অধ্যায় : তিন - ঈশ্বর এবং রাষ্ট্র - মিখাইল বাকুনিন

আমরা এটা ভালো করেই জানি যে একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি কখনোই একজন মানুষকে খরগোশের মত ভাবতে পারেন না। এটা তার ভাবা উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বিজ্ঞরা ভাবেন। ভাবেন বলেই বিজ্ঞদের কাজে আমাদের হস্তক্ষেপ করতে হয়। হস্তক্ষেপ করতে হয় এই কারণেই যেন তারা জীবন্ত মানুষকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হিসেবে না দেখে। তারা যদি মানুষের উপর ব্যর্থ হয়ে তাদের পরীক্ষণটা সমাজের উপর চালাতে যায় তাহলে সেটাকেও প্রতিহত করতে হবে। আসলে এসব বিজ্ঞ ব্যক্তিরা অনেকটা ধর্মজীবিদের মতোই। যদিও তাদের সংগঠন, কুক্ষিগত বিজ্ঞান, সামাজিক জীবন সব ক্ষেত্রে তারা ধর্মজীবিদের থেকে আলাদা। কিন্তু বৈজ্ঞানিক বিমূর্তিকে তারা ঈশ্বর মনে করেন। এটাই তাদের সমস্যা। জীবন ও জীব তাদের কাছে যেন এক প্রকার শিকার।

বিজ্ঞান দক্ষতার সাথে বস্তুর আকৃতি দান করে। যদি কোন কিছু বাস্তব জগতে নাও থাকে তবু বিজ্ঞান আমাদের স্মৃতি, আমাদের কল্পনা শক্তিকে উদ্দীপ্ত করে তুলতে পারে। অন্যদিকে শিল্প হলো একটি বোধ যা হাড় মাংসের শরীর ছাড়া একটি ব্যক্তিত্বকে অমর এবং চিরস্থায়ী করে তোলে। এটি একটি জলজ্যন্ত অস্তিত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি আমাদের চোখের সামনেই উদিত হয় কিন্তু চোখের সামনেই আবার হারিয়ে যায়। অর্থাৎ শিল্প হলো  জীবনের বিমূর্ততার ফল। সেখানে বিজ্ঞান বিমূর্ততার চেয়েও বাস্তব। যদিও বিজ্ঞানেও জীবন বলিদানের মতো বিষয় রয়েছে তারপরেও বিজ্ঞান শিল্পের চেয়েও বাস্তব।

তবে পাশাপাশি এটাও ঠিক যে, বিজ্ঞান মানুষের ব্যক্তিত্বকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে (খরগোশের ক্ষেত্রেও যা হয়েছিল)। তার মানে এই নয় যে বিজ্ঞান ব্যক্তিত্বের নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞ। এটি ব্যক্তিত্বকে পদ্ধতি হিসেবেই নিয়েছে, সত্য হিসেবে নয়। এটি ভালো মতই জানে যে মানুষের মত অন্যান্য প্রজাতিরও জনসংখ্যা ছাড়া কোনো অস্তিত্ব নেই। এরা সকলেই জন্ম নেয় এবং মৃত্যু বরণ করে। এটি জানে যে নি¤œ স্তর থেকে উঁচু স্তরের প্রাণীদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বের মন্ত্র বেশি উচ্চারিত হয়। উঁচু স্তরের প্রাণীর সত্ত্বা তখন আরো মুক্ত ও পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি জানে মানুষ বিশ্বের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ জীব। সবচেয়ে পরিপূর্ণ এবং স্মরণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। কারণ মানুষের কল্পনা করার বাস্তব ও মূর্ত হবার শক্তি আছে। এটি জানে মানুষের প্রতি ভালোবাসাই মানবতার সর্বোচ্চ আইন এবং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। এই শিক্ষার একমাত্র বৈধ উদ্দেশ্য হলো মানবিকীকরণ ও বন্ধন থেকে মুক্তি, প্রকৃত স্বাধীনতা, প্রত্যেক মানুষের সামাজিক সুখ ও সমৃদ্ধি। এজন্য রাষ্ট্রের পরিচালিত গণসচেতনতামূলক স্বাধীনতানাশী অলীক গল্পে বিশ্বাস করা ঠিক না। তারা আমাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত উন্নয়ন বুঝাতে চাইবে।  কিন্তু আমাদের সবাইকে সামগ্রিক স্বাধীনতা এবং উন্নতিকে উপলব্ধি করতে হবে। যেটাকে রাষ্ট্র ব্যক্তি স্বাধীনতা ও উন্নতি দিয়ে প্রকাশ করে।

বিজ্ঞান এসকল কিছুই জানে। তবে সমস্যাটা হলো এটি এর বাইরের কিছু জানেও না, জানতে পারেও না।  বিজ্ঞান বাস্তব ও জীবন্ত ব্যক্তিত্বের মন্ত্র সম্পর্কে ভালো মতন বুঝতে পারে। কিন্তু বাস্তব ও জীব জগতের সম্পর্কে এর কোনো ধারণা নেই। এটি সাধারণত জীবজগত সম্পর্কে কাজ করে কিন্তু পিটার বা জেমস নিয়ে নয়। এর সত্ত্বারা বিমূর্ত।

এখন ইতিহাস আবার বিমূর্ত সত্ত্বা দিয়ে তৈরি হয় না। তৈরি হয় জীবন ধারণ, কাজকর্ম ও গতিশীল মানুষ দ্বারা। ফলে ইতিহাসে এটি নিজের স্থান করে নিতে ব্যর্থ হয়। বাস্তব মানুষদের উৎপত্তির ফলে বিমূর্তন এগিয়ে চলে বিজ্ঞানের মাধ্যমে। বিজ্ঞানের কাছে মানুষ বৃদ্ধিবৃত্তিক এবং সামাজিক উন্নতির বস্তু। পিটার অথবা জেমসের অবস্থা কিংবা ভাগ্য নিয়ে ভাবা এটির কাজ নয়। বিজ্ঞানের কাছে এটি হাস্যকর। যদি বিজ্ঞানকে তার চিরায়ত কোন সূত্রের বাইরে আসতে বলা হয় তাহলে বিজ্ঞান সেটিকে পরিত্যাগ করবে, ধ্বংস করতেও দ্বিধা বোধ করবে না। আর যেহেতু এটা তার উদ্দেশ্য নয়, সেহেতু বিজ্ঞানের কাছে এরকম আশা করাও বোকামি । বিজ্ঞান বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারে না। এটি শুধু বিমূর্ততার মধ্যে ঘোরে। এর লক্ষ্য সাধারণ অবস্থার অস্তিত্ব ও উন্নতি নিয়ে ব্যস্ত থাকা। মনুষ্য প্রজাতি, অথবা অন্য কোন প্রজাতি নিয়ে ব্যস্ত থাকা। উন্নতি, অবনতি এবং উন্নতির সর্বশ্রেষ্ট নিরাপদ পদ্ধতির সাধারণ কারণ খুঁজে বের করা। কাজটিকে বাস্তবসম্মত ও বিস্তৃতভাবে সম্পন্ন করে বিজ্ঞান তার দায়িত্ব পালন করে। বিজ্ঞানের কাছে এর চেয়ে বেশি আশা করা সমীচীন নয়। এর কাছে এমন কিছু আশা করা হাস্যকর এবং বিপদজনক যা সে দিতে পারে না। যেহেতু এর উদ্দেশ্য পিটার ও জেমসের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা এটি পিটার ও জেমকে খরগোশের মতই বিবেচনা করে এবং এই কারণেই তাদের অস্বীকার করে।

পক্ষান্তরে এটি নানান ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করে মানুষের উপর অপ্রতিরোধ্য বিশেষ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। ঠিক যেমন এ যাবৎ বিভিন্ন ধার্মিক, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ঈশ্বর, রাষ্ট্র অথবা আদালতের নাম ভাঙিয়ে মানুষকে ঠকিয়েছে, তেমনি এই বিজ্ঞ ব্যক্তিরাও মানুষকে ঠকায়।

আমি যা বুঝাতে চাচ্ছি- বিজ্ঞানের এত ক্ষতিকর প্রভাব সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট পরিসরে জীবনের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের বিদ্রোহ অথবা বিজ্ঞানময় সরকারের বিদ্রোহ যাই বলি বিজ্ঞানকে ধ্বংস করা যাবে না। যদি করা হয় তাহলে এটাই হবে মানবতার বিরুদ্ধে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। বিজ্ঞানকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিতে হবে যেখানে এটি আগে ছিল। এটাই সমাধান।

এখন পর্যন্ত মানব জাতির ইতিহাসে ঈশ্বর, দেশ, রাষ্ট্রক্ষমতা, জাত্যাভিমান, ঐতিহাসিক অধিকার, বিচারিক অধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, গণউন্নয়ন সবই সৃষ্টি হয়েছে জঘণ্য বলিদানের মাধ্যমে। এগুলো আজ প্রাকৃতিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আমরা এগুলোকে বাতিল করতে পারবো না। আমাদের এগুলোকে অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতই মনে করতে হবে। আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে এগুলো মানব জাতিকে শিক্ষা দেয়ার একমাত্র সম্ভাব্য উপায় ছিল। সুতরাং আমাদের সত্যটা বুঝতে হবে। ম্যাকিয়াভেলীয় মনোরম কৌশলের শাসকশ্রেণীর গর্বিত অংশ হয়েও আমাদের স্বীকার করতে হবে কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হাতে এসব ভয়ংকর কর্মকান্ড চাপিয়ে দেয়ার ক্ষমতা থাকা উচিত নয়। তাহলে এটি হবে ইতিহাসের আরেকটি সর্বগ্রাসী বিমূর্ততা যা মানবজাতিকে রক্তগঙ্গায় নরপিশাচের মত প্রবাহিত করবে।

আমরা বুঝতে পারছি এই রক্তগঙ্গা ধর্মতাত্ত্বিক, রাজনীতিবিদ এবং বিচারকের কাছে সন্তোষজনক। কারণ ধর্মতাত্ত্বিক, রাজনীতিবিদ এবং বিচারকেরা এই রক্তগঙ্গার উপরই বেঁচে আছেন। অধিবিদ্যা নিজেও এতে সম্মতি জানিয়েছে। এদের একমাত্র উদ্দেশ্য অন্যায় ও কুযুক্তিকে প্রমাণ ও যুক্তিকে গ্রাহ্য করা।

কিন্তু এর বিপরীতে বিজ্ঞান তার এমন রূপ দেখিয়েছে যে একে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আক্ষেপ করতে হয়। প্রথমত, কিছু সুবিধাভোগী মানুষ জীবনের বাইরে নিয়ে গিয়ে বিজ্ঞানকে প্রকাশ করে এবং দ্বিতীয়ত, এখন পর্যন্ত বিজ্ঞান নিজেকে মানব উন্নয়নের চরম ও সর্বশ্রেষ্ট উদ্দেশ্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই যা সমস্যা।

ধর্মতত্ত্ব, অধিবিদ্যা, রাজনীতি এবং বিচারিক আকারের চেয়ে বিমূর্ত বিজ্ঞানের বিশাল সুবিধা এই যে, এসব মতবাদের মিথ্যা ও মারাত্মক বিমূর্ততার জায়গায় বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠা করে সত্য বিমূর্ততা। এসব বিমূর্ততা বস্তুর গতি প্রকৃতি ও কার্যকারণ প্রকাশ করে। তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক ও উন্নতির সূত্র প্রদান করে। এটি পূর্ববর্তী মতবাদগুলোকে দক্ষতার সাথে আলাদা করে এবং নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এটি সমাজের সামগ্রিক সচেতনতার একটি বোধ তৈরি করে। সবকিছুকে বিমূর্ত রাখা উদ্দেশ্য নিয়ে এটি সব মতবাদকে এক করে দেয়। এটি প্রকৃতিগতভাবে ব্যক্তিবাদকেও উপেক্ষা করে।

প্রাথমিক এই ভুলটিকে শুধরানেরা জন্য পজিটিভ বিজ্ঞানকে (যে বিজ্ঞান এরিস্টটলের সময় থেকে চলে আসছে) তার অতীতের মতবাদ ঝেড়ে নতুন কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। তার মধ্যে ব্যাপক সংস্কার সাধন করতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞান এটি পারবে না। সাধারণের অজ্ঞতাকে গর্বের সাথে বিমূর্ততার মাধ্যমে বলি দেয়ার একটা প্রকট সম্ভাবনা সেখানে থেকে যায়। অনেকে সত্য বিজ্ঞানের কথাও বলতে পারেন। একটি বার ভাবুন তো, এটি আমাদের সর্বোচ্চ কি দিতে পারে? এটি সাধারণ অবস্থার প্রাকৃতিক উন্নতির একটি বিশ্বাসযোগ্য ও কারণসম্মত ছবি, বস্তু ও আদর্শ, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক, ধর্মীয়, দার্শনিক, নান্দনিক ও বৈজ্ঞানিকসহ সমাজের ইতিহাস সম্বলিত উপাদান প্রদর্শন করতো। এই তো। তাও আবার বিমূর্ত ধারণার মধ্যে। শতকোটি মানুষের যারা ইতিহাসে বেঁচে থাকার ও সংগ্রামের সামগ্রী সাজিয়েছে বিজয়ী দলের মাধ্যমে ও বিজিত মানব শিকারের অসহায় বলির মাধ্যমে তা সেখানে চাপা পড়ে গেছে। অথচ সেই মানুষগুলোকে ছাড়া বিমূর্ত পৃথিবীর ইতিহাস লেখা সম্ভব হত না। কিন্তু এই মানুষগুলো এই সব লড়াই থেকে কোন রকম উপকৃত হয় নি, কোন ইতিহাসেও তাদের নাম নেই। তারা শুধু ত্যাগ করেছে, চূর্ণ হয়েছে বিমূর্ত মানবতার জন্য।

তাই সমাধানটা পজিটিভ বিজ্ঞানের সংস্কারের মধ্যেই নিহিত।

আমরা কি ইতিহাসের বিজ্ঞানকে দোষ দিবো? না। দোষ দিলে সেটি হবে অন্যায় ও হাস্যকর। আমরা আশা করি যে বিজ্ঞান জীবের সংগ্রামের সাধারণ কারণগুলোতে বিশ্বাসযোগ্য ও নিশ্চিতভাবে মনোযোগ দিবে। কিন্তু এটা ভুললে চলবে না যে বিজ্ঞানই আমাদের সমাজের জীবন্ত মানুষের প্রকৃত মুক্তির প্রয়োজনীয় সাধারণ শর্তসমূহ প্রকাশ করে। এটাই এর মিশন। এর বাইরে বিজ্ঞান নিষ্ক্রিয় ও মারাত্মক- এটাই এর সীমাব্ধতা। এই বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে।

বিজ্ঞান আমাদের আলোর সন্ধান দিতে চায়। কিন্তু বাস্তব জীবন আবার এটি চায় না। আবার বিজ্ঞান তার প্রচারের জন্য যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয় বাস্তব জীবন তার সমাধান দেয়। মাঝে মাঝে বিজ্ঞান ও বাস্তব জীবন এই দুই মতবিরোধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন হলো বিজ্ঞান ও বাস্তব জীবনের এই মতবিরোধের সমাধান হবে কিভাবে?

এই স্ববিরোধ কেবল একভাবেই সমাধান করা যায়। আর সেটা হলো অস্তিত্বমান সবকিছুর জীবনের নৈতিক সত্ত্বা হিসেবে বিজ্ঞানের দেনা পরিশোধ এবং অবেতনভুক্ত জ্ঞানীদের (সাধারণ জনগণের যারা স্বেচ্ছায় বিজ্ঞান মনষ্ক হয়ে কাজ করে) দ্বারা তার বহিঃপ্রকাশ করে জনসাধারণের কাছে ছড়িয়ে দেয়া। একে সমাজের সামগ্রিক সচেতনতার কথা তুলে ধরতে হবে। তারপর বিজ্ঞান নিশ্চিতভাবে সকলের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। যেখানে এটি কেবল মাত্র বস্তু এবং প্রাণীর সাধারণ কার্যকারণ, অবস্থা ও নির্দিষ্ট সস্পর্ক নিয়ে নিজেকে বিবেচনা করছে, যেখানে এটি সব জীবের বর্তমান ও বাস্তব জীবনের একটি সত্য হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি হবে প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের মত একটি সংস্কার যেখানে প্রোটেস্ট্যান্টরা দাবি করেছিল তাদের কোনো ধর্মযাজকের প্রয়োজন নেই, তারা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের নিজস্ব যাজক।

কিন্তু যতক্ষণ না জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন করা হবে, তাদের কি বৈজ্ঞানিক ব্যক্তিবর্গ সম্বলিত সেই সরকারের হাতে ছেড়ে দেয়া জরুরি? অবশ্যই না। বিজ্ঞদের দ্বারা শাসিত হবার চাইতে বিজ্ঞানকে প্রয়োগ করা উত্তম। প্রথমে এই সরকার বিজ্ঞানকে জনগণকে কাছে দুষ্প্রাপ্য করে  দিবে এবং দ্বিতীয়ত তারা একটি অভিজাত সরকার গঠন করে বিজ্ঞানকে করে তুলবে রাজসিক! বিষয়টা বাস্তবিকভাবে খুব নির্দয়! আর সামাজিকভাবে দেখলে সবচেয়ে উন্নত ও অপমানজনক অবস্থা। মূলত এভাবেই বিজ্ঞান তার ক্ষমতার ছড়ি ঘুরাবে। এরকম শাসনব্যবস্থা সমাজের প্রাণ ও আন্দোলনকে অবশ করে তুলবে। এসব বিজ্ঞরা সবসময়ই বেয়াদব, সামলম্বী এবং সবচেয়ে বেশি নিষ্ক্রিয়। সবকিছুকে তারা বিমূর্ততার নিচে শুকিয়ে দেয়।

আসলে বিজ্ঞান নয়, জীবনই জীবন তৈরি করে। মানুষের নিজেদের স্বতঃস্ফূর্ত কাজই মানুষের মুক্তি আনে। যদি বিজ্ঞান আজ থেকে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত  অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের মুক্তির স্বাদ এনে দিতে পারে তাহলে নিঃসন্দেহে সেটি বিজ্ঞানের জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু তথাকথিত বিজ্ঞদের নিকট মাথা নত করা যাবে না। তাদের মিথ্যা ও অকল্পনীয় আলোর চাইতে আলোর অনুপস্থিতি ভালো। এটি অন্তত কাউকে পথভ্রষ্ট করবে না। তবে চলার পথে মানুষের আলোর অভাব হওয়ার কথা নয়। মানুষ হয়তো সেই পথে কোন পারিশ্রমিক পাবে না, কিন্তু বাস্তব জীবনের কষ্টময় অভিজ্ঞতাগুলোকে মিলিয়ে তারা একটি গতানুগতিক মামুলি বিজ্ঞানের সন্ধান পাবে যার মূল্য কখনোই তত্ত্বীয় বিজ্ঞানের চেয়ে কম নয়। বরং বেশি।  তখন হয়তো দেখা যাবে বুর্জোয়া ছাত্ররা বুর্জোয়াদের মিথ্যাচার, ভন্ডামি, অবিচার ও কাপুরুষতাকে ঘৃণা করে এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস করবে, অকপটভাবে প্রলেতারিয়েতের প্রতি অবিচার স্বীকার করবে। তখন তারাই হয়ে যাবে জনগণের ভ্রাতৃসুলভ পথপ্রদর্শক। তাও তাদেরকে ধন্যবাদ। কিন্তু তারপরেও ঐ বিজ্ঞদের সরকার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

যদি জনগণ বিজ্ঞদের এই সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সতর্ক থাকে, আদর্শবাদীদের চেয়েও তারা বেশি আন্দোলন করতে পারবে। আসলে স্বর্গের কবি এবং বিশ্বাসীদের সংখ্যা যত বাড়ে, তারা ততই ভয়ংকর হয়ে উঠে। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক বিমূর্ততা হলো যুক্তিসম্মত বিমূর্ততা। এটি সত্য সত্ত্বা, জীবনের জন্য দরকারি কিন্তু এটি জীবনের তত্ত্বীয় উপস্থাপনা। একে প্রাণের মাধ্যমে শোষণ ও হজম করতে হবে। কিন্তু আদর্শবাদী বিমূর্ততা জীবনকে ধ্বংস করে, হত্যা করে।

ভাববাদীদের গর্ব, তারা ব্যক্তি কেন্দ্রিক নয়। তারা পবিত্র, অপরাজেয় ও পরিবর্তনশীল। কিন্তু সর্বশেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এটি মানুষকে ঈশ্বরের কাছে বলি দিবে। যেরকম করেছিল প্রুশিয়ার লেফটেন্যান্ট।

আসলে মানুষ প্রকৃতির অন্যান্য জিনিসের মতই, পুরোপুরি একটি বস্তুগত সত্তা। মানুষের মন, চিন্তার দক্ষতা, বিভিন্ন অন্তর্গত ও বাহ্যিক চেতনা গ্রহণ ও বোঝার ক্ষেত্রে কল্পনার মাধ্যমে চেতনাকে বাড়িয়ে তোলা, সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য খুঁজে বের করা, সদৃশ বিমূর্ততা নিরূপন করা ও এর মাধ্যমে সাধারণ মতবাদ তৈরি করা এবং সবশেষে মতবাদের বিন্যাস ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ধারণা প্রতিষ্ঠা করা- এককথায়, আমাদের ¯্রষ্টা এবং আদর্শ পৃথিবী,  প্রাণীর এবং মস্তিষ্কও বস্তুগত সম্পত্তি।

আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে এসব ভালো করেই জানি, কোনো সত্ত্বা এর বিরোধিতা করে নি। যে কেউ যেকোনো মুহূর্তে তা যাচাই করতে পারবে। সকল জীবেই আমরা বুদ্ধির একটি ক্রম দেখতে পাই। আর প্রজাতির সিরিজে প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা পরিমাপ করা হয় মানুষের মত করে। তাদের উন্নতি হয় মানুষের মত। কিন্তু একমাত্র মানুষেরই বিমূর্ততার শক্তি আছে যা তার চিন্তা ভাবনা গুলো গঠন করে।

আমাদের জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র ও উৎস হলো বিশ্বজনীন অভিজ্ঞতা। বুদ্ধিমত্তা থেকেই এই অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। আর এই বুদ্ধিমত্তার তীব্রতা, শক্তি আর ক্রিয়া কলাপ নির্ভর করে প্রাণীর আপেক্ষিক খুঁতবিহীনতার উপর। এই বিশ্বজনীন অভিজ্ঞতার ফলাফলের আধুনিকতম রূপটি বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীতে প্রয়োগযোগ্য নয়। আমরা মানুষের মতো করে একে প্রতিষ্ঠা করি। এই বুদ্ধিমত্তাই নির্ধারণ করে একটি প্রাণী কতটুকু ভুল বা সঠিক।

অন্যভাবে বলা যায়, কেউই বিশুদ্ধ মন দেখে নি বা দেখতে পারে নি যা তার শরীর থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কিছু। কিন্তু যদি কেউই একে বাস্তবে না দেখে থাকে মানুষ কিভাবে মনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে? এই বিশ্বাসের পেছনের সত্যটা বিশ্বজনীন না হলেও ভাববাদীদের মতই খুব সরল আর তা হলো এটি আমাদের খুবই আপন কিছু। সাধারণ বিশ্বাস বোকার মত হলেও এটি মানুষের প্রকৃত গন্তব্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ধাক্কা দেয় এবং মনকে নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে আমাদের সাবধান করে দেয়।

এই বিশ্বাসের ব্যাখ্যাটি যথেষ্ট বাস্তবসম্মত। এটি বুঝিয়ে দেয় মানুষ তার মানসিক দক্ষতা সম্পর্কে জানার আগেই একে ব্যবহার করা শুরু করে। মনের অবচেতন এই কাজের সময়, নিষ্পাপ কাজ অথবা বুদ্ধিমত্তায় বিশ্বাসের সময় মানুষ বাহ্যিক জগতের বিভ্রমে পড়ে যায়। যা তাকে জীবন নামের অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনায় চালিত করে। জীবনও নানাবিদ প্রয়োজনে বিপুল পরিমাণে কল্পনা, ধারণা ও চিন্তার সৃষ্টি করে (যেগুলোতে প্রথমে ভুল থাকে) এবং পরবর্তীতে জগতে বাস্তবতাকে মেনে নেয়। এগুলোকে সে প্রকাশের চেষ্টা করে। নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ড সম্পর্কে সচেতন না হয়ে নিজের কল্পনাশক্তি সম্পর্কে না জেনে এই চিন্তা ভাবনাগুলো ব্যক্তিকে (সাবজেক্ট) বাতিল করে দেয়।  স্বভাবতই মনে করে সবকিছু বস্তুনিষ্ট(অবজেক্ট)। বাস্তব সত্ত্বার মতই চিন্তাগুলো মানুষ থেকে স্বাধীন, মানুষ থেকে উদ্ভুত এবং থাকে মানুষের ভিতর।

একটি বারও কি ভেবেছেন যে কবে থেকে এরকমটি শুরু হলো? আসলে আদিম মানুষেরা যখন থেকে প্রাণীর নির্মলতা ছেড়ে ঈশ্বরের আরাধনা শুরু করে তখন থেকেই এরকম হচ্ছে। তারাই ঈশ্বরকে সৃষ্টি করে, ঈশ্বরকে কোনো রকম সন্দেহ না করে তারা পূজা শুরু করে দেয়, ঈশ্বরকে নিজেদের থেকেও শক্তিশালী ভাবা শুরু করে তাকে সর্বশক্তি অর্পন করে দেয়। আর নিজেদের বানিয়ে ফেলে ঈশ্বরের সৃষ্টি, ঈশ্বরের গোলাম। যতই দ্রুত মানুষের চিন্তা উন্নত হতে লাগলো তারা ঈশ্বরকে আদর্শ মনে করতে থাকে। যে ঈশ্বর বাস্তব দৃশ্যমান জগতে বাস করতো না সেই ঈশ্বরই হয়ে গেল তাদের আদর্শ। সবশেষে ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধাপ পেরিয়ে সেই ঈশ্বর হয়ে যায় পবিত্র একক সত্ত্বা, চিরায়ত পরম আত্মা, বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা এবং মহারাজা!

এই ভয়ংকর ধর্মীয় উন্মাদনার ঐতিহাসিক অগ্রগতি আমাদের চূর্ণ বিচূর্ণ করে পৃথিবীর বাইরে পাঠিয়ে দিতে চায়। উন্মাদনার এই ধাপটি শরীরবৃত্তীয় দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই স্বাভাবিক এবং একই সাথে মানবতার ইতিহাসের জন্য খুবই দরকারি। আমি ঠিক জানি না কত শতাব্দী ধরে এই বিশ্বাসটি বড় হয়ে মানুষের প্রথায় পরিণত হয়ে মানুষকে পরিচালিত করছে। কিন্তু একবার প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর এটি মানব সমাজে ঘাঁটি গেড়ে বসে। যেভাবে একজন পাগল একজন সুস্থ মানুষের মস্তিষ্ক দখল নিয়ে নেয় ঠিক সেভাবে। একজন পাগলকে দেখুন, তার পাগলামির কারণ কারণ যাই হোক, দেখা যায় এক নির্দিষ্ট ও অজানা চিন্তা তাকে সব সময় মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। এই ধর্মীয় উন্মাদনাও আমাদের এরকম মোহাচ্ছন্ন করে রাখে।

যাক, ধর্ম হলো একটি সামগ্রিক অসুস্থতা। এটি খুবই শক্তিশালী। কারণ এটি বংশ পরম্পরায় চলমান মূর্খতা। কারণ এর উৎপত্তিস্থান কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। এর সামগ্রিক উন্মাদনা  সমাজের রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যে প্রবেশ করার কারণে সমাজের মধ্যে এটি দেহ ধারণ করেছে। সত্য কথা বলতে, এটি সমষ্টিগত আত্মা ও চিন্তায় পরিণত হয়েছে। জন্মের পরই প্রত্যেকে এর খাঁচায় আটকে পড়ে। মাতৃদুগ্ধ পানের সময়ও একটা শিশু ধর্মের রস আস্বাদন করে। সে যাই দেখে কিংবা স্পর্শ করে সবখানেই সে ধর্মকে খুঁজে পায়। এতে সে মারাত্মক হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু এই বিষাক্ত ও মর্মভেদি প্রথাকে ভাঙার জন্য দরকার হয় ভয়ংকর প্রলয় ও বিদ্রোহ। যা তার শক্তিশালী  মনের পক্ষেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়ে উঠে না। আমরা আধুনিক ভাববাদীদের অনেক দেখেছি। আরো দেখেছি আমাদের বস্তুবাদী তত্ত্ব- জার্মান কমিউনিজমে। কিন্তু তারা রাষ্ট্রের ধর্ম দূর করার মত কোন উপায়ই শেষ পর্যন্ত বের করতে পারে নি।

মানুষের কল্পনায় সুপ্রতিষ্টিত হবার পর এসব ধর্মীয় সিস্টেমের অগ্রগতি প্রাকৃতিক ও যৌক্তিক পথ অনুসরণ করে। সকল যুগের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কও এই অগ্রগতি মেনে নেয়। মেনে নিয়ে তারা ধর্মীয় খামখেয়ালী, বিশ্বাস উৎপাদন ও পবিত্র উৎসর্গের জন্ম দেয়। এভাবে বস্তুকামের মাধ্যমে ধর্মের নাম দিয়ে সমষ্টিগত ও ঐতিহাসিক পাগলামি, বহু ঈশ্বরবাদ থেকে খ্রিষ্টীয় একেশ্বরবাদের সৃষ্টি হয়েছে।

ধীরে ধীরে বহু ঈশ্বরবাদিতা থেকে তখন একেশ্বরবাদিতায় রূপান্তর ঘটে। এটি ধর্মীয় বিশ্বাসের অগ্রগতির দ্বিতীয় ধাপ। প্যাগানদের ধর্মীয় বস্তুবাদ থেকে তখন খ্রিষ্টধর্মের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের আগমণ ঘটে। প্যাগান দেব দেবীদের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিলো তাদের জাতীয়তা। তারা ছিল জাতীয় দেবতা। মানুষ তাদের প্রয়োজনে হাজারো দেবতাকে মনে রাখতো। প্যাগান দেবতারা বাস্তবতাকে কঠোরভাবে অস্বীকার করতো না। সর্বোপরি বস্তুগত হওয়ার কারণে তারা ছিল সমৃদ্ধ। বৈচিত্রময় সত্ত্বা ছিল তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু এই আমূল পরিবর্তন অর্থাৎ একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠার পেছনে সংগ্রামও কিন্তু কম ছিল না। এর জন্য ইহুদীদের যে কি মূল্য দিতে হয়েছে তা আমরা সকলে দেখেছি। আমরা দেখেছি কিভাবে মুসা সহ অন্যান্য নবীদের বার্তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে গিয়েছিল। জনসাধারণ আবার তাদের প্রতিমা পূজায় ফিরে গিয়েছিল। ফিরে গিয়েছিল প্রাচীন ও আরো বেশি স্বাভাবিক ও সুবিধাজনক ভালো দেবতায়। আরো বেশি বস্তুগত ধারণায়, যাদেরকে স্পর্শ করা যায়। তারপরেও জিহোবাই সবসময় তাদের প্রকৃত ঈশ্বর ছিলেন। মুসা সহ অন্যান্য নবীদের এই ঈশ্বর ছিলেন পুরোপুরি তাদের জাতীয় ঈশ্বর। ইহুদীদের এই ঈশ্বর অবশ্য অন্যান্য ঈশ্বরের অস্তিত্ব কখনো অস্বীকার  করেন নি। তবে তিনি আসলে চাইতেন না তার অনুসারীরা তার পাশাপাশি অন্য কারো আরাধনা করুক কারণ জিহোবা ছিলেন খুবই ঈর্ষাপরায়ণ। তার প্রথম হুকুমটি ছিল- “আমিই তোমাদের রাজা ও ঈশ্বর এবং আমি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ঈশ্বর নেই।”

তারপর জিহোবা ছিলেন একজন খুবই বস্তুগত ও কর্কষ আধুনিক ভাববাদের প্রথম খসড়া। আবার তিনি ছিলেন একজন জাতীয় ঈশ্বর। জার্মান ঈশ্বরকে বার্লিনের রাজা প্রথম উইলিয়াম, তার ভক্ত ও জার্মান জেনারেলরা নিজেদের ঈশ্বর বলে প্রচার করতো। কিন্তু পরম সত্ত্বা কি কখনো জাতীয় ঈশ্বর হতে পারে না? তিনি তো অবশ্যই পুরো মানবতার ঈশ্বর হবেন। পরম সত্তা কখনোই বস্তুগত হতে পারেন না। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে তখন ঈশ্বর “জাতীয়” হয়ে গিয়েছিলেন। তৎকালীন মানুষজন পরম সত্ত্বাকে আরাধনা করার জন্য দুটি জিনিসকে বুঝেছিলঃ

১.            জাতীয়তাবাদের স্বীকৃতি এবং আরাধনার মাধ্যমে মানবতার বোধ জাগ্রত করা।

২.           অধিবিদ্যাগত ধ্যান ধারণার অধিক উন্নতির জন্য স্থ’ূল ঈশ্বরের আত্ম শুদ্ধিকরণ।

প্রথম শর্তটি পূরণ করেছিল রোমানরা। অধিকাংশ প্রাচীন দেশগুলোকে বশে এনে এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে তাদের এ কাজটি করতে হয়েছিল। বিজয়ী দেশের দেবতারা জড়ো হতো সূর্যদেবের মন্দিরে এবং একে অন্যকে বাতিল করে দিতো। এটিই ছিল মানবতার সর্বপ্রথম ¯ূ’’ল ও নেতিবাচক খসড়া।

দ্বিতীয় শর্তটি অর্থাৎ জিহোবার আধ্যাত্মিকীকরণ প্রথমত বুঝতে পেরেছিলো গ্রিকরা। যখন তারা রোমানদের হাতে সা¤্রাজ্য খোয়ায় নি সেই সময়টিতে। তারাই ছিল অধিবিদ্যার ¯্রষ্টা।

ইতিহাসের শুরুতে গ্রীস এবং ওরিয়েন্ট অঞ্চল(পূর্ব এশিয়া) একটি পবিত্র জগতের সন্ধান পেয়েছিল। যেটি মানুষজনের চিরায়ত বিশ্বাসের উপর চলতো। পরবর্তীতে ওরিয়েন্টরা এই পবিত্র জগতের ধারণা থেকে বেরিয়ে আসে। পরবর্তীতে গ্রীকরাই এটাকে ধরে রাখে। গ্রিসে রাজনৈতিক নানান প্রক্রিয়া শুরু হবার আগেই তারা তাদের কবিদের মাধ্যমে এই পবিত্র জগতকে উন্নত করে প্রকান্ড মানবিক করে তুলে। ধীরে ধীরে এটি তাদের কাছে সবচেয়ে মর্মস্পর্শী এবং মহান ধর্ম হয়ে গেল। কিছু গ্রিক চিন্তাবিদও তখন এই পবিত্র জগতটিকে প্রতিষ্টিত করতে ভূমিকা পালন করেছিলেন। জনসাধারণরা শুধু যে একে বিশ্বাস করতো তাই নয়, এটি তাদের অনুভব ও চিন্তা ভাবনার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই তারা একে অগস্ত্য যাত্রার মতো উপযুক্ত বিষয় হিসেবে মনে করলো।

প্লেটোর মত মহান প্রতিভাবান ব্যক্তিও পর্যন্ত এই পবিত্র জগতের ধারণাটি দ্বারা প্ররোচিত হয়েছিলেন। এ থেকে বোঝা যায়, ধর্ম এতটাই ছোঁয়াচে, এতটাই শক্তিশালী যে এর উন্মত্ততা মহৎ মনের উপরও তার প্রভাব ফেলে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সর্বকালের সেরা দার্শনিকেরা (!) এরিস্টটল ও প্লেটোর সময় থেকেই এই পবিত্র জগতের ধারণাটি তাদের অতিন্দ্রিয় ও স্বর্গীয় মুকুটে বসিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এদের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন হেগেল। কান্টের সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি এই ত্রুটিযুক্ত ও অতি দার্শনিক চিন্তা দিয়ে পবিত্র জগতের ধারণার নৈব্যক্তিকতা ও বাস্তবতাকে ভুল প্রমাণ করেছিলেন। তবে পাশাপাশি এটাও সত্য যে, হেগেল তার এই কাজটি এতই বাজেভাবে করেছিলেন যে, তিনি ঈশ্বরকে চিরতরে মেরে ফেলছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন মানুষ তার মনের চলমান ঐতিহাসিক সৃষ্টির বেশি কিছু নয়। এইসব ধর্মের  পাগলামি ও পবিত্র মরীচিকা বন্ধ করতে তিনি যে কথাটি বলতে চেয়েছিলেন তা তার পরবর্তী আরো দুজন দার্শনিকও বলেছিলেন। দুজন দার্শনিক প্রায় একই সময়ের ছিলেন। একই সময়ের হলেও দুজনের কেউই একে অপরকে চিতেন না। একজন ছিলেন হেগেলের শিষ্য ও হেগেলকে ধ্বংসকারী লুডভিগ ফয়েরবাখ। অপরজন পজিটিভ দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোঁৎ। তাদের বাণীগুলো ছিলো এরকম-

“অধিবিদ্যা মনস্তত্ত্বে পরিণত হয়েছে। অধিবিদ্যার সকল শাখা কালের বিবর্তনে এখন মনস্তত্ত্বের অগ্রগতির সাথে মিলে গেছে।”

বর্তমানে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, কিভাবে এই ধর্মীয় পবিত্রতার ধারণাটি আসলো এবং কিভাবে বংশ পরম্পরায় তারা মানুষের বিমূর্ত দক্ষতায় তৈরি হয়েছিলো। আমরা বুঝতে পারি যে, মানুষই ঈশ্বরকে সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্লেটোর সময় এগুলো ভাবা সম্ভব ছিলো না। সমষ্টিগত মন হোক কিংবা একক মানুষের মন হোক বা কোন মহৎ মন হোক - কেউই এ কথা মেনে নেয়ার মত শক্ত ছিলো না। তবে সেই সময় সবাইকে ছাপিয়ে ব্যতিক্রম ছিলেন সক্রেটিস। তিনি বলেছিলেন- “নিজেকে জানো।”

কিন্তু তখন মানুষের মনের পক্ষে এটির মর্মার্থ বোঝা অসম্ভব ছিলো। তাদের কেউই বুঝতে পারেন নি এখানে ঈশ্বরকেন্দ্রিক চিন্তার কারণ অনুসন্ধানের আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু মানুষের মন যে আগেই পবিত্র জগতের সন্ধান পেয়েছিল। তাদের সেই মন সক্রেটিসের বাণীকে ইতিহাস হিসেবে, ঐতিহ্য হিসেবে, আবেগ হিসেবে এমনকি চিন্তার অভ্যাস হিসেবে দেখেছিল। তারা শেষমেষ একে বানিয়ে ফেললো অতি মহিমান্বিত অলীক কিছুর লক্ষ্য বস্তু। এভাবেই জন্ম হয় অধিবিদ্যা বা দর্শনের। পবিত্রতার ধারণাকে তখর উন্নত করে পরে একে আরো নিখুঁত করা হয়। ফলে দর্শন হয়ে যায় আধ্যাত্মিকতার ভিত্তি।

এত কিছুর পরেও এটা সত্য যে প্লেটোর পরে মননের কিছুটা উল্টোগামী পরিবর্তন হয়। যেমন এরিস্টটলের কথাই ধরা যায়। এরিস্টটল (বিজ্ঞান ও পজেটিভ দর্শনের জনক) পবিত্র জগতকে বাতিল করে দেন নি। কিন্তু এ ব্যাপারে যতটা সম্ভব কম কথা বলেছিলেন। বিশ্লেষক এবং পরীক্ষকের মত তিনিই প্রথম বের করেছিলেন যে, যুক্তি হলো মানুষের চিন্তার আইন। আর একই সাথে তিনি বলেছিলেন এই পার্থিব জগত কোনো আদর্শ নয়, এটি একটি মোহনীয় সত্ত্বা। এরও বাস্তব একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। এরিস্টটল বিষয়টাকে এরকমই দেখতেন।

পরবর্তীতে আলেকজান্দ্রিয়ায় গ্রীকরা পজিটিভ বিজ্ঞানের প্রথম স্কুল স্থাপন করেন। যারা এটি স্থাপন করেছিলেন তাদের সকলেই ছিলেন নাস্তিক।  কিন্তু তাদের নাস্তিকতাবাদ সমসাময়িকদের উপর কোনো ছাপ ফেলতে পারে নি। ফলে বিজ্ঞান নিজেকে জীবন থেকে দিন দিন বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল।

কিন্তু তখনই আবির্ভাব ঘটে এপিকিউরিয়ান সংশয়বাদীদের। মূলত তাদের কারণেই প্লেটোর পর পবিত্র ধারণাগুলো দর্শনের মধ্যে নিজে থেকেই বাতিল হয়ে যাচ্ছিলো।

আলেকজান্দ্রিয়ার আরেকটি স্কুলের প্রভাব ছিলো আরো অনেক বেশি। এটি ছিলো নব্য প্লেটোনিকদের স্কুল। এরাই ছিলো খ্রিষ্টীয় মতবাদের জন্মদাতা এবং পরবর্তীতে এর ব্যাখ্যা কারক। এরাই ওরিয়েন্ট ও প্লেটোর ধারণা নিয়ে বীভৎস কল্পনার এক ভেজাল মিশ্রণ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিলো।

এদের হাত ধরে জিহোবা তখন ব্যক্তিবাদী ও অহংকারী হয়ে ওঠেন। তার এই অহংকার ও ব্যক্তিবাদ রোমানদের রাজ্য জয়ের চেয়ে কোনো অর্থেই কম নিষ্ঠুর ছিলো না। তখন গ্রীকদের আদর্শ দার্শনিক জল্পনা কল্পনার মতই ওরিয়েন্টদের মত বস্তুগত হয়েছিল এবং এগুলোই ছিলো খ্রিষ্টানদের আধ্যাত্মিক ধর্মের সেই তিনটি ঐতিহাসিক উপাদান। এগুলো দিয়েই তারা বিশ্বজুড়ে ছড়ি ঘুরিয়েছিল।

এইসব উপাদানের উপর ভিত্তি করেই রোমানরা একটি নৃশংস কাজ করেছিল। তারা তখন প্যাগান দেবতাদের ব্যর্থতার আসনে তাদের নতুন আবিষ্কৃত ঈশ্বরকে স্থান দেয়। তারা এটি পেরেছিল কারণ তাদের হাতে তখন প্রায় পুরো পৃথিবী ছিল। এজন্য তারা প্রথম এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করতে পেরেছিল। এটি নিঃসন্দেহে মানবতার জন্য বেশ বাজে ও নেতিবাচক একটি সিদ্ধান্ত ছিল। তারা একজন ঈশ্বরকে এভাবে তৈরি করলো যিনি জাতীয়তা, বস্তুগত ও সামাজিকতা ও সকল দেশের উর্ধ্বে। কখনো কখনো এই ঈশ্বর মানুষকেও অস্বীকার করেন। এই ঈশ্বর পুরোপুরিভাবে অশরীরী ও বিমূর্ত সত্তা।

সর্বোপরি গ্রিক দর্শনের হাতে দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি ও অগ্রগতির মাধ্যমে দার্শনিক পদ্ধতিতে পবিত্র জগতের ধারণা প্রতিষ্টিত হয়েছিল। এ মডেলটি চিরন্তনভাবে সৃজনশীল এবং দৃশ্যমান জগতে সর্বদা বিস্তৃত হয়েছিল। কিন্তু যে পবিত্রতা গ্রীকদের থেকে গৃহীত ও প্রস্তুত করা হয়েছিল তা ছিল ব্যক্তি নিরপেক্ষ পবিত্রতা। কোন যৌক্তিক বা আধ্যাত্মিক দর্শনের পক্ষে একজন ব্যক্তিগত ঈশ্বরের ধারণা গ্রহণ বা বর্জন করা যায় না। তাই একজন একক ও একান্ত ব্যক্তিগত ঈশ্বরকে কল্পনা করা সময়ের দাবি হয়ে উঠলো। অবশেষে এই ঈশ্বরকে পাওয়া যায় ইহুদীদের জাতীয় ঈশ্বর হিসেবে, সেই নৃশংস, স্বার্থপর এবং ক্ষুদ্ধ ব্যক্তি জিহোবায়। এজন্য স্বতন্ত্র জাতীয় চেতনা থাকা সত্ত্বেও ইহুদীরা  এ যুগে এসেও নিজেদের আলাদা করে রেখেছে। ইহুদীদের মধ্যে ব্যবসা করার প্রবণতা অনেক আগে থেকেই ছিল। ধীরে ধীরে এটি তাদের একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যই হয়ে যায়। এই ব্যবসায়ীরা সারা পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে গেছে। এর সাথে তারা জিহোবার উপাসনাও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তারা যত বেশি ঈশ্বরের কাছে নিজেদের উৎসর্গ করেছে, ঈশ্বর তাদের ততটাই বর্জন করে গেছেন।

আলেকজান্দ্রিয়ায় গ্রীকদের সেই স্কুলে ইহুদীদের এই ঈশ্বর প্লেটোর পবিত্রতার সাথে পরিচিত হন। তারই পরম্পরা হিসেবে একসময় জন্ম হয় তেজহীন খ্রিষ্টীয় ঈশ্বরের। অর্থাৎ আলেকজান্দ্রিয়ার নব্য প্লেটোনিক বোদ্ধারাই ছিলেন খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের প্রধান ¯্রষ্টা।

তবুও ধর্মতত্ত্ব কখনোই একা কোনো ধর্মের জন্ম দিতে পারে না। এজন্য ঐতিহাসিক নানান উপাদানের প্রয়োজন। মাঝে মধ্যে ঐতিজাসিক উপাদানের চেয়েও বেশি কিছু দরকার পড়ে। ঐতিহাসিক উপাদান বলতে আমি কোনো বাস্তব অগ্রগতির সাধারণ অবস্থাকে বুঝাচ্ছি। উদাহরণ হিসেবে রোমানদের দ্বারা সমগ্র বিশ্বজয়ের অথবা ইহুদীদের ঈশ্বরের সাথে গ্রিকদের পবিত্রতার আদর্শের সাক্ষাতের কথা বলা যায়। ঐতিহাসিক উপাদানগুলোকে উর্বর করতে হলে একটি জীবন্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত সত্য প্রয়োজন। এই সত্যটি খ্রিষ্টান ধর্মে উপস্থিত ছিল। আর তা ছিল যীশুখ্রিষ্টের প্রচারণা এবং তার শহীদী পরিণতি! এটিই এই ধর্মের ঐতিহাসিক উপাদানকে ত্বরান্বিত করেছিল।

আমরা এই মহান ও সাধু ব্যক্তিটির সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই জানি না। গসপেলগুলো (খ্রিষ্টের বাণী সমূহ) এতই স্ববিরোধী যে সেখানে আমরা কেবল তার কয়েকটি গুণই খুঁজে পাই। সেখানে তার আসল মুখোশ আবিষ্কার করা বড্ড কঠিন। তবে এটা ঠিক যে তিনি গরিব বন্ধু ছিলেন। সেই সাথে একজন ধর্মপ্রচারক, হতভাগ্য, অশিক্ষিত, দাস ও নারীদের সান্ত¦নাদাতা আরো অনেক উপাধি তাকে দেয়া যায়। মূলত এসব কারণেই সবাই তাকে ভালোবাসত। তিনি বঞ্চিত, নির্যাতিত ও সংগ্রামীদের চিরন্তন জীবনের কথা শুনিয়েছিলেন। তাকে তৎকালীন দাপ্তরিক ও রাজকোষের প্রতিনিধিরা ফাঁসি দিয়েছিল। কিন্তু ফাঁসি দিলেও পৃথিবীতে তিনি অনেক শিষ্য রেখে গিয়েছিলেন। তার শিষ্য ও শিষ্যের শিষ্যরা পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো দেশ বিদেশে। তারা গসপেলগুলোকে সেসময় বিভিন্ন দেশে পৌঁছে দিয়েছিল। এই প্রচারকেরা একটি কারণে ধন্যবাদ পেতে পারেন। তাদের কারণেই তখন রোমানদের জাতীয় শৃঙ্খলটি তারা ভেঙে গিয়েছিল। রোমান সা¤্রাজ্যের সর্বত্র তখন ক্রীতদাস ও নারীরা অমানবিক নির্যাতনের স্বীকার ছিল। এজন্য তারা গসপেলগুলো মুক্তভাবে গ্রহণ করেছিল। ধীরে ধীরে গসপেলগুলো ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। রোমান সা¤্রাজ্যের নির্যাতিত মানুষজনও সচেতন হতে থাকে। এটিই ছিলো প্রলেতারিয়েতদের প্রথম সতর্ক ও বৃদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই বিদ্রোহ মানুষকে নতুন একটি দাসত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

খ্রিষ্টধর্মের এই অভূতপূর্ব ও বৈধ ধারাবাহিক বিজয়ের মহত্ত্ব, অকাট্য যোগ্যতা ও গোপনীয় বিষয়টি লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের কাছে তার ব্যাপক আবেদনের কারণে। অন্যথা এটি ছড়াতে পারতো না। যারা মতবাদটি ছড়িয়েছিল তারা মনে করতো এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে খুবই বিপ্লবী ও যৌক্তিক। বাস্তবেও তাই হয়েছিল। সাধারণ সহজ, সরল, অশিক্ষিত ও দুর্বলচিত্তরা একে আদরে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু জ্ঞানী ও বিজ্ঞবানেরা একে বর্জন করেছিল। সাধারণ মানুষের এই খ্রিষ্টীয় অযৌক্তিকতা মেনে নেওয়াটাই ছিল তাদের সবচেয়ে গভীর অপ্রাপ্তি, হৃদয়ের তৃষ্ঞা ও চিন্তার দারিদ্রতা। এর ফলেই এই খ্রিষ্টীয় অযৌক্তিকতাগুলো সকল ধৃষ্টতা ও পৈশাচিকতায় অন্য সকল ধর্মকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে এটি কিভাবে সম্ভব হলো? এটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রত্মতাত্ত্বিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অস্বীকৃতির সৃষ্টি হয় নি। এটি মানুষের সাধারণ জ্ঞান ও কার্যকারণে অনীহার জন্যে সম্ভব হয়েছিল। এটিই মানুষকে ধীরে ধীরে গভীর শূণ্যতা ও চরম স্থায়িত্বের দিকে নিয়ে গেছে।

এই অসহনীয় ও অযৌক্তিক কাজকর্ম, পলের রচিত আখ্যান, বোকাদের নির্বুদ্ধিময় বিজয়ের কাহিনী এসব তখন এক এক করে জনসাধারণকে গেলানো হয়। একজন সৎ ও সত্যান্বেষী ব্যক্তির কাছে এই বিজয়ের কাহিনীগুলো সব সময়ই ক্লান্তিকর, দুর্নীতিগ্রস্থ, মোহহীন ও বিরক্তিকর ছাড়া কিছুই মনে হয় না।