গণ-মানুষের অর্থনীতি

গণ-মানুষের অর্থনীতি

আসিফ আযহার

পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে, অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকা কী এবং আমরা এটাও দেখেছি যে, সরকারের এই ভূমিকা অর্থনীতির অস্তিত্বের জন্য অনিবার্য কোন শর্ত নয়। সরকার কোন কিছু উৎপাদন করে না। সরকারের কাজ শুধু নিয়ন্ত্রণ করা। সমাজের মানুষের প্রয়োজনেই যে অর্থনীতির জন্ম হয় তাতে সরকার কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে মাত্র- সরকার অর্থনীতির স্রষ্টা নয়। একারণে সরকার না থাকলেও যে অর্থনীতি টিকে থাকবে- তা বলে দেওয়া কঠিন কোন কাজ নয়।

সরকার লোপ পেলে অর্থনীতির ওপর থেকে কেবল সরকারি নিয়ন্ত্রণটুকুই সরে যাবে- অর্থনীতি অচল হয়ে যাওয়ার কোন আশংকা নেই। সকল উৎপাদনের মূলে রয়েছে শ্রম আর সরকারের কাজ হল যারা শ্রম দেয় তাদেরকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে মালিকপক্ষকে সহায়তা দেওয়া। এরকম একটি কর্তৃত্ববাদী ও জবরদস্তিমূলক শক্তি না থাকলে যে সমাজের উৎপাদন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে- তা ভাবার কোন কারণ নেই। সরকারের উপস্থিতির কারণেই যে সমাজে উৎপাদন চালু রয়েছে- তা নয়।

এখন প্রশ্ন হল, যদি সরকারের স্থলে গণ-মানুষের ফেডারেশন সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে তাহলে সে সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা কেমন হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে সর্বাগ্রে বলতে হবে, গণ-মানুষের অর্থনীতিতে কোন মুনাফার অবকাশ থাকবে না। আর যদি মুনাফার অবকাশ না থাকে তাহলে সে সমাজের অর্থনীতি কেমন হবে তা উপলব্ধি করা তেমন কোন কঠিন কাজ নয়। মুনাফা না থাকলে অর্থনীতি কোন পথে চলবে তা খতিয়ে দেখা যাক।

মুনাফা না থাকলে প্রথমেই যা ঘটবে তা হল- অন্যায় বিলাসীতা বিলুপ্তি লাভ করবে। একটি দেশের অর্থনীতিতে যে বিরাট মুনাফা সৃষ্টি হয় তার পুরোটাই যে পুঁজি হিসেবে আবার উৎপাদনক্ষেত্রে চলে যায়- তা নয়। মুনাফার একটি বড়ো অংশই ব্যবহৃত হয় ভোগের পেছনে। এই ভোগকে বিলাসীতা বলতে হবে। কারণ- উৎপাদিত সম্পদের ন্যায্য বন্টন হলে সবাই যতটুকু ভোগ করতে পারত, এই ভোগ তার চেয়ে অনেক বেশী ব্যয়বহুল। সমাজের সকল সম্পদের সমবন্টন হলে যে ভোগ সম্ভব হতো তার চেয়ে বেশী ভোগ মানেই বিলাসীতা।

ধরুন, একটি সমাজে দশ লক্ষ কোটি টাকার পুঁজি রয়েছে। আবার ঐ সমাজের জনসংখ্যাও হল দশ লক্ষ। এবার ধরুন, ঐ সমাজের সকল পুঁজির ওপর সবার সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হল এবং মুনাফাও উঠিয়ে দেওয়া হল যাতে কারও হাতে অতিরিক্ত পুঁজি জমা না হয়। এমতাবস্থায় প্রত্যেকের পুঁজির পরিমাণ কত হবে? এক কোটি টাকা। এই এক কোটি টাকার পুঁজি থেকে যে আয় হবে তার পুরোটা যদি কেউ ভোগের পেছনে ব্যয় করে তাহলে কি সেটা বিলাসীতার পর্যায়ে পড়বে?

না। এটাকে বিলাসীতা বলা যাবে না। কারণ- এখানে কেউ কারও হক কেঁড়ে নিচ্ছে না এবং কোন শোষণও ঘটছে না। শোষণমুক্ত ভোগ যদি বল্গাহীন হয়েও যায় তাহলে তার অন্ততঃ একটা ন্যায্য ভিত্তি থাকে। সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে যে, সমাজের সম্পদ সত্যিই অবিশ্বাস্য আকার ধারণ করেছে এবং এর সমবন্টন হওয়ায় সবাই অনেক বেশী ভোগ করতে পারছে। এই ভোগ বিলাসীতা নয়। কারণ- এই ভোগের সামর্থ্য সমাজের সবার হাতেই তোলে দেওয়া হয়েছে।

সেই ভোগকেই বিলাসীতা বলতে হবে যে ভোগের সামর্থ্য অর্জিত হয় শোষণের পথ ধরে। সমাজের একটি বড়ো অংশের কাছে যে ভোগ অকল্পনীয় সেটাই হল বিলাসীতা। বিলাসীতার ক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, অতীতে যা ছিল বিলাসীতা বর্তমানে তা বিলাসীতার কাতারে না-ও পড়তে পারে। কারণ- অতীতের তুলনায় শোষিত শ্রেণিরও কিছুটা সামর্থ্য বেড়েছে- যদিও শোষকশ্রেণির চেয়ে তা নিতান্তই অল্প।

একশ’ বছর আগের বিলাসীতার কিছু দিক বর্তমান শোষিত শ্রেণির আওতার মধ্যেই পড়ে যেতে পারে। তাই এগুলোকে এখন আর বিলাসীতা বলা যাবে না। কিন্তু এতে যে সমাজে বিলাসীতা কমে গেছে- তা নয়। বরং বিলাসীতার এমন হাজারও নতুন উপায় বেরিয়েছে যা বর্তমান শোষিত শ্রেণির ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এসব বিলাসীতার অনেকগুলোই হল প্রকৃতি ধ্বংসকারি। বর্তমান বিশ্বের ধনীক সমাজের বল্গাহীন বিলাসীতা পৃথিবীর জলবায়ু এবং প্রকৃতিতে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে।

যদি আজ থেকে মুনাফার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে তা পৃথিবীর প্রাণ-প্রকৃতি ও জলবায়ুর জন্য যে অবিশ্বাস্য সুফল বয়ে আনবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। মুনাফা ধনীদেরকে আরও ধনী বানায় এবং শ্রমজীবীদেরকে একই অবস্থায় রেখে দেয়। এর ফলে ধনী এবং শ্রমজীবীদের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়ে যায়। এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে বিলাসীতা। প্রকৃতি বিধ্বংসী এসব বিলাসীতার পথ বন্ধ করার একমাত্র উপায় হল- মুনাফা বিলুপ্ত করা।

মুনাফা বিলুপ্ত করার সাথে সাথেই বিলাসীতা যেমন বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করবে তেমনি বিলাসীতা উৎপাদনের অবকাঠামোগুলোতেও পরিবর্তন আসবে। বিরাট আকারের যে পুঁজি বিলাসীতা উৎপাদনে ব্যবহৃত হতো তা এখন গণ-প্রয়োজন মেটানোর দিকেই ধাবিত হতে বাধ্য। কারণ-মুনাফা না থাকায় একদিকে যেমন বিলাসীতার চাহিদা কমতে থাকবে তেমনি অন্যদিকে গণ-মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সেবার চাহিদা বাড়তে থাকবে।

এটা হল- বিলাসীতার পতনের যুগপৎ প্রভাব। কারণ- মুনাফার যে অর্থ আগে পুঁজিপতিদের পকেটে চলে যেতো তা এখন চলে যাবে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের পকেটে। এতে যা ঘটবে তা হল- আগে যেভাবে মুনাফার একটি অংশ নতুন পুঁজি হিসেবে আবার উৎপাদনক্ষেত্রে চলে যেতো তেমনি বর্তমান পারিশ্রমিকেরও একটি অংশ নতুন পুঁজি হিসেবে উৎপাদনক্ষেত্রে যুক্ত হবে। আবার, আগে যেভাবে মুনাফার আরেকটি অংশ বিলাসীতায় ব্যবহৃত হতো তেমনি বর্তমান পারিশ্রমিকেরও আরেকটি অংশ গণ-চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হবে।

ব্যাপারটাকে সংক্ষেপে বলা যায়- যদি মুনাফা উঠিয়ে দেওয়া হয় তাহলে উৎপাদিত সম্পদের বড়ো অংশটি কতিপয় মানুষের পকেটে পুঞ্জীভূত না হয়ে সমাজের একটি বড়ো অংশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। এতে বিলাসদ্রব্যের চাহিদা কমে যাবে এবং স্বাভাবিক দ্রব্যের চাহিদা বেড়ে যাবে। এর ফলে বিলাসদ্রব্য উৎপাদনে পুঁজির বিনিয়োগও কমে যাবে এবং গণ-চাহিদা পূরণে পুঁজির ব্যবহার বেড়ে যাবে। আগে যেভাবে মুনাফার একটি অংশ নতুন পুঁজি হয়ে উৎপাদনক্ষেত্রে প্রবেশ করত তেমনি বর্তমান পারিশ্রমিকেরও একটি অংশ নতুন পুঁজি হয়ে উৎপাদনক্ষেত্রে প্রবেশ করবে।

আগে যেমন পুঁজিপতিরা তাদের মুনাফার অর্থ দিয়ে কেবল ভোগই করত না, পুঁজি হিসেবেও তা কাজে লাগাত- তেমনিভাবে শ্রমজীবী মানুষও এখন তাদের আয়ের পুরোটা খেয়ে না ফেলে একাংশ পুঁজি হিসেবে কাজে লাগাবে- এটাই স্বাভাবিক। এর ফলে সমাজের মোট পুঁজি আগে যেভাবে প্রতিনিয়তই বেড়ে চলত তেমনি এখনও তা প্রতিনিয়তই বাড়তে থাকবে। পার্থক্যটা হবে শুধু পুঁজির বিনিয়োগক্ষেত্রে। আগে বিলাসীতার চাহিদা পূরণে নিয়োজিত শিল্পগুলো যেমন বিকাশমান ছিল তেমনি এখন স্বাভাবিক গণ-চাহিদা পূরণে নিয়োজিত শিল্পগুলো বিপুল বেগে বিকাশ লাভ করবে।

অর্থাৎ অর্থনীতি আগেও যেমন বিকাশমান ছিল এখনও তা তেমনই বিকাশমান থাকবে। আয়-উৎপাদন-পুঁজি সবই থাকবে, কেবল মালিকানায় পরিবর্তন আসবে। মুনাফা না থাকায় পুঁজির মালিকানা অল্প লোকের হাতে না গিয়ে গণ-মানুষের হাতে চলে আসবে। এর ফলে উৎপাদন শিল্পে নিয়োজিত পুঁজি গণ-পুঁজির চেহারা ধারণ করবে। এই গণ-পুঁজি ২০-৩০ বছর সময়ের মধ্যে এতোটাই ব্যাপক আকার ধারণ করবে যে, এই গণ-পুঁজিই অতীতের অনেক বিলাসদ্রব্য উৎপাদনে সক্ষম হয়ে যাবে। কিন্তু সবার সামর্থ্যের মধ্যে থাকায় তখন তা আর বিলাসদ্রব্যের সংজ্ঞায় পড়বে না।

মুনাফা না থাকলে কীভাবে পুঁজির মালিকানায় এবং ভোগের বেলায় পরিবর্তন আসবে তা আমরা দেখলাম। এবার দেখা যাক, মুনাফার বিলুপ্তিতে অর্থনীতির পরিচালনায় কী পরিবর্তন আসে। বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতি পরিচালনা করছে কারা? এর সহজ উত্তর হল- যাদের হাতে পুঁজি রয়েছে তারাই অর্থনীতি পরিচালনা করছে। পুরো অর্থনীতির পরিচালনায় রয়েছে পুঁজি মালিকদের বেশ কিছু ‘কোম্পানি’। একটি দেশের পুরো শিল্প উৎপাদনের নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও সাফল্যের পেছনে রয়েছে কয়েক হাজার কোম্পানি।

যদি মুনাফা বিলুপ্তি লাভ করে তাহলে অর্থনীতি পরিচালনা করবে কে? এর উত্তরও সহজ- যাদের হাতে পুঁজি থাকবে তারাই অর্থনীতি পরিচালনা করবে। মুনাফা না থাকলে পুঁজির মালিকানা চলে যাবে শ্রমজীবী জনসাধারণের হাতে। আর পুরো অর্থনীতি পরিচালনা করবে এই শ্রমজীবীদের বেশ কিছু ‘সিন্ডিকেট’। একটি দেশের পুরো শিল্প উৎপাদনের নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও সাফল্যের সাথে জড়িত থাকবে কয়েক হাজার সিন্ডিকেট।

একেকটি কোম্পানিতে যেভাবে একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায় আগ্রহী অনেক পুঁজিপতি এসে জড়ো হয় তেমনি একেকটি সিন্ডিকেটে যুক্ত থাকবে একটি নির্দিষ্ট শিল্পের সাথে জড়িত সকল কর্মজীবী মানুষ। একেকটি কোম্পানির মধ্যকার অনেক শেয়ার মালিক যেভাবে নিজেদের মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষা করে চলে এবং অভিন্ন স্বার্থে সবাই একসাথে কাজ করে তেমনি একেকটি সিন্ডিকেটের সকল সদস্যও নিজেদের মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষা করবে এবং অভিন্ন স্বার্থে সবাই একসাথে কাজ করবে।

অর্থনৈতিক স্বার্থ যেভাবে একটি কোম্পানির শেয়ার মালিকদের মধ্যে ঐক্য ও শৃঙ্খলা এনে দেয় তেমনি একটি সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যেও ঐক্য ও শৃঙ্খলা এনে দেবে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ। একটি কোম্পানির শেয়ার মালিকদের মধ্যে বিরোধ বাঁধলে যেভাবে তার সমাধানের পথ বের করা হয় সেভাবে একটি সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যেও বিরোধ বাঁধলে তার সমাধানের পথ ঠিকই বেরিয়ে আসবে।

ঐক্য, বিরোধ, শৃঙ্খলা, বিশৃঙ্খলা- সবকিছু নিয়েই যদি পুঁজিবাদী সমাজ টিকে থাকতে পারে তাহলে গণ-মানুষের সমাজও তার সীমাবদ্ধতাগুলো নিয়ে যে টিকে থাকতে পারবে- তা বলে দেওয়া কঠিন কিছু নয়। শোষণের মতো একটি অস্বাভাবিক ব্যাপারকে আমরা চরম সত্য বলে মনে করি বিধায় এটা ছাড়া কোন সমাজের কথা কল্পনা করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। একটি দেশের পুঁজিপতি শ্রেণির সবার মধ্যে যে চেনা-জানা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক রয়েছে- তা নয়।

পুঁজিপতি শ্রেণির মধ্যে মানুষের সংখ্যা কয়েক হাজার- কয়েক লক্ষ কিংবা কোন দেশে তা এক মিলিয়নেরও বেশী হতে পারে। তাহলে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকে কীভাবে? এর উত্তর হল- তারা সবাই একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে অনুসরণ করে। নিজেদের স্বার্থেই তারা এই পদ্ধতিকে অনুসরণ করে। অনুরূপভাবে যদি কর্মজীবী মানুষদের হাতে সমাজ পরিচালনার ভার চলে আসে তবে তারাও একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতেই সমাজ পরিচালনা করবে এবং সবাই সে পদ্ধতিকেই অনুসরণ করবে।

একটি কোম্পানির বোর্ড মিটিংয়ে যে সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয় তা কোম্পানির সকলের স্বার্থেই গৃহীত হয়। একটি সিন্ডিকেটের সভায় যে সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হবে তা সিন্ডিকেটের সকল সদস্যের স্বার্থেই যে গৃহীত হবে- তা বলে দেওয়া কঠিন কিছু নয়। ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে উন্নত বিশ্বে যেসব শ্রমিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল সেগুলো যদি ‘সংসদীয় পথে সরকার’ গঠনের বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারত তাহলে আজকে হয়তো এসব সিন্ডিকেটই হয়ে উঠত আধুনিক অর্থনীতির প্রাণ।

পুঁজিবাদী অর্থনীতির পরিচালনায় পুঁজি মালিকদের কোম্পানিগুলোর যেমন সফল ভূমিকা রয়েছে তেমনি পুঁজিবাদী সরকারেরও কিছুটা ভূমিকা রয়েছে। তবে সরকার সরাসরি অর্থনীতি পরিচালনা করে না; সরকার অর্থনীতিকে কেবল ‘নিয়ন্ত্রণ’ করে মাত্র। পুঁজিপতিদের কোম্পানিগুলো স্ব স্ব ক্ষেত্রে উৎপাদন পরিচালনা করলেও সারা দেশের উৎপাদনের মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করে সরকার। একই সাথে পুঁজিপতিদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারের প্রয়োজন।

কারণ- কোন একটি কোম্পানির পক্ষে সশস্ত্র বাহিনী পোষা সম্ভব নয় এবং শ্রমিকদের বিদ্রোহ দমন করা সম্ভব নয়। পুঁজির মালিকানা রক্ষা, মুনাফা বজায় রাখা এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের মতো কাজ কোন কোম্পানির পক্ষে একা সম্ভব নয়। এছাড়াও দুটি কোম্পানির মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও সরকারের প্রয়োজন। তাই নিজেদের নিরাপত্তা, স্বার্থ ও কর্তৃত্ব রক্ষায় সকল কোম্পানিকে একজোট হতে হয়। সবার ক্ষমতাকে এক জায়গায় এনে তারা যে সংগঠন গড়ে তোলে সেটিই সরকার।

সরকার থাকার ফলে একেকটি কোম্পানিকে নিরাপত্তা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয় না। সরকারি বাহিনী যেকোন সময়ে যে কাউকে বড় ধরণের নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত থাকে। তাই এধরণের নিরাপত্তার জন্য প্রত্যেককে আর আলাদাভাবে বড়ো অংকের খরচে যেতে হয় না। সরকারি বাহিনীর এক খরচেই সকলের নিরাপত্তা রক্ষা হয়ে যায়। সকলে মিলে সরকারের এসব খরচ বহণ করায় কারও একার ওপর   তেমন চাপ পড়ে না। সকলেরই সামান্য সামান্য ট্যাক্সের টাকায় সরকার এবং সরকারি বাহিনী পরিচালিত হয়।

আমরা জানি যে, যদি মুনাফা বিলুপ্তি লাভ করে তাহলে পুঁজিপতিদের কোম্পানিগুলোও উঠে যাবে। সেক্ষেত্রে সরকারের কী হবে? হ্যাঁ। সরকারও উঠে যাবে। কারণ- পুঁজিপতিদের কোম্পানিগুলোই যদি না থাকে তাহলে কার নিরাপত্তার জন্য সরকার গঠিত হবে? আর সরকার গঠন করবেই বা কে? যে জনতাকে দমনের জন্য সরকার গঠিত হয়েছিল সেই জনতা আবার কাকে দমনের জন্য একটি সরকার চালু করবে?

হ্যাঁ, আপনার কাছে মনে হতে পারে- এই জনতার মধ্যেও তো শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একটি সরকারের প্রয়োজন। কিন্তু আসলেই কি এজন্য কোন ‘সরকারের’ প্রয়োজন? স্বাধীন জনতার মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষার মতো একটি মামুলী কাজের জন্য কি সরকারের মতো এতো বৃহৎ একটি শক্তির প্রয়োজন আছে? আপনি কি মনে করেন না যে, পুঁজিবাদী সরকার যে ‘শৃঙ্খলা’ রক্ষা করত তা ছিল মূলত একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে শক্তি দিয়ে দমনেরই অপর নাম?

স্বাধীন জনতার মধ্যে মামুলী অপরাধ ঠেকানোর জন্য কি এতোবড়ো দমনমূলক শক্তির প্রয়োজন আছে? ছোটখাটো অপরাধ দমন ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সরকারের মতো এতো বিশাল, এতো ব্যয়বহুল এবং এতো সশস্ত্র একটি সংগঠনের আদৌ কোন প্রয়োজন নেই। যে সরকার লক্ষ লক্ষ মানুষ কিংবা কোটি কোটি মানুষের আন্দোলনকে উপড়ে ফেলার ক্ষমতা রাখতো সেই সরকারকে কি বাঁচিয়ে রাখতে হবে মাত্র কয়েকশ’ কিংবা কয়েক হাজার অপরাধী দমনের জন্য?

তাই এটা খুবই স্পষ্ট যে, যদি চলমান অর্থনীতি থেকে মুনাফা বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে এর সাথে পুঁজিপতি শ্রেণি, তাদের কোম্পানিসমূহ এবং সরকারও বিলুপ্তি লাভ করবে। এক্ষেত্রে আরও কিছু প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। যেমন: শৃঙ্খলা রক্ষা এবং দমন-পীড়ন ছাড়াও তো সরকারের আরও কিছু কাজ থাকে। যেমন- সারা দেশের অর্থনীতির মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং উন্নয়নমূলক কাজ যেমন- রাস্তা-ঘাট-বিদ্যুৎ-বন্দর-শিক্ষা-স্বাস্থ্য প্রভৃতি বিষয়েও তো সরকারের কাজ রয়েছে।

সরকার না থাকলে এসব দেখবে কে? হ্যাঁ, সরকার না থাকলে এসব দেখা-শুনার জন্য একটি বড়ো-সড়ো সংগঠনের প্রয়োজন আছে বৈ কি। কিন্তু এসবের জন্য কোনভাবেই সরকারের মতো ভয়ংকর একটি সংগঠনের প্রয়োজন নেই। এসব কাজ এবং বাকী কাজগুলো করার জন্য যা করতে হবে তা হল- সকল সিন্ডিকেটকে একসাথে মিলে একটি বড় ধরণের সংগঠন গড়ে তোলতে হবে।

এ ধরণের গণ-সংগঠনের নাম কী হতে পারে তা আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়ে জেনেছি। ঊনিশ শতকের গোড়ায় উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকরা যেসব প্রাথমিক সংগঠন গড়ে তোলত সেগুলোকে বিভিন্ন নামে ডাকা হতো। যেমন- ফ্রান্সে এগুলোকে বলা হতো ‘সিন্ডিকেট’, ইংল্যান্ড-আমেরিকায় বলা হতো ‘ট্রেড ইউনিয়ন’। একেকটি দেশের সিন্ডিকেটগুলো কিংবা ট্রেড ইউনিয়নগুলো একসাথে মিলে গঠন করতো ‘ফেডারেশন’ বা ‘কন-ফেডারেশন’।

বর্তমান বাংলাদেশ বা ভারতবর্ষে এ ধরণের ফেডারেশনে শ্রমিক সংগঠনগুলো ছাড়াও মধ্যবিত্তদের অংশগ্রহণের বেশ সম্ভাবনা রয়েছে। শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত তথা সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের হাতে গড়ে ওঠা এমন গণ-সংগঠনকে আমরা গণ-ফেডারেশন বলে অভিহিত করতে পারি। সারা দেশের অর্থনীতির মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং উন্নয়নমূলক কাজগুলো করার জন্য গণ-মানুষের এমন ফেডারেশন যথেষ্ট নয় কি?

যদি সরকারগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে জাতীয় সীমারেখাগুলোও বিলুপ্তি লাভ করবে। পৃথিবীতে যতগুলো মিথ্যা জিনিস রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর মিথ্যাগুলোর একটি হল এই জাতীয়তাবাদী সীমারেখা। এই সীমারেখা আজকের যুগে একেবারেই অযৌক্তিক এবং অপ্রয়োজনীয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়- দুটি পাশাপাশি দেশের সরকারের মধ্যে যেমন কোন বিরোধ নেই তেমনি ঐ দুটি দেশের জনগণের মধ্যেও কোন বিরোধ নেই।

তবুও দুটি দেশ আলাদাই থাকে। এর কারণ- ক্ষমতা। দুটি দেশের মালিকশ্রেণির মধ্যে যারা ক্ষমতায় আছে এবং যারা ক্ষমতায় আসি আসি করছে তারা কোনভাবেই দু’দেশকে এক হতে দেবে না। কারণ- এক দেশ হলে তো আর দুটি সরকার থাকবে না, একটি সরকার এবং একজন সরকারপ্রধানই থাকবেন। দুটি দেশের কোন সরকারপ্রধানই ক্ষমতা ছাড়তে চাইবেন না এবং তাদের সরকারের বাকী লোকগুলিও অন্যপক্ষের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে চাইবে না।

গণ-মানুষের ফেডারেশনগুলি যদি স্বাধীনতা আদায় করতে পারে অর্থাৎ সরকারকে সরিয়ে দিয়ে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে পারে তাহলে দুটি দেশের দুটি ফেডারেশন মিলে একটি ফেডারেশনে পরিণত হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। আবার কয়েকটি ফেডারেশন মিলে কনফেডারেশনও গঠন করতে পারে। অন্যদিকে, একটি বড়ো দেশে স্বাধীনতার আগে এবং পরেও একাধিক ফেডারেশনের অস্তিত্ব থাকতে পারে।

ক্ষমতার বিষয়টি না থাকায় কোনো একটি ফেডারেশন কত বড় কিংবা ছোট হবে- তাতে কিছু যায় আসে না। আবার কোনো ফেডারেশনের কার্যাবলী কতবড় অঞ্চলে চালু রয়েছে- সেটাও কোন ব্যাপার নয়। কারণ- এখানে ক্ষমতার কিছু নেই। অবশ্য অতীত এবং বর্তমানের অনেক শ্রমিক সংগঠনকেই ক্ষমতার বিষয়টি থেকে মুক্ত ভাবা যাবে না। অতীতে অনেক বড় বড় শ্রমিক ফেডারেশন ক্ষমতার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে পথ হারিয়েছে।

সরকার এবং ক্ষমতার বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত গণ-ফেডারেশন ছাড়া অন্য কোন সংগঠন কখনোই ন্যায়ের দাবীগুলো পূরণ করতে পারবে না। বিশেষ কারও স্বার্থরক্ষার ব্যাপার না থাকায় একটি গণ-ফেডারেশন অর্থনৈতিক নীতি ও সিদ্ধান্ত প্রণয়নের বেলায় সর্বোচ্চ মাত্রায় গণ-কল্যাণ ও গণস্বার্থের প্রতিফলন ঘটাতে পারবে। বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটবে। সরকার নয়, একটি স্বাধীন গণ-ফেডারেশনের হাতেই গড়ে উঠতে পারে একশ’ ভাগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ একটি বিচারব্যবস্থা।

মানুষের ইতিহাস আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে- ক্ষমতা দিয়ে কভূ কল্যাণ ও ন্যায়বিচার কায়েম হয়নি। তাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মিথ্যা প্রকল্পের নাম হল সরকার। বিগত সাড়ে পাঁচ হাজার বছর ধরে সরকার টিকে আছে কেবল শক্তি ও সন্ত্রাসের ওপর নির্ভর করেই। উদ্ভবের সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অন্যায়, সবচেয়ে বেশি অপরাধ করেও সরকার এক মহান ও পবিত্র সংগঠন হিসেবে সমাজের বুকে চেপে বসে আছে।

সন্ত্রাস-নিপীড়ন-অন্যায়-অত্যাচারের এক মহান দূর্গ হল সরকার যার গাঁয়ে আঁচড় বসানোর চিন্তাও ছিল পাপ। হত্যা-শোষণ-লুণ্ঠন-যুদ্ধ-রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞ হল সরকারের ধর্ম। কল্যাণের সাথে এর সম্পর্ক খুবই দূর্বল। কেবল এসবেই শেষ নয়, সরকার যাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে তাদেরকে মানসিক ক্রীতদাসেও পরিণত করেছে। তাই মানুষের মগজে, বুদ্ধিজীবীদের মননে, বিপ্লবীদের চিন্তায় হাজার হাজার বছর ধরে কিলবিল করছে কেবল সরকারবাদ। সমাজে সরকারের প্রয়োজন নেই- এমন কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারে না।

সরকারবিহীন সমাজ আরও বেশি সংগঠিত-সুশৃঙ্খল-স্বনির্ভর ও অপরাধমুক্ত কীভাবে হতে পারে তা অনেক মানুষেরই বোধগম্য নয়। এজন্য অধিকাংশ মানুষের কাছে সরকারহীনতা হল এক ধরণের ভীতিকর শব্দ। সরকারহীনতাকে মানুষ ভয় পায়, অর্থাৎ নিজেদেরকেই ভয় পায়। নিজেদের ভয়েই মানুষ ভাবে, সরকার নামক এক অপ্রয়োজনীয় দানবকে পাহারায় রাখা প্রয়োজন। অথচ সরকার নামক দানবের হাতে পৃথিবী কয়বার ধ্বংস হয়েছে, যুদ্ধ ও হত্যাযজ্ঞ পৃথিবীকে কয়বার খালি করে ফেলেছে- তার হিসেব অধিকাংশ মানুষই জানে না।

এই সহজ সত্যটুকু অনেকেই বুঝে না যে, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অসংখ্য শাসকের ছড়াছড়ি রয়েছে যাদের মধ্যে কেবলমাত্র একজন শাসক যত মানুষকে হত্যা করেছে তা সরকারবিহীন সমাজের লক্ষ বছরের ইতিহাসেও সম্ভব নয়। কারণ হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য যে অস্ত্র প্রয়োজন, যে সেনাবাহিনী প্রয়োজন, যে স্বার্থ প্রয়োজন- তার কোন অস্তিত্বই সরকারবিহীন সমাজে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবুও ভয় সরকারহীনতাকে নিয়েই, সরকারকে নিয়ে নয়।

সরকার সম্পর্কে আরও একটি বহুল প্রচলিত বিভ্রান্তি হল অত্যাচারী সরকার বিলুপ্ত করে ভালো সরকার গঠনের চিন্তা। এ চিন্তাধারা হল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যর্থ ও বিপর্যয়কর চিন্তাধারার একটি। সরকারবাদী সামরিক কর্তৃত্ব আর সরকারি শাসনক্ষমতা পৃথিবীতে কোন পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়নি। তাই ঐতিহাসিকভাবেই পৃথিবীতে এখন সমাজ বদলের সর্বশেষ যে রূপরেখাটি বাকী রয়েছে সেটি হল সরকারবিহীন সমাজের রূপরেখা। অন্তত একবার আমাদেরকে সরকারবাদী সমাজের বাইরে গিয়ে দেখা উচিত আদৌ সমাজের জন্য সরকারের মতো দমনমূলক সংগঠনের প্রয়োজন আছে কিনা।

0 Comments
Loading...