কর্মক্ষেত্রে সংগঠনঃ কিছু মৌলিক নীতিমালা(Organising at work: some basic principles)

কর্মক্ষেত্রে সংগঠনঃ কিছু মৌলিক নীতিমালা(Organising at work: some basic principles)

একজন সফল সংগঠনকারীর জন্য অনুসরনীয় কতিপয় মৌলিক নীতিমালার একটি তালিকা নিচে প্রদান করা হলোঃ

কর্তৃপক্ষকে প্রশ্নঃ

মানুষ যখন কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করতে শুরু করে তখনই সংগঠিত করতে শুরু করুন । “তাঁরা আমাদের সাথে কি করছেন? তাঁরা আমাদের সাথে এমন করছেন কেন?  তারা যা যা করছেন তা কি সঠিক?” মানুষকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করুন।“কে বা কারা সিদ্বান্ত গ্রহন করেন, তাঁরা সেই সিদ্বান্ত মানতে আমাদেরকে বাধ্য করে, আর কেনই বা এই পরিস্থিতি আমাদেরকে মেনে চলতে হচ্ছে?” মানুষের এই ধরনের বিধি মানা উচিৎ নয়, কেননা সেই সকল সিদ্বান্ত গ্রহন করেন কেবল কর্তৃপক্ষ। এর সাথে মানুষের কোন সম্পৃক্ততা নেই । এই ধরনের কর্তৃপক্ষ হতে পারে সরকার, বস, ইউনিয়ন – বা আপনি নিজে। একজন কার্যকরী সংগঠক সকল সময়ই তার অনুসারী কর্মীদেরকে নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে উৎসাহিত করবেন।

জনে জনে কথা বলুন !

যে কোন অভিজ্ঞ সংগঠকই জানেন যে, “ জনে জনে ব্যাক্তিগত ভাবে আলোচনা করা সর্বদাই বেশী কার্যকরী হয়”। লিফলেট বিতরন করা দরকার আছে, সভা করা গুরুত্বপূর্ন, র‍্যালী করা ও ভালো, তবে কোন কিছুই ব্যাক্তিগত সাক্ষাৎকারের মত এত কার্যকরী নয়। যখন ক্রমাগত ভাবে আপনি আপনার সহ কর্মীর কথা গুলো শোনবেন এবং প্রয়োজন মত জবাব দিবেন তখন তাকে দলবদ্ব করা অনেক বেশী কার্যকর হবে। যখন আপনি নাসিমার সাথে কথা বলবেন তখন তার ভয় ধীরে ধীরে দূর হবে, তার আত্মবিশ্বাস বৃদ্বি পাবে। তাকে সভায় যোগদিতে আমন্ত্রণ জানান। তাকে র‍্যালীতে আসতে বলতে পারেন- এই ভাবেই ক্রমাগত সংঠনের কাজ এগিয়ে যাবে।

প্রাকৃতিক সংগঠকদেরকে খোঁজে বেড় করুন !

প্রতিটি কর্মক্ষেত্রেই সহ কর্মীদের মাঝে  কিছু সামাজিক দল বা গ্রুপ আছে । প্রতিটি গ্রুপেই কিছু মতামত গঠনকারী, প্রকৃতিক সংগঠক ও কতিপয় উৎসাহদাতা থাকেন। তাদের অনেকেই আছে যারা কেবল বলেন না অন্যদের কথা ও শোনেন এবং সম্মান করেন।  যদি তাদেরকে আপনি নিজের মতের সাথে যুক্ত করতে পারেন তবে বুঝবেন আপনি অনেক বড় কাজ করে ফেলেছেন বা অনেক দূর এগিয়ে গেছেন।

লোকদেরকে কাজে জড়িত করুন !

মানুষের জীবন কিন্তু একটি বিদ্যালয় মাত্র নয়। একটি সভায় এসে, একটি লিফলেট পড়েই সব কিছু শিখে যাবে। মানুষ সাধারন কোন পরিবর্তন দেখলে, কোন ঘটনা ঘটলে শিখতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। সুন্দর ভাবে জিজ্ঞেস করুন- আপনিকি এই লিফলেটটি পড়েছেন ? এটাকি আপনার কোন সহকর্মীকে দিয়েছেন ? এই পিটিশনে কি স্বাক্ষর নিয়েছেন ? এই সকল ছোট ছোট প্রশ্ন থেকে কাজের উৎপত্তি হতে পারে। আর কাজের ভেতর দিয়েই গড়ে উঠে কার্যকরী সংগঠন।

আমরাই ইউনিয়নঃ

মানুষকে  কেবল দলবদ্ব করলেই হবে না, তাদের মাঝে পারস্পরিক ঘনিস্ট সম্পর্ক নির্মান আদর্শ সম্পর্কে পূর্ন সচতনা সৃজন করা দরকার। আমরা এমন একটি সংগঠন চাই যার সকল সদস্য নিজেদেরকে একই পরিবারের মনে করবে। সভা সমূহে নিজেদেরকে একাত্ম করবে আর বসদের সাথে বুঝাপড়া করার ক্ষেত্রে ও সেই ঐক্য বজায় রেখে চলবেন।

সময়ের সাথে সাথে কার্যক্রম বাড়ানো উচিৎঃ

সবাইকে বলা দরকার যে, সামনে যতই সমস্যা আসুক না কেন সকলেরই কাজে আত্মনিয়োগ করা দরকার। জিজ্ঞেস করুন সকেই ইউনিয়নের ব্যাজ ধারন করতে চান কি না ? ধর্মঘট হলে আপনার অবস্থান কেমন হব? ধর্মঘটের কালে  পিকেটিং করতে প্রস্তুত কি না । দরকার হলে গ্রেফতার হতে রাজি কি না ? অনেক ইউনিয়নই আছে যারা দরকার হলে দলবেঁধে জেলে যতে প্রস্তুত আছেন । যারা ই ভাবে নিজেদেরকে প্রস্তুত করেন তারাই এক সময়ে মহান বিপ্লবের পথ প্রসস্ত করতে পারেন। সেই প্রথম প্রশ্ন হতে পারে “আপনি কি এই লিফলেটি পড়েছেন?”

ব্যবস্থাপকদের সাথে দ্বান্দ্বে লিপ্ত হোনঃ

সংগঠিত হবার উদ্দেশ্যই হলো ক্ষমতার বদল কর। ব্যবস্থাপক ও শ্রমিকদের সম্পর্কের ধরন পাল্টে দেয়া। নিয়োগ কর্তাদের সাথে নানা বিষয় নিয়ে বিরোধ তৈরী করুন। যদি শ্রমিকগন সাহস করে গিয়ে যায় তবে বসগন ভয় পাবে। আর চূড়ান্ত পর্যায়ে শ্রমিকদেরই বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে ।

ছোট ছোট বিজয় ছিনিয়ে অনুনঃ

ছোট ছোট কারখানায় ছোট খাট দাবি দাওয়া নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হোন আর বিজয়ী হবার চস্টা করুন। সেই বিজয় গুলো আমাদের সাহস ও অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে। এটা একসময় সামাজিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করবে। একটি বিজয় অনেক বড় বড় বিজয় অর্জনের পাথেয় হতে পারে। বিজয়ের ফলে নতুন লোক সহজেই আন্দোলনে সরিক হয়। তাদের মাঝে বিশ্বাস জন্ম হয় যে, “ আমরা বসদেরকে পরাজিত করতে পারব”। আসলে সকলেই বস শ্রেনীর পরাজয় চায়। তাই বিজয় লোক বাড়াতে বিশাল ভূমিকা রাখে।

সময়ে পিছু হঠার জন্য প্রস্তুত থাকুনঃ

জীবন কোন কিছুই একেই ভাবে সহজ পন্থায় পাওয়া যায় না । তাই সংগঠনে ও সব কিছু ই ঘোষনা মত বা পরিকল্পনামত ই এগিয়ে যাবে তা আশা করা ঠিক নয়। যদি কোন কাজে বিজয় হতে না পারেন হতাশ হবেন না । অবশ্যই ধৈর্য্য ধরে এগোতে হবে। সময় সকল সময় ই পালটায় । মালিক পক্ষ হয়ত এমন কিছু করবে বা আপনার সাথীরা হয়ত এমন কিছু কৌশল আবিস্কার করবেন যা আপনাদের লড়াই সংগ্রাম ও দাবী আদায়ের কাজকে অধিক গতিশীলতা দান করবে। তাই নিজদেরকে প্রস্তুত রেখে উপযুক্ত সময়ে ও সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ।

বাইরে বিশ্বের কথা ভুলে যাবেন নাঃ

শ্রমিক ও তাদের নিয়োগকর্তাদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে অন্যান্য শ্রমিকদের আত্মবিশ্বাসের উপর বড় প্রভাব পরে। অন্যান্য কোম্পানি ও শিল্পগুলিতে নিয়োজিত শ্রমিকদের সাথে লিঙ্ক এবং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে আমাদের স্বার্থে  এরা একত্রে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে পারে। যা আমাদের জীবনের উপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ কায়েমের ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে পারি।

নিজদের প্রচার মাধ্যম শক্তিশালী করুনঃ

এই পদ্বতীতে নিজেদের বার্তা অন্যদের নিকট পৌছানোর জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা থাকা দরকার। তবে বার্তা তৈরীর ক্ষেত্রে অবশ্যই সকল স্থরের লোকদেরকে জড়িত করতে হবে।

বার্তায় হালকা মেজাজ বজায় রাখা দরকারঃ

সকল কাজেই গম্ভীরতা বজায় রাখার দরকার নেই। সংগঠন করা কাজটি হালকা মেজাজে হলে তেমন কোন ক্ষতি নেই। বার্তা প্রচারে কার্টুন, কৌতুক, গল্প নাটক ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কাউকে বিজ্জতী করার জন্য নয়। তা হব সামাজিক পরিবর্তনের প্রেরনা ।

সকল কিছুই হবে সুসংগঠিতঃ

সকল কার্যক্রম হবে সুন্দর ও সুসংগঠিত ভাবে। সদস্য তালিকা, টেলিফোন, ইমেইল, মেইল করার জন্য ঠিকানা সংগ্রহ করে রাখা দরকার। সংঠনের কাজে সহায়ক লোকদের নাম ঠিকানা ও সংরক্ষিত করতে হবে। যেন সময় মত ব্যবহার করা যায়। সকল কাজই হবে গণতান্ত্রিক পন্থায় । বিগত দিনের সফতা ও ব্যার্থতা লিখিত আকারে সংরক্ষন করতে হবে। যারা নতুন আসবেন তাদের সাথে সেই সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার । যাতে তাদের মধ্যে ও অভিজ্ঞতার সঞ্চার হয়। মনে রাখতে হবে, “এলো মেলো কাজের কোন ফল আসে না”।

একা একা সংগঠিত করতে যাবেন নাঃ

স্থানীয় সংগঠনের সাথে যোগাযোগ করার চেস্টা করুন। যদি চেস্টা করেন তবে অবশ্যই কিছু সংগঠন বা ব্যাক্তি পেয়ে যাবেন। যারা আপনার সাথী হতে পারে। অনেকেই আপনাকে বস্তুগত ও অবস্তুগত অনেক রকমের সহায়তা দিতে পারেন। মনে রাখতে হবে মিলেমিশে যা সহজই করা যায়, তা এককভাবে করা সম্ভব হয় না ।

0 Comments 0 Comments
0 Comments 0 Comments