ভূমিকাঃ অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিজমঃ তত্ত্ব ও অনুশীলন

Rudolph Rocker

রুডলফ রকারের

ভূমিকাঃ অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিজমঃ তত্ত্ব ও অনুশীলন

প্রসঙ্গ কথাঃ নোয়াম চমস্কি

রুডলফ রকারের অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিজম বইয়ের প্রকাশনার সূদির্ঘ কাল পর যখন স্বাধীনতা ও ন্যায় বিচারের সংকট চলছে তখন এই বিষয়ে কথা বলা অনেক  গুরত্ববহ। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের পর থেকে রকারে প্রকাশিত বই  পুস্তকের সাথে পরিচিত হই, সেটা ছিলো প্রথমে নিউইয়র্ক শহরের এনার্কিস্ট বইয়ের দোকানে, এর কয়েক বছর পরে বিশ্ব বিদ্যালয়ের ধুলি মলিন বইয়ের তাকে পাই অপরিচিত ও অপঠিত অবস্থায় পড়ে থাকা বইয়ের স্তূপে। তার বই গুলো পড়ে সত্যি খুব আলোরিত হই, যা আমাকে কয়েক দশক পিছনে নিয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি রকার একটি সুন্দর ও শান্তিময় দুনিয়ার কথা বলেছেন, যা অর্জন করা আমাদের জন্য কঠিন নয়, তা আমাদের আয়ত্তের মধ্যই আছে। ‘বিশ্ব যে দুর্যোগের’ দিকে ‘ পাল তুলা নৌকার মত দ্রুত’ এগিয়ে যাচ্ছে তা তিনি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের সূচনাতেই দেখতে পেয়েছিলেন। যে দুর্যোগ সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়ন্ত্রন করা  সাধারন মানুষের সাধ্যের বাইরে, রাস্ট্র সমূহ যে ক্ষমতা অর্জন করেছে- তা মানব সমাজকে বিলয় ঘটিয়ে দিতে সক্ষম, প্রচলিত বিধি বিধানের ব্যাতিক্রম হলেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। রকার প্রচলিত রাজনৈতিক ও সামাজিক বিধি বিধানের বিপরীতে নিজের অবস্থান ব্যাক্ত করেছিলেন।  তিনি প্রচলিত প্রবণতা সমূহকে সাহসীকতার সাথে ব্যাখ্যা করেছেন, যে সকল প্রবনতা মানুষের আত্মনির্ভরশীল মানসিকতাকে বিনাশ করে দেয়। মাইকেল বাকুনিনের ভাষ্য মতে, ‘ নয়া সমাজের জীবন্ত জীবাণু সৃজন’ করে, মানুষের ভ্রমাত্মক চিন্তার অপসারণ করা দরকার, যারা ভাবেন মানুষের মুক্তির পথ আসে উপর থেকে – তাঁদের নিজস্ব সৃজনশীল কর্ম বা একাগ্রতা থেকে নয়। প্রচলিত প্রভাবশালী চিন্তাধারার আলোকে বোধগম্য করে জনগণের জন্য লক্ষ্য স্থির করা দরকার। এখন বলতেই হবে যে, তথাকতিথ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গুলো মনুষ্য বসবাসের উপযোগী নয় বা মার্কসবাদি-লেনিনবাদি আন্দোলন গুলো ও মুক্তির পথ নয়। শিল্প ভিত্তিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভিজাত শ্রেনীর মাঝেও একেই রকমের চিন্তাধারা গেঁড়ে বসেছে, তাঁদের নিজস্ব রাজনীতি যাই হউক কেন, তাঁরা এখন তা স্পস্টভাবেই জনসমক্ষে প্রকাশ করে যাচ্ছেন। জনগনের জন্য যেখানেই যে কোন সিদ্বান্ত গ্রহন করা হোক না কেন, তা তাঁরা সংশোধনের ও ব্যবস্থা রাখে, নিজেদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ও এরা সরাসরি না এসে ভিন্ন ভাবে হাজির হয়। রকার জোয়ান ভ্রাভো মেরিলো র কথা উল্লেখ করে বলেন, সকল কথা বার্তা বুঝা না গেলেও (পৃ-১১৮) এটা পরিস্কার যে অভিজাত শ্রেনীর স্বার্থ ও চিন্তা ভাবনাই সকল ক্ষেত্রে ধারন করা হয়। রকারের স্পস্ট কথা সাধারন মানুষ নিজেই নিজের জীবনের দায়িত্ব নিবে, তাঁদের কাজ তারাই করবেন, এবং তাঁদের হাতেই তাঁরা সকল কর্ম সম্পাদনের জন্য প্রস্তুত থাকবেন। তাঁদের নিজেদের  মুক্তির লড়াই সংগ্রামে ও তাঁরা সাধারন জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহনে সাফল্য অর্জন করবেন। অধীনস্থদেরকে আনুগত্যের মধ্যে রাখার জন্য প্রতিস্টানিক ভাবে দমন ও নিপিড়নের পথ বেচে নেয়া হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই মানুষ মানবিক নৈতিক মান অধিকতর উন্নত করবে, ‘ অধিকার আদায়ের একটি নয়াপথ,’ তাঁদের শক্তি সামর্থ নিয়ে নয়া চেতনার বিকাশ ঘটাবে। তাঁদের সময়ের সামাজিক ঘটনা প্রবাহ তাঁরা বুঝে নিবেন’, তাঁদের নিজস্ব ক্ষমতা  ও গুরুত্ব উপলব্দি করে কাজ করবেন। এই ধরনের সরাসরি সামাজিক পরিবর্তনের কাজে অংশগ্রহণ হবে তাঁদের ‘হ্রদয়ের গভীরতম’ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। রকার শ্রমজীবী মানুষের লড়াই সংগ্রামের ধারনাকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন করে এবং তাঁদের অর্জন সমূহকে আলোকিত করে প্রকাশ করেছেন। তাঁর কর্মের ধারা একেবারেই ‘কল্পনা বিলাশী’ নয়; বা রূপকল্প ও নয়, বরং বাস্তব সম্মত কার্যক্রম, তিনি অতীতের সকল বিষয়াবলী বিশ্লেষণ করে ব্যার্থতা ও সাফল্য সকলের সামনে হাজির করেছেন । অন্যান্য সাহসী নিরাজবাদিদের মত, রকার ও ‘ সকল নিরঙ্কুশ ধারনা ও প্রকল্পকে বাতিল করে দিয়েছেন’ এবং দৃঢ় মন্তব্যে বলেছেন, ‘আমরা মানবজাতির উন্নয়নের কোন চূড়ান্ত লক্ষ্য স্থির করতে চাই না’। তবে একটা ধারনা দিতে পারি যে, ‘ তা হবে সিমাহীন শান্তি, সামাজিক সংহতি এবং চমৎকার বসবাস যোগ্য পরিবেশ, যা ক্রমশ ধাপে ধাপে উচ্চতর স্থরে উন্নিত হবে, যার ভিত্তি হবে নয়া ধরনের পারস্পরিক বুঝা পড়া, ও নয়া উপলব্দি’। ইতিহাস আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, আমরা প্রায়স আমাদের উপর শোষণের বিষয়ে নির্লিপ্ত থেকে যাই, আমরা নিপিড়নের শিকার হয়ে ও কোন কোন সময় নিপিড়কদের সাথে বুঝে না বুঝে গলা মিলিয়ে কথা বলে ফেলি বা তাঁদের হয়েই কাজ করে যাই। রকার তাঁর আপন বিশ্বাস ও উপলব্দি থেকে বলেছেন, সাধারন মানুষের নিজস্ব ক্ষমতা ভিত্তির উপর নির্ভর করে একটি নয়া বিশ্ব গড়ে তুলা এখন সময়ের দাবী। তাঁদের অংশগ্রহনে সাংস্কৃতি ও স্বাধীনতাকে উন্নততর করা দরকার। তাঁদের সরাসরি অংশগ্রহনে, সামাজিক চুক্তি, ন্যায় বিচার, সংহতি সমৃদ্ব হতে পারে। এই পুস্তকটি প্রায় অর্ধশতাব্দি আগে লিখা হলে ও এর গুরুত্ব আজো অক্ষুণ্ণ রয়েছে। নয়া দুনিয়া গড়ার ক্ষেত্রে আমাদের চিন্তাধারাকে শানিত করতে ও গঠন মূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে ব্যাপক ভূমিকা বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

রুডলফ রকারের

অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিজমঃ তত্ত্ব ও অনুশীলন

ভূমিকাঃ নিকুলাস ওয়াল্টার

রুডলফ রকার (১৮৭৩-১৯৫৮) জার্মানীর রাইনল্যান্ডের মাইনজ শহরে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি যে পরিবারে জন্ম গ্রহন গ্রহন করেন সেটা ছিলো একটি ক্যাথলিক উদারপন্থী ও দক্ষশ্রমিক পরিবার । অল্প বয়সেই তিনি মা বাবা হারিয়ে এতিম হয়ে পড়েন, ফলে তাকে একটি এতিম খানায় প্রেরন করা হয়। তিনি বই বাঁধাইকারী শিক্ষানবিস হিসাবে জীবন শুরু করেন,তখন  ব্যবসায়ীক কারনে নানা স্থানে তিনি ভ্রমন করেন।

রকার তরুন বয়সে একজন সমাজতন্ত্রী ছিলেন, তিনি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে যোগদান করেন; কিন্তু তিনি বাম বিরুধীদের প্রতি আকৃষ্ট হন। ফলে তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হয় ১৮৯০ সালে। এর পর পর ই তিনি এনার্কিজম বা নিরাজবাদের সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। তিনি পশ্চিম ইউরূপের বহু এলাকা পরিদর্শন করেন, সেই পরিদর্শন বা ভ্রমনের উদ্দেশ্য ছিলো ব্যবসা ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড।

রকার ১৮৯১ সালে ব্রাসেলসে অনুস্টিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে পর্যবেক্ষক হিসাবে যোগদেন এবং ১৮৯২ সাল থেকেই এনার্কিস্ট প্রেসে কাজ করতে শুরু করে দেন, সেই কারনে পুলিশের যন্ত্রনায় সেই বছরই তিনি জার্মানী ত্যাগ করেন। তিনি কয়েক বছর প্যারিসে বসবাস করেন, পরে ১৮৯৫ সালে তিনি স্থায়ীভাবে ব্রিটেনে বসবাস শুরু করেন। রকার একজন ভিন্ন জাতীয়তার মানুষ হলে ও তিনি ইহুদি এনার্কিস্ট আদোলনে জড়িত হয়ে পড়েন। তিনি ইহুদি ভাষা শিখেন, এবং ইহুদি সমাজে তিনি বসবাস করতে থাকেন, এবং সারাজীবন মিলি ওইকপ (১৮৭৭-১৯৫৩) এর সহযোদ্বা হিসাবে লড়াই সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। তিনি খুব দ্রুত একজন ভালো বক্তা ও রাজনৈতিক লিখক হিসাবে গড়ে উঠেন, ফলে পরবর্তী প্রায় ২০ বছর তিনি সেই আন্দোলনে অত্যন্ত সম্মানী ও জনপ্রিয় ব্যাক্তি হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন।

১৮৯৮ সালে কয়েক মাস তিনি লিভারপুলে একটি সাপ্তাহিক  ইদিশ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পত্রিকাটির নাম ছিলো ডাস ফ্রেই ভর্ট বা মুক্ত দুনিয়া। এর পর তিনি সম্পাদনা করেন ডার আরবিটর ফ্রেইন বা শ্রমিকদের বন্দ্বু নামের একটি পত্রিকা । এটা ছিলো লন্ডনের একটি সাপ্তাহিক, এবং পরে ১৯০০ সালে জার্মানীর একটি এবং  আরো একটি ইদিশ মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন।  ইহুদিদের এনার্কিস্ট আন্দোলন স্থানীয় ব্রিটিশ আন্দোলনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিলো।  ১৯০২ সালে ইহুদি ফেডারেশন গঠন করা হয়, পত্রিকার গ্রহক সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যায় এবং অন্যান্য প্রকাশনার পরিমান ও বৃদ্বি পায়। এবং ১৯০৬ সালে ইস্ট লন্ডনের জুবেলী রোডে একটি সামাজিক যোগাযোগ অফিস খোলা হয়।

১৯০৭ সালে যখন অ্যামস্টারডামে আন্তর্জাতিক কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় সেই সময় রকার একজন প্রভাবশালী চিন্তক ব্যাক্তি হিসাবে পরিচিত হন। সেই সময়ে থেকেই তিনি মূলত আন্তর্জাতিক এনার্কিস্ট ফোরামের সদস্য হয়ে উঠেন। ইহুদি এনার্কিস্টগন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, এবং তাঁদের জন্য এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের তত্ত্ব ও প্রয়োগ নিয়ে লিখেন। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্ব যুদ্বের সময় রকার উভয় পক্ষের বিরুধিতা করেন এবং এই অপরাধে তাকে একজন বিদেশি শত্রু হিসাবে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এর পর আরবার্টার  পত্রিকাটি বন্দ্ব করে দেয় এবং জুবেলী রোডের অফিসে থালা ঝুলিয়ে দেয় শাসক চক্র।

সেই পরিস্থিতির সামাগ্রিক আন্দোলনের কর্ম কান্ডে নেতিবচক প্রভাব পড়ে ফলে ব্রিটেনে আর আগের মত এনার্কিস্ট আন্দোলন বা সাম্যবাদি দল গড়ে উঠতে পারে নাই। ১৯১৮ সালে রকারকে ব্রিটেন থেকে নেদারল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়া হয়, পরে তিনি নিজের মাতৃভূমি জার্মানীতে ফিরে যান। তিনি জার্মানীতে ও একজন উজ্জল ব্যাক্তি হিসাবে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। তিনি ফ্রাই ভেরিনিং ডয়েচেস্টার জিওয়ারক্সস্কটন (জার্মান ট্রেড ইউনিয়নের ফ্রি এসোসিয়েশন) এবং তারপর ফ্রাই আর্বিইটার-ইউনিয়ন ড্যুসিয়ামস (ফ্রি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন অব জার্মানি) এবং তার পত্রিকার সম্পাদক ডের সিন্ডিক্যালিস্টের একজন সক্রিয় প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ১৯২২ সালে বার্লিনে আন্তর্জাতিক কংগ্রেসের সক্রিয় উদ্যোগী ব্যাক্তি ছিলেন যার ফলে আন্তর্জাতিক ওয়ার্কিং মেনস অ্যাসোসিয়েশন গঠনের সূত্রপাত হয় এবং তিনি এটার সচিবদের একজন হিসেবে কাজ করেন।

তিনি ১৯২৬ সালের পর বলশেভিক বিপ্লবের পক্ষে এনার্কিস্টদের  সমর্থনের বিরোধিতা করেছিলেন রকার বা ১৯২৬ সালের পর পিটার অশিনভের সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্ম (যা এনার্কিস্ট আন্দোলনকে একটি ভার্চুয়াল রাজনৈতিক দল হিসেবে পুনর্বিন্যস্ত করার পক্ষে সহায়তা করেছিলেন) এবং তিনি  উদীয়মান নাজি আন্দোলনের স্বাধীনতার ও বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৩৩ সালে রকার পুনরায় জার্মানী ত্যাগ করতে বাধ্য হন, তখন নাজি সরকার তাঁর বিচার করতে চেয়েছিলো। তিনি পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী ভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। অবশ্য এর আগে ও তিনি লিখক এবং বক্তা হিসাবে সেখানে বহুবার গিয়েছিলেন। তিনি ফ্যাসিবাদ ও কমিউনিস্টদের দ্বন্দ্বের বিরুদ্বে ব্যাপক কাজ করেন । তিনি গত ২০ বছর ধরে নিউ ইয়র্কের ক্রোমপাঁডে মোহিগান সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে জীবন যাপন করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশটিতে তিনি একজন এনার্কিস্ট হিসাবে সুপরিচিত  ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের মিত্র জোটকে সমর্থন করেন, ফলে তাঁর কিছু পুরাতন কমরেডদের সাথে বিরোধ তৈরী হয়। কিন্তু এর পর ও ক্রপতকিন বা মালাতিস্তার চেয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা একটু ও কমেনি।

রকার একজন ভালো বক্তা হিসাবে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন, তিনি জার্মান ও ইদ্দিশ ভাষায় সমপারদর্শী ছিলেন, তিনি সেই ভাষায় প্রচুর প্রবন্দ্ব, পুস্তিকা ও গ্রন্থ রচনা করেন- বিশেষ করে মুক্তিপরায়ন উদারতাবাদি গবেষণা জাতীয়তাবাদি ও সাংস্কৃতি বিষয়ে, এবং নিরাজবাদি দার্শনিক জোহান মস্ট এবং ম্যাক্স ন্যাটালু্র এবং একিটি দির্ঘ আত্মজীবনী  রচনা করে গেছেন। তাঁর প্রচুর লিখা স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ হয়েছে এবং স্পেন ও ল্যাতিন আমেরিকায় ব্যাপক ভাবে বিতরন করা হয়েছে। কিন্ত সেই তুলনায় ইংরেজীতে খুব কমই কাজ হয়েছে (বাংলায় একেবারেই হয় নাই- অনুবাদক)। অন্যদিকে আমেরিকায় তিনটি বই ও কিছু পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছে – খুবই উঁচু মানের গবেষণা গ্রন্থ জাতীয়তাবাদ এবং সাংস্কৃতি (১৯৩৭), কিছু সমালোচনা মূলক রচনা যাকে বলা হয় (১৯৩৮), এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার উপর জনপ্রিয় জড়িপ (১৯৪৯)। ব্রিটেনে আরো দুইটি বই প্রকাশিত হয়। যেমন- এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের উপর জনপ্রিয় জরিপ (১৯৩৮) এবং তাঁর আত্মজীবনীর লন্ডন অংশ (১৯৫৬)। আরো কিছু ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয়েছিলো কিন্তু পরে আর তা প্রকাশিত হয় নাই - প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তার পরিচয় পত্রের একটি বিবরণ, বিশেষত  ওয়াইন এবং বারের পিছনে নামক গ্রন্থ।

রকের লিখিত বই গুলোর মধ্যে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম বইটি পাঠক মহলে সব চেয়ে বেশী সমাদৃত হয়েছে। এই বইটি যে পটভূমিতে রচিত হয়েছিলো তা হলো স্পেনের গৃহ যুদ্ব, যা ১৯৩৬ সালে ছড়িয়ে পড়ে এবং এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের উন্মেষ ঘটায় এবং রাজনৈতিক মঞ্চে প্রথম বারের মত প্রথম বিশ্বযুদ্ব ও রাশিয়ার বিপ্লবের পর এটাই ছিলো মানুষের সামনে এক মাত্র আলোক বর্তিকা। ১৯৩৬ সালে ফ্রেডারিক ওয়ারবার্গ সেই সময়ে প্রকাশনার ব্যবসায়ে মার্টিন সিকার কে নিয়ে নয়া কোম্পানী গঠন করেন যার নামকরন করা হয় সিকার এন্ড ওয়ারবার্গ, এটা ছিলো তখন লন্ডনের একটি উল্লেখ যোগ্য প্রকাশনা প্রতিস্টান ।

এই প্রকাশনা প্রতিস্টানটির কর্তাগন সেই সময়ে ভাল ভাল পুস্তকের সন্দ্বানে ছিলেন, বিশেষ করে বিদেশী লিখকদের রাজনৈতিক বই। যে সকল বইয়ে মুক্ত স্বাধীন চিন্তার প্রতিফলন আছে – এই বিষয়ে তিনি তাঁর স্মৃতিকথা দ্বিতীয় খন্ডে প্রকাশ করেছেন। সকল লিখকই সমান (১৯৭৩) তিনি সংগ্রহ করেন সমাজতান্ত্রিক, এনার্কিস্ট, র‍্যাডিকেল, এবং  মুক্ত সমাজবাদি ও শান্তিবাদি লিখক নির্বিচারে তাঁদের লিখিত গ্রন্থমালা, যারা নিরাজবাদি প্রকাশনার বিশাল ভূমিকা পালন করেন ( এঁদের মধ্যে আছেন, জুমু কেনিয়াত্তা। ইতেল মানিন, জর্জ ওরেল, রেজিন্যাল্ড রেন্যাল্ডস এবং এফ, এ রেডলী প্রমুখ)। তিনি বিশেষ করে স্পেনের অভিজ্ঞতা তাঁর প্রথম খন্ডে বর্ননা করেন,তিনি লিখেন একজন ভদ্রলোকের পেশা (১৯৫৯), সেই সময়ে স্পেনের গৃহ যুদ্বের  ধামামা চলছিলো । কিন্তু সেখানকার  প্রচলিত বাল্য বিবাহ  প্রথমেই আমাকে মারাত্মক ভাবে পিড়িত করে, পরবর্তী তিন বছর আমি এই নীতির সমালোচনা করে লিখতে থাকি। রকার এই বিষয়ে অনেক বই লিখেন।( সেই লিখা গুলো জর্জ ওরোয়েলের বাড়ি থেকে কাতালুনিয়া পর্যন্ত নামে পরিচিত)।

স্পেনের সমাজের তখন একটি অন্যতম বিষয় উল্লেখ্য যে, সেই সময়ে বিপ্লবী নিরাজনাবাদিদের দ্বারা একটি শক্তিশালী আন্দোলন চলছিলো। ওয়ারবার্গ তাই নিজে যে আদর্শের প্রতি অনুপ্রানিত সেই আদর্শের উপর আলোকপাত করা বই প্রকাশ করতে সামগ্রীক ভাবে এগিয়ে আসেন । ১৯৩৭ সালের এপ্রিল মাসে – জাতীয়তাবাদি বিদ্রোহী ও ফালাঞ্জিস্টদের মধ্যে চলছিলো দ্বন্দ্ব অন্য দিকে সমাজতন্ত্রী ও মুক্তিপরায়ন সমাজবাদিদের মধ্যে ও  চলছিলো বিরুধ । কমিউনিস্ট কর্তত্ববাদি ও গনপ্রজাতন্ত্রীদের মধ্যেও  বিরোধের সীমা ছিলো না। সেই সময়ে ওয়ারবার্গ স্পেন ও সারা বিশ্বের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাজবাদের  উপর একটি পুস্তক  রচনা করার প্রস্তাব করেন । এই প্রস্তাবটি এমা গোল্ডম্যান (১৮৬৯-১৯৪০) এর নিকট প্রদান করা হয়, তিনি তখন ইউরূপে একজন বিখ্যাত নিরাজবাদি চিন্তক, তিনি তখন লন্ডনে থেকে স্পেনের এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টদের জন্য কাজ করছিলেন; তবে, সেই সময়ে তাঁর এই রকম একটি বই লিখার জন্য  পর্যাপ্ত সময় ছিলো না । তাই তিনি এমন একটি বিশাল কাজের জন্য একজন উপযুক্ত লোক খোজ করছিলেন । অথচ সেই সময়েই এমন একটি  বা তাঁর সমপর্যায়ের বই লিখিত হয়ে গেছে। সেই পুস্তকের জন্য এমা গোল্ডম্যানের সহকর্মী অ্যালেকজান্ডার বার্কম্যান(১৮৭০-১৯৩৬) একটি দির্ঘ ভূমিকা ও লিখে দেন। সেই বইটি ১৯২৯ সালে আমারিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। তখন পাশাপাশি আরো একটি পুস্তক  প্রকাশিত হয়েছিলো এনার্কিস্ট সাম্যবাদ কি ? নামে এবং অতীত ও বর্তমানঃ সাম্যবাদি নিরাজবাদের অ আ ক খ। এর পর ও এমা গোল্ডম্যান রুডলফ রকারকে আরো একটি  পূর্নাংগ বই লিখার জন্য বিশেষ ভাবে অনুরুধ করেন। এবং বলেনঃ

... সিন্ডিক্যালিজমের উপর ইংরেজী ভাষায় একটি উন্নত মানের বই লিখা খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে। এটা করতে পারলে খুবই উত্তম কাজ হবে । প্রকৃত ঘটনা হল প্রকাশক এমন একটি পুস্তক প্রনয়নের জন্য বিশেষ ভেবে অনুরুধ জানাচ্ছেন। তিনি মূলত পাঠক মহলের চাহিদার প্রেক্ষিতেই এই কথা বলছেন। সুপ্রিয় রুডলফ তোমার কাছে অনুরুধ দয়া করে এমন একটি বই লিখ।

তোমার উচিৎ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এমন একটি কাজ করা। এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম বিজ্ঞান; নয় এটা হলো গভীর দর্শন। বিপুল সংখ্যক মানুষের নিকট পৌছানোর জন্য এটা দরকার, যা একটি আলোক বর্তিকা হিসাবে কাজ করবে। আমি মনে করি, এখন তুমি ছাড়া এই কাজ আর কেউ করতে পারবেন না । আমি আশা করি তুমি ই এই কাজটি করবে।  তুমি তা করতে অস্বীকার করলে তা হবে আমাদের প্রতি নির্দয়তা, তুমি কি বুঝনা এই সময়ে আমেরিকা ও ব্রিটেনের লোকদের সামনে আমাদের আদর্শ পরিস্কার ভাবে তুলে ধরা কত টুকু গুরুত্বপূর্ন ? অবশ্যই তুমি এটা ইংরেজীতে লিখবে । যদি মনে কর তবে এটা এখানে আবার পুনঃ লিখন হতে পারে। দয়া করে এই কাজটি সত্ত্বর করে দাও। (৪ মে, ১৯৩৭)

সেই সময়ে রকারে নিকট এই প্রস্তাব টি পছন্দের হলে ও ব্যাস্ততার কারনে দায়িত্ব নিতে পারেন নাই। তবে তিনি ব্যস্ততা কমিয়ে দিয়ে  জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতি বিষয়ক বইটির ইংরেজী ও স্প্যানিশ অনুবাদের কাজে হাত দেন। পরে অবশ্য সেই কাজ অ্যালেকজান্ডার বার্ক ম্যানের হাতে সমাপ্তি হয়েছিলো। যা পরে আমেরিকায় প্রকাশিত হয়।  তিনি স্পেনের বিষয়ে বেশী মনোযোগী ছিলেন; তিনি প্রাথমিক ভাবে স্পেনের প্রকৃত ঘটনা নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন (১৯৩৬) । তখন তাঁর জীবিকার জন্য ও কাজ করতে হয়েছিলো। কিছু দিন অতিক্রান্ত হবার পর তিনি এমা গোল্ডম্যানের অনুরুধ রক্ষার জন্য অত্র পুস্তকটি লিখার জন্য মনোনিবেশ করেন।

তিনি তাঁর অত্র বইয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের আন্দোলন সংগ্রামের উপর ও আলোকপাত করেন। তিনি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থার উপর ও বিশদ বিবরন তুলে ধরেন। শ্রমিক আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের সময়কার সঙ্কট ও প্রাসঙ্গিক বিষয়দি রকার চমৎকার ভাবে পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করেন। ব্রিটেনে রকার অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত হয়ে পড়েন। প্রথম বিশ্ব যুদ্বের সময়ে মুক্তিবাদি প্রবনতার বিকাশ হতে থাকে- বিশেষ করে ইহুদি শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক কাজ চলছিল ।

অন্যদিকে পূর্ব লন্ডনে রকার বেশ জনপ্রিয় ব্যাক্তি হয়ে উঠেন- সেই সময়ে সেখানে তিনি নানা ভাবে সিন্ডিক্যালিস্ট শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলার চেস্টায় ছিলেন। এটা ১৯৩০ সালের কথা । ১৯৫০ সালে ব্রিটেনে সিন্ডিক্যালিস্ট ফেডারেশন বেশ উজ্জিবিত হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু তা বশী দিন স্থায়ী হয় নাই। ১৯৭৯ সালে ডাইরেক্ট একশন কার্যক্রমের আওতায়, বেশ কিছু শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন আবার জোরদার হয়ে উঠে। তবে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের মৌলিক নীতিমালা যেমন- স্ব ব্যবস্থাপনা, স্ব নিয়ন্ত্রন, সরাসরি কাজ, স্বতস্ফুর্ততা, সম্মিলিত কাজ, মুক্তিপরায়নতা – ইত্যাদি। বাস্তবায়নের কাজ ও সর্বত্র চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়।

গতানুগতিক কর্মের পাশাপাশি রকার আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের কাজ ও গতিশীল করার চেষ্টা করেন  । এতে লিখক ড্যানিয়েল গুড়িয়েন এবং নোয়াম চমস্কি ও যুক্ত হন। তবে আসল কথা হলো, মুক্তিপরায়ন মানুষের জন্য রকার নিরাজবাদি চিন্তা চেতনা ও আদর্শকে মুক্তির পথ হিসাবে দেখেন। তিনি তাঁর সময়ে যে দলিল  ও বই পুস্তক রেখে গেছেন, যা এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের আদর্শ হিসাবে অবিরত মানুষের মুক্তির পথ প্রদর্শন করে যাবে । তাঁর অত্র গ্রন্থটি একটি চমৎকার বই যা দুনিয়ার পাঠকদেরকে মানব মুক্তির পথে অনুপ্রেরনা যোগিয়ে যাবে ।

নিকোলাস ওয়াল্টার লন্ডন,১৯৮৮ ইংরেজী।

ভাষান্তরঃ এ কে এম শিহাব

0 Comments 0 Comments
0 Comments 0 Comments