নৈরাজ্যবাদ বা এনার্কিজম বা নিরাজবাদ বিষয়ক প্রসঙ্গ মন্তব্যঃ

নৈরাজ্যবাদ বা এনার্কিজম বা নিরাজবাদ বিষয়ক প্রসঙ্গ মন্তব্যঃ

শ্রেণী সংগ্রাম

বিপ্লবী নিরাজবাদ বা এনার্কিজম আসলে শ্রেনী সংগ্রামের মাধম্যেই গড়ে উঠে, যদি ও নিরাজবাদি চিন্তকগণ মার্ক্সবাদি ধারায় এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে আগ্রহী নন, তারা এই বিষয়টিকে একটি অন্যমাত্রায় দেখে থাকেন। আর এই ধারাটি কোন যান্ত্রিক ধারার মত নয়। নিরাজবাদ বা এনার্কিজমঃ মার্কস-এঙ্গেলসদের মতের ব্যাতিক্রম ধারায় নিরাজবাদিদের মতামত প্রবাহিত হয়, মার্ক্সিস্টগন মনে করেন, কেবল শিল্প শ্রমিকগন কর্তৃকই সমাজতন্ত্র কায়েম হতে পারে, এবং বিজ্ঞান সম্মতভাবে শ্রমিক শ্রেনীই চূড়ান্ত বিজয় আনতে পারে। পক্ষান্তরে, নিরাজবাদিরা বলেন, ১৯১৪ সালের আগে থেকেই নানা ভাবে বিজয় অর্জন করে এসেছে, দরিদ্র কৃষক এবং কারিগর শ্রেনী ও বিপ্লবে ভূমিকা রাখতে পারেন, তবে নিরাজাদ সম্পর্কে শিল্প শ্রমিকদের চেয়ে তাঁদের মধ্যে কম প্রচার হয়েছে। তাই আমরা দেখেছি, মার্ক্সবাদিরা নিরাজবাদিদেরকে পাতি বুর্জোয়া বলে সমালোচনা করেন। এই শব্দটির আধুনিক অর্থ বিশ্লেষণ করলে মার্কসের বক্তব্যটি হাস্যকর বলে মনে হয়। মার্ক্স বুর্জোয়াদেরকে এই ভাবে পৃথক করেন ( যারা চাকুরী দাতা এবং ব্যবসায়ীদেরকে) এবং যারা সংখ্যায় অল্প । যেমন- স্ব কর্মে নিয়োজিত কর্মী।) মার্কস নিরাজবাদিদেরকে ‘পাতিবুর্জোয়া’ বলেন তাদেরকে জোর করেই পুঁজিবাদী সমাজে মিশিয়ে দেন। আর দরিদ্র কৃষক সমাজ এবং শিল্প সমাজের মধ্যে একটা ভাঙ্গন ধরিয়ে দেন, এই ধরনের বক্তব্য অনেকেই মেনে নিতে না পেরে সহিংসতার পথে এগিয়ে যান – কেননা এই ধরনের ধ্যান ধারনা অনেক লোককেই হতাশ করে ফেলে। তাঁর বক্তব্যে কেবল শিল্প শ্রমিকদের জন্যই নিশ্চয়তা ছিলো, বার্সেলুনা এবং পেরিস কমিউনের কিছু ঘটনার উল্লেখ করে তাঁর সময়ে অর্থনীতির ভাঙ্গনের প্রেক্ষিতে তিনি এই রকমের বক্তব্য হাজির করেন । এই পরিবর্তিত অর্থে নিরাজবাদিরা ও ব্যাংক ব্যবস্থাপকদের মতই হতাশ হয়ে পড়েন যেমন ব্যাংকারদেরকে জোর করে শিল্পে নিয়োজিত করা হয়েছিলো। যা ছিলো সত্যি হাস্যকর প্রয়াস । মার্কস ভাবতেন, শিল্প শ্রমিকগন নিজেদের জন্য চিন্তা ভাবনা করতে পারেন না – অবসর লোক, স্বাধীন মানুষ ও স্বনিয়োজিত ব্যাক্তিদের মত যোগ্যতা সম্পন্ন তাঁরা নন । তাই ট্রেড ইউনিয়নের মানসিকতা সৃষ্টির জন্য ‘শিক্ষিত লোকদের’ নেতৃত্ব থাকা দরকার। যা বাহির থেকে ও আসতে পারে। যারা হয়ত হতাশায় ভোগবেন না । তাঁর এই ধরনের চিন্তাধারা ছিলো অনেকটা অভিজাত শ্রেনীর চিন্তকের মত, পরে ছাত্রদের মাঝে প্রচার করা হয় । মার্কস নিশ্চয়ই আজকের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেননি। সেই সময়ে ছাত্রদের মাঝে হতাশা না থাকলে ও এখন অনেকেই হতাশায় ভোগেন। কেননা তাদেরকে এখন একেই ধরনের কর্ম করতে বাধ্য করানো হয় বলে মানসিক চাপে বিষাদে ভোগেন ।

মার্ক্সীয় চিন্তার আলোকে দেখলে দেখব যে, মানুষকে এক গেয়ে কাজ করতে হচ্ছে বা বেকার থাকতে হচ্ছে, নানা কারনে মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই পেশায় অনুতপাদন খাতে বিরাজ করছে । তাঁর সময়ে কি কোন বিপ্লবী শ্রেনী ছিলো; কেবল যারা উৎপাদন করেন তারাই প্রকৃতিগত ভাবে উদার পন্থী হতে পারেন, কারন তাঁদের শোষন করার দরকার পরে না । পাশ্চাত্যের দেশ সমূহে শিল্পায়ন হয়েছে সেখানে তো পুরাতন ‘বুর্জোয়াদের’ জায়গায় প্রলেতারিয়েত প্রতিস্থাপিত হবার কথা । পুজিবাদিদের জায়গায় শ্রমিক শ্রেনীর আগমনের কথা, বাম পন্থার উত্তরন হবার কথা । ঠিকে থাকার জন্যই বাম রাজনীতির উত্থান হওয়া দরকার ছিলো । কিন্তু পাশ্চাত্যের জগতে আমরা দেখতে পাচ্ছি তাঁর উল্টো রথ চলছে। কায়িক পরিশ্রম হয় এমন কল কারখানা বন্দ্ব করে দিয়ে সুপার মার্কেট, শপিং মল ও দোকান পাঠে বিক্রয় কর্তা বা সহকারী হিসাবে লোক নিয়োজিত হয়েছে। এখন এরা উৎপাদন মূখী নয় এরা এখন কেবল সেবা মূলক কাজ করছেন। যখন শিল্প শ্রমিকদের বিকাশ হতে শুরু করে তখনই এনার্কিস্ট বা নিরাজবাদিদের আন্দোলনের ও সূচনা হয়, কিছু কিছু বিধি শ্রমিক লোকেরাই উদ্ভাবন করে ফেলে, তারাই বাহির থেকে নেতৃত্বের ধারনার ও জন্ম দেয় এবং অনেকেই মনে করেন মুজুর শ্রেনীর ভেতর থেকে নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা এদের নেই। এনার্কু সিন্ডিক্যালিজম হল এমন সংস্থা যা কর্ম স্থলের আন্দোলন চালানো এমন কি পরিবেশ পরিস্থিতি সৃজন হলে তা দখল করে নেবার জন্য প্রস্তুত থাকবে। এটা গতানুগতিক ট্রেড ইউনিয়নের চেয়ে অধিকতর কার্যকরী এবং একেই সময়ে রাষ্ট্র পরিচালিত অর্থনীতিকে এড়িয়ে যেতে সক্ষম ? এনার্কিজম এবং মার্কসবাদ এরা কেহই শ্রমিকদেরকে আদর্শিক ভাবে তেমন উন্নত প্রশিক্ষন দেয় নি ( কেবল প্রচারনামূলক কিছু সাহিত্য ও কিবিতা শ্লোগান শিখিয়েছে)- এটা অনেক টা খৃস্টান সমাজতন্ত্রের মত । এমন কি প্রতিক্রিয়াশীলতাকে এড়াবার জন্য ও সঠিক নির্দেশনা ছিলোনা, অন্যদিকে এদের জন্য সত্যিকার শিক্ষার ও সুযোগ না থাকায় পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে তাঁদের মধ্যেই ছিলো বিরুধিতার প্রবল জোয়ার। ধৈর্য ধরে পড়ার মত পরিবেশ ও তাঁরা পায়নি, ফলে তাঁরা তো মানুষই ফিরিস্তা নন, নৈতিক দিক থেকে ও ছিলেন না খুব উন্নত, ফলে নিজেদের কর্ম ক্ষেত্রেই নিজের ব্যার্থতা পরিস্ফুট হয়ে উঠে। তাই যোগ্যতা অর্জনের ব্যবস্থা করার কোন বিকল্প নেই। কেবল জান্নতেই ফিরিস্তারা চাহিদামত সব কাজ করতে সক্ষম- এই দুনিয়ায় নয়। শ্রমিক শ্রেনীকে দুনিয়ার কার্যক্রম পরিচালনায় দক্ষ ও যোগ্য করে তুলতে হবে। এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট ফেডারেশন, বাংলাদেশ সেই কাজ অব্যাহত রাখতে বদ্বপরিকর।

কর্মক্ষেত্র শ্রমিদের নিয়ন্ত্রন রাখা প্রসঙ্গ

কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রন কায়েম প্রসঙ্গে যারা বলেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে ও কর্ম ক্ষেত্র ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের অংশগ্রহন করা দরকার বা ব্যবস্থাপনায় তাঁদের প্রাধান্য প্রতিস্টা করা প্রয়োজন সেই প্রসঙ্গে আমাদের ভিন্ন মতামত ও বক্তব্য আছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় স্ব-ব্যবস্থাপনার ধারনা একটি উল্লেখযোগ্য সংস্কার মূলক বিষয়, তবে এই ধরনের কাজ কোন কোন সময় বাস্তবায়ন সহজ হয়, বাহিরের হস্তক্ষেপ থাকলে অনেক ক্ষেত্রে তা আবার সমস্যার ও সৃষ্টি করে থাকে । তবে তা কোন ভাবেই সিন্ডিক্যালিজমের সাথে তালগুল পাকাবার অবকাশ নেই। তবে সিন্ডিক্যালিজমের সাথে একটি বিষয়ে মিল আছে আর তা হলো আগামী দিনের সমাজ হবে স্ব শাসিত প্রকৃতির।

আমরা শ্রমিকদের কোন প্রকার প্রাধান্য চাই না, এমন কি তাঁদের প্রতিনিধিদের প্রাধান্য ও নয়। শিল্পকে ছোট ছোট খন্ডে ভাগ করে পরিচালনা করা কে আমরা সমর্থন করি। ‘জাতীয়করনের’= রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রন নীতি আমরা সমর্থন করি না । আমাদেরকে অবশ্যই ব্যাক্তির স্বাধীনতাকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে, কোন ভাবেই শ্রেনীগত বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া যাবেনা । এমন কি প্রয়োজন হলে কোন অলস ব্যাক্তিকে ক্ষধার্থ ও রাখতে হবে। তবে এসবের কিছুই সমাজ পরিবর্তন করতে পারেনা । স্ব-নিয়োজিত কর্মী ও কারিগর সমাজের লোকেরা প্রুধুর সময়ের মত আর গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখেন না ( হয়ত এই প্রক্রিয়া নয়া সমাজের উত্থান ঘটাবে)। কেহ হয়ত খুশি হয় তাঁর পছন্দমত কাজ পেয়ে, আবার কেহ হয়ত খুশি হয় তাঁর চাহিদামত বেতন বা মজুরী পেয়ে। কিন্তু পরিবর্তত সমাজে যেন সকলেই তাঁদের চাহিদা মেটানোর মত কাজ পায় তা নিশ্চিত করা জরুরী।

আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখতে আচ্ছি মানুষ স্ব-নিয়ন্ত্রিত পেশা পছন্দ করেন। এখন বিভিন্ন দেশে বড় বড় শিল্প কারখানা গুলো বন্দ্বকরে দিচ্ছে, শাসক শ্রেনী মনে করছে পুঁজিবাদের জন্য এখন আর এসকল শিল্পের দরকার নেই। মুল ধারার পুঁজিবাদের বাহিরে যারা আছেন তাদেরকে একত্রিত করার একটা মওকা তৈরি হচ্ছে, তা আমরা কাজে লাগাতে পারি, যদি আমরা আমাদের কর্মে সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হই। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পুনঃ ফিরে আসার কারন গুলো পূর্ববর্তী অবস্থা থেকে উদঘাটন করা এখন দরকার হয়ে পড়েছে, যেন এনার্কু – সিন্ডিক্যালিজম বিনির্মানে তা কাজে লাগানো যায় ।

সংগঠন এবং এনার্কিজম বা নিরাজবাদ

যারা কর্তৃত্ববাদি দল করেন বা দল থেকে আসেন তাঁদের এটা ভাবতেই কষ্ট হয় যে ‘কোন রকম’ সরকার ছাড়া চলবে কেমন করে ! তাঁরা তখনই চিন্তা করতে থাকে থাকেন আর সিদ্বান্ত নিয়ে বসেন, ‘নিরাজবাদ বা এনার্কিজম কোন সংগঠনে বিশ্বাসী নয়’। কিন্তু সরকার মানেই হল কিছু লোক, আর সংগঠন হল একটি বিষয়। এক ধরনের বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, বিরোধীরা ‘ নিজেদের সংস্থা গড়তে না পেরে অন্যদের সংগঠন ভেঙ্গে ফেলা হয়’, এই ধরনের চিন্তা ধারা প্রায়স বিপদজনক হয়ে উঠে, দলের চেয়ে পদসোপানের গুরুত্ব প্রবল হয়ে উঠে, ফলে মানুষের ব্যাক্তিগত স্বাধীনতাকে হত্যা করা হয়।

এটা স্বীকার না করার কোন উপায় নেই যে, উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত মানুষের সমাহার না হলে সত্যিকার নিরাজবাদি সংস্থা গড়ে তুলা যায় না, দুনিয়ার নানা স্থানে হয়ত গণতান্ত্রিক কিছু সংগঠন গড়ে উঠেছে আবার স্বৈরতান্ত্রিক সংস্থার ও জন্ম হয়েছে, এই গুলো আবার পদসোপানদারী বা উদারনৈতিক সংস্থা হতে পারে - তবে তা নিরাজবাদি নয়, এটা প্রমানিত যে সংগঠন হবে অবশ্যই নিচে থেকে উপরের দিকে চালিত সংগঠন। তার অন্যতা হবে না । কেন্দ্র থেকে দলীয় প্যাডে কমিটি তৈরী করে পাঠিয়ে দিলে তা হবে হাস্যকর।

অনেক ট্রেড ইউনিয়ন আছে, বিশেষ করে যারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে মিশে সুশৃংখল ভাবে কার্যক্রম চালায়, তাঁদের মাঝে ও পদসোপানের চর্চা বিদ্যমান; কিন্তু দেখতে হবে তাঁরা কত সংখ্যক শ্রমিককে সুশৃংখল করে রাখতে পেরেছেন ? তাঁরা যদি তালিকা ভুক্ত হয়ে থাকেন তবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে ই হবে। নইলে তালিকা থেকে নাম কাঠিয়ে বা বাতিল করে বেড়িয়ে আসতে হবে। তাঁদেরকে অবশ্যই স্বাধীনভাবে আসতে দিতে হবে, সকল হুমকি ধমকির বিলয় ঘটাতেই হবে। যখন ফ্যাসিবাদের প্রভাব বেড়ে যায় তখন শ্রমিকের মর্যাদা নিচে নেমে আসে, সেই পরিস্থিতিতে মালিক পক্ষের স্বাধীনতা ও স্বার্থ বৃদ্বি পায় এবং বহাল থাকে। নাজিবাদ কেবল অল্প সংখ্যক পুজিপতির স্বাধীনতা ও স্বার্থ সীমিত আকারে বজায় রেখে শ্রমিকদের আশা আকাংখাকে গুড়িয়ে দিয়েছিল। কেবল মাত্র পরিবর্তনকামী ইউনিয়ন সমূহই শিক্ষা নিয়েছে কি ভাবে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রন হ্রাস করে সত্যিকার গমানুষের আন্দোলন সংগ্রাম বহাল রাখতে পারে, তা হোক আনুস্টানিক বা অনানুস্টানিক প্রক্রিয়ায়, সেই সকল ক্ষেত্রে প্রায় সকল সিদ্বান্তই গ্রহন করা হয়েছে মাঠে ময়দানে বা তৃনমূল পর্যায়ে।

একটি কর্তৃত্ববাদি সমাজে একজন নিরাজবাদির ভূমিকা

মহান চিন্তক থরো বলেন, “ একটি দাসত্বপূর্ন সমাজে একজন স্বাধীন মানুষের উত্তম স্থান হল কারাগার”, (তিনি সেখানে কেবল রাত কাটান)। এটা এক ধরনের দিনে দিনে প্রগাঢ় হয় এমন একটি প্রতিজ্ঞা, আসল কথা হল, ইহা সত্যিকারের বসবাসের জায়গা নয়। একজন বিপ্লবীকে সদা সর্বদা নিপিড়ন ও বিচারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়, একজন দুঃখবাদিই এমন বিষয়ে আস্থা রাখতে পারেন। এই ধরনের কার্যক্রম সাধারণত ব্যাক্তিগত স্তরেই থেকে যায়, তা কত দুর পর্যন্ত বিপ্লবী ভূমিকা রাখবে তা নিশ্চিত ভাবে বলা মুশকিলঃ এটা এমন ধরনের কাজ যা নিয়ে আগে থেকে অনুমান করা ও সম্ভব হয় না। এনার্কিস্ট বা নিরাজবাদিরা এই ধরনের কাজের জন্য উস্তাদ, এরা সামাজিক বা নানারকমের বিপ্লবী কাজে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে আসছেন। যেমন – উদারতাবাদি শিক্ষা, শ্রমিক আন্দোলন, যৌথ বা ব্যাক্তিগত ভাবে সরাসরি কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়া ইত্যাদি।

আমরা যখন এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট পদ্বতীর কথা চিন্তা করি তখন বলতে পারি যে সত্যিকার সামাজিক পরিবর্তন বা বিপ্লব কেবল অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই আসতে পারে। এটা ঠিক, ব্যাক্তিগত উদ্যোগ বা ভূমিকার কারনে উদারতাবাদের বিকাশে কিছু কাজ করতে পারে। ব্যাক্তিগত উদ্যোগ বলতে বুঝায়, কিছু ব্যাক্তি যারা একেই মানসিকতা সম্পন্ন তাঁরা পৃথক কোন স্থানে একটি কমিউন স্থাপন করে দুনিয়ার অন্যান্য কর্মকান্ডকে উপেক্ষা করে নিজেদের ইচ্ছেমত জীবন যাপন করেন। কারো ধার ধারেন না। যারা এই কমিউন কায়েম করবেন তাঁরা এক সময় মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বসবাস করতে গিয়ে অনেক সমস্যার সম্মোখীন হয়েছিলেন – এই ক্ষেত্রে হয়ত তা তাঁরা অতিক্রম করতে পারছেন। কিন্তু এই ধরনের প্রকল্প সামাজিক বিপ্লবে তেমন ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয় না । আসলে একক ব্যাক্তির ভূমিকায় কোন ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তন হয় না। সমগ্র জাতি যদি স্বৈরাচারের অধীনে থাকে আর একের পর এক জন করে ব্যাক্তি যদি নিজেদেরকে বলি দিতে থাকে, যখন সকল ব্যাক্তি ঐক্যবদ্ব হয়ে হাইড্রার মাথা কেটে না নিবে বা স্বৈরাচারকে হত্যা না করবে ততক্ষন পর্যন্ত নয়া সমাজের বিকাশ অসম্ভব। সাধারন মানুষকে ঐক্যবদ্ব না করে মাত্র কয়েকজন ব্যাক্তি সাহস ও দক্ষতা দেখালে স্বৈরাচার নানা অজুহাত খাড়া করে গনহত্যা চালাতে পারে। সেই ক্ষেত্রে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে যে মানুষ গ্যাসচেম্বারে প্রবেশের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে যাবে (এটা আক্ষরিক অর্থেই বলছি)। আমরা এটা মনে করি না যে, “ শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা ভূল করতে পারেন না”; হ্যাঁ, ভূল হতেই পারে। কিন্তু সংগঠন হল শক্তি ! আমরা সকল সময়েই গন আন্দোলন ও গন সংগ্রামের কথা বলি কেননা শ্রমিক শ্রেনীর হাতে রয়েছে বিশাল শক্তি। প্রলেতারিয়েত চাইলেই পুরাতন অর্থনীতি ভেঙ্গে নয়া ব্যবস্থা কায়েম করতে পারেন। শ্রমজীবী মানুষের হাত ধরেই দুনিয়ায় নয়া মুক্ত সমাজের কায়েম হতে পারে, এরা ই সকল কর্মের নিয়ন্ত্রন ভার হাতে নিতে পারেন এবং কর্তৃত্ববাদি ব্যবস্থাপনার বিলয় ঘটাতে পারেন।এখন তাঁরা ই সকল শ্রম শক্তিকে সংঘবদ্ব করতে সক্ষম।

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম

এনার্কিজম বা নিরাজ সমাজ হল একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ যা ঘোষনা করেছে “ সমাজতন্ত্র ছাড়া স্বাধীকার হল অন্যায় এবং অবিচার আবার স্বাধীনতা বিহীন সমাজতন্ত্র হল দাসত্ব ও নিস্টুরতা”।

সিন্ডিক্যালিজম হলো একটি শ্রমজীবীদের আন্দোলন। এই শব্দটির উদ্ভব হয়েছে ফ্রান্সের ইউনিয়নিজম(সিন্ডিক্যালিজল) থেকে। ইহা শ্রমিকদেরকে একতাবদ্ব করে তাঁদের স্বার্থের জন্য লড়াই করতে ভূমিকা রাখে।

এনার্ক-সিন্ডক্যালিজম হল কর্মজীবী- শ্রমজীবীদের আন্দোলন। ক্ষুদ্র একটি শিক্ষানবিশ দল থেকে একটি বৃহৎ বিপ্লবী দল ও এর আওতায় পড়ে, উদারনৈতিক সংগঠন সমূহ তৃনমূল থেকে নিয়ন্ত্রন প্রভাবিত হতে গড়ে উঠছে।

এনার্কো- সিন্ডিক্যালিস্ট অন্যান্য বিপ্লবী সংগঠন সমূহের সাথে ও কাজ করতে চায়। প্রথমিকভাবে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট দল ও শিল্প কর্মীদের সাথে নেট ওর্য়াক গড়তে চায়, তৃনমূল থেকে ক্রমে নানা কাজের ভেতর দিয়ে সরাসরি বা ডাইকেক্ট একশনের মাধ্যমে ধর্মঘট ও দখল করার স্তরে উন্নিত হতে চায়।

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টদের নীতি হল কাউকে রিক্রিট করা নয়, বরং ব্যাক্তিগত মত বিনিময়, সাধারন সভার মাধ্যমে বক্তব্য তুলে ধরে নিজেদের অবস্থান সকলের সামনে পরিস্কার করা, যাতে আগ্রহী ব্যাক্তিগন নিজেই এসে অংশ নিতে পারেনে। সেই সভায় সংহতির নীতি মালা তুলে ধরেন, ডাইরেক্ট একশন ও স্ব সংগঠিত হবার আহবান জানায়।

এই দিক থেকে বিচার করলে এটা পরিস্কার হয় যে এনার্কো – সিন্ডিক্যালিস্ট ও ইউনিয়নিজম কোন ভাবেই এক প্রকৃতির নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া আর তথাকথিত শ্রমিক পার্টি গুলো রাজনৈতিক স্বার্থে কাজ করে থাকেন। এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় বৈষম্যের বিরুদ্বে স্ব সংগঠিত হয়ে থাকে।

মোট কথা হলো আমরা নিজেরা দল বদ্ব হয়ে, পরস্পরের নিকট থেকে কাজের ভেতর দিয়ে শিখি, আমরা আমাদের ক্ষমতা ব্যবহার করি নিজেরাই আমাদের কোন অফিসার, রাজনৈতিক নেতা বা ভ্যানগার্ডের দরকার নেই। এই প্রক্রিয়াকে আমরা বলতে পারি সেটা হলো সেই মডেল যে মডেল অনুযায়ী আমরা আগামী দুনিয়া বানাতে চাই। যেখানে কোণ বস, রাজা থাকবে নাঃ সত্যিকার স্বাধীন সাম্যবাদ।

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের আসল মুলনীতিই হলো কর্ম ক্ষেত্রে নিজেদের মাঝে গভীর সম্পর্কের বুনন তৈরী করা, শ্রমিকগন যেন নিজেরাই দল বদ্ব হয় বা ঐক্য গড়ে তুলে ভেতরে ও বাহিরে। যে ঐক্য আমাদেরকে সরকার, আমলা, বস ও হুজুরদের বিরুদ্বে লড়াই করতে নিজেদের স্বার্থে বিজয়ী হতে সাহায্য করবে। আমরা চূড়ান্ত ভাবে সরকার, রাষ্ট্র, শ্রেনী বিহিন সমাজ বা নিরাজ সমাজ গড়ে তুলতে চাই। যেখানে মানুষ ‘সামর্থমত কাজ করবে, আর চাহিদা মত পাবে’- কর্ম ক্ষেত্রের সকল প্রতিনিধিত্ব হবে সকলের মতের ভিত্তিতে আর তা অবশ্যই রিকল যোগ্য। আর এটাই হল সত্যিকার স্বাধীন সাম্যবাদ।

আমরা শ্রেনী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এমন একটি সমাজ বিনির্মান করতে চাই। আমাদের কাজের লক্ষ্যই হল শ্রেনী সংগ্রাম তরান্বিত করতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রচার মূলক, সহযোগিতা মূলক, ও উন্নয়ন মূলক কাজ করে যাওয়া। এই ধরনের কাজ আমাদের স্বপ্নের সমাজ গড়তে এবং সকলকে ঐক্যবদ্ব হতে সহায়তা করবে। আমরা নিম্নের নীতিমালা অনুসরন করে কাজে ব্যপৃত হয়েছিঃ

সংহতিঃ ‘একতাই বল’ একজন ব্যাক্তি তুলনা মূলক ভাবে ক্ষমতাহীন। বস, আমলা, রাষ্ট্র, বা কোন নেতার সামনে এককভাবে তেমন কিছু করা যায় না। কিন্তু সকলে একতাবদ্ব হয়ে কাজ করলে গনেশ উল্টে যাবে । ঘুরে যাবে টেবিল সহজেই।

ডাইরেক্ট একশনঃ আমরা আমাদের কাজের জন্য আমাদের পক্ষে কাজ করে দেবার জন্য কোন রাজনৈতিক দল বা নেতাকে ডাকব না, আমারা যা চাই তা আমারাই করব।

স্ব সংগঠনঃ আমরা সাধারন সভার মাধ্যমে লড়াই সংগ্রামের নিয়ন্ত্রন করা হবে, আমরা একে অন্যের নিকট থেকে শিখব, আমরা চেষ্টা করব যেন কেহ বিক্রি না হয়ে যায় বা কাজকে স্থবির করে ফেলে।

এনার্কো –সিন্ডিক্যালিস্ট কি কি করে থাকে?

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টগন কর্ম ক্ষেত্র ও সামাজিক ভাবে নানা রকমের কাজ কর্মে নিয়োজিত আছে, এর মধ্যে কিছু দির্ঘ মেয়াদি আবার কিছু কাজ আছে স্বল্প মেয়াদি ধরনেরঃ

কর্ম ক্ষেত্রে সংগঠিত হওয়াঃ কাজের মজুরী ও কর্ম পরিবেশ বিষয়ক।

সামাজিক সংগঠনঃ জনগণের জন্য গৃহ ও পরিবেশ বিষয়ক।

ধর্মঘট এবং দখলে সংহতি প্রকাশঃ পিকেটিং, অর্থ সাহায্য এবং অন্যান্য সহায়তা দান।

শ্রমিকদের জন্য সহায়তাঃ পিকেটিং, ধর্মঘট, মিছিল করতে গিয়ে সমস্যায় পড়লে সাহায্য করা।

নেট ওয়ার্কিং করাঃ একেই উদ্দেশ্যে কর্মে নিয়োজিত দল, গ্রুপ ও ব্যাক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা।

জনসভার আয়োজন করাঃ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, যুদ্ব, বায়ুমন্ডলের পরিবর্তন এবং রাজনীতি যা শ্রমিকদেরকে আক্রান্ত করে । সেই সকল বিষয় মানুষের সামনে তুলে ধরা।

প্রচার প্রপাগান্ডা চালানোঃ নিয়মিত ভাবে লিফলেট, নিউজ লেটার, ম্যাগাজিন প্রকাশ করা। সংহতি, ডাইরেক্ট একশন, ও স্ব সংগঠনের ধারনা সকলের সামনে প্রচার করা ।

নিরাজ সমাজঃ আসলে কি চায় ?

এটা একটি ঐতিহাসিক সত্য যে, যেকোন নতুন আদর্শ বাস্তবায়ন করা একটি কষ্ট সাধ্য বিষয়। পুরাতন ধারনা কোন দিনই খুব সহজ ভাবে নিজের জায়গা ছেড়ে দেয়নি। ইতিহাস এটা ও আমাদের জানায় যে, পুরাতন ব্যবস্থা ঠিকে থাকার জন্য নতুন ব্যবস্থার উপর সর্বদাই নির্মম ভাবে হামলা চালিয়েছে, এমন কি নিস্টুরতার আশ্রয় নিয়ে খুন, গুম ও নরহত্যার মত পথে হেঠেছে। আময়াদেরকে ও সেই কথাটি মনে রেখেই সামনে এগোতে হবে। আলোকিত ও প্রাগ্রসর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার পাশা পাশি নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে ও পিছ পা হওয়া যাবে না । একটি নৌকা তৈরী করতে যেমন হাতুরী বাটালের দরকার হয়; দেয়াল ছিদ্র করার জন্য ড্রিল মেশিন লাগে, তামনি নয়া সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলার জন্য আমাদেরকে ও দরকারি জিনিষ পত্র জায় জোগার করতে হবে। আমাদের হাতিয়ার হল আদর্শ।

এনার্কিজম বা নিরাজ সমাজ পন্থা নয়া সমাজ গড়ার জন্য যে স্বাভাবিক পথ রয়েছে তা থেকে পালাতে চায় না । বরং এটা সবচেয়ে বেশী বিপ্লবী ও আপোষহীন। নয়া উদ্ভাবিত ব্যবস্থা হিসাবে দুনিয়ার মানুষের সামনে হাজির হতে চায়। এই ব্যবস্থা দুনিয়া থেকে সকল বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে চায় আর সমাজকে নতুন ভাবে গড়ে তুলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ব।

এই পর্যন্ত নিরাজ সমাজ বা এনার্কিজম সম্পর্কে যা বলা হয়েছে বা যা যা করা হয়েছে যদি এসকল কিছুর উত্তর দিতে হয় তবে এক বিশাল গ্রন্থ রচনা করতে হবে। আমি এখানে কেবল দুটি বিষয় আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই । আর তা হলো আসলে এনার্কিজম বা নিরাজ সমাজ সত্যি কি চায় ?

একটি অদ্ভুত বিষয় হলো এনার্কিজম বিরুধীদের সামনে আলোকিত একটি পথের নির্দেশনা দেয়। তথা কথিত জ্ঞানবুদ্বি ও অজ্ঞতার বিষয়ট তেমন গুরুত্বপূর্ন নয়। কিন্তু আমরা আজো তা সকলের সামনে তুলে ধরতে পারিনি । এখনো এই বিষয়ে অজ্ঞতার পাল্লাই ভারী, জ্ঞান ও সহনশীলতার মাত্রা অনেকটা ই কম। তবে কখনো কখনো শিশুর ন্যায় ভনিতা করেন অনেকেই। “কি ” “কারন কি ?” জিজ্ঞেস করা হয়। এখনো নিরাজ সমাজ সম্পর্কে মানুষ অনেক কিছুই জানেন না । জ্ঞান অর্জন কারী মানুষ যে ভাবে বিষয়টি গ্রহন করেন অন্যরা তা পারেন না ।

নিরাজ সমাজ নিয়ে মানুষের সাধারন কিছু কথা আছে। প্রথম কথাই হলো, এনার্কিজম বা নিরাজ সমাজ হলো অবাস্তব একটি বিষয়, যদি ও কিছু সুন্দর সুন্দর কথা বলে। দ্বিতীয় কথা হলো, এনার্কিজম বা নৈরাজ্যবাদ বা নিরাজবাদ হলো সন্ত্রাস, ধ্বংসের মন্ত্র তাই এটাকে নিকৃষ্ট ও বিপদজনক বিষয় হিসাবে বিবেচনা করে পরিত্যাগ করা দরকার। জ্ঞানী ও মুর্খ প্রায় সকলেই এমন সরল বিচার করে থাকেন যা মুখস্ত ও শোনা কথা যা একেবারেই বাস্তব সম্মত নয়।

নিরাজ সমাজঃ আসলে কি চায় ?

অস্কার ওয়াইল্ড বলেছিলেন, এনার্কিজম বা নিরাজ সমাজ হলো একটি বাস্তব সম্মত প্রকল্প। কল্পনা বিলাশ নয়। এই ধরনের প্রকল্প এখনো দুনিয়ার কোন কোন সমাজে বিরাজমান আছে, বা প্রচলিত ব্যবস্থার অধীনেই তা বাস্তবায়ন সম্ভব; প্রচলিত পরিস্থিতিগত শর্তেই এই এইধরনের সমাজ কায়েম সম্ভব এর পরিবর্তে অন্য কিছু গ্রহন করা ভূল বা বোকামী। আমরা যদি আমাদের অতীতের সকল প্রকার ভূলের সংশোধন করতে চাই, সকল বোকামীর অবসান ঘটাতে চাই, নতুন ও ঠেকসই ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে চাই- তবে নিরাজ সমাজ বিনির্মানের বিকল্প নেই। আর কোন ব্যবস্থাই এর মত এত সুন্দর ভাবে আমাদের ভুল ও বোকামী সমুহ ধরিয়ে দিতে পারে না; নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় নিরাজ সমাজ ব্যবস্থার মত এত চমৎকার ব্যবস্থা আর নেই। এটা এক নয়া দুনিয়ার, নয়া সমজের স্বপ্ন দেখায়।

মুর্খ ও অজ্ঞ লোকেরা আবেগ তাড়িত হয়ে নিরাজবাদি সমাজকে একটি রক্তাক্ত কাহিনীর সাথে যুক্তকরে মন্দ ভাবে চিত্রিত করতে চায়। অথচ এই ধরনের কোন প্রকার কর্মের সাথে নিরাজ সমাজের কোন সম্পর্ক নেই। নিরাজবাদি সমাজে কোন শিশুকে খারাপ মানুষে পরিণত করার কথা চিন্তাও করা যায় না । সকল কালো দৈত্যকে সমাজ বিনাশী কার্যক্রম থেকে বিরত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে এনার্কিজম বা নিরাজ সমাজ।

সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক কর্ম প্রসঙ্গ ! অনেক সময়েই একজন সাধারন নাগরিক জানেন না একটি সমাজে কি করে সহিংস কার্যক্রম সংগঠিত হয়ে থাকে; আর এনার্কিজম বা নিরাজ সমাজবাদের কি অপরাধ দমনের ক্ষমতা আছে ? তিনি জানেন না একটি সমাজের ভেতরের অপরাধ ও ধ্বংসাত্মক কাজের মুল উৎপাটনের কি কি পদ্বতী বা অস্ত্র নিরাজবাদের নিকট বিদ্যমান আছে। সমাজের সকল পরগাছা উৎপাটন করে নিরাজ সমাজ একটি শান্তির পরিবেশ তৈরী করতে প্রতিজ্ঞা বদ্ব।

কারো মনে হতেই পারে যে মন্দ কাজের নিন্দা করার জন্য তেমন শক্তির দরকার নেই। কিন্তু ব্যাপক ভাবে খারাপ কাজ নির্মূল করার জন্য সত্যিকার শক্তির দরকার হয়। আমরা যদি খারাপ কাজের নিন্দার বিষয়টি তিব্রভাবে দেখি এবং এর গোড়ার দিকে নজরদেই, তা হলে দেখব মানুষ সম্মিলিত ভাবে কিছুর নিন্দা করলে তা কোন ভাবেই ঠিকে থাকতে পারে না । মানুষ যা চায় না তা বিদায় নিতে বাধ্য। দরকার মানুষের সত্যিকার স্বাধীনতা।

এনার্কিজম বলে, মানুষ হিসাবে আমাদের চিন্তা করা, কোন কিছুকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা এবং প্রতিটি পরিস্থিতিতে তদন্তের ব্যবস্থা থাকা দরকার; কোন মানুষের চিন্তা শক্তির উপর বাঁধা নিষেধ আরোপ করা সমিচীন নয়। আমি এনার্কিজমের বা নৈরাজ্যবাদের বা নিরাজবাদের একটি সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা দিয়ে এর বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব।

নিরাজ সমাজঃ আসলে কি চায় ?

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক মতবাদ যা মানুষের উদ্ভাবিত মতবাদ হিসাবে মানবিক ও সার্বিক স্বাধীনতার কথা বলে; যা সকল প্রকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে, সকল সহিংসতা, ও চাপিয়ে দেয়া আইন কানুন এবং ক্ষতিকর পরিস্থিতি থেকে মানুষকে মুক্ত করে দেয়। ইহা সরকার কে একটি অদরকারী প্রতিস্টান মনে করে।

এই নয়া জীবন ব্যবস্থা মানুষকে সকল প্রকার কুসংস্কারমুক্ত ও ভাবাবেগের ভেতর থেকে বেড় করে আনে, ইহা মানুষের জীবন ব্যবস্থার প্রতিটি দুষ্ট ক্ষত সারিয়ে তুলে। সমাজের বড় দুষ্ট ক্ষতটি হলো,- অর্থনীতির অব্যবস্থাপনা। এনার্কিজম মানব জীবনের প্রতি স্তরের বিষয় গুলো সবিশেষ বিবেচনায় নিয়ে থাকে- ব্যাক্তিগত ও সামস্টিগত এবং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সব কিছুর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করে থাকে।

মানব জাতির ইতিহাসের দিকে থাকালে আমরা দেখতে পাই দুইটি বড় বিষয় বা দ্বন্দ্ব সকল সময়েই মানুষকে কষ্ট দিয়েছে; তাই এই বিষয় সমূহ আমাদেরকে ভালোকরে বুঝে নিতে হবে। এই বিষয় গুলো বাহিরের জিনিষ নয় বরং আমাদের ভেতরেরই জিনিষ। আর এই গুলো হলো, সামাজিক এবং ব্যাক্তিগত প্রবৃত্তি । ব্যাক্তি ও সমাজ বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, তবে সকল সময়েই এদের মধ্যে চলে এসেছে দ্বন্দ্ব ও লড়াই। সমাজের সকলেই কে কার চেয়ে বড় এই একটি মানসিকতা সকল সময়েই বিরুধের সূত্রপাত করেছে। আবার একজন আরেকজনের থেকে বড় হবার জন্য চেস্টায় লিপ্ত হয়েছে। মানুষ একে অন্যের মূল্যায়নে অন্দ্ব থেকে গেছে। ব্যাক্তি ও সামাজিক প্রবৃত্তি যেমন, উন্নয়ন, আগ্রগতি, উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা স্ব-উপলব্দি ইত্যাদি এগিয়ে যাবার জন্য সহায়ক এবং দ্বন্দ্বে কারন হয়েছে । তা আবার, সামাজিক কল্যানের জন্য ও সহায়ক হতে পারে।

মানুষের জিজ্ঞাসা সমূহ খোঁজার জন্য বেশী দূরে যাবার দরকার নেই। আদিম কালে মানুষ অনেক কিছুই বুঝতে পারত না। তারা অজ্ঞাত ও লুকানো কোন শক্তির পুতুল হিসাবে নিজেকে মনে করত। তাঁদের নিজস্ব ক্ষমতা ও শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিলো না । তারা সেই অজ্ঞাত শক্তির সন্তুষ্টির জন্য চস্টা করত। যার ফলে ধর্মীয় ভাব ধারা ও আচার আচরনের উৎপত্তি হয়। প্রথম দিকে তা ঘুর্নি ঝড়ের বালি কনার মত শুরু হলে ও পরে তা প্রকটতর হয়। তারা সেই শক্তির নিকট পূর্ন সমর্পনের মধ্যেই নিজেদের মুক্তি খোজতে থাকে । এর ই ধারাবাহিকতায় ইশ্বর, গির্জা, রাষ্ট্র, সমাজ ইত্যাদির উন্মেষ ঘটে। তারা ধরে নেয় সকল ক্ষমতা ও শক্তি আধারই হলো সেই অজ্ঞাত শক্তি। সেই শক্তির নিকট নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মধ্যেই রয়েছে মানুষের সামগ্রীক কল্যান ও গৌরব। মানুষের ধারনা ছিলো তাঁদের নিজের কোন ক্ষমতা নেই সকল ক্ষমতা ঐ লুকানো শক্তির। কিন্তু আসল সত্য হলো মানুষ নিজের সম্পর্কে সচেতন হলে বা নিজেই জেগে উঠলে দুনিয়ায় অভাবনীয় কর্ম সম্পাদন করতে পারে।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ হলো একমাত্র দর্শন যা মানুষকে ব্যাক্তিগত ভাবে সচেতন করে দেয়; এটা বলে দেয় প্রভু, রাষ্ট্র, সমাজ আসলেই অস্থিত্বহীন বিষয়। এই গুলো মানুষের নিকট অনেক প্রতিশ্রুতি শোনায় বাস্তবে কিছুই করে না । এই গুলো কেবল মানুষের আনুগত্য হাসিলের জন্য চেস্টায় লিপ্ত থাকে। নিরাজবাদ হলো মানব জীবনের মহান শিক্ষক, যা জীবনের ঐক্ষ্য শিক্ষা দেয়। মূলত ব্যাক্তি ও সমাজের মধ্যে কোন বিরুধ নেই। এই গুলো হলো মানব দেহের হার্ট ও ফুসফুসের মত। এর একটি হলো জীবন ঠিকিয়ে রাখার অঙ্গ আর অন্যটি হলো শরীরে বিশুদ্ব অক্সজেন সর্বরাহ করে তাঁকে শক্তিশালী করে রাখার অঙ্গ। ব্যাক্তি হলো সমাজের হার্ট আর ফুসফুস হলো সমাজ যা ব্যাক্তি মানুষের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে ।

নিরাজ সমাজঃ আসলে কি চায় ?

এনার্কিজম হল এমন একটি পথ ও পন্থা বা উপায় যা সকল মানুষকে বিদ্যমান সব বাঁধা থেকে স্বাধীন ও মুক্ত করে দেয়; এটা ব্যাক্তি ও সমাজের মধ্যে ন্যায় সংগত পন্থায় একটি সুসমন্ব সাধন করে থাকে। মানুষের ঐক্য ও সংহতি বিধানের ক্ষেত্রে যে সকল বাঁধা আছে তা দূরী করনের জন্য প্রয়োজনে যুদ্ব ঘোষনা করে। ব্যাক্তি মানুষ ও সমাজের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক সৃজনে ভূমিকা রাখে।

মানুষের মনোজগতে ধর্ম একটি প্রবল প্রভাবশালী বিষয়; মানুষের চাহিদা মেটানোর জন্য সম্পদ হলো একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান; মানুষের আচরনকে নিয়ন্ত্রন করতে প্রভাবকের ভূমিকায় আছে সরকার, এই তিনটি বিষয় মানব সমাজকে অক্টোপাশের মত ঘিরে রেখেছে। অলৌকিক বিশ্বাস মানুষের মনোজগতের উপর প্রভাব সৃষ্টি করে মানুষের আত্মাকে মেরে ফেলে। লুকানো শক্তিই সব কিছু, মানুষ কিছুই নয় এমন একটা ধারনার প্রচলন আছে। নিরাজবাদ শিক্ষা দেয় চারপার্শ্বের সকল কিছু বিচার বিশ্লেষণ করে নিজের পথ টি পরিস্কার করে নেয়ার মধ্যেই সকল সমস্যার সমাধান নিহিত আছে ।

মানুষের চাহিদার উপর প্রবল প্রভাব রাখে সম্পদ, এটা অধিকারের চেয়ে বেশী কাজ করে চাহিদা নিবারনের জন্য। সম্পত্তির উপর মানুষের অধিকার ও এক কালে ধর্মীয় বিধানের মতই কার্যকরী ছিলো। “দান কর ! অর্পন কর! বলি দাও!” এনার্কির চেতনাওই মানুষকে সেই সমর্পিত অবস্থান থেকে সরিয়ে এনেছে। মানুষ এখন আলোর দিকে ফেরেছে। মানুষ শিখেছে, সম্পত্তি এখন বিপদজন হয়ে উঠছে, নির্যাতন নিপিড়নের মাধ্যম হয়ে উঠেছে, এটা এখন এক ভয়ঙ্কর দৈত্যের রূপ নিয়েছে। এই দৈত্য ব্যবহার করতে কিছু মানুষ ও রাষ্ট্র এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে।

ফ্রান্সের মহান দার্শনিক প্রুধো বলেছিলেন, “সম্পত্তি হলো ডাকাতির মাল”। হ্যাঁ এটা তাই। পুঁজি খাঁটিয়ে, ব্যবসা বানিজ্যের মাধম্যে সাধারন লোকদের শ্রমের মূল্যকে একছেটিয়া ভাবে পুঞ্জিভূত করার মাধম্যেই সম্পদের সমাহার ঘটে। সম্পদ উৎপাদন হয় ঠিকই কিন্তু সকলের চাহিদা কিন্তু মেটানো হয় না । একজন সাধারন মানুষ ও এটা জানেন যে বিগত কয়েক দশক ধরে দুনিয়া এমন জায়গায় এসেছে যে এখন চাহিদার তুলনায় অনেক বেশী সম্পদ উৎপাদন করা হচ্ছে। কিন্তু সাধারন মানুষের চাহিদা মেটাতে উপযোগী প্রতিস্টান কি গড়ে উঠেছে? পুরাতন সংস্থা সমূহ সম্পদকে তাঁদের ক্ষমতার উৎস হিসাবে ব্যবহার করছে। সুষ্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানুষের চাহিদা মেটাতে চাইছে না । বরং সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে আরো শোষণ, নিপিড়ন এবং মানুষকে দাসে পরিণত করতে চাইছে । আমেরিকা নিজের ক্ষমতা আরো বাড়াতে চাইছে, আরো সম্পদ লুন্ঠন করে আরো ধনী হতে চাইছে। বিপুল সম্পদের মালিকানা অর্জন সত্ত্বে ও এরা হতাশা, ভয় ও নিরান্দ জীবন যাপন করছে। সেনাবাহিনী পরিবেষ্টিত জাতি হিসাবে নিজেদেরকে গড়ে তুলছে । যা একেবারেই স্বাভাবিক মানব সমাজ নয়।

সাধারণত বলা হয় কোন ব্যবসায়ের উদ্যোগ গ্রহন কারী ব্যাক্তি যদি লাভের চেয়ে বেশী খরচ করেন তবে, অনিবার্য ভাবেই তিনি দেওলিয়া হয়ে যান। কিন্তু যারা উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত তারা এই সাধারন শিক্ষা টি এখনো শেখেননি। এক হিসাবে দেখা গেছে আমেরিকায় প্রতি বছর উৎপাদন কার্যে প্রায় ৫০,০০০ হাজার লোক মারা যায় আর প্রায় ১০০,০০০ লোক আহত হন। যারা সম্পদ সৃষ্টি করেন তাঁরা পায় কম, অন্যদিকে সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠছে, তাঁদের অবস্থার তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। আমেরিকা আজো উতপাদক দেওলিয়া লোকদের প্রতি অন্দ্ব হয়ে আছে। এই ধরনের কার্যক্রম অবশ্যই অপরাধ মূলিক কাজ হিসাবে গন্য। ষ্টীল ও লোহার শিল্পের কর্মে যারা নিয়োজিত তারা তাঁদের মালিক শ্রেনীর দ্বারা আরো বেশী শোষিত হচ্ছে। যা ক্রমে বিপদজনক হয়ে উঠবে। মানুষ কেবল তাঁর শ্রমের পন্য নয়, বরং তাঁর মধ্যে মুক্ত উদ্যোগক্তা, মৌলিকত্ব ও বিদ্যমান আছে। সে তাঁর ইচ্ছে শক্তির মাধ্যমে অনেক চমৎকার কাজ করতে পারে।

রাজ সমাজঃ আসলে কি চায় ?

এ প্রসঙ্গে মার্কিন সরকারের কথা উল্লেখ করা যায়, আমেরিকার মহান এনার্কিস্ট চিন্তক, ডেভিড থিউ বলেন, “ সরকার এখন যতটা না কার্যকর তাঁর চেয়ে বেশী ঐতিহ্য হিসাবে চলছে, অনেকেই সরকার চালাতে নানা প্রকার জোড়াতালি দেবার চেষ্টা করছেন, কিন্ত কিছুতেই শেষ রক্ষা ও হচ্ছে না; নানা ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে অনৈতিকতা ও অব্যবস্থপনা। রাষ্ট্র এখন আর প্রাণবন্ত সংস্থা নয়, এটা জীবন্ত মানুষকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে। আইন মানুষকে আর ন্যায় বিচার দিতে পারছেনা ; এটাকে নিজেদের ইজ্জত রক্ষার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করছে, দৈনিন্দন ঘটনা প্রবাহে অন্যায়ই পরিস্ফুট হয়ে উঠছে”।

এখন সরকার সাধারন মানুষের সামনে আন্যায়ের প্রতীক হয়ে উঠছে। এক কালে একটি কথার ব্যাপক প্রচলন ছিল যে রাজা মশায়ের কোন প্রকার ভূল নেই। এখন সরকার সমূহ ও ক্ষমতার পরিধি এত বাড়িয়ে দিচ্ছে যে এরা যে কোন কিছু কে নিন্দা জানাতে, বিচার করতে, এবং শাস্তি দিতে পারে। লগু অপরাধে গুরু দন্ড আবার গুরু অপরাধে লগু দন্ড দিতে তাঁদের কোন সমস্যাই হয় না । রাষ্ট্র ব্যাপক ক্ষমতার মালিক হয়ে বসেছে। রাষ্ট্রের অধিকার জনগণের অধিকারকে দলিত করলেও কেঊ কিছু করতে পারে না । রাষ্ট্রের লক্ষ্যই থাকে এমন কিছু করতে যা দেখে জনগণ কোন ভাবেই এর বিরুধীতা করার সাহস যেন না পায় । রাট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ ছিলো মানুষের কায়িক শ্রম ও যন্ত্রনাকে লাগব করা, নিরাপত্তা দেয়া । ব্যাক্তি স্বাধীনতার পরিবেশ তৈরী করা এবং সু স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ভাল ও উন্নত চিকিতসার ব্যবস্থা করা । জনগণ যথাযথ ভাবেই কর দিয়ে যাচ্ছে, তাঁর ব্যাতিক্রম হবার উপায় নেই। অথচ রাষ্ট্র মানুষকে দুই দিকে উঁচু দেয়াল তুলা একটি সরু রাস্তা দিয়ে মানুষকে হাটতে বাধ্য করছে।

রাস্ট্র যতই অন্যায় অবিচার, দুর্নীতি, ও স্বৈরাচারী ই হোক না কেন রাষ্ট্রের বিরুদ্বে অল্প লোক হলে ও বিদ্রোহ করবে। যাদেরকে সেবার জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে তারা যখন প্রভু হয়ে বসেন তখন এদেরকে তাড়ানো ছাড়া তো আর কোন পথ থাকে না । তাই বাকুনিন রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুধিতা করেছিলেন এই যুক্তিতে যে, রাষ্ট্র ব্যাক্তি ও সংখ্যা লগুদের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। এটা সামাজিক সম্পর্কে ফাটল ধরায়, মানুষের প্রানবন্ততাকে সিমীত করে দেয় এমন কি অনেক ক্ষেত্রে অস্বীকার করে । রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিলো স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে, এটাকে ধর্মের মতই মানুষ জীবন বলি দিয়ে সুরক্ষার চেষ্টা করে ইতিহাসের নানা বাঁকে।

আজ ও বেশীর ভাগ চিন্তাবিদ রাষ্ট্র ব্যবস্থার সুরক্ষা, সম্পত্তিতে একছাটিয়া অধিকার, পদপদবীর সোপান ইত্যাদিতে আস্থাশীল। তা তারা তাঁদের চিন্তা ভাবনায় ও কর্মে প্রকাশ করে যাচ্ছেন।

এমন কি জর্জ বার্নাড শ ও ফেবিয়ানবাদের আওতায় এক প্রকার আলৌকিক পন্থায় রাষ্ট্রের মাধ্যমে মুক্তি ছেয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য হলোঃ “ রাষ্ট্র এখনো দাস-দাসী ও ক্ষতিকর দরিদ্রদেরকে কাজে লাগাবার একটি বিশাল যন্ত্র”। তা হলে দারিদ্র চলে গেলে রাস্ট্রকে ও চলে যেতে হবে।

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে সত্য যে, এখনো অনেক লোক বিশ্বাস করেন যে, সরকার প্রাকৃতিক ন্যায় বিচারের উপর নির্ভরশীল, এটা সামাজিক সংহতি বাজায় রাখার জন্য কাজ করছে, এটা অপরাধের বিলয় ঘটাচ্ছে এবং অলস লোকদেরকে কর্মঠ করে তুলছে। তাই আমি এই বিষয় গুলো নিয়ে সামনে আরো আলোচনা করব।

বিপ্লবী সামাজিক আন্দোলন

নৈরাজ্যবাদ একটি শক্তিশালী বিপ্লবী সামাজিক আন্দোলন যা পুঁজিবাদের বিরুদ্বে লড়াই সংগ্রাম করতে গিয়ে উদ্ভোত হয়েছে- এর লক্ষ্য হলো সকল প্রকার শোষণ ও শাসন থেকে বিশ্ব মানব সমাজকে মুক্ত করা । এটা কোন কঠিন বিষয় নয় বরং খুবই সরল ও স্বাভাবিক একটি পথ ও পন্থাঃ জনগন জানেন কোন প্রকার বিষেশজ্ঞ ছাড়াই কিভাবে তাঁদের জীবন যাপন করতে পারবেন। অন্যান্য আত্মসমর্পিত লোকেরা বলে বেড়ায় যে মানুষ তাঁর নিজের প্রকৃত স্বার্থ বুজতে পারে না। তাঁদের সুরক্ষার জন্য একটি সরকার দরকার। একটি রাজনৈতিক দলের উপস্থিতিই সমাজের সকল স্তরের মানুষের সকল স্বার্থ নিশ্চিত করতে পারে। নৈরাজ্যবাদিরা দৃঢ় ভাবে বলে কোন প্রকার এক কেন্দ্রীক সরকারের পক্ষে সকল মানুষের জন্য সিদ্বান্ত গ্রহন সঠিক হতেই পারে না, তা অবশ্যই বিকেন্দ্রিক করতে হবেঃ তাই বলা হয় প্রতিটি ব্যাক্তিই সমাজের কেন্দ্র হয়া উচিৎ, সকলেরই স্বাধীন ভাবে পরস্পরের সাথে মিশে সম্পর্কের বুনন তৈরী করার মাধ্যমে নিজেদের সকল সমস্যার সমাধান করার পরিবেশ বজায় থাকা চাই।

রাষ্ট্র পরিচালিত স্কুল কলেজ বিশ্বব্দ্যালয়ে আমরা যে শিক্ষা গ্রহন করি তাতে এই শিক্ষাই দেয়া হয় যে আমরা আমাদেরকে রাষ্ট্র ছাড়া পরিচালনা করতে পারব না । তারা শেখায় নৈরাজ্য হল অবাস্তব বিষয় কল্পনা বিলাশ মাত্রঃ এটা কোন কাজের মতবাদ নয়। পক্ষান্তরে, আমাদের অভিজ্ঞতা বলে ইহা রাষ্ট্রের ছেয়ে আরো অনেক চমৎকার ভাবে স্মাজ পরিচালনায় সক্ষম । দুনিয়ার ইতিহাস বলে লক্ষ লক্ষ বছর পৃথিবীর নানা জায়গায় মানুষ রাষ্ট্র ছাড়াই সুন্দর, নিরাপদ ও শান্তির জীবনযাপন করেছে।

একটি নৈরাজ্যিক সমাজকে রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদের সাথে তুলনা করা যায় কেমন করে? একটি উঁচু নিচু স্তর বিশিষ্ট সমাজ কিছু বিষেশ বৈশিস্ট ধারন করে থাকে। এই ধরনের সমাজ তাঁদের প্রতিবেশীদেরকে গিলে খায়, তাঁদের প্রশাসক চক্র নানা সুবিধা আদায় করে থাকে । পক্ষান্তরে, এই সকল সমাজে জলবায়ুর পরিবর্তন, খাদ্য সঙ্কট, পানির সঙ্কট, বাজারের অস্বাভাবিক উঠা নামা, সামাজিক-আর্থিক বৈষম্য ও অস্থিরতা নিত্য সংগী হয়ে থাকে । এই গ্রন্থে আমি দেখাতে চেষ্টা করব একটি নৈরাজ্যবাদি সমাজ কিভাবে ঠেকসই পদ্বতীতে তাঁর সকল লোকদের সকল চাহিদা পুরন করে থাকে ।

আমরা বর্তমান ও অতীত থেকে নানা তথ্য উপাত্য সংগ্রহ করে পাঠকের সামনে হাজির করে দেখাব কিভাবে নৈরাজ্যব্যবস্থাকে চাপা দেয়া হয়েছে নানা সময়ে এবং তা থেকে কিভাবে বিপ্লবী সিদ্বান্তে উপনিত হওয়া যায়। আমরা খুব সহজেই কোন প্রকার কতৃর্ত্ব, প্রভূ, রাজনীতিবিদ, বা আমলা ছাড়া সমাজে বসবাস করতে পারি; এটা হবে বিচারক, পুলিশ, এবং অপরাধী, ধনী ও গরীব বিহীন; এই নৈরাজ্যিক সমাজে লিংগগত বৈষম্য, দাসত্ব, গনহত্যা বা কোন প্রকার উপনিবেশবাদের অস্থিত্ব থাকবে না । আমাদের এই লক্ষ্যিত সমাজে কোন প্রকার কারাগার থাকবে না । থাকবে না কোন প্রকার বন্দ্বিত্ব।

অবশ্যই আমরা বাস্তব অবস্থায় নৈরাজ্যবাদি সমাজ বিনির্মানে কোন অভিজ্ঞতাকে খাট করে দেখবনা। আমরা যদি একবার স্বধীনতার ভিত্তিতে সমাজ পরিচালনার সুযোগ পেয়ে যাই তবে এতে অনেক সৃজনশীল পন্থার সংযোজন ঘটানো হবে। সমাজকে সত্যিকার অর্থেই স্বধীনভাবে স্থাপন করা হবে। তাই আসুন সেই নয়া যুগের সুচনা করি। সকল বাঁধা অতিক্রম করে সুন্দর সমাজ আজকের ও আগামী প্রজন্মের জন্য বিনির্মান করি।

নৈরাজ্যবাদ নিয়ে কিছু আলাপ

এই প্রশ্নের জবাবে বহু প্রবন্দ্ব ও পুস্তক প্রণীত হয়েছে, নৈরাজ্যবাদ নির্মান করতে, প্রচার করতে, বাস্তবায়ন করতে এবং সংজ্ঞায়িত করতে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের জান কোরবান করেছেন। নৈরাজ্যবাদের সূচনা করতে এই পথে বহু মানুষ অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেনঃ উনবিংশ শতাব্দিতে ইউরূপের শ্রমজীবী মানুষ পুঁজিবাদের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরুদ্বে এবং রাজনৈতিক দল গুলোর বিপরীতে তাঁদের আদর্শিক লড়াই চালিয়েছেন; আদিবাসি ও উপনিবেশের মানুষ লড়াই করেছে তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রাখতে, ছাত্র জনতা তাঁদের ভাষা সংস্কৃতিকে সুরক্ষার জন্য জীবন দিয়েছেন; চীনের ডায়োস্ট বা এনাবাপট্রিস্ট গৌত্রের লোকেরা প্রায় পাঁচ শত বছর আগে সরকার ও তাঁদের চাপিয়ে দেয়া ধর্মের বিরুদ্বে সংগ্রাম করেছেন; বাম পন্থীদের কর্তৃত্ববাদ ও যৌনতার বিরুদ্বে লড়াই চালিয়েছেন। নৈরায়বাদের কোন কেন্দ্রীয় কমিটি নেই, নেই কোন চিরস্থায়ী নীতিমালা। নৈরাজ্যবাদ হল নানা মানুষের নানা মতামতের গুরত্ব দান করা। তবে, নিম্নে কিছু বিষয় তুলে দেয়া হল যে সকল বিষয়ে নৈরাজ্যবাদিরা প্রায় সকলেই একমত।

স্বাধীন এবং সার্বজনীনঃ সকল মানুষের ই স্বাধীন ভাবে মতামত প্রদান এবং দলবদ্ব হবার অধিকার রাখে। চাপিয়ে দেয়ার পরিবর্তে সকলকে নিয়ে সিদ্বান্তগ্রহন প্রক্রিয়া বজায় থাকবে, কেহই কোন ভাবে প্রাধান্য প্রতিস্টা করতে পারবেন না; তারা নিজেদের ক্ষমতা নিজেরা স্বাধীন ভাবে চর্চা করতে পারবেন, তবে তা অন্যদের উপর নয়। নৈরাজ্যবাদ পিতৃতান্ত্রিক, সাদাদের প্রধান্য, রাষ্ট্র ব্যবস্থার খবরদারী, সামাজিক নিপিড়ন মূলক উঁচু নিচু পন্থার সম্পূর্ন বিরুধী।

সম্মিলিত সহযোগীতাঃ মানুষ স্বেচ্ছায় একজন আরেক জনকে সহায়তা করবেন; মানুষের সম্পর্ক আইন, কারাগারের ভয়, অত্যাচারিত হবার বা এক ঘরে হয়ে যাবার ভয়ে গড়ে উঠবে না, বরং পারস্প্রিক সংহতি ও দয়া মায়ার ভিত্তিতে গড়ে উঠবে। সম্মিলিত সহযোগীতা কোন দান দক্ষিনা বা কিছু পাওয়ার জন্য ও হবে না; সেবা গ্রহিতা বা দাতা সকলেই সমান হবেন এটা হবে আন্তঃ বিনিময় ব্যবস্থা হিসাবে। কেহ কাহারো উপর ক্ষমতা খাটাতে যাবেন না, তারা তাঁদের সম্মিলিত শক্তিকে বৃদ্বি করবেন আরো সুন্দর ভাবে সম্মিলিত কর্ম সম্পাদনের জন্য।

স্বেচ্ছা সংস্থাঃ জনগনের স্বাধীনভাবে কারো সাথে সম্পৃক্ত হবার না হবার অধিকার থাকবে, মানুষে মাঝে মুক্ত সম্পর্কের পরিবেশ বজায় থাকবে; সম্পর্ক রাখা না রাখার ও স্বাধীনতা থাকবে, প্রতিটি মানুষ ব্যাক্তিগত ভাবে বা সামাজিক ভাবে সম্পূর্ন স্বাধীনভাবে চলার ফেরার স্বাধীনতা ভোগ করবেন। কোন প্রকার ভৌগলিক, লিঙ্গগত বা বর্ন গত বোর্ডার বা সিমান্ত থাকবে না ।

সরাসরি কাজঃ নৈরাজ্যবাদ কোন ভনিতা করে না বরং সরাসরি কাজে মন দেয়। লক্ষ্য অর্জনে নৈরাজ্যবাদিরা কোন প্রকার মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি ও লাগাতর কাজ করে যায়। একজন স্বাধীন মানুষ দুনিয়াকে স্বাধীন দেখতে চায়, তারা পরিবর্তনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়।

বিপ্লবঃ প্রচলিত নিপিড়ন মুলক ব্যবস্থার কেবল সংস্কার করে দিলেই হবে না । যারা নানা প্রতিস্টানের ক্ষমতার মসনদে আসীন আছেন তাঁদের দ্বারা সত্যিকার সংস্কার সম্ভব নয়, তারা কোনভাবেই চাইবেন না যে তাঁদের ক্ষমতা কমে যাক বা খাট হোক। সাদা অভিজাততন্ত্র এবং পুঁজিবাদ রীতিমত নিজেদের প্রভূত্ব বজায় রাখার জন্য লড়াইয়ে লিপ্ত; নৈরাজ্যবাদিগন বিপ্লবের মাধ্যমে সকল প্রকার অভিজাততন্ত্রের বিলয় ঘটিয়ে একটি মুক্ত ও স্বাধীন সমাজ গড়ে তুলতে চায়।

ব্যাক্তিগত স্বাধীনতাঃ একটি পুরাতন শ্লোগান আছে, “ শ্রমজীবী মানুষের স্বাধীনতা শ্রমজীবীগনকেই আদায় করে নিতে হবে”। এটি অন্যত্র ও কাজে লাগানো যায়; মানুষ তাঁর স্বাধীনতা নিজেই চিনিয়ে আনবে। স্বাধীনতা কেউ কাউকে দেয় না; এটা অর্জন করতে হয়।

কট্টর আদর্শবাদে বহুত্ববাদ ও স্বাধীনতার স্থান নেই। ঐতিহাসিক ভাবে নৈরাজ্যবাদের অনেক উদাহরন পাওয়া যাবে। অনেক সমাজে, সরকারে, ও সংস্থায় অনেকেই মুক্ত ভাবে জীবন যাপন করেন কিন্তু নিজেকে “নৈরাজ্যবাদি” দাবী করেন না । এই শব্দটি উনবিংশ শতাব্দিতে আত্মসচেতন ভাবেই ইউরূপে উদ্ভাবিত হয়। যার লক্ষ্যই ছিলো মানুষের সার্বজনীন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো।

ধারনা করা হয় যে মানুষ নৈরাজ্যিক জীবন যাপন করলেও “নৈরাজ্যবাদি” লেভেল নিজেদের পছন্দ নয় বলেই তা গ্রহন করে নাই; আমরা গভীরভাবে দেখলে দেখব যে ভিন্ন পরিভাষায় ব্যবহারিক জীবনে মানুশ নৈরাজ্যবাদ চর্চা করছেন।

“নৈরাজ্যবাদ” হল এমন একটি সামাজিক অবস্থা সরকারের নিপিড়ন মূলক উঁচু নিচু প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তে স্বনিয়ন্ত্রিত ও সম্মিলিত সামাজিক সম্পর্ক বিরাজ করবে; “নৈরাজ্যবাদি” হল সেই সকল ব্যাক্তি যারা নৈরাজ্যিক দর্শন আনুসারে সামাজিক আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত। কর্তৃত্ববাদ বিরুধী লোকেরা কোন প্রকার নিপিড়ন মুলক যাজকতন্ত্রের অনুগত থাকতে চায় না । ঐতিহাসিক পঠভূমি অনুসারে আমারা জানি এই যাজকতন্ত্রের বিরুদ্বে আন্দোলন ইউরূপেই প্রথম সূত্রপাত হয়। সেই সময়ে সামাজিক শ্রেনী বিভক্তির বিরুদ্বে নানা প্রকার আন্দোলন ও গড়ে উঠেছিলো। তবে সকলেই ‘নৈরাজ্যবাদি’ ছিলেন না । এমন একটি সমাজের কথা চিন্তা করা হয়েছে যেখানে কোন রাষ্ট্র ব্যবস্থা থাকবে না যাকে বলা হয় নৈরাজ্যবাদি বা “রাষ্ট্র বিহীন” সামজ। যদি কোন ঘটনা চক্রে সত্যি রাষ্ট্র থেকেই যায় তবে অত্যন্ত সচেতন ভাবে লক্ষ্য রাখা হবে যেন কোন ভাবেই সামাজিক শ্রেনীর উদ্ভব না হয়। সেই সমাজকে মুক্ত ও নৈরাজ্যবাদি হিসাবে সুরক্ষা দেয়া হবে।

এখানে একটি দীর্ঘ সময় কালের মধ্যে সংঘটি সমাজ বিষয়ে কতিপয় নির্বাচিত উদাহরন উপস্থাপন করা হবে – তা প্রায় নব্বইটির মত হবে। এর মধ্যে ত্রিশটি হুবহু নৈরাজ্যবাদি সমাজ, আর বাকি গুলো ছিলো রাষ্ট্র বিহিন, স্বশাসিত, বা সচেতনভাবেই কর্তৃত্ববাদ বিরুধী সমাজ। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই হল বর্তমান পাশ্চাত্য সমাজ ভুক্ত, তিনভাগের এক ভাগ হলো পাশ্চাত্য সমাজের বাহিরে আর বাকি গুলো হলো দ্রুপদি ঐতিহাসিক সমাজের উদাহরন। এদের মধ্যে কিছু সমাজ স্পেনের গৃহ যুদ্বের সময় বিলয় হয়। যাদের সম্পর্কে সুনির্দিস্ট দলিল পত্র মজুদ আছে। আগ্রহী পাঠক অধ্যয়ন করে জেনে নিতে পারেন।

এই গ্রন্থের মুল বক্তব্যই হলো নৈরাজ্যবাদ কেমন করে পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্বে লড়াই করে। এখানে বেশ কিছু উদাহরন তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে পুলিশ কেমন করে ধ্বংস আর সেনাবাহিনী কিভাবে নানা ভাবে নিপিড়ন নির্যাতন করে নিজেদেরকে বিজয়ী করার চেষ্টা করে। সেই জগন্য কর্মের জন্যই নৈরাজ্যবাদিরা বলেন বিপ্লবকে অবশ্যই বিশ্ব ভিত্তিক হতে হবে। পুঁজিবাদ একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা, এটা ক্রমাগত দুনিয়ার নানা স্থানে নানা ভাবে উপনিবেশ কায়েম করে ইহা স্বাধীন ও স্বশাসিত সমাজ ব্যবস্থার শত্রু। দির্ঘ সময় নিয়ে চিন্তা করলে বলতেই হয় যে কেবল একটি মাত্র দেশে নৈরাজ্যবাদ কায়েম করা বা ঠিকিয়ে রাখা অসম্ভব। পুজিবাদ বিরুধী বিপ্লব অবশ্যই পুঁজিবাদকে বিনাশ করবে, বা নিজেরা ধবংস হয়ে যাবে। নৈরাজ্যবাদ একক ভাবে বিশ্বব্যাপী মতবাদ নয়। নৈরাজ্যবাদ নানা জায়গায় নানা ধরনে সমাজ বিনির্মান করতে পারে, তবে কোথাও কোথাও সহ অবস্থান করলেও তা নৈরাজ্যবাদি সমাজ হিসাবে বিবেচিত হবে না। ইহা অবশ্যই কর্তৃত্ববাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে বা নিপিড়নের শিকার হবে। নিম্ন আমরা এই সকল বিষয়ে আলোকপাত করব।

এখানে আমরা বিশেষ কিছু দিক তুলে ধরব যা এই পুস্তক পাঠে সহায়ক হবেঃ

বিচ্ছিন্নন্তাঃ কিছু নৈরাজ্যবাদি প্রকল্প বেশ চমৎকার কাজ করে থাকে, কিন্তু এটা কেবল স্বল্প সঙ্খ্যার মানুষকে উপকার করতে পারে। এই বিচ্ছিন্নতার কি উৎপাদন করতে পারে ? কি কি অবদান রাখা যায় বা কি ফলাফল পেতে পারেন ?

জোটঃ এমন কিছু উদাহরন আছে, নৈরাজ্যবাদি ও কতৃর্ত্ববাদ বিরুধীরা বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে, বিশ্বাস ঘাতকদের সাথে মিলিত হয়ে নিজেদেরকে ক্ষমতায় আসীন করার প্রয়াস চালিয়েছে। নৈরাজ্যবাদিরা কেন এই ধরনের জোটকে বেঁচে নিয়েছে? আমরা এ থেকে কি শিক্ষা নিতে পারি বা কি ধরনের জোট গড়ে তুলতে পারি?

দমনঃ স্বশাসিত সম্প্রদায় এবং বিপ্লবী কার্যক্রম পুলিশ ও সামরিক অভিযানের দ্বারা বন্দ্ব করে দেবার চেষ্টা করা হয়। মানুষ ভীত, অত্যাচারিত, গ্রেফতার, এবং খুন হয়েছে এবং নিজেদেরকে সময়মত লুকিয়ে রেখেছে এমন কি লড়াই সংগ্রাম থেকে সরে ও পড়েছে অনেকে; সম্প্রদায় সমূহ যদি বিপদের সময় সহযোগীতা না করেন, তবে কি কি কি কার্যক্রম ও কৌশল নেয়া হবে, দমন পিড়ন কি অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে মোকাবেলা করা যাবে? সেই কি করে বাহিরের সহায়তা ও সমর্থন আদায় করা যাবে তা নির্নয় করা হবে?

সহযোগীতাঃ কিছু আন্দোলন সংগ্রামী দল, র‍্যাডিকেল প্রজেক্ট আছেন, যারা প্রচলিত ব্যবস্থার সাথে মিলেমিশে কাজ করতে চান, নিজেদেরকে জনগণের সাথে বড় পরিসরে মিলাতে চান, বা নিপিড়ন নির্যাতনকে এড়িয়ে যেতে চান। এই ধরনের কর্ম পন্থার উপকারিতা কি ? এটা কি সত্যি বিচ্ছিন্নতা বা নিপিড়ন থেকে রক্ষা করতে পারে? এর কোন বিকল্প আছে কি ?

সাময়িক অর্জনঃ এমন অনেক উদাহরন এই বইয়ে আছে যার এখন কোন অস্থিত্ব নেই। নৈরাজ্যবাদিরা অবশ্যই কোণ স্থায়ী সংগঠন গড়ে তুলতে চায় না । সুনির্দিস্ট কাজের জন্য গড়ে তুললে ও কাজ শেষে তাঁর বিলুপ্তি ঘটে। ক্ষমতা দখলের পর নানা সমস্যার সমাধান কি কি প্রক্রিয়ায় করা হবে? ক্রমাগত লড়াই সংগ্রাম ও সম্প্রদায়ের ব্যবস্থাপনা কেমন করে হবে ?

নিরাজ সমাজঃ আসলে কি চায় ?

প্রাকৃতিক জগতের আইন প্রয়োগের জন্য কোন প্রকার জবরদস্তির দরকার পরে না, এটা প্রকৃতির মধ্যেই স্বপ্রনদিত হয়ে চালু থাকে- বাস্তবায়িত হয়। উদাহরন হিসাবে উল্লেখ করা যায়, মানব দেহে পুস্টি চাহিদা, যৌন কর্মের আকাঙ্ক্ষা, আলো ও বাতাস তার নিজস্ব গতিতেই পরিচালিত হয়। এই সকল আইন বা নিয়ম বাস্তবায়নের জন্য সরকার, ক্লাব, বন্দুক, হাত করা বা কারাগার দরকার হয় না । এই ধরনের নিয়ম বিধি মেনে চলার জন্য দরকার কেবল মাত্র স্বাধীন পরিবেশ। দুনিয়ার সরকার গুলো মোটেই এই নিয়ম মানেন না, তারা সর্বদাই শক্তি প্রয়োগ, সহিংসতা, প্রতিশোধ পরায়নতার পন্থা অনুসরন করে মানুষের আনুগত্য অর্জন করতে চেষ্টা করে। তাই আইনবিদ ব্ল্যাকস্টোন বলেন, “ মানবের আইন অবৈধ, কারন এই আইন গুলো প্রকৃতি বিরুধী”।

ওয়ার্শোর নির্দেশ পাবার আগে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে নির্মম ভাবে, এই ক্ষেত্রে এটা বুঝা মুশকিল যে সরকার সত্যি মানুষের সামাজিক সংহতি চায়। নির্মমতা, নির্যাতনের মাধ্যমে যে আনুগত্য আদায় করা হয় সেখানে ক্ষমতা অর্পন করা একেবারেই নিরাপদ নয়; আমরা বিগত দিন গুলোতে এই চিত্রটিই দেখে আসছি। প্রকৃতিক ও স্বপ্রনোদিত অবস্থায়ই আমরা মানুষের মাঝে সত্যিকার সহমর্মিতা দেখতে পাচ্ছি। ভেবে দেখুন ! যে সমাজে যারা সর্বদা খেটে মরে তারা তেমন কিছুই পায় না, আর যারা তেমন কিছুই করেন না তারা সকল কিছুই পায়; তা হলে যে সামাজিক সংহতি বা বন্দ্বনের কথা বলায় তা এখন প্রহেলিকা মাত্র। এখনো যারা এই পৃথিবী নামক গ্রহের নিয়ন্ত্রনকারী তারা সকল ভোগ বিলাশের সামগ্রী নিজেরাই ভোগ করছেন আর চেষ্টা করে যাচ্ছেন যারা তাঁদের দাসত্বের আওতায় আসেনি তাদেরকে ও দাসানু দাসে পরিণত করতে । সরকার সমূহের – আইন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আদালত, সংসদ ও কারাগারকে সেই তথাকথিত “সামাজিক সংহতি” র নামে ব্যবহার করছে।

আইন এবং কর্তৃপক্ষের নিকট এক অদ্ভুত বিষয় হলো যে তারা নাকি অপরাধ হ্রাস করছেন। পক্ষান্তরে, আমরা দেখি রাস্ট্রই হলো সবার চেয়ে বড় অপরাধী, এটাই লিখিত ও প্রকৃতির আইন ভঙ্গ করে চলেছে, করের টাকা নানাভাবে মেরে দিচ্ছে, যুদ্ব ও ক্যাপিটাল পানিসম্যান্টের নামে মানুষ হত্যা করছে, রাষ্ট্র কোনভাবে অপরাধ থামাতে পারছে না। বরং বাড়িয়ে দিচ্ছে অপরাধ ও অপরাধের পরিমান। অনেক ক্ষেত্রে নিজেই অপরাধের মেশিন হয়ে অপরাধ সৃজন করছে ।

অপরাধ আর কিছু নয় এটা হলো ভুল ভাবে চালিত মানুষের ক্ষমতা। যতক্ষন পর্যন্ত প্রতিটি প্রতিস্টানের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নৈতিক দিক গুলো সঠিক ভাবে চালিত না হবে ততক্ষন পর্যন্ত অপরাধ থামবে না । যতদিন মানুষ অপরাধ মুলক কাজকে ঘৃনা করবে না, বা জীবন যাপনে পরিচ্ছন্নতা আনয়ন করবে না ততদিন অপরাধ ঘটতেই থাকবে। এখন আমরা সমাজে বাস করি সেই সমাজে কেবল আইনের সংখ্যা বাড়ে কিন্তু অপরাধের সংখ্যা কমে না । প্রচলিত সমাজে দারিদ্র, হতাশা, বেচে থাকার কঠিন লড়াই মানুষকে বেপরোয়া করে দেয়। এই সত্যটি পিটার ক্রপথকিন সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেনঃ

“ যারা মানবতার উপর আইনের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য আইন ও শাস্তির উপকারিতা যাচাই করেন; যারা সমাজের প্রকৃত অবস্থা বিবেচনায় না নিয়ে অন্যদেশের খবরের উপর নির্ভর করে গর্বীত হন বা বিচারকের পক্ষ নেন, বা সরকারের পক্ষ নিয়ে অর্থ উপার্জন করেন তারা প্রায়স ই অপরাধ বৃদ্বির জন্য কাজ করে থাকেন । আর যারা অপরাধের তকমা মাথায় নিয়ে কারাগারে যান তারা জানেন মানুষের স্বধীনতা কি ভাবে ভুলন্ঠিত হয়ে হয়। নির্মমতা, নিস্টুরতা তাঁদের হয় নিত্য সঙ্গী। মানুষকে অপমান অপদস্ত করে অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়” ।

নিরাজবাদ : কতিপয় ভাবনা

মানবজাতি মুক্তভাবে জন্মগ্রহন করে !

আমাদের ন্যায্য অধিকার অলংগনীয় বিষয়। প্রতিটি লোক তাঁর পূর্ববর্তী প্রজন্মের উত্তরাধিকার হিসাবে জন্মায়। জন্মগত ভাবেই আস্ত দুনিয়াটা আমাদেরই। কিন্তু সাথে সাথে কিছু দায়িত্ব মাথার উপর চেপে বসে বা অর্পিত হয়। দেশের প্রতি ভালোবাসা, দেশের প্রতি কর্তব্য। প্রভুর প্রার্থনা করা। উঁচু শ্রেনী বা কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য ও উত্তারাধীকারের প্রতি সুবিধার জন্য সম্মান প্রদর্শন – এই সবই ভূয়া। মিথ্যা!

মানুষ যদি সত্যি মুক্ত ভাবে জন্মায়, তবে দাসত্ব হলো তাঁর জন্য মৃত্যু !

কোন মানুষই কোন মানুষকে শাসনের উপযুক্ত নয় । কোন দিনই কেহ দাবী করতে পারেন না যে মানুষ সম্পূর্ন ত্রুটি মুক্ত। কেহ একক ভাবে বা প্রাকৃতিগত আবে নিজেকে পরিপূর্ন করতে ও পারেন না । যা তাঁকে শাসক হিসাবে বিবেচনা করা যায়। সেই সকল ক্ষেত্রে শাসন কার্যের নামে অপকর্মই হয়ে থাকে। আসলেই কোন অতিমানব নেই বা অতি গুনাবলীর অধিকারী লোকের শ্রেনী ও নেই যারা “ত্রুটি পূর্ন” মানব জাতির শাসন করতে পারেন । দাসত্ব মেনে নেয়া আসলেই জীবনের পরাজয় মাত্র।

দাসত্ব যেমন মৃত্যু, সম্পদ ও চুরির মাল !

মানুষ কোন ভাবেই তাঁর প্রাকৃতিক উত্তরাধিকারে রাজ্যে পৌছতে পারে না । নানা বাঁধা বিপত্তি তাঁকে পদে পদে আটকে দেয় ( কখন ও আইনের দোয়াই দিয়ে বা শক্তি প্রয়োগ করে তা করা হয়) বা চালাকি করে ( রাষ্ট্র ও তাঁর কর্মকর্তাদেরকে হাত করে এক শ্রেনীর লোক সম্পদের মালিকানা অর্জন করে ফেলে। এবং সকল সুবিধা ভোগ করে)। প্রচলিত ব্যবস্থাটাই হলো এক দল মানুষের শ্রমের ফল আরেক দল কেড়ে নিবে। এটা সত্য যে একটি প্রতিযোগীতা মুলক সমাজে, স্বাধীন ভাবেই এক দল লোক সম্পদের মালিকানা পেয়ে থাকেন। ( কিন্তু মহান চিন্তক প্রুধু দেখিয়েছেন, সত্যিকার স্বাধীনতাই হলো সম্পদের মালিকানা “সম্পদ ই স্বাধীনতা” সভ্যতার সূচনা লগ্নেই এক শ্রেনীর মানুষ তা চুরি করে আত্মসাৎ করে ফেলেছে)। তবে, মালিকার সাধারন নীতিই হলো, এটা সামাজিক কাঠামোর সাথে জড়িত, এটা সমাজের নিম্ন স্তর পর্যন্ত অসাম্য সৃজন করে থাকে ।

সম্পত্তি যদি হয় চুরির মাল, তবে সরকার হল স্বৈরাচার !

আমরা যদি একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজে বাস করি, এবং সামাজিক শ্রেনীর উচ্ছেদ করি, রাস্ট্রকে যদি অদরকারী করে ও তুলি । কিন্তু রাষ্ট্র যদি ঠিকে থাকে তবে সে নিজের অস্থিত্বের জন্য চেষ্টা করেবেই। “ স্বাধীনতা ছাড়া সমাজতন্ত্র অর্থহীন, আবার সমাজতন্ত্র ছাড়া স্বাধীনতা মূল্যহীন” বলেছিলেন মাইকেল বাকুনিন।


সরকার যদি হয় স্বৈরাচার তবে নিরাজবাদ হলো স্বাধীকার !

সাধারন আমাদের অঞ্চলে “এনার্কি বা নৈরাজ্য” শব্দটিকে ভুল ভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। লোকেরা একে অবিচার ও সন্ত্রাস মনে করে থাকে। প্রচলিত ভাবে মানুষ চিন্তা করেন যে, সরকার, পুলিশ, উঁচু মহলের নির্দেশনা, সামাজিক জীবন, ও রাজনৈতিক দল এবং কার্যক্রম ছাড়া চলা যায় না – সেই দৃস্টিতে তাঁদের ধারনা সঠিক - এনার্কিজম মানেই হলো সরকারে বিলয় ও উচ্ছেদ। কিন্তু যারা এই ধারনার সম্পূর্ন বিপরীত চিন্তা করেন তারা মনে করেন, সরকার হলো স্বৈরাচারী এক ব্যবস্থার নাম। তারা ও মনে করেন সরকার ছাড়াই সত্যিকার স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব। সরকার যখন ই ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ ও শোষন নিপিড়ন নিবারনে বিফল হয় তখনই – সমাজে এনার্কি অনিবার্য ভাবে দেখা দেয় ।

0 Comments 0 Comments
0 Comments 0 Comments