অধ্যায়ঃ চার - ঈশ্বর এবং রাষ্ট্র - মিখাইল বাকুনিন

বর্তমানে অনেককেই সম্মোহনবিদ্যা, আধ্যাত্মিকতা এরকম হাস্যকর বিষয়ে বিশ্বাস করতে দেখা যায়। খ্রীষ্টধর্ম, ভাববাদ কিংবা ঈশ্বরে বিশ্বাস- সবই এরকম হাস্যকর। আমরা যদি আদিকালের প্রলেতারিয়েতদের দিকে তাকাই তাহলে দেখব তাদের বিশ্বাস ছিল দৃঢ় এবং সরল। অনেকটা আধুনিক যুগের মতই। খ্রিষ্টীয় অতিরঞ্জনত্ত্ব তাদের হৃদয় চেয়েছিল, মন নয়। প্রলেতারিয়েতরাও তখন তাদের অভাব, দুঃখকষ্ট এবং দাসত্বের কারণ চায় নি। যে কারণে প্রলেতারিয়েতরা এই অযৌক্তিক খ্রিষ্টধর্মের যৌক্তিক স্ববিরোধিতা ও অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারে নি। এর ফলে প্রলেতারিয়েতরা খ্রিষ্টধর্ম কখনো বুঝতেই পারে নি। তারা ধর্মান্তরিত হয়ে কেবল এর সংখ্যাই বাড়িয়েছিল, আধ্যাত্মিক শক্তিটিও বাড়ায় নি। অন্যদিকে ধর্মীয় মতবাদ হওয়ার কারণে খ্রিষ্টধর্মকেও তার স্ববিরোধীতা ও অস্তিত্ব নিয়ে সেসময় তেমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় নি।

খ্রিষ্টীয় মতবাদ অনুসারে প্রলেতারিয়েতরা ধর্মান্তরিত হয়েছিল ব্যাপক তত্ত্বীয় ও সাহিত্যিক কাব্যকর্মের ফলাফল হিসেবে। একাজটি প্রধানত করেছিল ওরিয়েন্টের ধর্মান্তরিত নব্য প্লেটোনিকরা। ওই সময় গ্রিকদের পতন এতটাই মর্মান্তিক ছিল যে,  খ্রিষ্টযুগের  চতুর্থ শতকে প্রথম কাউন্সিলের সময় চার্চের ফাদাররা সর্বসম্মতভাবে সর্বশ্রেষ্ট, শুদ্ধ, সৃষ্টিকর্তা হিসেবে এই খ্রিষ্ট্রীয় ঈশ্বরকে মেনে নিয়েছিলেন। এই চরম নির্বুদ্ধিতার ধারাবাহিকতা হিসেবে মানবাত্মার অশরীরীতা ও অমরত্বকে বিশ্বাস করা স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় হয়ে যায়।

খ্রিষ্ট ধর্মের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য যে, তাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল ক্রীতদাসের পৃথিবীর সাথে। আরেকটি বড় ভাগ্য ছিল বর্বরদের বহিরাক্রমণ। বর্বররা ছিল মূল্যবান, প্রাকৃতিক শক্তিতে ভরপুর এবং জীবনের প্রয়োজন মেটানোর তাড়না ও সাধ্য তাদের ছিল। তারা তাদের উত্তরসূরী জার্মানদের মতোই লুুটেরা দস্যু ছিল। তারা যখন যা ইচ্ছা ধ্বংস করত, চুরি করতো। তারা জার্মানদের চেয়ে কম শৃঙ্খল, গোঁড়া, কম নীতিবাদী ও অশিক্ষিত ছিল। অপরদিকে তারা জার্মানদের চেয়েও বেশি মাত্রায় স্বাধীনচেতা, অহংকারী এবং বিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলো (অনেকটা আধুনিক জার্মান বুর্জোয়াদের মতো)। কিন্তু এত কিছুর পরেও তারা ছিলো ¯্রফে বর্বর। একারণে প্রাচীন দাসদের ধর্মতত্ত্বীয় ও অধিবিদ্যাগত সকল অভিন্ন প্রশ্নই এই বর্বর জাতিতেই রয়ে গিয়েছিল। সুতরাং কোনো ভাবে তাদের এই বর্বরতা ও হিং¯্রতা থেকে বের করে আনা গেলে তাদেরকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করাটা খুব বেশ সহজ ছিল। তৎকালীন খ্রিষ্টধর্ম প্রচারকেরা এই কাজটি সফলভাবে করতে পেরেছিলেন।

খ্রিষ্টীয় যুগের দশম শতক পর্যন্ত চার্চ ও রাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের মধ্যে কোনো বিরোধকারী ছিল না। তারা ইউরোপকে কলুষিত, হীন চরিত্র ও কলঙ্কিত করেছিল। চার্চের বাইরে চিন্তাবিদ বা শিক্ষিত লোক না থাকার কারণে কেউ চার্চের সাথে প্রতিযোগিতাও করতে পারে নি। চার্চ একাই চিন্তা করতো, কথা বলতো ও লিখতো, একাই মানুষকে শেখাতো। যদিও তখন পৃথিবীর বুকে বুকে কিছু বক ধার্মিক জন্ম নিয়েছিল, কিন্তু এই বক ধার্মিকেরা কেবল এই মতবাদের ধর্মতত্ত্বীয় বা ব্যবহারিক অগ্রগতিতে আক্রমণ করতো। আর কোথাও তারা কিছু করতে পারে নি। তারা ঈশ্বর, পবিত্র আত্মা ও বিশ্বের ¯্রষ্টায় বিশ্বাস এবং আত্মার অশরীরীত্বে বিশ্বাস- এই বিষয়গুলোকেও আক্রমণ করে নি। ফলে বিশ্বাস জিনিসটি পরবর্তীতে ইউরোপের পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের আদর্শ বিশ্বাসে পরিণত হয়ে যায়। এটি সকল প্রতিষ্ঠান, সকল শ্রেণীর ব্যক্তিগত ও জনজীবনে প্রবেশ করে নিজের আসল মূর্তি ধারণ করে।

অবাক হওয়ার বিষয় এই যে, এই বিশ্বাস আজো টিকে আছে। মাজ্জিনি, মিশেলেট, কুইনেট সহ অনেকে এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে এই সুদীর্ঘ সময়ে ধর্মের উপর যে কেউ আঘাত হানে নি বিষয়টা এরকম ছিল না। ধর্মের উপর প্রথম আঘাতটি করে দুটি জিনিস। একটি ছিল রেঁনেসা এবং আরেকটি মুক্তমনা মানুষেরা। পঞ্চদশ শতকে ভানিনি, লিওর্দানো ব্রুনো এবং গ্যালিলিওর মতো বীর শহীদেরা ধর্মের উপর আঘাত হেনেছিলেন। যদিও সংস্কারের নামে গন্ডগোল, দাঙ্গা ও আবেগের কারনে তাদের সেই আত্মত্যাগ চাপা পড়ে গিয়েছিল, তবুও রেঁনেসা তখন নীরবে সকলের অলক্ষ্যে তার কাজটি করে যাচ্ছিল। একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অযৌক্তিকতাকে ধ্বংস করার জন্য মানবতার মুক্তির মহান দায়িত্বটি প্রতিটি প্রজন্মের মহতী মানুষদের হাতে অর্পণ করেছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে এই রেঁনেসা আবারও হাজির হয়। তবে এবার তার বলিষ্ট হাতে ছিল নাস্তিকতা ও বস্তুবাদের পতাকা।

মানুষের মন তখন সকল পবিত্র বিভ্রান্তির থেকে মুক্তি পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল। কিন্তু শেষমেষ তা আর সম্ভব হলো না। খ্রিষ্ট ধর্ম আর পবিত্র মিথ্যাচার তখন আরেকবার দৃশ্যপটে এসে হাজির হয়। এবার তাদের হাতে না আছে কৃষ্ঞাঙ্গ উপজাতি, না আছে চার্চের কাছে পবিত্র হওয়া ডাকাত ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট যাজকদের। ফলে অপেশাদার যাজক, মিথ্যাবাদীদের নিকট খ্রিষ্টধর্ম ছড়ানোর দায়িত্ব আসে। এসময় এ ধর্মপ্রচারের মূলনীতি প্রণয়নে দুজন ভয়ংকর মানুষের অবদান ছিল। এদের মধ্যে একজন আঠারো শতকের সবচেয়ে বড় মিথ্যুক জাঁ জ্যাক রুশো এবং আরেকজন স্বৈরাচারী মতবাদের প্রবক্তা রোবেসপিয়ের।

রুশো ছিলেন সংকীর্ণতা ও সন্দেহ প্রবণতার জলন্ত উদাহরণ। তিনি অন্যদের চেয়ে কেবল নিজেরই উচ্চাকাংখা নিয়ে সচেতন থাকতেন। ভন্ডামিতে কখনো ভাবালু ও কখনো নির্মম। সর্বোপরি তিনি আধুনিক ভাববাদের প্রচারক ছিলেন। তাকে আধুনিক প্রতিক্রিয়ায় প্রকৃত ¯্রষ্টা হিসেবেও দেখা হয়। আঠারো শতকের সবচেয়ে গণতন্ত্রমনা এই লোকটি সর্বত্র তার নির্লজ্জ কূটনৈতিক স্বৈরতন্ত্রের বীজ ছড়িয়ে গিয়েছিলো। এরপর তার যোগ্য ও বিশ্বস্ত শিষ্য হিসেবে রোবেসপিয়ের তার প্রচারিত মতবাদের সর্বোচ্চ যাজক হবার চেষ্টা করেছিলেন। “যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকে, তাকে আবিষ্কার করো”- ভলতেয়ারের বাণিটি শুনে রুশো একেশ্বরবাদীদের জন্য একজন মহান, বিমূর্ত ও বন্ধ্যা ঈশ্বর আবিষ্কার করেছিলেন। এই অদ্বিতীয় ঈশ্বরের নামে তার অদ্বিতীয় সত্ত্বা ও কুটিল ধর্মের জন্য রোবেসপিয়ের অনেক কুকর্ম করেছিলেন। তিনি গিলোটিনে হেবার্টিস্টদের শিরোশ্চেদ করেছিলেন। এরপর শিরশ্চেদ করেন ফরাসি বিপ্লবের সবচেয়ে বড় মেধা দান্তনকে। দান্তনকে হত্যার মধ্য দিয়ে রোবেসপিয়ের তখন গণতন্ত্রকেও হত্যা করেছিলেন। এভাবেই মূলত প্রথম বোনাপার্টের একনায়কত্বের বিজয়ের পথ সুগম হয়েছিলো। এই বিশাল বিজয়ের পরে ভাববাদী প্রতিক্রিয়াশীলদের কাজের সুযোগ অনেক বেড়ে যায় । ফ্রান্সের শ্যাতুব্রিয়াঁ, ল্যামার্ত, এমনকি ভিক্টর হুগোও এই ভাববাদী প্রতিক্রিয়াশীলদের দলে ছিলেন। এদের সামনে রেখেই দুঃখভারাক্রান্ত আবেগী দরিদ্ররা জার্মানিতে স্থাপন করেছিল একটি আধুনিক রোমান্টিক স্কুল। এই স্কুলের সৃষ্টি হওয়া সাহিত্যগুলো ছিল উদ্ভট ধরনের। প্রকাশ্য দিবালোকে এর কোনো জায়গা ছিলো না। গোধূলিই ছিলো এ সাহিত্যের উপযুক্ত স্থান। জনগণের সাথে ন্যূনতম যোগাযোগও ছিলো না এর। এটি ছিল আবেগ প্রবণ, অভিজাত, অসাধারণ আত্মা  এবং স্বর্গলোভীদের সাহিত্য। যেন কেবল এদেরই পৃথিবীতে বাঁচার কথা! দৈনন্দিন জীবনের প্রশ্ন ও রাজনীতিকে এরা ভয়ে এড়িয়ে যেত। যখনই কেউ এদের দিকে আঙুল তুলতো তখন এরা মুক্তমনাদের বিপক্ষে অন্যদিকে চার্চের পক্ষে সুর তুলতো। জনগণের বদলে রাজার পক্ষ নিতো এবং আমজনতার বিরুদ্ধে অভিজাতদের সাফাই গাইতো। এই স্কুলের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল রোমান্টিকতা। রাজনীতি সম্পর্কে এদের জ্ঞান ছিল একেবারে অসম্পূর্ণ।

রেঁনেসা ও বিপ্লব চলাকালীন সংস্কারের সময় থেকে বুর্জোয়ারাই ছিল ইতিহাসের বিপ্লবী প্রতিভার নায়ক ও দূত। জার্মানিতে না হলেও ইতালি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও হল্যান্ডে বিষয়টি এরকমই ছিল। উদাহরণস্বরূপ, পঞ্চদশ শতকের মুক্তচিন্তক, পরপর দুই শতাব্দীর ধর্মীয় সংস্কারক, মানবতার মুক্তির অগ্রদূত, এমনকি তৎকালীন জার্মান বিপ্লবীদের কথাও বলা যায়। এদের সবাই-ই বুর্জোয়া শ্রেণীভুক্ত ছিল। ১৭৮৯ ও ১৭৯৩ এর বিপ্লব দুটি এরকমই ছিল। এই বিপ্লব দুটির বিপ্লবীরাও বুর্জোয়া ছিল। তবে জনগণের শক্তিশালী অংশই ছিল এই বিপ্লবীদের সমর্থক। এই বিপ্লবীদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে তারা রাজতন্ত্র ও চার্চতন্ত্রের পতন সক্ষম হবেই। তারা তখন জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলার এবং মানুষের অধিকার আদায়ের আহ্বান জানায়। এগুলোই ছিলো তাদের বিপ্লবের মূল্যবান কীর্তি!

কিন্তু তাড়াতাড়িই তাদের এ কীর্তি বিভক্ত হয়ে যায়। জাতীয় সম্পদের ক্রেতাদের একটি বড় অংশ তখন বিত্তশালী হতে থাকে এবং প্রলেতারিয়েতদের প্রতি পৃষ্টপোষকতা বন্ধ করে দেয়। অপরদিকে ফ্রান্সের কৃষকদের যারা ততদিনে জমির মালিকানা পেয়ে গেছে তারা তখন সরকারি কাঠামোর পুণঃপ্রতিষ্ঠা ও শক্তিশালী স্বাভাবিক সরকার ব্যবস্থা স্থাপন করার দাবি জানাতে থাকে।

প্রথম বোনাপার্টের একনায়কতন্ত্র কৃষকদের এই দাবির প্রতি সাধুবাদ জানায়। ভলতেয়ারের অনুসারী হয়েও বোনাপার্ট তখন পোপের সাথে চুক্তি করেন এবং সরকারের সাথে ফ্রান্সের দাপ্তরিক চার্চতন্ত্র পুণঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি বাণী দিলেন- “জনগণের জন্য ধর্ম খুব দরকার।” তার মানে, নিজেদের তৃপ্ত করে বুর্জোয়াদের এই অংশটি তাদের পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন বুঝত পারলো এবং সদ্যপ্রাপ্ত ভূসম্পত্তি সংরক্ষণের চেষ্টা করলো যাতে স্বর্গীয় প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে জনগণের অতৃপ্ত শুধাকে নিবৃত্ত করা যায়। এরপরই আগমণ ঘটলো আরেক প্রচারকের, শ্যাতুব্রিআঁ।

ধীরে ধীরে প্রথম বোনাপার্টের পতন হয় এবং সংস্কারের মাধ্যমে ফ্রান্সে বৈধ রাজতন্ত্র ফিরে আসে। এর পেছনে ছিল চার্চ ও নানা মহান ব্যক্তিদের শক্তি। এ ঘটনাটি বুর্জোয়াদের আবারো বিপ্লবের রাস্তায় নিক্ষেপ করলো। পুণঃজাগরণ হয় সংশয়বাদ ও বিপ্লবী চেতনার। বিপ্লব এবার শ্যাতুব্রিআঁকে ফেলে ভলতেয়ারকে অনুসরণ করা শুরু করলো। এসময় দিদেরুর মতবাদও বেশি দূর অগ্রসর হতে পারে নি। এর নিস্তেজ ¯œায়ু এত আদর যতœ সহ্য করতে পারে নি। অন্যদিকে ভলতেয়ার, একই সাথে মুক্তচিন্তক ও যৌক্তিক একেশ্বরবাদী হয়েও এর সাথে মানিয়ে নিলেন। বেরাঙ্গার ও পি এল কুরিয়ার এসম্পর্কে যথার্থই বলেছেন- “ভাল মানুষের ঈশ্বর ও আদর্শ বুর্জোয়া রাজা।”

১৮৩০ সালের জুলাইয়ের বিপ্লব বুর্জোয়াদের স্বাদে কিছুটা পরিবর্তন নিয়ে আসে। আমরা জানি, এর আগে প্রতিটি ফরাসি বুর্জোয়া তাদের মধ্যে ভদ্রতার অবিনশ্বরতা বহন করতো, যা কেবল ভুইফোঁড় সম্পদশালী ও শক্তিমান লোকদের মধ্যে থাকত। ১৮৩০ সালের পর সম্পদশালী বুর্জোয়ারা শক্তিমত্তার আসনগুলোতে এ পুরনো মহত্ত্বকে বিসর্জন দেয়। স্বাভাবিকভাবেই তখন একটি নতুন অভিজাত তন্ত্রের উদ্ভব হয়। প্রথমত এটি ছিল পুঁজির অভিজাততন্ত্র। সেই সাথে বুদ্ধিজীবী, শিষ্টাচার ও আবেগেরও অভিজাততন্ত্র বটে। এটি ধর্মের স্বাদকে পুণরায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

এই পরিবর্তনটি কেবল অভিজাত প্রথার অন্ধ অনুকরণেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। এটি নিজের প্রয়োজনের তাগিদেই তৈরি হয়েছিল। প্রলেতারিয়েতরা মহৎ লোকদের (!) ভূপাতিত করার জন্য এ পরিবর্তনকে মেনে নিলো। প্রলেতারিয়েতদের তখন বুর্জোয়াদের আর কোনো সহায়তার প্রয়োজন থাকলো না। ফলে জনসাধারণ তখন বুর্জোয়াদের জন্য অসুবিধাজনক হতে শুরু করলো। এই পরিস্থিতি সামলানোর জন্য তখন অভিজাততন্ত্রকে পুণঃপ্রেরণ করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু জনগণের মধ্যে ঘৃণামিশ্রিত ক্রোধ জাগিয়ে তোলা ছাড়া এটি করা সম্ভব ছিলো না। এই ঘৃণামিশ্রিত ক্রোধ তাহলে কীসের নামে হবে? বুর্জোয়াদের স্বীকৃত স্বার্থের নামে? কিন্তু এটা বিদ্রুপমূলক হয়ে যেত। তখন তারা ধর্মকে বেছে নেয়। সর্বকালের সেরা বুর্জোয়া বিজয়ীরা দেখলো যে, ধর্মই হলো মানুষের একমাত্র অপরিহার্য অংশ।

ধর্মীয়, দার্শনিক এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার গর্বময় মুকুট পরার পরে আন্দোলন এবং বিপ্লবকে পরাজিত করে এই অভিজাত বুর্জোয়ারাই একাধারে প্রভাবশালী, রাষ্ট্রের রক্ষক ও প্রহরী হয়ে উঠলো। একচেটিয়া শক্তি প্রদর্শনের জন্য তাদের হাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তো ছিলই। এভাবেই রাষ্ট্রের দ্বারা তখন জনগণের ক্ষমতাকে সীমিত করে রাখা হয়েছিল।

রাষ্ট্রের হাতে তখন জনগণকে প্রভবিত করার দুটি প্রক্রিয়া ছিল। প্রথমটি বাস্তব ও মেনে নেয়া কঠিন- কারণ এটি রাষ্ট্রকে বাতিল করে দেয়। অন্যকথায়, বললে সংখ্যালঘুদের দ্বারা সংখ্যাগুরুদের প্রতিষ্টিতি রাজনৈতিক শোষণকে এটি বাতিল করে দেয়। এজন্য ধর্মই তখন একমাত্র রাস্তা হিসেবে খোলা থাকে। এটি হলো এক ধরনের চিরন্তন মরীচিকা; যা জনগণকে পবিত্র গুপ্তধনের সন্ধানে ব্যস্ত রাখে।

ফরাসি স্বাধীনচেতা ও ভলতেয়ারপন্থী বুর্জোয়ারা সংকীর্ণ ও নৃশংস দৃষ্টবাদী মেজাজের ছিল। ১৮৩০ সালের বিজয়ের পর তারা শাসকশ্রেণীতে পরিণত হয়। নির্ধারিতভাবেই তারা দাপ্তরিক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করে। কাজটি খুব সহজ ছিলো না। একদিকে তারা রোমান ক্যাথলিকবাদের ছায়াতলে আর ফিরে যেতে পারছিল না, অন্যদিকে বুর্জোয়া ও রোমান চার্চের মাঝে ছিলো অতল ঘৃণা ও রক্তপাত। শেষ পর্যন্ত ক্যাথলিকবাদে পুণর্গমণ তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

এক্ষেত্রে প্রোটেস্ট্যান্টবাদ অনেক সুবিধাজনক ছিল। এটি তখন শ্রেষ্ট বুর্জোয়া ধর্ম হয়ে ওঠে। বুর্জোয়াদের কাছে এটি যথেষ্ট সুবিধাজনক ছিলো, কারণ এটি স্বর্গীয় আকাঙ্খার সাথে পার্থিব চাহিদা ও পরিস্থিতি সম্মিলন ঘটিয়েছিল। এভাবেই ধীরে ধীরে প্রোটেস্ট্যান্ট দেশগুলোতে শিল্প ও বাণিজ্য উন্নত হতে লাগলো। কিন্তু ফরাসি বুর্জোয়াদের পক্ষে প্রোটেস্ট্যান্ট হওয়া সম্ভব ছিল না। ফরাসি বুর্জোয়াদের একচ্ছত্র দৃষ্টবাদী মনে বিশ্বাস বলে কোনো বস্তু ছিল না। তারা মুক্ত কণ্ঠে তাদের অনাসক্তি প্রকাশ করতো। তাদের কাছে প্রোটেস্ট্যান্ট বা ক্যাথলিকবাদ অভিন্ন ছিল। তাছাড়া ফরাসি জনগণের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে ক্যাথলিক ধর্ম ত্যাগ করে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়াটাও তাদের জন্য একটা অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছিল।

দ্বিতীয় উপায়টি ছিল আঠারো শতকের মানবতাবাদী ও বিপ্লবী ধর্মে ফিরে যাওয়া। কিন্তু সেটির মেয়াদ ততদিনে শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই বুর্জোয়াদের হাতে রাষ্ট্র গঠনের একটিমাত্র পথই খোলা ছিল- নতুন একটি ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা! যেখানে হাস্যকর ও কলঙ্কজনক অধ্যায়গুলো থাকবে না এবং সবকিছুই তাদের কথামতো চলবে। এরই ধারাবাহিকতায় জন্ম হয় যৌক্তিক একেশ্বরবাদের।

এই যৌক্তিক একেশ্বরবাদের জন্ম ও অগ্রগতি তৎকালীন ফরাসি তরুণ বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক শিক্ষার উপর চূড়ান্ত ও মারাত্মক প্রভাব পড়েছিল। এই মতবাদের প্রকৃত প্রবর্তক ছিলেন রয়্যার কোলার্ড। গুইজোট, কাজিন, ভিলেমাইন সহ অনেকেই এর প্রচারের সাথে যুক্ত ছিলেন। সর্বোপরি বেনজামিন কনস্ট্যান্ট থেকে মাদাম ডি স্টলের সময় পর্যন্ত এর দারুণ প্রভাব ছিল। এই মতবাদের স্বীকৃত উদ্দেশ্য ছিল প্রতিক্রিয়ার সাথে বিপ্লবের মিলন সাধন করা। এই উদ্দেশ্য নিয়ে এই মতবাদের প্রচারকেরা তাদের স্বাধীনতা ও কর্তৃত্বকে ব্যবহার নানান সুবিধা আদায় করেছিল। বিপ্লবের সাথে প্রতিক্রিয়াকে মেলাতে গিয়ে তারা সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা হরণ করেছিল। দার্শনিকভাবে বিশ্বাসের চিরন্তন নীতিকে মুক্তভাবে উপস্থাপন করেছিল।

এই দর্শনের অন্যতম প্রচারক এম. কাজিন একজন অগভীর নীতিবাগিশ বক্তা ছিলেন। প্রকৃত ধারণা গ্রহণে তিনি পুরোপুরি অক্ষম ছিলেন। এমনকি নতুন কোনো ধারণাও মেনে নিতে পারতেন না। এগুলোর তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই ছিল বলা যায়। এই প্রসিদ্ধ দার্শনিক ফরাসি পড়–য়া তরুণদের জন্য এমন একটি খাদ্য তৈরি করলেন যা পরবর্তীতে বাধ্যতামূলকভাবে ফ্রান্সের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গেলানো হয়। চার্চের ফাদার, বিদ্যান দার্শনিক দেকার্ত, প্যাস্কেল, কান্ট এবং স্কটিশ মনোবিজ্ঞানীদের সাথে প্লেটো এবং হেগেলীয় সর্বেশ্বরবাদের মত, পবিত্র ও সহজাত ধারার মিশ্রণ সব মিলে তিনি এক ধরনের জগাখিচুরি তৈরি করেছিলেন। এভাবেই যৌক্তিক একেশ্বরবাদীরা ঈশ্বরের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছিলেন! এটি “দুইয়ে দুইয়ে পাঁচ” এর মত মুর্খ তত্ত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়।