এ কে এম শিহাব অনূদিত পিটার ক্রপতকিন প্রণীত “কনকোয়েস্ট অব ব্রেড” পুস্তকের ধারাবাহিক-১

এ কে এম শিহাব অনূদিত পিটার ক্রপতকিন  প্রণীত “কনকোয়েস্ট অব ব্রেড” পুস্তকের ধারাবাহিক-১

Interested readers are requested to click here for its English Version:

http://dwardmac.pitzer.edu/kropotkin/conquest/ch1.html

অধ্যায়ঃ এক – আমাদের ধনীরা

শত কোটি বছর ধরে মানব জাতি নানা বাঁধা বিপত্তির সিড়ি ডিঙ্গিয়ে সামনের দিকে গিয়ে এসেছে, মানুষ সময়ের ব্যবধানে দুনিয়ার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে, নিজেদের বসবাসের জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃজনের প্রয়াস চালিয়েছে, তাদের শিশু সন্তানদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে চেস্টা করেছে আপ্রাণ। প্রকৃতির নানা দুর্যোগ, বিপদ আপদ থেকে সন্তান সন্ততিকে আড়াল করতে, বাঁচিয়ে রাখতে প্রানান্তকর চেস্টা করেছে প্রতিটি প্রজন্ম।

মানুষ সময়ের মহা সাগর সন্তরন করে বহু পথ এগিয়েছে, পেড়িয়ে এসেছে কয়েক হাজার বছর, এই যাত্রা পথে মানবজাতী অর্জন করেছে বহু অমূল্য সম্পদ। তাঁরা ভূমি পরিস্কার করেছে, শুকনো ভূমিতে সেচন করেছে জল, বন কেটে নির্মান করেছে গৃহ, তৈরী করেছে সুন্দর সুন্দর নিরাপদ সড়ক ও জনপথ; এরা বহু কিছু নির্মান করেছে, উদ্ভাবন করেছে, পর্যবেক্ষন করেছে নানা বস্তু ও ঘটনা প্রবাহ, বিনির্মান করেছে চিন্তার জগতে যুক্তি-ধারা; এরা আরো উদ্ভাবন করেছে অনেক চমৎকার সব জটিল যন্তপাতির, উন্মোচন করেছে প্রকৃতির রহস্য, এবং সর্ব শেষ বড় একটি আবিস্কার করেছে বাস্প চালিত, বিদ্যুৎ চালিত রকমারি জিনিষ-পত্র। ফলে, এখন একজন সভ্য মানুষের হাতে তার সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা চলে এসেছে, তাদের হাতে জমেছে প্রচুর পুঁজি, আরো অনেক অনেক সুযোগ সুবিধা। সেই এখন তাদেরকে ক্ষমতা দিয়েছে নিজের ও  অন্যের শ্রমের উপর নিয়ন্ত্রন বজায় রাখার, ধনিক শ্রেনী কেড়ে নিচ্ছে সাধারন লোকদের স্বপ্নসাধ, তা এখন এমন স্তরে পৌঁছে গেছে যে, যা অনেক ক্ষেত্রে কল্পকাহিনীকে ও হার মানায়।

আজ দুনিয়ায় সভ্যতার ভূমি অনেক উর্বর, ভালো কিছু করার জন্য উপযুক্ত সময় এখন, সেই মহান কর্ম সম্পাদনের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরী আছে- মানুষ যদি ভালো কিছু করতে চায় তবে সেই সক্ষমতা মানুষের হাতেই আছে। উত্তম চাষ বাসের পদ্বতী এখন মানুষে করায়ত্ত।

আমেরিকার দিকে থাকালেই দেখতে পাব যে, মাত্র একশত মানুষ আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কয়েক মাসে দশ হাজার মানুষের জন্য সারা বছরের খাদ্য উৎপাদন করতে পারে । এবং সেখানে সেটা দ্বিগুন তিন গুন বা আরো বেশী পরিমানে উৎপাদন করতে পারে। তাঁরা মাটিকে সেই ভাবে প্রস্তুত করতে পারে,  এবং প্রতিটি গাছের ছাড়াকে প্রয়োজনীয় যত্ন নিতে সক্ষম। ফলে বিপুল পরিমান উৎপাদিত ফসল অর্জন করতে পারে কৃষকগন। প্রাচীন শিকার যুগে মানুষ তার পরিবারের খাদ্যের খোঁজে পঞ্চাশ ষাট বর্গ মেইল পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে খাদ্য সংগ্রহ  করতে হত। কিন্তু এখন সভ্য দুনিয়ায় মানুষ তার পরিবারের খাবারের জন্য অনেক কম কষ্টে, কম অনিশ্চিয়তায়, হাজার গুন কম ক্লেশে খাদ্য পানীয় সংগ্রহ করে দিতে পারছে।  জল বায়ু মানুষের চলার পথে এখন আর কোন অন্তরায় নয়। যখন সূর্য অস্ত যায় মানুষ কৃত্তিম ভাবে উষ্ণতা সৃজন করে; আমরা দেখতে পাচ্ছি কৃত্তিম উষ্ণতা ব্যবহার করে শাক সব্জি সহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই মানুষ গ্লাস, গরম পানির নল, ও অন্যান্য আধুনিক উপকরন ব্যবহার করে প্রকৃতির স্বাভাবিক উৎপাদনের চেয়ে বহু বহু গুন বেশী খাদ্য উৎপাদন করছে।

শিল্পের জগতে ও ঘটেছে অভাবনীয় বিশাল পরিবর্তন।  মানুষের মনন ও মেধার সমন্বয়ে যন্ত্রপাতি গুলোর দিনে দিনে ব্যাপক উন্নয়ন ও রূপান্তর ঘটে চলছে- ফলে উদ্ভাবনের তিন চারটি জনারেশন অতিক্রম করা হয়ে গেছে। যা আগে কারো জানা ছিলোনা । এখন একশত জন লোক চাইলে দশ হাজার লোকের প্রয়োজনীয় কাপড় চোপড় দুই বছরের জন্য তৈরী করে দিতে পারে অতি অল্পসময়েই। ভালো ভাবে পরিচালিত একটি কয়লা খনিতে মাত্র একশত শ্রমিক কাজ করে যে পরিমান খয়লা উত্তোলন করতে পারবে তা ব্যবহার করে যে পরিমান জ্বালানী হবে তা দিয়ে প্রায় দশ হাজার পরিবারের লোক আকাশের নিজে এক বছর বসবাস করতে পারবেন। আমরা দেখলাম বিগত কয়েক মাসের মধ্যেই প্যারিসের অভূতপূর্ব রূপের বাহার।(১) যা ফ্রান্সের লোকেরা নিজদের কাজের মাধ্যমে সম্পাদন করেছে। (১)

আমাদের কৃষির উৎপাদন, এবং আমাদের সামগ্রীক সামাজিক ব্যবস্থার মাধ্যমে শ্রম, আবিস্কার, উদ্ভাবন ও আমাদের  পূর্ব প্রজন্মের লোকেরা স্বল্প খরচে প্রচুর মুনাফা অর্জন করেছেন, তবে তাতে কিন্তু সাধারন ভাবে সকল জনসাধারন ভাগ পায়নি। অথচ তাদের সহায়তায়ই স্টিল ও লোহার মালিকানা অর্জন করে কিছু লোক।  তারাই আবার সমাজের অন্যান্য সদস্যদের নিকট থেকে সমাজের সম্পদ কিনে নিয়েছে।

এটা সত্য যে আমরা এখন ধনী, আমরা যতটুকু ভাবি তার চেয়ে ও এখন বেশী সম্পদশালী আমরা; আমরা কিসে সম্পদশালী বা কিসের মালিক, আমাদের হাতে এমন যন্ত্রপাতি আছে যা দিয়ে আমরা অভাবনীয় উৎপাদন করতে পারি, আমরা আমাদের ভূমি ব্যবহার করে আরো ব্যাপক ভাবে উন্নতি করতে পারি, তাই বিজ্ঞানের সর্বোচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি, সকলের সামগ্রীক উন্নয়ন ও কল্যানের জন্য আমরা আমাদের কাজের দক্ষতা বাড়াতে পারি।

আমরা এই আধুনিক সভ্য সমাজে সমৃদ্বশালী। তা হলে দুনিয়ায় এখনো এত দরিদ্র মানুষ কেন ? সাধারন মানুষ এত কষ্ট করে কেন? অনেক উঁচু বেতন ভোগী লোক ও অনিশ্চিয়তায় ভোগে কেন? উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিপুল সম্পদ প্রাপ্তি, অনেক ক্ষমতাশালী উৎপাদক যন্ত্রপাতি থাকা সত্যে ও শ্রমজীবী মানুষ ও তাদের সন্তানেরা জীবনে সুখ সমৃদ্বি পায়না কেন ?

সমাজবাদিগন এই প্রসঙ্গে কথা বলছেন, প্রতিনিয়ত পুনরাবৃত্তি করছেন। তাঁরা প্রতিদিন তাদের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি তোলে ধারার জন্য সকল প্রকার বিজ্ঞান ব্যবহার করছেন। আর এসবের উদ্দেশ্য হলো এটা পরিস্কার করা যে, উতপাদনে – জমি, খনি, সড়ক ও জনপথ, যন্ত্রপাতি, খাদ্য, আশ্রয়, শিক্ষা, জ্ঞান – এসকল কিছুই কতিপয় লোক ডাকাতি করে দখল করে নিয়েছে- যদিও এটি একটি বিরাট ইতিহাস। যুদ্ব, শরনার্থী সৃষ্টি, অজ্ঞতার প্রচার, মানুষের উপর নির্মম নিপিড়ন পরিচালনা, শোষণ ও নিপিড়ন ইত্যাদি ছিলো দস্যুদের অস্ত্র। অতীতের সম্পদ প্রাপ্তির কারনে কিছু লোক আজ দুনিয়ার মোট মানব শ্রমের দুই তৃতীয়াংশ নিজেরা ভোগ করছে। যা মানুষ্য সমাজের জন্য লজ্জার ও মুর্খতার পরিচায়ক। আজ বহু দেশের মানুষকে এমন এক জায়গায় এনে দাড় করিয়েছে যে, একশ্রেণীর লোক সম্পদের সিংহ ভাগ দখল করে বাকীদেরকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলেছে যেখানে- তাদের অনুমতি ছাড়া কাজ করতে পারেনা-  ফলে তাদের এক মাসের বা এক সপ্তাহের বেশী খাবারে নিশ্চয়তা পর্যন্ত থাকে না ।  এই পরিস্থিতিগত কারনে মানুষ তাদের চাহিদামত পন্য তৈরী করার অধিকার হারিয়েছে, জীবনের চাহিদা মেটাতে হিমসিম খাচ্ছে। অথচ সেই ধনীক শ্রেনীর লোকেরা একচাটিয়া ক্ষমতা ভোগের কারনে বিপুল পরিমান মুনাফা হাসিল করে নিচ্ছে। সমাজবাদিরা এই সকল বিষয়েই মূলত কাজ করছেন।

প্রকৃত অবস্থা বুঝার জন্য একটি সভ্য দেশ উদাহরন হিসাবে গ্রহন করুন। এটা এক সময় বনে আবৃত ছিলো, পরে তা পরিস্কার করা হয়, জলাবদ্বতা দূরকরা হয় তখন জলবায়ু উন্নত হয়। এটাকে আবাস যোগ্য করে গড়ে তোলা হয়। যে মাটি এক সময় নানা প্রকার উদ্ভিদ ও লতা গুল্ম দিয়ে ছিলো আচ্ছাদিত, সেই মাটিতে এখন নানা প্রকার ধান ও খাদ্য শষ্য উৎপাদিত হয়। ভূপৃস্টের নানা উপত্যাকায় যত্রতত্র পাথরের দেয়াল ও যেখানে সেখানে ছোট বড় পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো যা মানুষের সোনালী ফসল ফলানোর জন্য ছিলো বড় বাঁধা। মানুষ তা সরিয়েছে। ছিলো বন্য গাছ পালা, যা মানুষের খাবার বা ব্যবহার উপযোগী ছিলো না। মানুষ তাদের চিন্তা আর মেধা দিয়ে তা অপসারিত করে সুস্বাদু, স্বাস্থ্যসম্মত গাছ পালা, ফল মূলের চাষ প্রবর্তন করেছে। মানুষ লক্ষ লক্ষ কিলোমিটা রেলরোড, সড়ক পথ, ফেরী, বিশাল বিশাল ব্রীজ-সেতু নির্মান করেছে। পৃথিবীর বড় বড় পর্বত মালা আল্পস, ককেসাস ও হিমালয় জয় করেছে। পা রেখেছে চাঁদে, পাড়ি জমাচ্ছে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। নদি গুলো নৌ চলাচলের জন্য উপযোগী করা হয়েছে। সমূদ্র সৈকত সমূহ যত্নসহকারে জরিপ করে তাতে উঠানামা করার জন্য বন্দর নির্মান করা হয়েছে। এমন কি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ও সামূদ্রিক ঝড় ঝাঁপটা থেকে বন্দর ও জাহাজ নিরাপদ করার জন্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছে মানুষ। জোয়ার ভাটায় কঠিন শিলা ও ধারালো পাথর ডুবে যেত; যা জাহাজ তীরে ভীরতে সমস্যার সৃষ্টি করতে। এখন আর সে সমস্যা ও নেই। মাটির তলা খুঁড়ে মানুষ কয়লা, লোহা ও নানা প্রকার খিনিজ সম্পদ উত্তলন করা হচ্ছে। মহা সড়কের মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠছে চোখ জলসানো শহর ও নগর। মানুষ তার হিসাবের খাতায় জমা করছে শিল্প, বিজ্ঞান, কল কারখানা ইত্যাদি যা সভ্যতাকে আগামীতে ও এগিয়ে নিবে দ্রুত।  মানবজাতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম অতিক্রম করে নানা ঘাত প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে এগিয়েছে। মানুষ দুঃখ যন্ত্রণা, মৃত্যু, নিপিড়ন, নির্যাতন, আর তাদের প্রভুদের দ্বারা দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছে পদে পদে। তাদের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা ও উত্তরাধিকার আমাদের নিকট হস্তান্তর করে গেছেন ।

হাজার হাজার বছর ধরে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ কাজ করেছে জঙ্গল পরিস্কার করতে, নদি খন ও নাব্যতা আনয়ন করতে, স্থল পথে ও জল পথে যাতায়াতের জন্য রাস্তা নির্মান করতে। ইউরূপে যত ভূমি চাষ করা হয়েছে সেই ভূমির মাটির প্রতিটি কনায় নানা জাতের মানুষের গায়ের ঘাম ও চোখের পানির দ্বারা সিক্ত হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে প্রতিটি জাতির আলাদা আলাদা ইতিহাস রয়েছে। যাদেরকে জোর করে শ্রম দিতে বাধ্য করা হয়েছিলো। প্রতি মেইল রেলওয়ে নির্মান করতে, ও প্রতি গজ টানেল তৈরী করতে নানা জাতির মানুষের রক্ত ও ঘামের প্রয়োজন হয়েছে।

প্রাকৃতিক খনি সমূহের পাথুরে দেয়ালের উপর এখনো লুঠেরা শ্রেনীর প্রতিনিধিরা দাঁড়িয়ে আছে, যারা শ্রমিকদেরকে খনিতে কাজ করতে বাধ্য করছে। সেই খনির ভেতরের পাঠাতনে বহু শ্রমিক কবর রচিত হয় হর হামেশা। কেউ কি খবর রাখে সেখানে কত ঘাম, খুন, চোখের জল ঝরে ? কখনো শীলায় ধ্বস বা ভু গর্বস্থ বন্যা কত শ্রমিকের জীবন প্রদীপ নিবিয়ে দেয়?

দুনিয়ার শহর নগর গুলো একে অন্যের সাথে যুক্ত হয়েছে রেলপথ, সড়ক পথ, আকাশ পথ ও পানি পথের মাধ্যমে। একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝা যাবে, এই সকল কিছু কেমন করে নির্মিত হয়েছে। রাস্তা ঘাট, ঘর বাড়ী, থিয়েটার, সিনেমা হল ও সরকারী ভবন সমূহ। ভেবে দেখুন এই গুলো নির্মানের ইতিহাস কি ? দৃশ্যমান এই সভ্যতা, শহর নগর, কল কারখানা ইত্যাদি কেমন করে হলো ? এখন মানুষের জীবন যাত্রা এত সহজ হলো কেমন করে ? মানুষের বাস গৃহ, কারখানা, গুদাম ঘর ইত্যাদি নির্মান করতে কত হাজার হাজার মানুষ কাজ করেছেন, শ্রম দিয়েছেন। তাদের অনেকে মারা গেছেন, তাদের অনেকেই এখন কবরে। কিন্তু তাদের কর্ম রয়ে গেছে। আজকের দুনিয়ার মানুষ তাদের নিকট ঋণী। বিভিন্ন জাতির মানুষের খন্ড খন্ড অংশ মিলিত হয়ে তৈরী হয়েছে জাতীয় সম্পদ। তার প্রতি সামগ্রীক ভাবে আমরা সকলেই ঋনী। লন্ডন ডকইয়ার্ড, বা প্যারিস গুদাম কি তৈরী হত যদি আজ আনর্জাতিক বানিজ্যের বিকাশ না হত? আমাদের খনি, কল কারখানা বা ওয়ার্কসপ, রেলওয়ে সহ নানা প্রকার বানিজ্যিক যানবাহন যা জলে, স্থলে ও আকাশ পথে চলে তা কি করে হলো ? তা সবই শ্রমিকদের শ্রমের ফল।

লক্ষ লক্ষ মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে বর্তমান সভ্যতার বিনির্মান করেছেন, যার জন্য আমরা গর্বিত। এই সভ্যতা ঠিকিয়ে রাখার জন্য সারা দুনিয়ার আজো লক্ষ কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত কাজ করছে। তাদের কাজ ছাড়া মাত্র পঞ্চাশ বছরে সকল সভ্যতা দুনিয়া থেকে হাঁড়িয়ে যাবে।

এমন কি কোন  চিন্তাধারা, বা কোন উদ্ভাবন সকলের সম্পত্তি হিসাবে পরিগনিত হয়না, সেই গুলো কিন্তু বর্তমান এবং অতীতের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে। হাজার হাজার চেনা অচেনা উদ্ভাবক এবং চিন্তক দারিদ্রতার কারনে মারা গেছেন। আধুনিক যন্ত্রপাতির পেছনে ও সেই সকল মহান জ্ঞানী লোকদের অবদান রয়েছে।

হাজার হাজার লেখক, কবি, সাহিত্যিক, মেধাবী নিরন্তর পরিশ্রম করে মানুষের জ্ঞান জগতকে সমৃদ্ব করেছেন, অনেক ভ্রান্তিকে দূর করেছেন, তারাই আবার বিজ্ঞান ভিত্তিক চিন্তা ভাবনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন। তাদের কঠোর শ্রম ছাড়া আজকের এই শতাব্দির উজ্জল সভ্যতা আবির্ভাব সম্ভব ছিলো না ।  আসল কথা হলো, এই হাজার হাজার কবি সাহিত্যিক দার্শনিক ও উদ্ভাবকগন পরস্পরকে বিগত শতাব্দীর শ্রমের মাধ্যমেই সাহায্য করেছেন। তাঁরা শারিরীক ও মানসিক পরিশ্রমের মাধ্যমে মানব জীবনকে উন্নততর অবস্থা থেকে আরো উন্নত অবস্থায় নিয়ে যান। তাঁরা তাদের পরিবেশ থেকে উপাদান সংগ্রহ করেন এবং মানুষকে নয়া জীবনের স্বপ্ন দেখান।

সিগুইনের মেধাবী মানুষ, গ্রোভের মেয়র অন্যান্য পুঁজিপতিদের তোলনায় ব্যাপক হারে কল কারখানা নতুন মডেলে স্থাপন করেছেন। তাঁরা অবশ্যই মেধাবী বিজ্ঞান ও শিল্পের সন্তান। যতক্ষন পর্যন্ত তাপ চালিত ইঞ্জিন তাদের চোখের সামনে  কাজ করেনি, তাপ শক্তির নানা কার্যক্রম প্রদর্শন করা হয়নি, যা শব্দ, আলো, এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করে মানুষের দৈনিন্দিন জীবনকে নাড়া দেয়নি ততক্ষন পর্যন্ত কোন মেধাবী লোকের অন্তর্দৃস্টির শক্তি বলে জনগনের সামনে নতুন কিছু দেখাতে পারেন নাই। উনবিংশ শতাব্দির যারা জন্মেছেন, তাঁরা যদি এই বিষয়াদি বুঝতে পারেন এবং প্রয়োগ করতে পারেন তবে আগামীদিনের পথ চলা সহজতর হবে। অষ্টাদশ শতাব্দীর চিন্তকগন এই বিষয় গুলো ও লক্ষ্য করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা তাদের চিন্তার তেমন অগ্রসর হতে পারেন নাই। কারন এখন দুনিয়া যে জায়গায় দাঁড়িয়েছে তখন তা ছিলো বহু পেছনে। তাপ ও বাস্প চালিত ইঞ্জিন আবিস্কার ও বিকাশের ফলে অনেক কিছু অগ্রগতি হয়েছে। চিন্তা করা যায় কি যে আমরা স্বাভাবিক আইনকে অবজ্ঞা করেই চলেছি, যারা আধুনিক শিল্পের বিপ্লব ঘটিয়েছেন, লোহার ব্যবহার জানেন এমন লোক এক কালে ছিলো না। যারা ইঞ্জিনের সাথে যুক্ত করে তা ব্যবহার করতে পারেন। বাস্প শক্তির মাধ্যমে গোড়ার শক্তিকে প্রতিস্থাপন করার পদ্বতি ও মানুষের অজানা ছিলো। আর মানুষ যখন শক্তির ব্যবহার শুরু করে ক্রমে তার উন্নয়ন ঘটালো তখনই আধুনিক শিল্পের বিকাশ হলো।

দুনিয়ার প্রতিটি যন্তপাতির একটি করে ইতিহাস আছে। বহু বিনিদ্র রজনী ও দারিদ্রতা, হতাশা ও আনন্দ, অগনিত নাম না জানা শ্রমিকের অহর্নিশি শ্রমের অবদান, প্রতিটি উদ্ভাবনের সাথে জড়িয়ে আছে। কঠোর পরিশ্রম করে উন্নত ধারনার জন্ম দেয়া ও স্বার্থহীন ভাবে কাজ করে যাওয়ার কাহিনী সারা দুনিয়ার ছড়িয়ে আছে। এমনো উদ্ভাবক আছেন যারা সারা জীবন কোন কিছু প্রাপ্তির আশা না নিয়েই কাজ করে গেছেন। এছাড়া প্রতিটি নয়া উদ্ভাবনের সাথে পুরাতন উদ্ভাবনের সংযোগ স্থাপিত হয়ে আছে। শিল্প ও যন্ত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর প্রতিফলন স্পস্ট।

বিজ্ঞান এবং শিল্প, জ্ঞান এবং তার প্রয়োগ, আবিস্কার এবং বাস্তব জগতে এর ব্যবহার আরো নয়া আবিস্কারকে ত্বরান্বিত করে। মানুষের মগজ ও হাত এক সঙ্গে কাজ করে। কাজ করতে করতে মানুষ চিন্তা করে । সেই চিন্তার সূত্র ধরেই হয় নয়া নয়া আবিস্কার। প্রতিটি আবিস্কার, প্রতিটি অগ্রগতির প্রতিটিই মানব জাতির এগিয়ে যাবার যোগফল। তা হয়েছে আজকের ও বিগত দিনের সকল মানুষের শারিরীক ও মানসিক কঠোর শ্রমের ফলে।

এই যখন পরিস্থিতি তখন কেমন করে কোন অধিকারে  দাবী করা যায় যে – এটা আমার, এটা তোমার নয়?

যুগ যুগ ধরে মানব জাতির যাত্রা পথের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় প্রমানিত হয়েছে যে, মানুষ উৎপাদন করতে পারে আর সেই উৎপাদন করার ক্ষমতা ও বাড়াতে পারে। আর সেই ক্ষমতার ফলাফল কতিপয় মানুষ নিজেদের করায়ত্ব করে ফেলেছে। কখনো কখনো মানুষ সেই পরিস্থিতি বুঝতে পারে এবং বিশ্লেষণ করতে পারে।

এখন মাটির যে উৎপাদন ক্ষমতা আছে, চাইলে সেই ক্ষমতা আরো অনেক বাড়ানো যেতে পারে । দিনে দিনে লোক সংখ্যা বাড়ছে, দরকার অধিক পরিমানে উৎপাদন ও খাদ্য দ্রব্যের বৃদ্বি। তাই দরকার হলো বৈজ্ঞানিক পদ্বতীতে চাষাবাদ। কিন্তু সেই জমির মালিকানা আটিকে আছে মাত্র কতিপয় মানুষের হাতে। ফলে এরা সেই জমিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং কৃষি উপকরন ব্যবহার করতে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি খনি, আসলে বহু প্রজন্মের শ্রম ও জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করে, সেই খনি থেকে যে পরিমান মূল্য উৎপন্ন হয় তা বিতরিত হবার কথা  সেই দেশের জনসংখ্যার মাঝে আর তা ব্যবহার হবার কথা শিল্প কারখানায় – এখন খনির মালিকানা বিশেষ কতিপয় লোকের দখলে আছে – তা ব্যবহার  ও ভোগ তাদের ইচ্ছেমতই হচ্ছে। তাঁরা খনিজ দ্রব্য কয়লা, তৈল, সোনা ইত্যাদি নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রেখে অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য চেস্টা করে। যন্ত্রপাতি ও তাদেরই দখলে, শ্রমিকগন প্রতিনিয়ত কাজ করতে গিয়ে যে যন্ত্রপাতির বিকাশ ঘটাচ্ছেন তাদের সেই উতকর্ষিত যন্ত্রপাতির মালিকানা ও সেই চক্র করায়ত্ব করে রাখে। এক শতাব্দি আগে যে শ্রমিকগন লেইস তৈরীর মেশিন উদ্ভাবন করেছিলেন তাদের উত্তারিধারীগন এখন নাইটিঙ্গহ্যামে সেই লেইস তোইরী ফ্যাক্টিরী গুলোতে কাজ করছেন গড়ে তোলছেন সংগঠন। তারা এখন তাদের অধিকারের দাবী জানাচ্ছে। তাঁরা বলছেন, “ আপনারা কাজ বন্দ্ব করুন ! এই মেশিন আপনাদের নয়”। অথচ পরিস্থিতি হলো এমন যে সেখানে তাঁরা যদি অধিকারের জন্য একটু কঠোর হন তবে তাদের উপর গুলি চালিয়ে হত্যা করা হবে।

রেলওয়ে একটি চমৎকার যোগাযোগ ব্যবস্থা হওয়া সত্বেও এই গুলো অর্থহীন হয়ে পড়ত যদি দেশের জনগণ এই কার্যক্রমের সাথে যুক্ত না হতেন। ইউরোপের লোকেরা তাদের শিল্প কারখানা, ব্যবসা বানিজ্য, দোকান পাট সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি নিজেরা ই খাতের শেয়ারের মালিকানা ক্রয়করে নেন । ফলে সামজের অনেক অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূরী করনের পাশাপাশি মাধ্যযুগের রাজাদের থেকে বেশী রাজস্ব আদায়ে সহায়ক হয়। যে সকল শ্রমিক এক সময়ে পাহাড় সম মাটি কেটেছে, টানেল বানিয়েছেন। সেই কাজ করতে গিয়ে বহু শ্রমিক প্রান হারিয়েছেন। না খেয়ে দিবানিশি কাজ করেছেন । অথচ আজ যদি সেই শ্রমিকদের সন্তানেরা সেই কাজের ফলাফলের শেয়ার দাবী করে তবে আজ যারা কায়েমী স্বার্থবাদি মহল তাঁরা তাদেরকে হত্যা করতে চাইবে।

বর্তমানে যে দানবীয় ব্যবস্থা দুনিয়ায় চালু আছে, সেই ব্যবস্থায় শ্রমিকদের সন্তানেরা যখন কাজের দাবী নিয়ে আসে তাঁরা প্রায়স কাজ পায়না। কারখানায়, মেশিনে, খনিতে তাদের কাজের পরিমাণ সীমীত হয়ে আসছে। কতিপয় পুঁজিপতি প্রভূদের ইচ্ছা এখন সকল কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। শ্রমিকগন এখন অনিশ্চিত জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। যেমন কাজের নেই কোন নিশ্চয়তা তেমনি নেই মজুরীর ও নিশ্চয়তা। অথচ তাদের পিতা বা পিতামহ মাথার ঘম পায়ে ফেলে আজকের কলকারখানা গড়ে দিয়ে গেছেন। মেশিনপত্র স্থাপন ও সুরক্ষা দিয়ে গেছেন । তারাই দুনিয়ার সকল বৃহৎ কর্ম গুলো করে গেছেন আর মজুরী পেছেন সবচেয়ে কম।  সেই সময় শ্রমিক গন দাসের মত জীবন যাপন করতেন। তাদের স্বাধীকার বলে কিছু ছিলো না । যদি কোন শ্রমিক ছুটি নিয়ে অন্য কোথাও কাজ করতেন তবে চার ভাগের একভাগ তাদের প্রভূকে দিতে হত, আর একভাগ দিতে হত সরকার এবং মধ্যসত্ত্বভোগীদেরকে। সেই টেক্স বা কর দিতে হত রাষ্ট্র, পুঁজিপতি, প্রভূ ও মালিকদেরকে । সেই টেক্স বা করের পরিমাণ প্রতিনয়ত বেড়েই চলেছে। এই পথা এখন নানা সমাজে একটি শক্তিশালী প্রথায় পরিনত হয়েছে। জমি থেকে যখন একজন শ্রমিক শিল্প কারখানায় কাজ করতে আসেন তখন সেই পদ্বতীর তেমন রকমফের হয় না । জমির মালিক যেমন উৎপাদনের সিংহ ভাগ নিয়ে নেয় তেমনি মেশিন পত্রের মালিকেরা ও তাই করে থাকেন।

আমরা সামন্তবাদি জমিদারদেরকে লজ্জা দেই- এই বলে যে তাঁরা কৃষকদের নিকট থেকে তাদের উৎপাদিত ফসলের চার ভাগের এক ভাগ নিয়ে নিত। আমরা সেই সময়টাকে বর্বরতা বলে আনন্দিত হই। তবে যদি তার ধরন প্রকৃতি পাল্টায় তবু চরিত্র কিন্তু একেই থেকে যায়। শ্রমিকদের উপর জোর খাটানো হয়, সামন্তবাদের বিধি মোতাবেক শ্রমিকদেরকে চুক্তি করতে বাধ্য করা হয়। আর তাদের জন্য এটা সহজ হয় তখনই যখন শ্রমিকদের অন্য কোন খানে যাওয়ার বা বেশী সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকে না । এই সব কিছুই ঘটে ব্যাক্তিগত সম্পত্তির বিধান জারি থাকার কারনে। শ্রমিককে হয় এই অবস্থা মেনে নিতে হবে বা মরতে হবে বা না খেয়ে থাকতে হবে।

প্রচলিত ব্যবস্থার কারনে সকল উৎপাদনের ফলাফলে একটি ভূল পথে পরিচালিত হচ্ছে। ব্যবসায়ী মহাজন সম্প্রদায় জনগণের চাহিদার কথা একেবারেই বিবেচনায় নেয় না। তাদের সকল কার্যক্রমের লক্ষ্যই হলো নিজেদের বানিজের মুনাফা বৃদ্বি করা। তাই মাঝে মাঝে তাদের এমন অবস্থা হয় যে, তাঁরা নিজেদের স্বার্থে মন্দ্বা মোকাবিলা করতে হাজার হাজার শ্রমিকদেরকে রাস্তায় ঠেলে দেয়।

একজন শ্রমিক যে পন্য উৎপাদন করেন তিনি তার বেতন দিয়ে সেই পন্য ক্রয় করার সামর্থ রাখেন না। প্রতিটি কোম্পানী প্রতিনিয়ত বেদেশী ক্রতা খোঁজে। অন্য জাতির ধনিক শ্রেনীর নিকট সেই পন্য বিক্রি করতে অধিক আগ্রহী। প্রতীচ্যে, আফ্রিকায় সর্বত্র, মিশর, টনকিন বা কঙ্গোতে ইউরূপীয়রা শ্রমদাসত্ব ঠিকিয়ে রাখার জন্য সকল সময়েই চেস্টা করছে। কেহ যদি সেই চক্র থেকে বেড়িয়ে যাবার চেস্টা করে তবে তিনি সর্বত্র একেই চিরিত্র দেখতে পাবেন। আদতে সকল জাতি একেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। বাজার ব্যবস্থায় এক ধরনের প্রতিযোগীতার চিরস্থায়ী যুদ্ব চলছে। প্রতীচ্যের দখলের লড়াই, সমূদ্র দখলের লড়াই, প্রতিবেশীদেশের উপর প্রভাব বলয় তৈরী করে নিজেদের প্রভূত্ব কায়েম করা এবং তাদের উপর ইচ্ছেমত শুল্ক আরোপ করা এখন সাধারন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কালো মানুষ যা একটু বিদ্রোহ করে তাদেরকে মেরে ফেলতে ও সাম্রাজ্যবাদিরা কসূর করে না । তাদের কামানের চিৎকার থামেনি, তাঁরা বহু জাতিকে মাটির সাথে মিশিয়ে ফেলতে চেস্টায় লিপ্ত। ইউরূপের অনেক দেশে তাদের মোট বাজটের তিন ভাগের একভাগ তাঁরা কেবল মাত্র সামরিক খাতে ব্যায় করে। আমরা জানি সেই ব্যয় ভার বহনের জন্য আরোপিত কর প্রদান করা শ্রমিক শ্রেনীর উপর কত বড় বোঝা।

প্রকৃত অর্থে শিক্ষা এখনো সত্যিকার অর্থে সকলের জন্য উন্মুক্ত হয়নি, শ্রমিক দরিদ্র পরিবারের সন্তানদেরকে খুব অল্প বয়সেই জীবীকা নির্বাহে নিয়োজিত হতে হয়, তাদেরকে খামারে বা খনিতে কাজ করতে যেতে হয়। প্রতি দিন শেষে সেই শ্রমিকগন কঠিন কঠোর কাজ করে যখন ফিরে তখন ও তাদের জন্য ভালো বিশ্রামের স্থল মিলেনা –তাঁরা একটি নির্মম পরিবেশেই ফিরে আসে। আমাদের সমাজ দুটি পরস্পর বিরোধী শিবিরে বিভক্ত হয়ে আছ । এই পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা শব্দটি একটি অর্থহীন হয়ে আছে। রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য অনেকেই এগিয়ে আসেন, কিন্তু যখনই তাঁরা দেখেন যে তাদের সেই অধিকার ও স্বাধীকারের আন্দোলন শ্রমিক মেহেনতি মানুষের  আন্দোলন জোরদার হচ্ছে তখনই তাঁরা পিছটান দিয়ে নিজেদের মতামত পাল্টে ফেলে রাতারাতি। সেই বিপ্লবী লোকেরাই আবার নিপিড়ন মূলক আইন ও সরকারের তলোয়ারে পরিনত হয়ে উঠেন। এরা রাষ্ট্র এবং সরকার ঠিকিয়ে রাখার জন্য দরকার হয় আইন, আদালত, পুলিশ, গুপ্তচর, মিথ্যাচার, খুন গুম, দুর্নীতি  ইত্যাদির।

আমরা এখন  যে ব্যবস্থার অধিনে বসবাস করছি সেই ব্যবস্থায় আমাদের সামাজিক অনুভূতির বিকাশ বাঁধা প্রাপ্ত হয়। আমরা সকলেই জানি যে, আমাদের সত্যিকার বিকাশের জন্য দরকার হলো পারস্পরিক শ্রদ্বা, ভালবাসা, একে অন্যকে সহযোগিতা ইত্যাদির। এই গুনাবলী গুলো ছাড়া মানব জাতির সিত্যিকার বিকাশ সম্ভব নয়। প্রানি জগতে একে অন্যকে সহযোগীতার বদলে হত্যা, বিতারন, ও ধবংসের কারনে এদের বিকাশ হয় না। আমাদের রাজ শক্তির নিকট মানবিক গুনাবলীর কোন মূল্য নেই। তাঁরা নিজেদের স্বার্থে ভূয়া বিজ্ঞান তৈরী করে প্রচার করে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কিছু যুক্তি দাঁড় করায়।

কিছু নীতি বাক্য তৈরী করে জনগণের মাঝে প্রচারের চেস্টা করে, কেহ গ্রহন করে আবার নিজেদের মাঝে প্রচার ও করে আবার কেহ কেহ করে ও না । জনগনের মতামত নিজেদের পক্ষে রাখার জন্য নানা প্রকার চাতুরীর আশ্রয় নেয়। মানবিক গুনাবলীর দিক গুলো সামনে এলেই তাঁরা বলতে থাকে, “এগুলো হলো কবিতা আর সাহিত্যের কথা”। এই গুলি বাস্তব সম্মত নয়। আমরা দৃঢ় ভাবে বলি সভ্য দুনিয়ায় আমরা ও সত্য মিথ্যার পার্থক্য বুঝি। এমন কি আমাদের শিশুরা ও ভন্ডামী বুঝতে পারে। ভন্ডদের দ্বিমূখী নীতি সকলের কাছে পরিস্কার হয়ে আছে। যেহেতু আমাদের চিন্তা শক্তি মিথ্যা দ্বারা আক্রান্ত, তাই অনেক সত্য বিষয় নিয়ে ও নিজেরাই নিজেদের সাথে প্রতারনা করা হয়ে যায় । এখন ভন্ডমী প্রচলিত সভ্যতার দ্বিতীয় চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু সমাজ মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা; তাকে অবশ্যই সত্যের পথে ফিরে আসতে হবেঃ

এক সময় সামাজিক ভাবে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেখানে একপেশে ভাবে সামাজিক রীতিনীতি গড়ে উঠতে থাকে। যখন সমাজ ধবংসের মুখোমুখী হয় - তখন তা আবার তার মৌলিক চরিত্রের দিকে ফিরে যায়ঃ যৌথভাবে উৎপাদন করতে সকলেই একত্রে মিলিত হয়, সকল উৎপাদিত পন্য দ্রব্যের মালিক সমগ্র জাতিরই হওয়া উচিৎ। ব্যাক্তিগত মালিকানা বিলুপ্তি আসলে একটি সামগ্রীক সেবা ধর্মী পদক্ষেপ মাত্র। যেখানে সকলেই সকল কিছুর মালিক হয়। সকল কিছু সকল মানুষের জন্য, সকল মানুষের ই চাহিদা আছে, সকল মানুষ তাদের সামর্থ মত কাজ করবেন, কে কোন মাত্রায় উৎপাদন প্রক্রিয়া ভূমিকা রাখছেন তা পরিমাপ করা কোন ভাবেই সম্ভব নয় বিধায় তা বিশ্ব সম্পদের অংশ হিসাবে বিবেচিত হলেই সকল দিক থেকে কল্যান কর ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা যায়।

সকল কিছু সকল মানুষের জন্য। দুনিয়ায় বহু যন্ত্রপাতি এখন মজুদ আছে;  আমরা দেখছি লোহা ও ইস্পাতের যন্ত্রপাতি, প্লেন, স্প্যান, একটির সাথে অন্যটি যুক্ত, কিছু তৈরী করা আবার কিছু এখনো তৈরী হয় নাই। নানা উপকরন নিয়ে আরো কিছু তৈরীর আয়োজন চলছে। এখানে কেহই বলতে পারবেন না যে, “ এই মেশিনটি আমার, যদি তুমি আমার মেশিনটি ব্যবহার কর তবে তোমাকে মূল্য দিতে হবে”। মধ্য যুগে সামন্ত প্রভূগন কৃষকদেরকে বলতেন, “এই পাহাড়, এই ঘাস, এই রাস্তা, এই ভূমি আমার – এখানে তুমি ফসল ফলাতে চাইলে আমাকে মুনাফা বা কর দিতে হবে”।

সকল কিছুই সকলের জন্য ! প্রতিটি নারী পুরুষের কাজের জন্য তাদের ন্যায্য পাওনা পাওয়ার অধিকারী। তাঁরা যা যা উৎপাদন করেন তার উপর তাদের অবশ্যই অংশীদারিত্ব আছে। তাদের অংশ তাঁরা পেলে তাদের জীবন যাত্রা উন্নত হবে। “ কাজ করার অধিকার” বা “ যা আছে সবই তাদের কাজের ফল”- এই রকমের অস্পস্ট সূত্র আর নয়। আমরা যা দাবী করি তা হলো- ভালো থাকার অধিকার; ভালো থাকার জন্য সকলের অধিকার চাই !

নোটঃ

১। আন্তর্জাতিক প্যারিস প্রদর্শনী ১৮৮৯ এবং ১৯০০ ইংরেজী।

0 Comments 0 Comments
0 Comments 0 Comments