রুডলফ রকারের এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমঃ তত্ত্ব ও অনুশীলন - অধ্যায়ঃ পঞ্চম এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের পদ্বতী ( দ্বিতীয় অংশ)

রুডলফ রকারের এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমঃ তত্ত্ব ও অনুশীলন  - অধ্যায়ঃ পঞ্চম এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের পদ্বতী  ( দ্বিতীয় অংশ)

ভাষান্তরঃ এ কে এম শিহাব

সাধারন ধর্মঘট এমন কোন কর্মসূচি নয় যা যখন তখন প্রয়োগ করা যাবে । এই অস্ত্রটি ব্যবহার করতে হলে সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে, যখন সমাজের বেশীর ভাগ মানুষ এই ধরনের কর্মসূচী প্রতাশ্যা করবেন তখনই ধর্মঘট ডাকার ঘোষণা দেয়া যেতে পারে। একটি হাস্যকর কথা চালু আছে যে, এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টগন প্রায়স সাধারন ধর্মঘট নাকি ডেকে বসে তাদের নিকট নাকি একটি কর্মসূচি আছে। সমাজবাদি সমাজ কায়েমের জন্য নাকি তারা তাড়াহুড়া করেন আর দুষ্ট মন নিয়ে যেখানে সেখানে আক্রমন করে বসে । আদতে যারা এসব বলে প্রচার করেন – ওরাই হলো সমাজে দুষ্ট চক্র।

একটি সাধারন ধর্মঘট অনেক লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক হয় । সামাজিক সঞ্চালন ও সমর্থন আদায়ের সর্ব শেষ পদক্ষেপ হিসাবে এই অস্ত্র ব্যবহার করা হয় । উদাহরন হিসাবে ১৯০২ সালে বার্সেলুনার ধর্মঘটের কথা উল্লেখ করা যায়। ১৯০৩ সালে বিলবাওয়ে অক্টোবর মাসে খনি শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত করার জন্য শ্রমিকগন প্রথমে দরকষাকষি করেন, নিয়োগ কর্তাদেরকে দাবী মানার জন্য যথা সাধ্য চেষ্টা করেন। শ্রমিকগ তাদের সমস্যা গুলো সাধারন সমস্যা হিসাবে আলোচনার মধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন। তারা কিন্তু প্রথমেই ধর্মঘট ডেকে বসেন নাই। ১৯৮৬ সালে ও আমেরিকায় শ্রমিকগন আট ঘন্টা কাজের দাবীতে নিয়োগ কর্তাদের সাথে  আলোচনায় বসেছিলো।  ১৯২৬ সালে ইংরেজ শ্রমিকগন ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করেছিলেন, কিন্তু মালিক পক্ষের লোকেরা শ্রমিকদের বেতন কর্তন করার জন্য ষড়যন্ত্র মূলক ভাবে ধর্মঘটের দিকে শ্রমিকদের ঠেলে দেয় । যা শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যাশা ছিলো না ।

তবে সাধারন ধর্মঘটের  একটি রাজনৈতিক গুরুত্ব ও থাকে, উদাহরন হিসাবে ১৯০৪ সালের স্পেনের শ্রমিকদের সংগ্রাম, যাদের লক্ষ্য ছিলো রাজবন্দীদের মুক্তি, আবার ১৯০৯ সালে কাতালুনিয়ায় জুলাই মাসে যে ধর্মঘট হয় তার লক্ষ্য ছিলো মরোক্কোর সাথে যুদ্ব বন্দ্বকরা। ১৯২০ সালে জার্মানীর  শ্রমিকদের ধর্মঘটের লক্ষ্য ছিলো সরকারে সেনা তোষননীতির বিরদ্বে, অন্যদিকে বেলজিয়ামে ধর্মঘট হয় ১৯০৩ সালে, সুইডেনে ১৯০৯ সালে ধর্মঘট করেন শ্রমিকগন বিশ্ব ব্যাপি মানুষের দুর্দশা নিবারনের জন্য। ১৯০৫ সালে রাশিয়ায় ধর্মঘট হয় একটি সাংবিধানিক গ্যারান্টির জন্য । জুলাই, ১৯৩৬ সালে স্পেনে ব্যাপক ভিত্তিক ধর্মঘট পালিত হয় ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিরুদ্বে । সেই ধর্মঘট ছিলো একটি “সামাজিক সাধারন ধর্মঘট”। এই ধর্মঘটের পথ ধরে সশস্ত্র লড়াইয়ের সূত্রপাত হয় সেখানে । তাদের আরও লক্ষ্য ছিলো পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার বিলয় আর অর্থনৈতিক জীবন যাত্রার পুর্বিন্যাস সাধন করা ।

সাধারন ধর্মঘটের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে । এটা সকল প্রকার অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে থামিয়ে দেয়, এবং সমাজের মুল ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম । এছাড়া, এই কর্মসূচি শ্রমিকদেরকে বাস্তব সম্মত কার্যক্রম গ্রহন করতে দক্ষ করে গড়ে তুলে, এমন কি দেশের সকল স্থরের নাগরিকগন যারা কোন দিন লড়াই সংগ্রামে অংশ গ্রহন করেন নাই তারা ও আন্দোলিত হন। যে সকল আরখানায় শ্রমিকগন সুসংঘটিত তারা সেখান কার সকল আর্থিক কার্যক্রম নিথর করে দিতে পারেন, যদি কারখানায় কয়লা না আসে, বিদ্যুৎ বন্দ্ব থাকে, এবং কাচামাল সর্বরাহ না করা হয় তবে উৎপাদন বন্দ্ব। ক্ষমতাশীন চক্র যত শক্তি নিয়েই আসুক না কেন, সংঘটিত শ্রমিকদের সামনে কিছুই করতে পারবে না । তাই শ্রমিক শ্রেনীকে সচেতন করে সাংগঠনিক ভাবে যোগ্যতা সম্পন্ন করে গড়ে তুলার কোন বিকল্প নেই । একজন সমাজবাদি সাংসদ নাম তার জা জুরাস তিনি এই ধারনার সাথে একমত ছিলেন না । তিনি মনে করতেন এতে শ্রমিকদের উপর দমন পীড়ন বেড়ে যাবে, অর্থনৈতিক ভাবে ও বিপর্যয় নেমে আসবে । ফলে চলমান পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।

যখন কোন সর্বপ্লাবী সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হয়, যেমন আজ স্পেনের সংকট সকলকে উদ্ভিগ্ন করে তুলেছে, জনগণের বিরুদ্বে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র আক্রমন করা হচ্ছে, সেই সময়ে সাধারন ধর্মঘট হলো একটি চমৎকার অস্ত্র, এই পরিস্থিতিতে এর কোন বিকল্প আর কিছু  নেই । এই অস্ত্র জনগণের সামগ্রীক জীবন যাত্রাকে অচল করে দেয়, সাধারনের পরিতিনিধি ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে কোন বোঝাপড়ার সুযোগ নষ্ট করে দেয়, এমন কি তা তাদেরকে পরস্পরের মধ্যে ব্যবধান ও বাড়িয়ে দেয় । এই অবস্থায় সরকার সমূহ সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে পারেনা, নানা ভাবে তখন রাজনৈতিক বিদ্রোহ ও বিপ্লবের সূচনা করতে পারে। তখন সরকার সৈন্যবাহিনীকে রাজধানী সহ গুরুত্বপূর্ন স্থানে সমাবেশ করে রাখার চেষ্টা করে থাকে । নিজেকে ঠিকিয়ে রাখার জন্য সরকার সম্পূর্নরূপে সেনা ও পুলিশ নির্ভর হয়ে পড়ে।

একটি সর্বপ্লাবী ধর্মঘট চলা কালে সেনাবাহিনী ও নানা ভাবে সিদ্বান্তহীনতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তাদের সামনে তখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয় দেশের বড় বড় গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা পাহাড়া দেয়া । শিল্প কারখানার ও যাতায়াত ব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করা । কিন্তু সেনাবাহিনী ঠিকে থাকে তার শৃখলার উপর, তার শক্তি ভিত ঠিকে থাকে  একটি নির্ধারিত কাঠামোতে। কিন্তু সেনাবাহিনী যখন তার দেশীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দৃঢ় চেতা দলের বিরুদ্বে লড়াই করে, এমন কি গুলি করার নির্দেশ পায়, তখন সৈনিকদের মনে একপ্রকার সংহতির সৃষ্টি হতে পারে, কেননা এরা তখন দেখতে পায় যারা তাদের বিপরীতে লড়াই সংগ্রাম করছে তারা তাদেরই বাবা, ভাই  ও ভাতিজা । পরিস্থিতি সেনাবাহিনীর মাঝে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে থাকে । তারা নিজেদের দেশের মানুষ হত্যা করে জীবনের মহৎ কর্মের জলাঞ্জলি দিতে চায় না । তাই তারা শয়তান প্রকৃতির রাজশক্তির পক্ষে কাজ করতে ব্যাপক ভাবে আগ্রহ হাড়িয়ে ফেলে ।

শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা যখন ধর্মঘট ডাকে তখন রাজনৈতিক দল গুলোর লাফালাফি চাপা পড়ে যায়। কেননা শ্রমিকগনই হলেন শিল্প কারখানার শোষণের শিকার তাই স্বাভাবিক ভাবেই  শ্রমিকদের ভূমিকা মূখ্য হয়ে উঠে। তাদের মুক্তির সংগ্রাম তাদেরকেই করতে হয়। উইলিয়াম মরিস তার  “কোথাও খবর নেই” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, সমাজবাদি সমাজ গড়ে তুলার জন্য নিরন্থর ধর্মঘট পালনের উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে, ক্রমে সহিংসতা চর্চা বাড়াতে হতে পারে, প্রচন্ড ঝাঁকুনি ছাড়া  সমাজের ভিত্তিমূলে আঘাত করা যাবে না । আন্দ্বকার দূর করে মুক্তির সোনালী আলো জ্বালাতে হলে শহর ও গ্রামের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের সাফল্য ছিনিয়ে আনতেই হবে ।

আধুনিক পুঁজিবাদের যে উন্নয়ন হয়েছে, তা আজ দুনিয়ার যে কোন সময়ের তুলনায় আমাদের সমাজের জন্য বেশী বিপদজনক, এই পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা শ্রমিক শ্রেনীর সামনে পরিস্কার হওয়া দরকার। শ্রমিক সংগঠন গুলোর সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহনের অসারতা ও বুঝা দরকার হয়ে পড়েছে, সেই পদ্বতী বা প্রক্রিয়াটি ক্রমে নানা দেশের শ্রমিক আন্দোলনের পরিবেশকে নষ্ট করে দিচ্ছে। মজুরী দাসত্বের যে জোয়াল আজ মানুষের উপর চেপে বসেছে তা থেকে রেহাই পেতে হলে পরিস্থির বদল করার কোন বিকল্প নেই।

অন্য আরও একটি লড়াই করা পদ্বতী আছে তা হলো বয়কট বা অসহযোগ। এই প্রক্রিয়াটি প্রয়োগ করা হয় উৎপাদক শ্রেনী ও ভোগ কারী বা পন্য ক্রেতাদের সমন্বয়ে । এটা হলো এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা যে ক্রেতাগন শ্রমিক ইউনিয়ন কর্তৃক অনুমোদিত নয় এমন পন্য ক্রয় করতে আস্বীকার করবেন। তবে তা প্রয়োগ করা যাবে যে সকল প্রতিস্টান সর্বসাধারনের জন্য দৈনিন্দিন ব্যবহারের জন্য পন্য উৎপাদন করে থাকেন । এই কর্মসূচিটি একদিকে যেমন জনগণের মতামতের প্রতিফলন হয় অন্য দিকে পন্য পয়দাকারীদের প্রভাব বলয় সামাজিক ভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠে । এটা প্রচারনা চালানোর ও বড় একটি উপায় । ইউনিয়নের এইলে লেবেলিং বা ছাপ মারা পদ্বতিটি একটি কার্যকরী পন্থা, যা ক্রেতাদের বুঝতে সুবিধা হয় কোন কোন কোম্পানী সঠিক আর কোনটি বেঠিক। এমনকি থার্ড রিচের  অভিজ্ঞতা বলে যে, এই বয়কট সাধারন মানুষকে আন্দোলনে অধিক হারে সম্পৃক্ত করে দেয়। আন্তর্জাতিক ভাবে জার্মানীর পন্য বর্জন তাদেরকে বিশাল বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিলো । তাদের ব্যবসা বানিজ্য লাটে উঠে গিয়েছিলো। ট্রেড ইউনিয়নগুলি অবিলম্বে প্রচারের মাধ্যমে জনগণের মতামতকে সতর্ক করে দিয়েছিল এবং জার্মান শ্রমিক আন্দোলনের দমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছিল, এই প্রভাব  ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছিলো ।

একজন উৎপাদক হিসাবে বয়কট কারী শ্রমিকগন একটি কারখানার উপর নানা ভাবে অবরোধ তৈরী করেন, সেই ক্ষেত্রে সেখানকার ব্যবস্থাপকগন সরাসরি ট্রেডইউনিয়নের বিরুদ্বে কাজ করে থাকে । বার্সেলুনা, ভ্যেলেঞ্চিয়া এবং কাদিজে যেসকল জার্মান জাহাজ মালামাল খালাস করার জন্য অপেক্ষমান ছিলো তাদের মালামাল খালাস করতে শ্রমিকগন অস্বীকার করেন । এবং তারা জাহাজের ক্যাপ্টেনকে উত্তর আফ্রিকার সমূদ্র বন্দ্বরে মালামাল নামিয়ে দিতে বাধ্য করেছিলো। যদি অন্য দেশে ট্রেড ইউনিয়নগুলি একই পদ্ধতিতে সমাধান করে তবে তারা প্লাতনিক প্রতিবাদগুলির তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি ফলাফল অর্জন করবে। যে কোনো ক্ষেত্রে বয়কট শ্রমিক শ্রেণির হাতে সবচেয়ে কার্যকর লড়াইয়ের অস্ত্র এবং শ্রমিকরা এই অস্ত্রের মাধ্যমে আরো গভীরভাবে সচেতন হয়ে ওঠে, তারা তাদের দৈনন্দিন সংগ্রামে আরও ব্যাপক ভাবে সফল হয়ে উঠবেন।

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টদের নিকট এর মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ন অস্ত্র আছে যা নিয়োগ কর্তাদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়, তারা এটাকে চিৎকার করে বলতে থাকে এটা “বেআইনি”। এটা হলো স্যাবোটাস। বাস্তবতা হলো আমরা আসলে একটি অর্থনৈতিক লড়াইয়ে আছি। রাজনৈতিক নিপিড়ন এবং অর্থনৈতিক শোষণের বিরোদ্বে আমাদের লড়াই। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকগন নানা সময়ে চাপ সৃস্টিকারী কার্যক্রম গ্রহন করে থাকেন, কিন্তু সকল চেষ্টা যখন ব্যার্থ হয়ে যায় তখন বাধ্য হয়ে মরন কামড় তো দিতেই হয় । স্যাবোটাস হলো সেই পদ্বতী যা ব্যবহার করে শ্রমিকগন উৎপাদন পদ্বতীতে বাধার সৃষ্টি করে থাকেন । এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ কর্তা বা মালিক পক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে দেখে উদ্ভিগ্ন হয়ে উঠে। শ্রমিকগন তাদের শ্রম ঘন্টা লম্বা করে দেন। স্যাবোটাস শব্দটি ফ্রান্স ভাষা থেকে আগত। স্যাবোট মানে হলো কাঠের জুতা, অর্থাৎ কাঠের জুতা পড়ে যা-তা ভাবে আঘাত করে বিনষ্ট করে দেয়া । স্যাবোটাসের বিষয়টি যুক্ত করেই আমদানীনীতি নির্ধারন করা হয়ঃ মন্দ শ্রমের জন্য কম মজুরী। সকল নিয়োগ কর্তাই একেই নীতি অনুসরন করে থাকে । তারা তাদের পন্যের মূল্য তাদের নিজস্ব গুনের উপর ভিত্তি করেই নির্ধান করে থাকে । অন্যদিকে পন্য সৃজনকারীগন নিজেদেরকে একেই অবস্থায় দেখতে পান। তার পন্য হলো তারই শ্রম- শক্তি, যদি সেটা ভালো ও যথাযথ  হয় তবে তিনি ভালো মজুরী পাবেন সেই ভাবে নিশ্বপত্তি করার চেস্টা করা হয়ে থাকে।

নিয়োগকর্তা বা মালিক পক্ষ মন্দ্ব সময়ের কালে শ্রমজীবী মানুষের উপর সুবিধা নিতে চায়, তারা শ্রম বাজারে শ্রমের মূল্য কমিয়ে দিয়ে অধিক মুনাফা অর্জন করতে চায় । একজন শ্রমিক অবাক হন না যখন তিনি নিজেকে পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। বিপ্লবী সিন্ডিকালিজমের লক্ষ্যে ইংলিশ শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা বেশ আগে থেকেই এই ধরনের কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। সত্যিকার অর্থে এই ধরনের কাজ হলো ধীরে চলো নীতির পন্থা, এই বিষয়টি স্কটিশ শ্রমিকদের নিকট থেকে ইংলিশ শ্রমিকগন গ্রহন করে। তারা স্যাবোটাজের পন্থা হিসাবে এই পদ্বতীকে ব্যবহার শুরু করেন । এখন কল খারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বাধা গ্রস্থ করার জন্য শ্রমিকগন নানা ভাবেই পদ্বতী ব্যবহার করে থাকেন । এমন কি এই শ্রম বিভাজনের যুগেও শ্রমিকগন কোন একটি ভাগে কাজ আটকে দিয়ে সামগ্রীক উৎপাদন ব্যবস্থাকে বন্দ্ব করে দিতে পারেন । এই ভাবে ফ্রান্স ও ইটালীর রেলওয়ে শ্রমিকগন এই পদ্বতী ব্যবহার করে সামগ্রীক যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দিয়েছিলেন । তারা প্রচলিত যোগাযোগ আইন বলবত থাকা সত্বেও তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছোতে দেয়নি। যখনই কোন নিয়োগ কর্তা মালিক পক্ষ এই ধরনের পরিস্থিতির সম্মোখিন হয় তখন তারা এমন পন্থায় কাজ করেন যেন শ্রমিকগন এই ধরনের ধর্মঘট বা পদক্ষেপ গ্রহন করতে না পারেন । তবে এই অস্ত্র শ্রমিক শ্রেনীর হাতে নিজেদের সুরক্ষার জন্য মজুদ রয়েছে, যখন শ্রমিকগন বুঝতে পারবেন যে তারা নিজেদের শ্রমের জন্য সত্যিকার পাওনা পাচ্ছেন না তখন তারা নিজেরাই এই ভ্রম্মাস্ত্র ব্যবহার করবেন ।

তথাকথিত হরতাল ভাঙ্গার আন্দোলন ইউরূপ থেকে আমেরিকায় স্থানান্তরিত হয়, বিস্ময়কর ভাবে তা ছড়িয়ে ও পড়ে, রাত দিন শ্রমিকগন যে আন্দোলনের পেছনে কাজ করে তা স্যাবোটাজের মধ্যমে কেবল আঙ্গুলের ইশারায় অর্জন করা সম্ভব হয়ে উঠে । স্যাবোটাজ খুবই চমৎকার ভাবে কাজ করেঃ ধর্মঘটের আগে শ্রমিকগন কেবল কারখানার মেশিন গুলো অকেজো করে দিয়ে যায়, ফলে হরতাল ভাংগা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে । সেই শ্রমিক ছাড়া কোন প্রকার কাজ কারো পক্ষেই চালানো অসম্ভব । স্যাবোটাজ কেবল নিয়োগ কর্তা বা মালিকদের বিরুদ্বেই প্রয়োগ করা যেতে পারে। তা কোন ভাবেই পন্য ব্যবহার কারী বা গোক্তাদের বিরুদ্বে ব্যবহার করা যাবে না । সিজিটির কাছে একবার রিপোর্ট করা হয় যে, ১৮৯৭ সালে টুলাউসে, এমিলে যখন প্রচন্ড আন্দোলন তখন সকল বুর্জয়া পত্রিকা প্রতিবেদন চাপে যে, শ্রমিকগন নাকি রুটিতে ও দুধে বিষ মিশিয়েছে, এই প্রচারনা ছিলো  ডাহা মিথ্যাচার, মালিক পক্ষের ষড়যন্ত্র। তারা শ্রমিকদেরকে জন সাধারনের বিরুদ্বে দাড় করাতে চাইছিলো । তাদের মতলব পরে ধরা পড়ে যায় ।

ভোক্তাদের বিরুদ্বে স্যাবোটাজ করা মালিক পক্ষ বা নিয়োগ কর্তাদের একটি পুরনো অভ্যাস। মালামাল সর্বরাহের ক্ষেত্রে, দরিদ্রদের জন্য গৃহ নির্মানের ক্ষেত্রে তারা নিম্ন মানের উপকরান দিয়ে থাকে। খাদ্য দ্রব্য সর্বরাহে ও এরা উচু মূল্যে কমদামি দ্রব্য দিতে চায়। এরা দরকার হলে লক্ষ লক্ষ টন খাদ্য নদিতে বা সমূদ্রে ফেলে দিবে, বাজারে কৃত্তিম সংকট সৃজন করার জন্য। আর সেই সংকটকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক হারে মুনাফা ঘরে তুলার জন্য তারা সব কিছুই করতে পারে। এই ধনীক ক্ষমতা শালী চক্রটি যুদ্বের অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ও চুরি চামারীর আশ্রয় নিয়ে থাকে। মুনাফা পুজারী এই সকল লোকদের লজ্জা শরম ও খুব কম থাকে । সামগ্রীক ভাবে পুঁজিবাদের ধারক বাহক চক্র নিজেদের লোকদের বিরুদ্বে ও নানা অপকর্ম করে থাকে ।

সাধারন জনগণ যখন কোন পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত হয় তখন সাধারন ধর্মঘট ডাকা অনেক সহজ হয়ে যায় । এই কার্যক্রম তাৎক্ষনিক ভাবে উৎপাদক শ্রেনীর জন্য তেমন লাভজনক না হলে ও সামাজিক ভাবে সাধারন মানুষের অধিকার আদায়ে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। যা সামাজিক ব্যবস্থার বদল করতে ও সহায়ক হয়ে থাকে । সামাজিক ধর্মঘট নিয়োগ কর্তাদেরকে সামাজিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য করেতে পারে। এই কর্মসূচী ভোক্তাদের অধিকার শ্রমজীবী মানুষের অধিকার  ও ট্রেড ইউনিয়নের সুরক্ষা দেয় । এযাবতকাল নিয়োগ কর্তাগন দেখে এসেছেন শ্রমিকগন কত ঘন্টা, কি পরিমানে কাজ করেন, আর নির্ধারিত মাত্রায় মজুরী পরিশোধ করেছেন। অন্য দিকে ট্রড ইউনিয়ন সমূহ তাদের সদস্যদের অবস্থান বিবেচনায় নিয়েছেন, তারা কোন কালেই শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্বি বা মান সম্মত কর্মকান্ড সম্পর্কে তেমন আগ্রহী নয়। তত্ত্বগতভাবে, যদি ও বলা আছে যে, নিয়োগ কর্তা ও নিয়োগকৃতগন পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে  একেই উদ্দেশ্যে ট্রেড ইউনিয়ন সমূহ কাজ করবে । আর সেই উদ্দেশ্য হলো সামাজিক উৎপাদন বৃদ্বি । কিন্তু সেই উদ্দেশ্য তখনই সফল হতে পারে যখন উভয় পক্ষ সমান ভাবে সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করবেন। বাস্তবতা হলো শ্রমিক শ্রেনী উতপাদনের ক্ষেত্রে কোন কথাই বলতে পারে না । সকল সিদ্বান্ত আসে নিয়োগ কর্তাদের নিকট থেকে । ফলে যা ঘটে তা হলো নিয়োগ কর্তাদের কথায় হাজার কাজ করেন অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ক্ষতি ও সাধিত হয়  এবং শ্রমিকগন  নিজেরা প্রায়স অপবাদের শিকার হয় । মালিক বা নিয়োগ কর্তাগন সকল সময়েই চায় কম মূল্যের নিম্ন মানের উপকরন দিয়ে পন্য তৈরী করে বেশী মূল্যে বাজারে ছাড়তে এবং অধিক হারে মুনাফা অর্জন করতে। তারা সেই জন্য ভোক্তাদেরকে প্রতারনা কতে কোন রূপ দ্বিধাবোধ করে না ।

বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন গুলোর মহান কাজ হলো কঠোরভাবে কর্ম ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার সক্ষমতা অর্জন করা । এর ফলে শ্রমিক শ্রেনীর অবস্থা উন্নত হবে, সামাজিক পরিমন্ডলে উৎপাদক শ্রেনীর অবস্থান সুদৃঢ় হবে । ইতিমধ্যে এই পরিস্থিতি তৈরী করার মত বেশ কিছু উদাহরন সৃজন করা হয়েছে । ১৯০২ সালে বার্সেলুনাতে গৃহ নির্মান শ্রমিকগন নিম্নমানের উপকরন দিয়ে গৃহ নির্মান কাজ চালিয়ে যেতে অস্বীকার করে । ১৯০৬ সালে প্যারিসের কিচেন শ্রমিকেরা নিম্নমানের খাদ্য উপকরন দিয়ে খাদ্য প্রস্তুত করতে ও তা সরবরাহ করতে অস্বীকার করেছিলেন । এছাড়া ও অনেক উদাহরন আমাদের আশে পাশেই পাওয়া যাবে ;  এই সকল কার্যক্রমের ভেতর দিয়ে বুঝা যায় যে সামাজিক চাহিদা বুঝার ক্ষেত্রে উৎপাদক শ্রেনীর লোকেরা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে সক্ষম। ১৯১৯ সালে জার্মান শ্রমিকগন একটি প্রস্তাব গ্রহন করেছিলেন যে, তারা আর মরনাস্ত্র তৈরী করার জন্য কাজ করবেন না। এমনকি যে সকল কারখানায় শ্রমিকগন এখন অস্ত্র তৈরী করছেন তারা ও সেই সকল কারখানা রূপান্তর করার জন্য দাবী জানাবেন এবং এই আন্দোলনের সাথে জনগণকে সম্পৃক্ত করার প্রয়াস অব্যাহত রাখবেন । এই রেজুলেশন টি নিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন সমূহ দু বছর কাজ করেছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় সংগঠনকে এই রেজুলেশন বদল করতে সরকার বাধ্য করে । সেই সময় এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট কর্মীগন তাদের সিদ্বান্তে অটল থাকার জন্য প্রানান্তকর চেষ্টা করে কিন্তু সেখানে ভিন্ন একটি ট্রেড ইউনিয়ন সরকারী ছত্রছায়ায়  জোরদার হয়ে উঠে যাদের নাম ছিলো “ ফ্রি লেবার ইউনিয়নস”।

বিপ্লবী এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টগন বিরুধীদের বিপরীতে ব্যাপকভাবে প্রচারনা চালায়, বিশেষ করে ল্যাতিন আমেরিকার দেশ গুলোতে, তারা সকল সময়েই সেনাবাদের বিরুদ্বে উচ্চ কন্ঠ ছিলেন। তারা শ্রমিকদেরকে সৈনিক না হবার আহবান জানাতেন, আর যারা তাদের শ্রেনীর ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়েছেন তাদেরকে শ্রমিকদের পক্ষে বিশেষ করে ধর্মঘট চলা কালে  কাজ করার বা ইতিবাচক ভূমিকা পালনের  জন্য আহবান জানাতেন । তাদের সেই কাজের ব্যাপক মূল্য আছেঃ কিন্তু তারা তাদের সেই প্রচেস্টাকে একেবারে বন্দ্বকরে দেয় নাই। তারা বিবেচনা করতেন যে তাদেরকে বিরাট ক্ষমতাশালী চক্রের বিরুদ্বে লড়াই করতে করতেই একদিন তারা তাদের অধিকার প্রতিস্টা করতে পারবেন ।  তবে তারা সেই প্রচারনা কালে জঙ্গীবাদ বিরুধী বক্তব্য হাজির করেন যা তাদের সাধারন ধর্মঘটের সময় কাজে লাগে । এনার্কো- সিন্ডিক্যালিস্টগন ভালো করেই জানেন যে, প্রতিটি যুদ্বই ক্ষমতাসীন চক্রের সার্থে পরিচালিত হয়ে থাকে; তারা এটা ও বিশ্বাস করেন যে , পরিকল্পিত ও সংগঠিত ভাবে মানুষ হত্যা করে তা বৈধ বলে প্রচারনা চালাবে ক্ষমতাসীনরা । এই সকল ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখার ক্ষমতা শ্রমিকদের হাতেই রয়েছে । তবে তার জন্য দরকার তাদের নৈতিক ও ইচ্ছা শক্তি।

সর্বোপরি, শ্রমিক আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কমিয়ে শান্ত ও চিন্তাশীল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৌতিক দলগুলোর প্রভাব প্রতিপত্তি কমিয়ে মুক্ত ভাবে সামাজিক শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের মাধ্যমে সমাজবাদ চর্চার পথকে প্রশস্ত করতে হবে সকলের জন্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শ্রমিকদের নিজেদের যোগ্যতা বৃদ্বি করতে হবে, নৈতিক মান উন্নয়নের জন্য প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। সমাজবাদ কায়েমের জন্য যে মহান লক্ষ্য স্থির করা আছে তার জন্য নিরন্তর লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে । এই আন্দোলনকে একটি সামাজিক চরিত্র দিতে হবে । যা প্রচলিত সমাজকে একটি সমাজবাদি সমাজে রূপান্তর করতে সহায়ক হবে ।

.

0 Comments 0 Comments
0 Comments 0 Comments