্রয়োগ ঘটাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় অর্থাৎ যারা প্রকৃত জনগণ তাদের কী হবে? তাদের ব্যাপারে কোনো সমাধান আছে এই বিদ্যালয়ে?

রাষ্ট্র তখন আর নিজেকে রাজতন্ত্র বলে দাবী করতে পারে না; তখন বাধ্য হয় নিজেকে প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু তাতেও কি রাষ্ট্র নিজের চরিত্র পাল্টায়? না। তখন রাষ্ট্র কিছু সংখ্যক লোককে ব্যাপক জনমানুষের অভিভাবক হিসেবে নিযুক্ত করে। মহৎ গুণ কিংবা প্রতিভার অধিকারী অল্প সংখ্যক এই মানুষগুলো মানব ইতিহাসের ভাস্কর, উদ্যমী এবং সম্মিলিভভাবে পরাক্রমশালী ব্যাপক জনতার উপর ছড়ি ঘুরাতে শুরু করে। তারা নিজেদেরকে প্রজাতন্ত্রী বলে পরিচয় দেয়। অন্যদিকে অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত মানুষ যেরকম ভেড়ার পাল হিসেবে ছিল সেরকমই থেকে যায়। আর প্রজাতন্ত্রীরা হয় রাখাল। লোমকাটা এই রাখালদের ব্যাপারে তাই সবসময় সচেতন থাকতে হবে।

বর্তমান সিস্টেমে মানুষ মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও তারা এই রাখালদের শিষ্য হতে বাধ্য। নিজেদের সার্বভৌমত্বের ব্যাপারটা মানুষ তাই সম্পূর্ণ কাল্পনিক মনে করতে থাকে। তারা প্রতিনিয়তই অন্যের চিন্তার, ইচ্ছার এবং স্বার্থের সেবা করে যায়। এই অবস্থার মধ্যে যাকে আমরা মুক্তি বলি, সেই প্রকৃত মুক্তির চিন্তা রসাতলে চলে যেতে বাধ্য হয়। এমতাবস্থায় পুরাতন শোষণ এবং দাসত্ব নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসে। এই দাসত্ব যেখানে থাকে সেখানে নির্দয়তা এবং মানুষের দুর্বিষহ অবস্থা খুবই সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সুবিধাবাদী শ্রেণী এবং সাধারণ মানুষ উভয়ের মধ্যেই প্রকৃত সামাজিক বস্তুবাদের চিন্তা তখন নতুনভাবে দেখা দেয়।

মানবজাতির সুবিধা-অসুবিধাগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভাববাদীরা শেষ পর্যন্ত পাশবিক বস্তুবাদেরই  জয়জয়কার ঘোষণা করে। এর কারণটাও খুব সরল। তাদের মধ্যে তখন দৈব সুখের চিন্তা উবে গিয়ে নিজেদের দেশেই স্বর্গভোগ করা চিন্তা আসে। যার কারণে পাশবিক এই ভাববাদী গোষ্ঠী পৃথিবীতেই নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করার কথা ভাবতে থাকে। আসলে ভাববাদের তত্ত্বগত বুনিয়াদ প্রকৃতপক্ষে পাশবিক বস্তুবাদ ছাড়া কিছুই নয়। তবে হ্যাঁ, যারা প্রকৃতপক্ষে ভাবের দুনিয়ার সন্ধান করে তারা এই হিসাবের বাইরে থাকবে। সেই প্রকৃত ভাবের দুনিয়ার লোকেরা স্বাভাবিকভাবেই দেখতে পায় ভাবের দুনিয়ায় পৌঁছানোর জন্য তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা বৃথা আন্দোলন ছাড়া কিছুই নয়। তারা ছাড়া অন্যান্য সমস্ত ভাববাদীরা মানুষের জীবনে তাদের প্রচারিত নিয়ম কানুনগুলোর প্রয়োগ ঘটাতে চায়। পুরো মানব সমাজটাকে তারা তাদের ভাববাদী মতবাদ দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করতে থাকে। যা প্রকারান্তে পাশবিক বস্তুবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়।

তাদের প্রচারিত সাধারণ নিয়মগুলো প্রথমে মানুষের কাছে অদ্ভুত ঠেকলেও তারা ধীরে ধীরে ইতিহাসের প্রমাণাদি হাজির করে মানুষের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। এই তথ্য প্রমাণাদি হাজির করার ব্যাপারে তাদের কখনো কার্পণ্য করতে দেখা যায় না।

প্রাচীন কালের দুটো পুরাতন সভ্যতা- গ্রীক এবং রোমান সভ্যতার মাঝে তুলনা করুন। এদের মধ্যে কোনটি বেশি বস্তুবাদী? ইতিহাসে কোনটি বেশি স্বাভাবিক? মানবজাতির জন্য এদের মধ্যে কোনটি আদর্শ সভ্যতা ছিল? সন্দেহতীতভাবে সেটি হলো গ্রীক সভ্যতা। বিপরীত দিকে চরিত্রগতভাবে কোনটি বেশি ভাববাদী ছিল? কোনটি দাসদের বস্তুগত স্বাধীনতাকে সভ্য নাগরিকদের ভাববাদী স্বাধীনতার কাছে বলি দিয়ে আইন প্রণয়ন করেছিল? কোনটির মাধ্যমে মানব সমাজের স্বাভাবিক অগ্রযাত্রাকে রাষ্ট্রের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছিল? ইতিহাসে কোনটির চেয়ে পাশবিক আর কোন সভ্যতা হয় না? নিঃসন্দেহে তা হলো রোমান সভ্যতা। এটা সত্য যে রোমসহ অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার মত গ্রীক সভ্যতাও তীব্রভাবে জাতীয়তাবাদী ছিল। দাসত্বের উপর ভিত্তি করেই এগুলোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই দুটো সমসাময়িক সভ্যতা অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতাগুলোর চেয়ে আধুনিক ছিল। অন্যান্য পুরাতন সভ্যতাগুলো কখনোই মানবতাকে তাদের ইতিহাসে জায়গা দেয় নি। সেখানে গ্রীক সভ্যতা মানুষের জীবনকে মহান এবং আদর্শ  হিসেবে দেখেছিলো। এটা মানুষের পশুসুলভ অবস্থার কোরবানি করে তাদের মুক্ত পৃথিবীর মুক্ত মানুষ হিসেবে চিন্তা করার খোরাক জুগিয়েছিল। মুক্ত চিন্তার মাধ্যমে বিজ্ঞান, শিল্প, কবিতা এক অমর দর্শন এবং মানুষ হিসেবে সম্মান প্রাপ্তির পথ দেখিয়েছিল এই সভ্যতা। রাজনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তির মধ্য দিয়ে এই সভ্যতা মুক্ত চিন্তা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। মধ্যযুগের শেষভাগে রেঁনেসার সময়ে কিছু গ্রীক অভিবাসী তাদের অমর গ্রন্থগুলোর কিছু সংখ্যক ইতালিতে নিয়ে এসেছিলো। যেগুলো ইতালিয়ানদের জীবনকে পুণরুজ্জীবিত করে মুক্তি, চিন্তা এবং মানবতার ধারণা নিয়ে এসে ক্যাথলিকিজমের অন্ধকূপ থেকে তাদের বের করেছিল। সুতরাং, মানুষের মুক্তি এসেছিল গ্রিক সভ্যতার নাম নিয়ে। তাহলে রোমান সভ্যতার নাম নিয়ে কী হয়েছিল? রোমান সভ্যতার নাম নিয়ে বিজয় হয়েছিল সমস্ত পাশবিক সত্ত্বার। এই সভ্যতাজুড়ে ছিল সমস্ত  জাতি এবং মানুষদের নিদারুণ দাসত্ব বরণ এবং মানবতার চরম অধঃপতন।

এমন কি আজো, সিজার তথা রোমান সা¤্রাজ্যের বিজয়োল্লাস যা মানুষ খুন করে, যা সমস্ত পৃথিবীকে পাশবিকতার হাসি হেসে গুঁড়োগুঁড়ো করে দেয়, যা ইউরোপের সমস্ত দেশে মুক্তি এবং মানবতাকে গলা টিপে ধরে রাখে।

এখন ইতালিয়ান এবং জার্মান এই দুটো আধুনিক সভ্যতার মাঝে তুলনা করুন। নিঃসন্দেহে স্বাভাবিকভাবেই প্রথমটির সাধারণ চরিত্র হলো বস্তুবাদ। বিপরীত দিকে দ্বিতীয়টি ভাববাদকে আরো বিমূর্ত, সবচেয়ে বিমূর্ত এবং সর্বাধিক অতিন্দ্রিয়বাদী মতবাদ হিসেবে প্রচার করে। চলুন আমরা দেখি বাস্তবে এই দুটি সভ্যতা মানবজাতির জন্য কি ফল বয়ে নিয়ে এসেছিল।

মানবজাতির মুক্তির লক্ষ্যে ইতালি ইতোমধ্যেই প্রচুর কার্য সম্পাদন করেছে। ইতালিই সর্বপ্রথম মানবজাতির মুক্তির বাসনাকে পুণরুজ্জীবিত করে তার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছিল এবং তারাই শিল্প, ব্যবসা, কবিতা, চিত্রকলা, ইতিবাচক বিজ্ঞান এবং মুক্তচিন্তার মধ্য দিয়ে মানবতাকে দেবত্ব থেকে অভিজাত করে তুলেছিল। বিগত তিন শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানকে ভেঙেচুড়ে দিয়েছিল যে সা¤্রাজ্যবাদ এবং পোপের স্বৈরতন্ত্র, সরকারি পৃষ্টপোষকতায় যে সমস্ত বুর্জোয়ারা বিজ্ঞানকে মাটির নীচে কবর দিয়েছিল, সেই বাজে অবস্থা থেকে ইতালিই মানবজীবনে বিজ্ঞানের আবেদনকে পুণরুদ্দার করেছিল। ইতালিতে বাজে অবস্থা সৃষ্টির পরেও আমরা খানিকটা আশান্বিত হয়েছিলাম এই ভেবে যে সেখানে একজন লোক মানবিকভাবে জীবনধারণ করতে পারতো এবং সেখানে সে এমন কিছু সঙ্গী পেত যাদের জন্মই যেন মুক্তির লক্ষ্যে হয়েছিল বলে মনে হত। ইতালি বুর্জোয়াদের দ্বারা অধিকৃত হবার পরেও মাজ্জিনি এবং গ্যারিবল্ডির মতো লোকেদের নিয়ে গর্ব করতে পারত। অন্যদিকে জার্মানির অবস্থা ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। সেখানে একজন মানুষকে তীব্র রাজনৈতিক এবং সামাজিক দাসত্বের মধ্যে জীবন ধারণ করতে হতো। দার্শনিকভাবে জার্মানির লোকেরা নিজেদের ইচ্ছা এবং মর্জিকে শাসকদের কাছে বলি দিতে বাধ্য হতো। আসলে জার্মানির নায়কেরা ছিলেন মাজ্জিনি কিংবা গ্যারিবল্ডির ঠিক বিপরীত। তারা হলেন প্রোটেস্ট্যান্টদের ঈশ্বরের মনোনীত ভয়ংকর এবং নির্দয় প্রথম উইলিয়ামের মতো ব্যক্তিবর্গ, বিসমার্ক এবং মল্টকের মত ভদ্র মহোদয়গণ, জেনারেল ম্যান্টুফেল এবং ওয়ের্ডার মতো সামরিক কর্মকর্তা। জার্মানির অস্তিত্বের শুরু থেকেই দেশটি বেশ সুশৃঙ্খলভাবে আক্রমণাত্মক ছিলো। বিজয়ী হবার নেশায় দিগ¦ীদিক ছুটে বেড়াত তারা। এমনকি তাদের দাসত্বের শৃঙ্খলকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমানায় পৌঁছে দিতেও তাদের বিন্দুমাত্র বাঁধে নি। একক ক্ষমতাশালী হিসেবে আবির্ভূত হবার পর থেকে জার্মানি সমস্ত ইউরোপের মুক্তির পথে কাঁটা হিসেবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছিল।

ভাববাদের তত্ত্বগত দিকটি কিভাবে অহর্নিশি অনিবার্যভাবে বাস্তবে বস্তুবাদে পরিণত হয় সেটা দেখানোর জন্য একজনের বেশী কিছু করার দরকার নেই। কেবল মাত্র খ্রিষ্টানদের চার্চের শ্লোকগুলো মুখস্ত রাখতে পারলেই তা হয়ে যাবার কথা। যদি সেটা এপোস্টলিক কিংবা রোমান চার্চের শ্লোক হয় তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই। খ্রিস্টের মতবাদগুলো যত বেশি জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে তা তত বেশি মহিমান্বিত হবে। সেটাই যদি হয় তবে কি ঐ চার্চ খ্রিষ্টের মতবাদের বাহিরে চলে যায় না? তাহলে তো ৮ম শতাব্দীর চার্চ কেন্দ্রিক খ্রিষ্ট ধর্মের যে চর্চা শুরু হয়েছিল তা থেকে বর্তমানকালের বস্তুবাদী চার্চগুলো অনেক বেশি মাত্রায় ব্যতিক্রমী। সেটা কীজন্য? সেটা কী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেদের অধিষ্টিত করার লক্ষ্যে নয়? তাহলে পুরো ইউরোপের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে চার্চের পূর্বের এবং বর্তমানের অবস্থানের ব্যাখ্যা কি দাঁড়াল? সেটা হল অস্থায়ী এবং এক ঈশ্বরের মূর্তি সামনে রেখে প্রথমে রাজস্ব আদায়, তারপর অস্থায়ী ক্ষমতা লাভ এবং সবশেষে রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধা আদায় করা। তবে আমাদের এটা স্বীকার করে নিতেই হবে বস্তুবাদী চার্চের কারণেই আমরা প্রথম এই অদম্য সত্যের কথা জানতে পারি যে, সম্পদ, ক্ষমতা, জনগণের উপর অর্থনৈতিক শোষণ এবং রাজনৈতিক নিপীড়ন ভাববাদের দুনিয়ায় একই মুদ্রার এপিট ওপিট। এগুলোর প্রত্যেকটিই স্বর্গীয় সুখ প্রাপ্তির লক্ষ্যে এপিস্টলিক চার্চ কর্তৃক দেখানো শহীদী মৃত্যু অপেক্ষা অধিক সুখদায়ক।

আমি ইংল্যান্ড, আমেরিকা এবং সুইজারল্যান্ডের স্বাধীন চার্চগুলোর কথা বলবো। জার্মানির পরাধীন চার্চগুলো আমার বক্তব্যের মধ্যে পড়বে না। জার্মানির চার্চগুলো স্বউদ্যোগে কিছুই করে না। তাদের সাময়িক সার্বভৌমত্বের আত্মিক গুরুরা যা বলে তারা সেটাই করে। আর এটা কারো অজানা নয় যে, প্রধানত ইংল্যান্ড এবং আমেরিকা দেশদুটিতে প্রোটেস্ট্যান্টদের প্রচারিত প্রোপাগান্ডা বস্তুবাদী এবং বাণিজ্যিক স্বার্থধারীদের প্রচারিত প্রোপাগান্ডার মতই। তারা বিভিন্ন দেশে ঈশ্বরের বাণী প্রচারের লক্ষ্যে কোম্পানি প্রতিষ্টা করে এবং সেই দেশ লুট করে তারা একটি বিশেষ শ্রেণীর ধন সম্পদ বৃদ্ধি করে। যারা এই কাজগুলোতে অংশ নেয় সেই সমস্ত ব্যক্তিরা তাদের নিজেদের দেশে একই সাথে ধার্মিক কিন্তু অর্থের প্রতি লোভও তাদের মধ্যে প্রচন্ড মাত্রায় বিদ্যমান থাকে। এক কথায় বলতে গেলে ইতিহাস পাঠ করে এটা প্রমাণ করা তেমন কোনো কঠিন ব্যাপার নয় যে, সমস্ত চার্চ, সেটা খ্রিষ্টান চার্চ হোক কিংবা অখ্রিষ্টান চার্চ হোক সেগুলোর আধ্যাত্মিক প্রোপাগান্ডা ছাড়াও তাদের সাফল্যকে বৃদ্ধি করে পর্বতসম করার জন্য দৈব আশীর্বাদ কিংবা অন্যান্য উপায়ের সহযোগিতায় তারা জনগণের উপর অর্থনৈতিক শোষণ চাপিয়ে দেয়। একই ভাবে সব রাষ্ট্রগুলোর বেলাতেও আমরা দেখতে পাই, রাষ্ট্রগুলো তাদের রাজনৈতিক এবং বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগিয়ে, সমাজের অধিপতি ও সুবিধাবাদী শ্রেণীগুলোর সহযোগিতায় চার্চের মতই ব্যাপক সংখ্যক লোকের উপর শোষণ নিপীড়নের খড়গ চালিয়ে কিছু সংখ্যক মানুষের পেটকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলেছে। যার দরুণ জনতার মাঝে ধর্মান্ধতা এবং ভাববাদের বদলে জায়গা করে নিয়েছে কুৎসিত ভোগ সর্বস্ব বস্তুবাদ।

আজকের দিনে নতুনভাবে আমরা এর প্রমাণ পাই। তথাকথিত মহান আত্মা এবং যে মানুষগুলো এখনো পৃথিবীতে আছেন যাদেরকে আমি পূর্বে পথভ্রষ্ট বেদুইন বলেছিলাম, বর্তমানে তারা ছাড়া ভাববাদের আসলেই কি আর কোনো রক্ষক আছে? তারাই তো বর্তমানে স্বাধীন সার্বভৌম দেশগুলো চালাচ্ছে। ফ্রান্সে তৃতীয়  নেপোলিয়ন এবং তার স্ত্রী মাদাম ইউগেনি; তাদের সমস্ত প্রাক্তন মন্ত্রী, রাজসভাসদ, রোহের এবং রাজাইন থেকে শুরু করে ফ্লিওরি এবং পিয়েট্রি পর্যন্ত তাদের সমস্ত প্রাক্তন সেনাপতি এই সমস্ত পুরুষ এবং মহিলারাই সার্বভৌম ফ্রান্সকে মহিমান্বিত করে তাকে রক্ষা করেছিল। তাদের সাংবাদিক সহ অন্যান্য মহাপন্ডিতেরা ক্যাসাগনাকাস, গিরারদিন, ডুভারনইস, ডুইলটস, রেভেরারিস, ডুমাস; উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ফ্রান্সের সমস্ত বুর্জোয়া মতবাদ ধারণাকারী উদারপন্থী এবং মতবাদবিহীন উদারপন্থী- যাদের মধ্যে গুইজট, থিয়ারস, জুলেস ফারভেস, পেলিটান্স এবং জুলেম সিমন্স; এদের সবাই ছিল  মোটাদাগে ফ্রান্সের বুর্জোয়াদের প্রতিষ্ঠিত দুর্গের রক্ষক। প্রুশিয়া এবং জার্মানিতে প্রথম উইলিয়াম, তার সমস্ত জেনারেল, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে এক সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন যার সদস্যদের সকলেই পরিপূর্ণরূপে ধর্মে বিশ্বাসী। তারা যে উপায়ে ফ্রান্স দখল করেছিলেন তাও সকলের জানা। রাশিয়াতে সিজার পোল্যান্ডের ধার্মিক কসাইদের তার বিচারকমন্ডলিতে মৌরাবিফ এবং বার্গের মত স্থান দিয়েছেন । প্রতিটি জায়গায় ধর্ম কিংবা দার্শনিক ভাববাদ হাতে হাত ধরে রক্তক্ষয়ী এবং পাশবিক বস্তুগত শোষণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। অন্যদিকে এর বিপরীত তত্ত্বগত বস্তুবাদের দর্শন, অর্থনৈতিক সাম্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের লাল পতাকা শোষিত এবং নিপীড়িত মানুষের দ্বারা “আদর্শ” হিসেবে প্রতিষ্টিত হয়েছে। যা মানব মুক্তি এবং অধিকারের মহৎ চিন্তাকে হৃদয়াঙ্গম করে সমস্ত মানুষের জন্য উর্বর জমি প্রদানের অঙ্গীকার নিয়ে তার কাজ শুরু করেছে।

আসলে সত্যিকারের মসীহ কারা? যারা বিমূর্ততার আদর্শ বর্জন করে আদর্শকে জীবন ঘনিষ্ট করেছে, যারা স্বর্গকে বাদ দিয়ে পৃথিবীকে আপন করে নিয়েছে, তারা নয় কী? এটা প্রমাণিত যে, স্বর্গীয় ভাববাদ প্রতিষ্ঠার প্রধান শর্ত হলো যুক্তিকে বিসর্জন দেয়া, কার্যকারণকে অপসারণ করা এবং বিজ্ঞানকে বলি দেয়া। আমরা পরবর্তীতে আরো দেখতে পাই যারাই ভাববাদী মতবাদগুলোকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে তাদের ভালো লাগুক কিংবা না লাগুক তাদেরকে জনগণের শোষকদের দলভুক্ত হতে হয়েছে। এই কারণটিই ভাববাদ সমর্থনকারীদের সুমহান মন এবং হৃদয় বিনষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আমাদের সমসাময়িক ভাববাদীদের, যাদের কিনা সুমহান মন এবং হৃদয়ের কোন কমতি নেই এবং যাদের সদিচ্ছা কিংবা মানব জাতির কল্যাণে নিজেকে সঁপে দেওয়া নিয়েও কেউ কোন দিন প্রশ্ন তুলতে পারবে না, তাদের সাথে এটি কিভাবে ঘটে?

তারা নিশ্চয়ই একটি শক্তিশালী উদ্দেশ্য দ্বারা প্ররোচিত। যেহেতু যুক্তি এবং বিজ্ঞান অনেক আগেই ভাববাদী মতবাদ সম্বন্ধে তাদের রায় ঘোষণা করেছে, সেহেতু এই শক্তিশালী উদ্দেশ্য যুক্তি কিংবা বিজ্ঞান হতে পারে না। যেহেতু অনেক আগেই তারা ব্যক্তিবাদের উর্ধ্বে চলে গিয়েছে, সেহেতু এটা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্যেও হতে পারে না। তাহলে নিশ্চয়ই এটা নৈতিক কোন উদ্দেশ্য হবে। সেটা কোনটা? এক্ষেত্রে একটিই উদ্দেশ্য হতে পারে। আর সেটা হলো, ভাববাদী তত্ত্ব কিংবা বিশ্বাসের সম্মান এবং মোহনীয়তা বৃদ্ধি।

এবার বস্তুবাদী ও ভাববাদী বিদ্যালয়ের দিকে একটু দৃষ্টি দেই। আমি আগেই বলেছি প্রতিটি সৃষ্ট ঘটনার যেমন একটা জন্মসূত্র থাকে, তেমনি তার ধ্বংসও থাকে। বস্তুবাদী বিদ্যালয়ের শিক্ষা মোতাবেক একেকটি ঘটনাকে বস্তুবাদী দৃষ্টিতে বিচার করা উচিত। বস্তুজগতের সমগ্রতা দিয়ে শুরু করলে কিংবা বিমূর্তরূপে যেভাবে “বস্তু” নামক ধারণার সৃষ্টি হয়, যৌক্তিকভাবে তার সত্যিকারের রূপ পাওয়া সম্ভব কেবলমাত্র বস্তুর পরিপূর্ণ মূর্তায়নের মাধ্যমে। যার মানে দাঁড়ায় সমাজের সম্পূর্ণ মুক্তির লক্ষ্যে বস্তুকে মানবিকীকরণ করার মধ্য দিয়েই বস্তু সৃষ্টির ধারণা সম্পূর্ণ হয়। অন্যদিকে ভাববাদীদের বিদ্যালয় ঠিক এর বিপরীত। চার্চ ও রাষ্ট্র এই দুই সংস্থা কর্তৃক পাশবিক স্বৈরাচার এবং অন্যায় ও শোষণের মাধ্যমেই সমাজে ভাবের আধিপত্য প্রতিষ্টিত হয়। বস্তুবাদীদের বিদ্যালয়ের শিক্ষা মোতাবেক মানুষের ঐতিহাসিক বিকাশ হল একটা পর্যায়ক্রমিক উত্তরণ। ভাববাদী সিস্টেমে তা পতন ছাড়া আর কিছুই নয়।

এমতাবস্থায় আমি যা বুঝতে পারছি তা হলো বস্তুবাদ পশুত্ব থেকে পর্যায়ক্রমে মনুষ্যত্বে উন্নতি ঘটায়। অন্যদিকে ভাববাদ স্বর্গ থেকে শুরু হয়ে মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে তাদের সীমাহীন পশুত্বের দিকে নিয়ে যায়। বস্তুবাদ মানুষের সমস্ত ইচ্ছাগুলোকে স্বীকার করে না। কিন্তু সবশেষে তা মানুষকে মুক্তির স্বাদ দেয়। ভাববাদ দাবি করে সেটি মানুষের সম্মানজনক অবস্থা চায় এবং তাদের সমস্ত ইচ্ছাগুলোকে স্বীকার করে। কিন্তু মুক্তি খুঁজতে গিয়ে সবশেষে সেখানে দেখা যায় কর্তৃপক্ষের শৃঙ্খল। বস্তুবাদ মানুষের উপর কর্তৃপক্ষের নগ্ন হস্তক্ষেপকে অস্বীকার করে। কারণ বস্তুবাদী অনুসন্ধান মতে কর্তৃপক্ষকে স্বীকার করা আর পশুত্ব বরণ করে নেয়া একই কথা। বস্তুবাদীরা মনে করে ইতিহাসের লক্ষ্য এবং প্রয়োজনীয়তার সারমর্মই হলো মনুষ্যত্ব অর্জনের মাধ্যমে পশুত্বকে বর্জন করে মুক্তির স্বাদ লাভ করা। এক কথায়, বাস্তবে কেবল বস্তুবাদীদের কর্মগুলো করার মধ্যেই আপনি ভাববাদীদের কাজের সীমা দেখতে পাবেন।

আমি আগেই বলেছি ভাববাদীদের সিস্টেমে ইতিহাস মানুষের ক্রমাগত পতন ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের স্বর্গ ভয়াবহ পতনের মধ্য দিয়ে তার ইতিহাস শুরু করেছিল। যা তারা আর মেরামত করতে পারে নি। বস্তুর মাঝে বিশুদ্ধ এবং পরম ভাব খুঁজে বস্তুকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে তারা এমন এক লাফ দিয়েছিল যে তাদের দুটো পা-ই তাতে ভেঙে গিয়েছিল। তারা এমন কোনো বস্তুতে ভাব খুঁজে নি যা বাস্তবে সক্রিয় এবং সচল। যাতে মুক্তি এবং বল দুটোই সমানতালে বিদ্যমান। যার প্রাণ এবং বুদ্ধিমত্তা আছে, অর্থাৎ যে বস্তুগুলো বাস্তব জীবনে দেখা যায়। এজন্য তারা ভাব খুঁজেছে বিমূর্ত বস্তুতে। বস্তুর সত্যিকারের সত্ত্বাকে প্রুশিয়ানদের চিন্তক, ধর্মবেত্তা ও আধিবিদ্যিকদের দ্বারা তারা দুর্বিপাক এবং দুর্দশার মাঝে ফেলে দিয়েছিল। ঐ সমস্ত লুটেরাগুলো বস্তুর মোহনীয় সত্ত্বাকে কাঁটাছেঁড়া করে তা তাদের স¤্রাট এবং ঈশ্বরের কাছে তুলে দিয়েছিল। ঐ সমস্ত শাসকদল এবং ঈশ্বর তাদের নির্বুদ্ধিতা, ভোঁতা মস্তিষ্কের নিষ্ক্রিয়তা এবং অচল চিন্তার মাধ্যমে বস্তুকে স্বর্গীয় বাতাবরণ দিয়ে তার সমস্ত গতি ও শক্তিকে কেড়ে নিয়ে তাকে অচল পয়সায় পরিণত করে দিয়েছিল।

এই পতন এতই ভয়াবহ ছিল যে, দৈবত্ব, দেবতা কিংবা দৈব চিন্তা অসার হয়ে গিয়েছিল। মানুষজন অচেতন হয়ে পড়েছিল। এই অচেতন হওয়ার কারণে তারা যে তীব্র নিদ্রায় ডুব দিয়েছিল তা আর কখনো ভাঙেনি। কিন্তু ঘুমানো সত্ত্বেও মানুষ তখন স্বপ্নে স্বপ্নে নানান মিরাকল ঘটাতে থাকে। চমৎকার বস্তুগত কাঠামোতে যে সমস্ত ঘটে তাদের মতে সেগুলোর সবই নাকি মিরাকল। কেবলমাত্র বস্তুর উপর ঈশ্বরের দৈব হস্তক্ষেপের কারণেই এগুলো ঘটতে পারে বলে তারা মনে করতো! সর্বোপরি ভাবের পতনে এই দৈন্য দৈবত্ব তখন ভেঙেচুড়ে বিলুপ্ত হবার উপক্রম হয়েছিল। সহ¯্র শতাব্দী ধরে এটি মূর্ছা গিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে তা পুণঃজাগৃতির চেষ্টা চালায়। তাও ব্যর্থ হয়। তাদের অস্পষ্ট প্রচেষ্টায় এবং পরবর্তীতে বস্তুর উপর তারা যতবার খবরদারি করতে চেয়েছে তাদের প্রতিটি কাজ নতুন নতুন মিরাকল সৃষ্টি করেছে।

প্রসঙ্গত একটা উদাহরণ টানছি। যেমন একটা উদ্ভিদের কথাই ধরা যাক। একটা উদ্ভিদ প্রথমে বাষ্প, তরল কিংবা কঠিন রাসায়নিক বস্তুতে পরিণত হয়। তারপর তা সকল উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহে ছড়াতে ছড়াতে শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে এসে পৌঁছেছে। এখন এই উপাদানগুলো কি আবার স্বরূপে ফিরে যেতে পারে? কিংবা আদৌ কি এটা সম্ভব? আগেই বলেছি এ হবে এক উল্টো পথে যাত্রা। যেটি ভাববাদীরা বারবার চেষ্টা করে থাকেন।

বস্তুগত একটি জিনিসের মধ্যে কিভাবে পুরোপুরি অবস্তুগত একটি জিনিস বাসা বাঁধতে পারে? কিভাবে শরীর বিশুদ্ধ আত্মাকে ধারণ করে নিজেকে এর ভেতর আটকে দিতে পারে? এই ধরনের প্রশ্নকে কেবলমাত্র “আত্মা” নামক এই হাস্যকর জিনিসটাই সমাধান করতে পারে। এটা মিরাকলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় মিরাকল।

সহ¯্র শতাব্দীর আত্মা প্রমাণের বৃথা চেষ্টার পর স্বর্গীয় দ্যুতি নিয়ে তা আবারো নিজেকে ফিরে পেয়েছে। ধর্মবাদীরা আত্মসংযোগের মধ্য দিয়ে তাকে চিত্রিত এবং গতি প্রাপ্ত করেছে। তাদের এই তত্ত্বের মূলকথা হলো অমর আত্মা মানুষের ক্ষণস্থায়ী শরীরে অল্প সময়ের জন্য আশ্রয় নেয়। স্বর্গের প্রাচুর্যতার তুলনায় মানুষ অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং তাদের কার্যক্রমও সীমাবদ্ধ। তাদের শরীর আত্মা নামক এই বস্তুটিকে নিজের মধ্যে রাখতে পারে। কিন্তু নিখিল জগতের তুলনায় সেটি নিতান্তই ক্ষুদ্র। এই ক্ষুদ্র বস্তুটি পরমের সন্ধান প্রাপ্তির জন্য এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। সর্বোপরি এর আত্মার ধারণাও একটা রহস্য। এর সমাধান বিশ্বাস করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। বিশ্বাস ছাড়া এর কোনো ভিত্তি নেই।

ঈশ্বর যদি প্রতিটি মানুষেই থাকেন তাহলে তো প্রত্যেক মানুষই ঈশ্বর হয়ে যাবেন। আমাদের তাহলে প্রচুর পরিমাণে ঈশ্বর রয়েছেন। প্রত্যেক ঈশ্বরের ক্ষমতার জন্য তাহলে অন্য সকল ঈশ্বরের প্রয়োজন এবং এক ঈশ্বর ছাড়া অন্য ঈশ্বর মূল্যহীন। অর্থাৎ এটা এমন এক  দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে যার মাধ্যমে মানুষেরই পারস্পরিক বিনাশ ঘটছে।

বস্তুবাদীদের মতে এটা সত্য যে, মানুষের শরীরের বস্তুগত ক্রিয়ার ফলেই মনের সৃষ্টি হয়। মন বড় কিংবা ছোট হওয়া সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে মনের শরীরে বস্তু  কত বড় বা ছোটভাবে বিন্যস্ত হয়েছে তার উপর। কিন্তু, ভাববাদীরা মনকে যেভাবে মহিমান্বিত করে তাতে মনের এই বস্তুগত ব্যাখ্যা  তাদের পছন্দ হবে না। তাদের মতে মন পরম এক সত্ত্বা এবং তা বস্তু থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। মন বড় কিংবা ছোট কোনটাই হতে পারে না। মানুষের কেবলমাত্র একটিই মন থাকতে পারে- তা হলো ঈশ্বর যা দিয়েছে সেই মন।  চলুন আমরা আরেকটু যাচাই বাছাই করি বিষয়টাকে।

আমরা দেখতে পাই লিঙ্গ, বয়স, জাতি এবং বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের ক্ষুদ্র বস্তুকণাতেও স্বর্গ সৃষ্ট মন আশ্রয় নিয়েছে। এই মনের পক্ষে এত ক্ষুদ্র জায়গাতে নিজেকে মানিয়ে নেয়া বেশ অসুবিধাজনক। এই বিষয়টি তথাকথিত মনকে অসুখী করে। তার উপরে এই বর্বর এবং পাশবিক অবস্থায় স্বর্গীয় মন প্রাথমিক দিকে তার স্বর্গীয় অস্তিত্বের কথাই ভুলে যেতে বসে। বৃহৎ মনের এ ক্ষুদ্র পরিণতি তাদের সুখী করে না। তারা তখন আবারো সমগ্র হতে চায়। বাস্তব জগতে তখন মনের স্বর্গীয় দ্যুতি হারিয়ে যায়।  মন তখন মানুষের মাঝে তার অস্তিত্ব খুঁজতে থাকে। “শরীর” নামক মানব কারাগারে সে নিজেকে জরাজীর্ণ অবস্থায় উদ্ধার করে নিজের মূর্খতার জন্য নিজেই নিজেকে অভিসম্পাত করতে থাকে।

বস্তুপ্রেমে মোহাগ্রস্থ মন তখন নিজেকে এক খন্ড পাথর, এক টুকরো কাপড় কিংবা কাঠের খন্ডাংশের ভজনা করে। মনের তখন এমন বোধ হতে থাকে যে এই কাপড় কিংবা কাঠের বাহিরে সে আসতে পারবে না।

এখানে উদ্ভুত হয় আরেক নতুন রহস্য- দৈবত্বের দুটি বিভাজন। এই দুই বিভাজনের প্রত্যেকটিই সমানভাবে অনন্ত অসীম সত্ত্বার অধিকারী। প্রথমটি হলো- ঈশ্বর যখন পিতা তখন তিনি অবস্থাগত জগতেই বিচরণ করেন এবং পরেরটি হলো- ঈশ্বর যখন পুত্র তখন তিনি বস্তুজগতে পতিত হন। আমরা তখন সরাসরি দেখতে পাই, এই দুই পরস্পর বিচ্ছিন্ন দৈবত্বের মধ্যে নীচ থেকে উপরে এবং উপর থেকে নীচে ক্রমাগত পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপিত হতে থাকে। পারস্পরিক এই আত্মিক সম্পর্কই খ্রিষ্টানদের কাছে “হলি গোস্ট” নামে পরিচিত। এর ধর্মতাত্ত্বিক ও আধিবিদ্যিক মর্মার্থ খ্রিষ্টানদের ত্রয়ী তত্ত্বের ভিত্তি বলে ধরে নেয়া হয়।

পিতারূপী ঈশ্বর পৃথিবীর উপরে নিজের জাঁকজমক দেখান। কিন্তু তার পুত্র, দরিদ্র ঈশ্বরের এই অধঃপতনে স্তম্ভিত হয়ে যান। নিজের পুত্র মানুষের শরীরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তুকণার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে এটা দেখে ঈশ্বর তাকে পুণরুদ্ধার করার ব্রত নিয়ে নিজে পৃথিবীতে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এই অমর, অসীম, স্বর্গীয়, অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণাগুলোতে ঈশ্বর পুত্র এমনভাবে নিজের সত্ত্বা হারিয়ে বসেন যে পিতারূপী ঈশ্বরও তাকে এক সময় চিনতে পারেন না। তখন ঈশ্বর সিদ্ধান্ত নেন তার বিরাগভাজন, তার কাছের লোক, তার সৃষ্ট সর্বোত্তম গুণের অধিকারী মানুষ অর্থাৎ নবীদের পৃথিবীতে পাঠাবেন পুত্ররূপী ঈশ্বর তথা মানুষের উদ্ধারকল্পে। একে একে তিনি জরথুস্ত্র, বুদ্ধ, মুসা, কনফুসিয়াস, সাইসুরগাস, সোলন, সক্রেটিস, প্লেটো এবং সবার শেষে যীশু খ্রিষ্টকে পৃথিবীতে পাঠান। তাদের মধ্যে তিনি ঈশ্বরের সম্পূর্ণ গুণের সন্নিবেশিত ঘটান। মানবতার সমস্ত প্রচারক এবং জনহিতৈষী ভদ্রলোকদের আগমণে পৃথিবী তখন সরগরম হয়ে যায়। সবার উপরে সেই পিটার, সেইন্টপল, সেইন্ট জন; তারপর নাম নিতে হয় কনস্ট্যানটাইন দ্য গ্রেট, মামোথ, চার্লেম্যাগনে, গ্রেগরি এবং কারো কারো মতে লুথার, ভলতেয়ার, রুশো, রবেসপিরি, ডাল্টন এবং অন্যান্য সব ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের নামও এখানে আসবে। এদের লিস্ট এতই বিশাল যে সবার ব্যাপারে এখানে আলোচনা করা যাবে না। কিন্তু আমি বলবো একজন রাশিয়ান হিসেবে সেইন্ট নিকোলাসের নাম আমাদের ভুলে  গেলে চলবে না।

তারপর অবশেষে এসব নবীদের আগমনে পৃথিবী জুড়ে ঈশ্বরের সুবাতাস বইতে শুরু করলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় এদের আবির্ভূত হবার সাথে সাথেই মানুষ অসার হয়ে পড়লো।

আমার মতে বস্তু যত ক্ষুদ্রই হোক, পরিমাণ এবং ইতিবাচকতার দিক দিয়ে তা কিন্তু স্থায়ী। বস্তুটি যত বড় হবে সেটি বাস্তবে ততই ছোট হবে। শতকোটি ক্ষুদ্র বস্তুকে শতকোটি ক্ষুদ্র বস্তু দিয়ে গুণ করলে বড় এক বস্তু গঠিত হবে যা আদতে অনেকগুলো ক্ষুদ্র বস্তুরই সমন্বিত রূপ। এই অতি ক্ষুদ্র বস্তু বাস্তবে শূণ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। ঈশ্বর সমস্ত কিছু; কিন্তু যেহেতু মানুষ, বাস্তব জগত এবং বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তুকণার সমন্বয়ে গঠিত সেহেতু তিনি আসলে কিছুই নন।

দেখা যায় ঈশ্বর আসার সাথে সাথে মানুষ নাই হয়ে গেল। দৈবত্ব যত মহৎ হয়েছে মানবতা তত দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থায় পতিত হয়েছে। এটাই হলো সকল ধর্মের ইতিহাস। স্বর্গীয় আইনকানুনের নিষ্টুর ইতিহাস। অর্থাৎ ইতিহাসে ঈশ্বর হলো সেই ভয়ানক সংঘের সভাপতি, যার নাম দিয়ে স্বর্গীয় দ্যুতিপ্রাপ্ত মহৎ গুণের অধিকারী সমস্ত মহাপুরুষেরা সাধারণ মানুষের মুক্তি, সম্মান, কার্যকারণ এবং উন্নতি কেড়ে নিয়েছে।

আমরা প্রথমে স্বর্গ থেকে ঈশ্বরের পতন দেখলাম। এখন আমরা এমন একটি পতন দেখতে পেলাম যেটি আমাদের আরো বেশি চিন্তিত করে তোলে। তা হলো স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে ঈশ্বরের আবির্ভাবের সাথে সাথে মানুষের পতন।

দেখুন, আমাদের সুহৃদ মহিমান্বিত ভাববাদীরা কি এক ছলনা করলো আমাদের সাথে! ঈশ্বর প্রাপ্তির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা বলে আমাদেরকে উর্ধ্বাকাশে উঠাতে, উন্নত করতে মুক্তি দিতে এসে তারা আমাদের গুঁড়োগুঁড়ো করে ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা ভেবেছিল যে ঈশ্বরের নাম নিয়ে তারা মানুষে সৌহার্দ বৃদ্ধি করবে। তার বিপরীতে তারা সৃষ্টি করলো মানুষের অহংকার ও ঘৃণা। তারা বপন করলো বিবাদ, ঘৃণা ও যুদ্ধের বীজ। তারা প্রতিষ্ঠা করলো দাসত্ব। ঈশ্বর বিভিন্ন ভাগে তার শিষ্যদের কৃপা করায় কিছু মানুষ হয়ে পড়লো বেশি মহিমান্বিত। কিছু মানুষ হলো কম মহিমান্বিত, আবার কিছু মানুষ কোনো মহিমা না পেয়ে হীন জীবন যাপন করতে লাগলো। এটা সত্য ঈশ্বরের প্রত্যেক সন্তানই তার কাছে সমান। কিন্তু মানুষের মাঝে তুলনা করলে কিছু সংখ্যক লোক অন্যদের থেকে মহান হয়ে গেল। এই অসাম্য সমগ্র মানবজাতিতে এমনভাবে বিন্যস্ত হয় যে কোনো ধরা বাঁধা ছকে একে ফেলা যায় না। স্বর্গীয় মহিমার কারণে অতি দ্রুতই এটি অসাম্য টেকসই, স্থায়ী এবং চরম রূপ লাভ করে ফেলে। উচ্চ মহিমান্বিত ব্যক্তিদের মান্য করা তখন কম মহিমান্বিত ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক কাজ হয়ে দাঁড়ালো। অন্যদিকে নি¤œ মহিমান্বিতদের মহিমাহীনেরা মান্য করতে বাধ্য হয়। এভাবে সমাজে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্টিত হল এবং এর সাথে স্থাপিত হলো দাসত্বের দুই মৌলিক প্রতিষ্ঠান। একটি হলো চার্চ এবং অপরটি রাষ্ট্র।

সমস্ত স্বৈরাচারী মতবাদগুলোর মধ্যে ধর্মীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ লোকদের মতবাদ সবচেয়ে বাজে। তারা ঈশ্বরের বিজয়ে এতটাই উল্লসিত হন যে মানুষের সম্মান, মুক্তি চাওয়া কিংবা মানুষের দুঃখ দুর্দশা লাঘব করার মতো হৃদয় তাদের আর অবশিষ্ট থাকে না। স্বর্গীয় ভাবাবেগের প্রতি তন্ময়তা তাদের নরম আত্মাকে শুষ্ক করে তোলে। তারা মানব মুক্তির আধার স্বরূপ বিবেচিত তাদের মোহবৎসল হৃদয়কেও হারিয়ে বসেন। আত্মিক ভাব কিংবা বিমূর্ত ধারণা দিয়ে বিশ্বকে বিশ্লেষণ করার ফলে তারা বাস্তব জগতের বস্তুগুলোকে অবজ্ঞার চোখে দেখেন। কিন্তু বাস্তব জগতের সমস্ত মানুষ, রক্ত মাংসের সমস্ত মানুষ বস্তু দিয়েই সৃষ্টি। মানুষের দেহ নশ্বর এবং মানুষের দেহে অবস্থিত বস্তুগুলোর ক্রমাগত রূপান্তর চলতেই থাকে। একমাত্র স্থায়ী কিংবা আপেক্ষিকভাবে আত্মিক বস্তু হচ্ছে মানবতা। যার উন্নতি ঘটতে থাকে ধীরে ধীরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

কিন্তু এই মহাবিশ্ব মানব জাতির জন্য ভবিষ্যতে কি নিয়ে আসছে? আমরা কি জানি? জানি না। যদিও পৃথিবী ধ্বংস হওয়া অনেক দূর ভবিষ্যতের ব্যাপার তাই আমাদের এ ক্ষুদ্র মানবজীবনে আমরা মানবতাকেই সত্যিকারের আত্মিক বস্তু বলে গণ্য করতে পারি। কিন্তু প্রগতির ধারায় এ মানবতা তখনই বাস্তব রূপ লাভ করে যখন তা তার সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট স্থানে সত্যিকারের মানুষের মধ্যে তার রূপ পরিগ্রহ করে।

আসলে যেকোন জিনিসের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো কেবল ঐ ঘটনার বিমূর্তায়নই প্রকাশ করে। বাস্তবে এর বিপরীতও ঘটতে পারে। এতক্ষণ আমি মানব চিন্তার পরিশিষ্টগুলো বর্ণনা করেছি। এর ধারাবাহিকতায় বিজ্ঞান সেই চিন্তাগুলোর কার্যকারণ, সম্পর্ক এবং আইনকানুনের বাস্তব ভিত্তি দিতে সক্ষম। সংক্ষেপে বলতে গেলে চিন্তার ক্রমাগত রূপান্তর প্রক্রিয়া বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু সেগুলোর বস্তুগত দিক, ব্যক্তিগত দিক, যে চিন্তাগুলো অনিয়মিতভাবে আসে, যেগুলো বারবার আসে এবং যে চিন্তাগুলো মানুষের অধরা সেগুলোর ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিতে পারে না। বিজ্ঞান বাস্তব জগতের চিন্তাকে ধারণ করতে পারে। চিন্তা ব্যতীত শুধু বাস্তবকে বোঝা তার পক্ষে অসম্ভব। সুতরাং জীবন নিয়ে চিন্তা বিজ্ঞানে ধরা দিলেও বিজ্ঞান জীবন দান করতে পারে না। এটাই বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। এটা এর একমাত্র অনতিক্রম্য সীমাবদ্ধতা। কারণ চিন্তার উপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং চিন্তাই হলো বিজ্ঞানের একমাত্র অঙ্গ।

বিজ্ঞানের এই তর্কাতীত প্রয়োজনীয়তা এবং মহান উদ্দেশ্য সত্ত্বেও এর দুর্বলতা কিংবা বলা যায় এর ধ্বংসাত্মক কাজ হলো, বিজ্ঞানের লাইসেন্সধারী সরকারি প্রতিনিধিরা কখনো কখনো জেদিভাবে বিজ্ঞানকে জীবনের চালিকাশক্তি হিসেবে দাবি করে। বিজ্ঞানের লক্ষ্য হচ্ছে বস্তুগত এবং বাস্তবজীবনের কার্যকারণগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করে বস্তুগত এবং সামাজিক জীবন মানবজাতির ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সাধারণ নিয়মকানুনগুলো বর্ণনা করা। সোজা কথায় বলতে গেলে বিজ্ঞান প্রগতির পথে মানুষের অগ্রযাত্রার সাধারণ এবং বিশেষ ঘটনাগুলোকে মেরামত করে। আর যেগুলো মানবজাতির জন্য অকল্যাণকর বিজ্ঞান সেগুলোকে যুক্তিসঙ্গত উপায়ে বাতিল করে দেয়। এক কথায় বিজ্ঞান মানবজীবনের চাবিকাঠির মতো। কিন্তু তা নিজে কখনোই জীবন নয়। বিজ্ঞান মানুষের শারিরীক কিংবা মানসিক পরিবর্তন, সামষ্টিক, সাধারণ, বিমূর্ত, অচেতন বৈশিষ্ট্যগুলোর পুণরুৎপাদন করে। সর্বতোভাবে বিজ্ঞান একটি পলায়নপার ও অস্থায়ী বস্তু বটে। কিন্তু তা অনিয়মিতভাবে মানুষের বাস্তবতা, ব্যক্তিত্ব, চৈতন্য, দুঃখ, আনন্দ, আশা, অভাব, আবেগ নিয়ে খেলা করে। প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞান আসলে কিছুই সৃষ্টি করে না। এটা কেবল মাত্র জীবনের আবিষ্কৃত দিকগুলো চিহ্নিত করে। প্রত্যেক কালেই বিজ্ঞান মনষ্ক লোক বিমূর্ত এই পৃথিবী থেকে সৃষ্টি হয়ে বাস্তব জগতের সাথে মিলে মিশে বসবাস করতে থাকে। বস্তুজগতে তারা যাই সৃষ্টি করে তা দরিদ্র, ভয়ংকরভাবে বিমূর্ত, রক্তহীন-জীবনহীন নতুন এক শিশু ছাড়া আর কিছুই নয়। তার মানে বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবনকে প্রজ্জলিত করা। তাকে চালনা করা নয়।