সরকার এবং অর্থনীতি

সরকার এবং অর্থনীতি

আসিফ আযহার

সরকার না থাকলে সমাজের আয়-উৎপাদন ও অর্থনীতি পরিচালনা করবে কে? আপনার মনে এ প্রশ্নটি জাগা খুবই স্বাভাবিক। এবার দেখা যাক, অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকা কী এবং সরকার না থাকলেও কেন অর্থনীতি টিকে থাকবে। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে, সরকারের হাতে আমরা যেভাবে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তোলে দেই তাতে আমরা সরকারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ি। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপারই ঘটে। সরকারের হাতে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ থাকা মানে হল, সরকার যেভাবে খুশী আমাদের ওপর শোষণ চাপিয়ে দিবে কিন্তু আমরা সরকারের কিছুই করতে পারব না।

সরকার অর্থনীতিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে? প্রথমত, বিনিময়ের মাধ্যম অর্থাৎ মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, ট্যাক্স আরোপের মাধ্যমে, তৃতীয়ত, অর্থনীতির জগতে সর্বোচ্চ আইনী ও প্রশাসনিক ক্ষমতা খাটানোর মাধ্যমে এবং চতুর্থত, ভূ-প্রাকৃতিক সম্পদ অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের ব্যাপারে যেকোন সরকারি সিদ্ধান্ত কায়েমের ক্ষমতা সংরক্ষণের মাধ্যমে। এখানে একটা ব্যাপার দেখুন, সরকার কোন কিছু সৃষ্টি করছে না- সরকার খালি নিয়ন্ত্রণই করে যাচ্ছে। কিন্তু সম্পদ সৃষ্টিতে সরকারের কোন ভূমিকা নেই।

এখন কথা হলো, সম্পদ সৃষ্টি হয় কীভাবে? কারা সম্পদ সৃষ্টি করে? সম্পদ কীভাবে সৃষ্টি হয় সেটি একটি উদাহরণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যাক। ধরুন, একটি দেশে যতো সেলাইয়ের মেশিন রয়েছে তা বিগত দশ বছরে কোন একটি কোম্পানি উৎপাদন করেছে। বিগত দশ বছর ধরে সেলাইয়ের মেশিন বিক্রয় করে ঐ কোম্পানির মালিকরা মোট এক হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। এবার কিছু হিসাব-নিকাশে যাওয়া যাক। সেলাইয়ের মেশিন উৎপাদনের জন্য কোম্পানিটি মোট তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটিয়েছে:

১. জমিসহ সকল প্রাকৃতিক উপাদান যেমন আলো, বাতাস, পানি প্রভৃতি। কোম্পানিটি জমি হয় কিনেছে অথবা ভাড়া করেছে। জমিসহ সকল প্রাকৃতিক উপকরণর পেছনে কোম্পানিটির যে খরচ তাকে খাজনা বলতে হবে।

২. বাজার থেকে ক্রয়কৃত সকল ‘মনুষ্যনির্মিত’ উপাদান, যেমন- সকল প্রকার মেশিনারি, কল-কব্জা, গৃহ-উপকরণ, যান-বাহন, জ্বালানী, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, ডিজাইন, ফর্মুলা প্রভৃতি। এসকল উপকরণের পেছনে কোম্পানিটির যে খরচ তাকে ‘পুঁজি’ বলতে হবে। পুঁজি মানে হলো, উৎপাদনের সেই সকল উপকরণ যা অন্য কেউ ‘উৎপাদন’ করেছে, প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য যে, খনি থেকে যেসব কাঁচামাল আসে ওগুলোও ‘উৎপাদিত’ উপকরণ। এমনকি পানি এবং বাতাসকেও যদি পরিশোধনের মাধ্যমে বোতলে ভরে বিক্রয় করা হয় তাহলে তা আর প্রাকৃতিক থাকে না, তা ‘উৎপাদিত’ পণ্য হিসেবেই গণ্য হবে। যে ‘উৎপাদিত’ পণ্য কোন কিছু উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হবে তাকে ‘পুঁজি’ বলতে হবে। অন্যথায় তা হবে কেবলই ‘ভোগ্যপণ্য’।

৩. কোন কিছু উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক উপাদান এবং ‘মনুষ্যনির্মিত’ উপাদানের সাথে আরেকটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটাতে হবে। সেটা হল, শ্রম। উৎপাদনক্ষেত্রে মূল শ্রমই আসে শ্রমিকদের কাছ থেকে। কিছুটা শ্রম আসে কর্মচারী, কর্মকর্তা, সুপারভাইজার, টেকনিশিয়ান, ইঞ্জিনিয়ার প্রভৃতি লোকজনের কাছ থেকে।

এবার ধরুন তো, এ তিনটি উপকরণের পেছনে বিগত দশ বছরে কোম্পানিটির মোট খরচ এক হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম দুটি অর্থাৎ খাজনা এবং পুঁজি বাবদ কোম্পানির খরচ পাঁচশ’ কোটি টাকা এবং শ্রমের মজুরি বাবদ কোম্পানির খরচ আরও পাঁচশ’ কোটি টাকা। অন্যদিকে সেলাই মেশিন বিক্রয় করে গত দশ বছরে তাদের আয় হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কোম্পানির মুনাফা এক হাজার কোটি টাকা।

ব্যাপারটাকে খুব সহজভাবে নিবেন না। এখানে একটি শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। এই ফাঁকিবাজীর ব্যাপারটাই আপনাদের সামনে তোলে ধরার জন্য এতো উদাহরণ টেনে আনা হয়েছে। আপনারা দেখেছেন যে, এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের উপকরণ সমাজে দুই হাজার কোটি টাকার সম্পদ সৃষ্টি করেছে। এই বাড়তি এক হাজার কোটি টাকা কার প্রাপ্য বলে আপনি মনে করেন? দুই হাজার কোটি টাকার সম্পদ উৎপাদনে কোম্পানি মালিকরা পাঁচশ’ কোটি টাকার পুঁজি ও খাজনা সরবরাহ করেছে।

অন্যদিকে শ্রমিকরাও পাঁচশ’ কোটি টাকার শ্রম দিয়েছে। এক্ষেত্রে তো উভয়পক্ষেরই অংশগ্রহণ সমান। তাহলে মুনাফার অংশটি কেবল মালিকরাই পাচ্ছে কেন? শ্রমিকরা কেন মুনাফার অধিকারী হল না? মুনাফা ব্যাপারটাই বা কী এবং এটা আসলে কার পাওয়া উচিত ছিল? যদি আপনারা শ্রমিকশ্রেণির মানবেতর জীবনের দিকে তাকান তাহলে এ প্রশ্নের উত্তর কিছুটা হলেও পেয়ে যাবেন। সারা জীবন ধরে হাড় ভাঙ্গা খাটুনি খেটেও কেন শ্রমিকরা দরিদ্র থেকে যায় তার কারণ এখানেই নিহিত। সম্পদ সৃষ্টি করছে তারাই। শ্রমই উৎপাদনের একমাত্র উপকরণ। তাই তথাকথিত ‘মুনাফা’ তাদেরই প্রাপ্য।

হ্যাঁ, আপনি প্রথম দুটি উপকরণের কথা মনে করিয়ে দেবেন। বলবেন যে, প্রথম দুটি উপকরণও তো সম্পদ সৃষ্টি করছে! এবার দেখা যাক, প্রথম দুটি উপকরণের সাথে শ্রমের সম্পর্ক কী? প্রথম যে উপকরণের সাথে আমাদের পরিচয় হয়েছে অর্থাৎ উৎপাদনের প্রাকৃতিক উপকরণসমূহ- এগুলোকে কেউ সৃষ্টি করে না। এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই পাওয়া যায়। এগুলোকে উৎপাদনের উপযোগী বানাতে শ্রমের প্রয়োজন। যদি শ্রম দেওয়ার কেউ না থাকে তাহলে এগুলোর কোন মূল্য থাকে না। দ্বিতীয় যে উপকরণের সাথে আমাদের পরিচয় হয়েছে অর্থাৎ ‘পুঁজি’ বা ‘মনুষ্যনির্মিত’ উপাদান- সেগুলো পুরোপুরিভাবেই মানুষের শ্রমেরই সৃষ্টি।

আপনার মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে, উৎপাদনের দ্বিতীয় উপকরণ অর্থাৎ ‘পুঁজি’ সৃষ্টিতেও তো অন্য যন্ত্রের ভূমিকা থাকতে পারে। তাহলে সেগুলো ‘পুরোপুরিভাবে’ শ্রমের সৃষ্টি হয় কীভাবে? হ্যাঁ, আপনার এ প্রশ্নেরই উত্তর এখন খুঁজে বের করব। তবে তার আগে দেখা যাক ‘পুঁজি’ ব্যাপারটা কী? ‘পুঁজি’ বলতে আমরা এমন কিছু বুঝি যা খাটালে তা থেকে আরও কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই অর্থ যথার্থ। কারণ- উৎপাদনের সেসব উপকরণকেই আমরা ‘পুঁজি’ বলছি যেসব উপকরণকে নতুন জিনিস উৎপাদনের ক্ষেত্রে খাটানো যায়।

অনেকে পুঁজি বলতে জমানো টাকা বুঝে থাকেন। হ্যাঁ, পুঁজি বলতে আপনি টাকাকেই বুঝতে পারেন তবে সেই টাকাকে এমন টাকা হতে হবে যা আপনি দৈনন্দিন প্রয়োজনে ব্যবহার করেন না অথবা কোন ভোগ্যপণ্য ক্রয়েও এর ব্যবহারের সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ সেই টাকা আপনি বাণিজ্যিক উৎপাদনে খাটাবেন অথবা তা দিয়ে কোন বাণিজ্যিক উৎপাদনের অংশীদার হবেন। এর মানে হল, এই অর্থ দিয়ে উৎপাদনের উপকরণ ক্রয় করা হবে। উৎপাদনের উপকরণ ক্রয়ে যে টাকার ব্যবহার হবে তাকে ‘পুঁজি’ বলা যেতে পারে।

এবার মূল বিষয়ে আসি। উৎপাদনের ‘মনুষ্যনির্মিত’ উপাদান বা ‘পুঁজি’ পুরোপুরিভাবেই মানুষের শ্রমের সৃষ্টি কিনা তা খতিয়ে দেখা যাক। আমরা ইতোপূর্বে যে সেলাইয়ের মেশিনের উদাহরণ এনেছি সেটা দিয়েই ব্যাখ্যা করা যাক। আমাদের উদাহরণে যেসব সেলাই মেশিনের কথা এসেছে সেগুলো যন্ত্রপুঁজি হিসেবেই বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত হবে। আবার এসব সেলাই মেশিন সৃষ্টিতেও যন্ত্রের ভূমিকা রয়েছে। সেসব যন্ত্র বানাতেও যন্ত্র লেগেছে।

মানুষের শ্রমে যন্ত্র সৃষ্টি হয়। সেই যন্ত্র হয়ে যায় ‘পুঁজি’। সেই পুঁজির সাথে আবার শ্রম যোগ হয়ে সৃষ্টি হয় নতুন ‘পুঁজি’। সেই নতুন পুঁজির সাথে আবারও শ্রম যোগ হয়ে সৃষ্টি হয় আরেক নতুন ‘পুঁজি’। এভাবে পুঁজি থেকে পুঁজির সৃষ্টি হয়। কিন্তু মূলত তা শ্রমেরই অবদান। কারণ প্রতিটি ধাপেই শ্রম পুঁজিতে রূপ নিচ্ছে। নতুন পুঁজি থেকে যদি আপনি শ্রমটাকে বাদ দিয়ে দেন তাহলে কী থাকে? পুরাতন পুঁজিই তো! পুরাতন পুঁজির সাথে শ্রম যুক্ত হয়েই তো নতুন পুঁজির সৃষ্টি।

সেই পুরাতন পুঁজি থেকে শ্রমকে বাদ দিয়ে দিলে পাওয়া যাবে তার চেয়েও পুরাতন পুঁজি। ঐ পুরাতন পুঁজি থেকে শ্রমকে বাদ দিয়ে দিলে…….। এভাবে শেষ পর্যন্ত কী পাওয়া যাবে? পুঁজি কি শেষ পর্যন্তও থাকবে? না। পুঁজি শেষ পর্যন্ত থাকতে পারে না। কারণ প্রকৃতি কোন পুঁজি সৃষ্টি করেনি। প্রকৃতিতে কোন পুঁজি নেই। মানুষের হাতেই পুঁজি সৃষ্টি হয়। তাই শেষ পর্যন্ত যা পাওয়া যাবে তা হল মানুষের শ্রম।

মানুষের শ্রম থেকেই পুঁজির সৃষ্টি হয় এবং এরপর সেই পুঁজির সাথে আরও শ্রম যুক্ত হয়ে নতুন পুঁজির সৃষ্টি হয়। প্রতিটি ধাপেই পুরাতন পুঁজির সাথে শ্রম যুক্ত হয়ে নতুন পুঁজিতে রূপ নিচ্ছে। এভাবে সমাজে পুঁজির পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। শ্রম এবং পুঁজি মিলে যদিও নতুন পুঁজি সৃষ্টি করে কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আগের পুঁজিটাও শ্রমেরই সৃষ্টি। তাই সকল পুঁজিই শ্রমের সৃষ্টি। তাই শ্রমই হল উৎপাদনের মূল উপকরণ এবং বাকী উপকরণগুলোকে বিচার করতে হবে শ্রমের মূল্যেরই নিরিখে।

মানুষ একসময় তাদের শ্রম দিয়ে মূলত ভোগ্যপণ্য এবং খুব সাধারণ কিছু পুঁজি সৃষ্টি করত। যেমন- কাঁচামাল, কৃষি উপকরণ, নৌকা, ঘোড়ার গাড়ী, হাতিয়ার, সরল যন্ত্র প্রভৃতি হস্তনির্মিত উপকরণ। যখন উৎপাদনক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যাবহার প্রসার লাভ করল অর্থাৎ পুঁজি সৃষ্টিতে ব্যাপকভাবে পুঁজির ব্যবহার হতে লাগল তখন এ যুগটিকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা শুরু হল। যথা- আধুনিক যুগ, যান্ত্রিক যুগ, সভ্যতার যুগ প্রভৃতি। কিন্তু অর্থনীতিবিদরাই এর প্রকৃত নামকরণ করলেন- পুঁজিবাদ।

পুঁজিবাদী সমাজে যদিও শ্রমনির্ভর উৎপাদনের চেয়ে পুঁজিনির্ভর উৎপাদনই বেশী, কিন্তু পরোক্ষভাবে এই পুঁজিবাদ শ্রমের কাছেই ঋণী। কারণ সমাজে যে বিপুল পুঁজির জন্ম হয়েছে তা দীর্ঘ সময়ের শ্রমেরই অবদান। বর্তমান সময়েও শ্রম থেকেই প্রতিনিয়ত নতুন পুঁজি জন্ম নিচ্ছে। শ্রম ছাড়া পুঁজির কোন উৎপাদনক্ষমতা নেই। তাই পুঁজিবাদকে সবসময়েই শ্রমের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে।

আমরা দেখলাম যে, উৎপাদনের প্রথম দুটি উপকরণের সম্পদ সৃষ্টির যে ক্ষমতা তা শ্রমই এনে দিয়েছে। শ্রমই প্রাকৃতিক উপকরণকে উৎপাদনের উপযোগী বানায় এবং শ্রমই পুঁজিতে রূপ নিয়ে নতুন উৎপাদনে অংশ নেয়। তাই এটা বললে ভুল হবে না যে, উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ হল শ্রমেরই বিশেষ রূপ মাত্র। প্রকৃতিপ্রদত্ত বিষয়গুলো ছাড়া বাকী যা আছে তার সবই শ্রমের সৃষ্টি। সুতরাং পৃথিবীতে সবকিছুর ওপর সবচেয়ে বেশী হকদার হল শ্রমিকশ্রেণির মানুষ।

কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটাই দেখা যায়। শ্রমিকশ্রেণিই সবচেয়ে হতদরিদ্র এবং সবচেয়ে মানবেতর জীবন তাদেরকেই যাপন করতে হয়। এর কারণ কি? এর কারণ হল মুনাফা। আমরা দেখেছি যে, সম্পদ সৃষ্টিতে একমাত্র ভূমিকা পালন করে শ্রমিকশ্রেণি অথচ সম্পদের একটি বিশাল অংশ মুনাফা হয়ে গুটিকতক মানুষের পকেটে চলে যায়। এরা কারা? এরা হল পুঁজিপতি গোষ্ঠী অর্থাৎ পুঁজির মালিকপক্ষ।

এদের হাতে পুঁজি এলো কী করে? সকল সম্পদই শ্রমের সৃষ্টি। সকল পুঁজিই শ্রমের সৃষ্টি। তাহলে শ্রমিকদের হাত থেকে পুঁজির মালিকানা এদের হাতে চলে এলো কী করে? এর উত্তরও মুনাফা। অর্থাৎ শ্রমিকদের হাতে সৃষ্ট পুঁজি সর্বদাই মুনাফা হয়ে পুঁজিপতিদের হাতে চলে যায়। এখন দেখা যাক, মুনাফা ব্যাপারটা কী? পুঁজিবাদীরা মুনাফার একটি ব্যাখ্যা দাড় করিয়েছে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী পুঁজিপতিরা নিজেরাও নাকি উৎপাদনের একটি উপকরণ এবং এই উপকরণের প্রাপ্য হল মুনাফা!

কিন্তু উৎপাদনের ক্ষেত্রে পুঁজিপতিদের ভূমিকাটা কী তা কোন পুঁজিপতিই ঠিকমতো বলতে পারবে না। অথচ উৎপাদনের সবচেয়ে বড়ো অংশটিই তাদের পকেটে চলে যায়। এই অংশটা কিন্তু পুঁজির মূল্য নয়। আমরা সেলাই মেশিন কোম্পানির উদাহরণে দেখেছি, খাজনা এবং পুঁজি বাবদ কোম্পানির যে পাঁচশ’ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল তা তাদের মোট দুই হাজার কোটি টাকার আয় থেকে পূরণ হয়ে গিয়েছে। বাকী পনেরশ’ কোটি টাকা পেয়েছে শ্রমিকপক্ষ ও পুঁজিপতি মালিকপক্ষ।

পুঁজিবাদীদের কথা অনুযায়ী যদি আমরা উৎপাদনের চারটি উপকরণ ধরে নিই তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, প্রথম দুটি উপকরণ পেয়েছে মোট পাঁচশ’ কোটি টাকা আর পরের দুটি উপকরণ পেয়েছে পনেরোশ’ কোটি টাকা। পরের দুটি উপকরণের প্রাপ্যতা কে নির্ধারণ করল? বিপুল সংখ্যাক শ্রমিক পাবে মাত্র পাঁচশ’ কোটি টাকা আর মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি পাবে এক হাজার কোটি টাকা- এটা কে নির্ধারণ করে দিচ্ছে?

উত্তর হল- পুঁজিবাদী মালিকপক্ষ, তাদের ক্ষমতা, তাদের সরকার এবং তাদের সরকারের আইনই শ্রমিকদেরকে অল্প মজুরি নিতে বাধ্য করছে। উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত গুটিকয়েক পুঁজিপতি বড়ো অংশটাই নিয়ে যাবে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক পাবে ক্ষুদ্র অংশ- এ নিয়ম পুঁজিপতিরাই তৈরী দিচ্ছে। এর কারণ তাদের হাতে রয়েছে পুঁজি, ক্ষমতা, আইন ও সরকার। এটা ঠিক যে, পুঁজিপতিদের পুঁজি ছাড়া শ্রমিকরা কিছু উৎপাদন করতে পারবে না।

কিন্তু এটাও তো সত্য যে, শ্রমিকদের শ্রম ছাড়া পুঁজিপতিরাও কিছু উৎপাদন করতে পারবে না। উৎপাদনের ক্ষেত্রে পুঁজিপতিদের পুঁজি এবং শ্রমিকদের শ্রম- দুটোই প্রয়োজন। তাহলে মুনাফা খালি পুঁজিপতিরাই নেবে কেন? শ্রমিকরা কেন নেবে না? এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর পুঁজিবাদ দিতে পারে না। পুঁজিবাদ দাড়িয়ে আছে মুনাফার ওপরেই। মুনাফা নেই মানে পুঁজিবাদ নেই। মুনাফা আছে মানে পুঁজিবাদও বেঁচে আছে।

মুনাফার অস্তিত্ব থাকার কারণেই পুঁজির মালিকানা চক্রবৃদ্ধি হারে শ্রমিকদের হাত থেকে মালিকদের হাতে চলে যায় । আমরা পূর্ববর্তীতে যে সেলাইয়ের মেশিনের উদাহরণ এনেছি সেটা দিয়েই ব্যাখ্যা করা যাক। আমরা জানি যে, আমাদের উদাহরণে যেসব সেলাই মেশিনের কথা এসেছে সেগুলোর মোট মূল্য দুই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এক হাজার কোটি টাকা মালিকপক্ষের হাতে রয়েছে। আরও পাঁচশ’ কোটি টাকার পুঁজি অর্থাৎ কারখানা ও প্রাকৃতিক স্থাপনা তাদের হাতেই রয়েছে।

এবার ধরা যাক, এই মোট পনেরোশ’ কোটি টাকাকে তারা আরও দশ বছর পুঁজি হিসেবে খাটাল। শ্রমের মজুরি বাবদ তাদের আরও পাঁচশ’ কোটি টাকা খরচ হল। এই দুই হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে তারা চার হাজার কোটি টাকার সেলাই মেশিন উৎপাদন করল। এর মধ্যে তাদের মুনাফা দুই হাজার কোটি টাকা। এবার আপনি বলুন তো, এই দুই হাজার কোটি টাকার মুনাফার পেছনে কত টাকার পুঁজি ও খাজনা জড়িত? পনেরোশ’ কোটি টাকা নাকি পাঁচশ’ কোটি টাকা?

কিছু বুঝতে পারলেন? যতোই পেছনে যাবেন ততোই পুঁজি ছোট হয়ে আসবে। শেষ পর্যন্ত পুঁজি শূণ্য হয়ে আসা ছাড়া কি আর কোন উপায় আছে। যদি পুঁজি শূণ্য হয়ে যায় তাহলে প্রাকৃতিক উপকরণ আর শ্রম ছাড়া কী থাকে? আবারও কি প্রমাণ হল না যে, শ্রমই পুঁজিতে রূপান্তরিত হয় এবং সেই পুঁজিকে মুনাফা বানিয়ে লুটে নেয় ক্ষমতাধর শ্রেণি? মাত্র পাঁচশ’ কোটি টাকার পুঁজি ও খাজনা নিয়ে চালু হওয়া ব্যবসাটা এই যে চার হাজার কোটি টাকায় এসে পৌঁছাল তাতে শ্রম ছাড়া আর কীসের প্রয়োগ হয়েছে?

আমরা দেখলাম যে, পুঁজি থেকে মুনাফা হয় আর এই মুনাফাকে আবার নতুন পুঁজি হিসেবে খাটানো হয়। অর্থাৎ, পুরাতন পুঁজি এবং শ্রমের যৌথ প্রয়াসে সৃষ্ট নতুন পুঁজিই হল মুনাফা। আজকের দিনে পুঁজিপতিদের হাতে যে বিপুল পুঁজি জমা হয়েছে তা মুনাফা হয়েই তাদের হাতে এসেছে। অত্যন্ত বর্ধনশীল হারে পুঁজি বেড়েই চলেছে। কিন্তু মুনাফা হয়ে তা প্রতিনিয়ত পুঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রণেই চলে যাচ্ছে। শ্রমিকরা যে অর্থ পায় তা দিয়ে তারা কোনমতে টিকে থাকে। এসব অর্থ পুঁজি হিসেবে খাটানোর প্রশ্নই আসে না।

শ্রমিকদের শ্রমেই মুনাফা সৃষ্টি হয়। সেই মুনাফার সাথে আবার শ্রম যোগ হয়ে সৃষ্টি হয় নতুন মুনাফা। সেই নতুন মুনাফার সাথে আবারও শ্রম যোগ হয়ে সৃষ্টি হয় আরও নতুন মুনাফা। এভাবে মুনাফা থেকে মুনাফার সৃষ্টি হয়। কিন্তু মূলত তা শ্রমেরই অবদান। কারণ প্রতিটি ধাপেই শ্রম মুনাফায় রূপ নিচ্ছে। নতুন মুনাফা থেকে যদি আপনি শ্রমটাকে বাদ দিয়ে দেন তাহলে কী থাকে? পুরাতন মুনাফাই তো! পুরাতন মুনাফার সাথে শ্রম যুক্ত হয়েই তো নতুন মুনাফার সৃষ্টি।

সেই পুরাতন মুনাফা থেকে শ্রমকে বাদ দিয়ে দিলে পাওয়া যাবে তার চেয়েও পুরাতন মুনাফা। ঐ পুরাতন মুনাফা থেকে শ্রমকে বাদ দিয়ে দিলে…….। এভাবে শেষ পর্যন্ত কী পাওয়া যাবে? মুনাফা কি শেষ পর্যন্তও থাকবে? না। মুনাফা শেষ পর্যন্ত থাকতে পারে না। কারণ প্রকৃতি কোন মুনাফা সৃষ্টি করেনি। প্রকৃতিতে কোন মুনাফা নেই। মানুষের হাতেই মুনাফা সৃষ্টি হয়। তাই শেষ পর্যন্ত যা পাওয়া যাবে তা হল মানুষের শ্রম।

মানুষের শ্রম থেকেই মুনাফার সৃষ্টি হয় এবং এরপর সেই মুনাফার সাথে আরও শ্রম যুক্ত হয়ে নতুন মুনাফার সৃষ্টি হয়। প্রতিটি ধাপেই পুরাতন মুনাফার সাথে শ্রম যুক্ত হয়ে নতুন মুনাফাতে রূপ নিচ্ছে। এভাবে সমাজে মুনাফার পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। শ্রম এবং মুনাফা মিলে যদিও নতুন মুনাফা সৃষ্টি করে কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আগের মুনাফাটাও শ্রমেরই সৃষ্টি। তাই সকল মুনাফাই শ্রমের সৃষ্টি।

যদি শ্রম থেকেই মুনাফা সৃষ্টি হয় তাহলে এটা কার প্রাপ্য বলে আপনি মনে করেন? পুঁজিবাদ যে কতোটা অন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত তা কি আপনি এখন অনুধাবন করতে পারেন? যদি পুঁজিবাদ না থাকত তাহলে কী হতো? এর উত্তর খুবই সহজ। যদি পুঁজিবাদ না থাকত তাহলে যারা সম্পদ সৃষ্টি করছে তারাই সম্পদের মালিক হতো। পুঁজিবাদ না থাকলে যাদের শ্রমে নতুন পুঁজি সৃষ্টি হয় তারাই সেই নতুন পুঁজির মালিক হতো। সমাজে বিলাসিতা ও অভাব থাকত না। সমাজে সবসময়েই একটি সমতা বজায় থাকতো।

প্রশ্ন হল, পুঁজিবাদকে আমরা টিকিয়ে রাখছি কেন? এর উত্তরও সহজ। পুঁজিবাদীদের ক্ষমতা ও কৌশলের কাছে আমরা পরাজিত। দেশের সরকার হচ্ছে তাদের হাতের মুঠোয়। তারাই ট্যাক্স দিয়ে সরকারকে পুষছে। আর সরকার পুষছে পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনী যারা যেকোন সময়েই মালিকশ্রেণির পক্ষে মাঠে নামতে প্রস্তুত। মেহনতী মানুষদের যেকোন আন্দোলনকে গুড়িয়ে দিতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী সদা প্রস্তুত থাকে। এদের সবচেয়ে বড়ো কাজ হলো, মালিকশ্রেণির নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং মুনাফা ব্যবস্থাকে সমাজে বলবৎ রাখা।

পুঁজিপতিরা এবং পুঁজিপতিদের সরকার কোন সম্পদ সৃষ্টি করছে না। তাদের কাজ হল, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব তাদের হাতেই রাখা এবং মুনাফার নামে সমাজের বৃহত্তর অংশকে শোষণ করা। মুনাফার নামে পুঁজিপতিরা যে সম্পদ কুক্ষিগত করে তাকে তারা সবসময়ই যে নতুন পুঁজি হিসেবে খাটায়- তা নয়। এ সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয় তাদের আমোদ-স্ফূর্তি ও বিলাসীতায়। অন্যদিকে সমাজের নিচের তলার মানুষের জীবন কেটে যায় হাহাকার আর দারিদ্রতার মধ্যে।

এ বৈষম্য যাতে চিরস্থায়ীভাবে টিকে থাকে সেজন্য পুঁজিপতিরা তাদের নিজেদের সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে রাখে। অবশ্য তারা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দলের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু যে দলের সরকারই ক্ষমতায় আসুক, সকল পুঁজিপতিদেরই স্বার্থ রক্ষা করা তাদের প্রধান কাজ। এটাই হল সরকার এবং পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর মধ্যকার সম্পর্ক। পুঁজিবাদীদের স্বার্থে সরকার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

এ অর্থনীতি হল শোষণের অর্থনীতি। সরকার কীভাবে শোষণে সহায়তা করে তার কিছু চিত্র আমরা দেখব। প্রথমত, সরকার শোষণের সবচেয়ে বড়ো সহায়ক শক্তি হয়ে ওঠে মুনাফার বৈধতা দিয়ে। শ্রমিকদের শ্রমেই সৃষ্ট সম্পদকে যাতে মুনাফা বানিয়ে পুঁজিপতিরা অবাধে লুন্ঠন করতে পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান কাজ। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন যাতে কোনভাবেই মাথা তোলে দাড়াতে না পারে সেটা দেখা সরকারের প্রধান কর্তব্য।

দ্বিতীয়ত, ঋণখেলাপীদেরকে ঋণ দিয়ে সরকার সরাসরি শোষণে জড়িত হয়ে পড়ে। এ ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক। আমরা জেনেছি যে, সরকার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। মুদ্রা বা টাকা আসলে কী? মুদ্রা হল কিছু কাগজের টুকরো বা ধাতব বস্তু মাত্র। যদি সরকার এগুলোকে মূল্যহীন ঘোষণা করে তাহলে এগুলোর কোন মূল্যই থাকবে না। সরকার এগুলোকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে চালু রেখেছে বলেই এগুলোর মূল্য রয়েছে।

অনেক সময় সরকার বড়ো নোট বাতিল করে দেয়। তখন এগুলোর কোন মূল্যই থাকেনা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে বড়ো নোট বাতিল করে দিয়েছিল। সরকারী ঘোষণার সাথে সাথেই বড়ো নোটগুলি অপ্রয়োজনীয় কাগজে পরিণত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সরকারও বড়ো নোট বাতিলের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এসব উদাহরণ আমাদেরকে এটাই বুঝিয়ে দেয় যে, নোটের কোন শক্তি নেই- যদি না সরকার এর মূল্য স্বীকার করে।

কোন দেশ যদি অন্য দেশের দখলে চলে যায় তাহলে সেই দেশের মুদ্রারও পতন ঘটে যায়। ১৯৯১ সালে যখন ইরাক কুয়েত দখল করেছিল তখন কুয়েতী মুদ্রার মূল্য অনেক নিচে নেমে আসে। আবার ২০০৩ সালে যখন আমেরিকা ইরাক দখল করে তখন ইরাকী মুদ্রাও প্রায় অচল হয়ে যায়। এর কারণ হল- মুদ্রার কার্যকারিতা সরকারের অস্তিত্বের ওপরেই নির্ভর করে। দেশে সরকারের অস্তিত্ব থাকলে মুদ্রাও সচল থাকে। দেশের সরকার উৎখাত হয়ে গেলে সরকারের মুদ্রাও অচল হয়ে যায়।

সরকারী মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষেত্রে এমন এক অনিবার্য মাধ্যমে পরিণত হয় যে, সারা দেশের যতো সম্পদ আছে তার মূল্য ঐ সরকারী মুদ্রাই বহণ করে। বিনিময়ের মাধ্যম হয়ে উঠায় মুদ্রার সাথে বিনিময়যোগ্য জিনিসের যে মূল্য- মুদ্রারও সেই একই মূল্য আছে বলে ধরা হয়। দেশের সকল সম্পদের মূল্য ঐ মুদ্রা দিয়েই পরিমাপ করা হয়। একটি সম্পদের সাথে আরেকটি সম্পদের সরাসরি বিনিময় হয় না। বিনিময় হয় মুদ্রার মাধ্যমে। একারণে মুদ্রা যে ছাপাতে পারে আর যে বাতিল করতে পারে সে সমাজের সকল সম্পদের ওপরেই পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে বসে থাকে।

আপনি আপনার বেতনের টাকা দিয়ে কিছু ক্রয়ের অর্থ হল, আপনি প্রথমে টাকার সাথে আপনার শ্রমের বিনিময় করেছেন এবং পরে সেই টাকার সাথে ক্রয়কৃত জিনিসটির বিনিময় ঘটিয়েছেন। এ প্রক্রিয়ায় আপনি দু’বার টাকার মূল্য স্বীকার করেছেন: একবার শ্রমের বিনিময়ে টাকা নিয়ে এবং আরেকবার পণ্যের বিনিময়ে টাকা দিয়ে। এখানে দু’বার টাকা বিনিময়ের মাধ্যম হয়েছে এবং মোট তিনটি পক্ষ টাকাকে মূল্যের বাহন বানিয়েছে।

এই বিনিময়যোগ্যতার কারণেই টাকার নিজস্ব কোন মূল্য না থাকলেও তা এর সাথে বিনিময়যোগ্য বস্তুর সমান মূল্যই বহণ করছে। মুদ্রা দিয়ে যেকোন মুহুর্তে যেকোন কিছু কেনা যায় বলেই ক্রয়যোগ্য বস্তুর মূল্য আর মুদ্রার মূল্য একই হয়ে যায়। এক লক্ষ টাকার সমপরিমাণ স্বর্ণের যে গুরুত্ব এক লক্ষ টাকারও সেই একই গুরুত্ব। এ ব্যাপারটাই সরকারের হাতে প্রভূত অর্থনৈতিক ক্ষমতা এনে দেয়, সরকারকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে নিরংকুশ ক্ষমতাবান করে তোলে।

আপনার সম্পদের যে গুরুত্ব এবং দেশের সকল সম্পদের যে গুরুত্ব তার সমান্তরালে সরকারের মুদ্রারও সেই একই গুরুত্ব রয়েছে। একারণে সরকার কোন সম্পদ সৃষ্টি না করেও কেবল মুদ্রা ছাপিয়েই সম্পদের মালিক হয়ে যেতে পারে। আপনি যতো সম্পদেরই মালিক হোন না কেন সরকার নীরবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়ে আপনার সম্পদে ভাগ বসিয়ে দিতে পারে। সম্পদ সৃষ্টি না করেও কেবল মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে সরকার কীভাবে সম্পদের মালিক হয়ে যেতে পারে তা একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাক।

ধরুন, একটি দেশে যতো সম্পদ রয়েছে তার মূল্য একশ’ বিলিয়ন ডলার। দেশে মুদ্রাও আছে একশ’ বিলিয়ন ডলার। এখন সরকার ভাবল, দেশে তো প্রচুর সম্পদ। এর অর্ধেক কীভাবে দখল করা যায়! সরকার দেশের সম্পদ দখল করার জন্য খুবই সহজ এক পদ্ধতি বেছে নিল। সরকার আরও একশ’ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা ছাপিয়ে নাগরিকদের সম্পদ কিনতে শুরু করল। দেশের অর্থনীতিতে নতুন একশ’ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হওয়ায় মোট মুদ্রা হয়ে গেল দুইশ’ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যাপারটার নাম মুদ্রাস্ফীতি।

বাজারে নতুন মুদ্রা ছেড়ে দেওয়ার যে মুদ্রাস্ফীতি ঘটল তাতে মুদ্রার মান গেল কমে। আগের একশ’ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের দাম বেড়ে গিয়ে এখন হয়ে গেল দুইশ’ বিলিয়ন ডলার। সেই সম্পদের অর্ধেকের দাম হল এখন একশ’ বিলিয়ন ডলার। এই অর্ধেক সম্পদ অর্থাৎ বর্তমান মুদ্রামান অনুযায়ী একশ’ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ চলে গেল সরকারের হাতে! বিনিময় মাধ্যম অর্থাৎ মুদ্রার ওপরে নিয়ন্ত্রণ থাকায় সরকার কতটুকু ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে পারে তা এই উদাহরণটি থেকে সহজেই বুঝা যায়।

পুঁজিবাদী সরকার অবশ্য এভাবে সরাসরি মুদ্রাস্ফীতি ঘটায় না। কারণ সরকার যে শ্রেণির হয়ে ক্ষমতায় বসেছে- এই মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব সেই শ্রেণির সম্পদের ওপরেও পড়ে। যে শ্রেণির গুটিকতক লোককে নিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে সেই শ্রেণিটির স্বার্থরক্ষা করাই সরকারের প্রধান কাজ। সেই শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সরকার ঋণ কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে। সরকার নোট ছাপিয়ে তা দিয়ে সম্পদ কেনে না। সরকার সেই নোটগুলি যা করে তার চেয়ে সম্পদ কিনলেই ভালো হতো।

সরকার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের নোট ছাপিয়ে তা তোলে দেয় পুঁজিপতিদের হাতে। সরকার এটার নাম দিয়েছে ‘ঋণ’। কিন্তু এটা এমন এক ঋণ যা পরিশোধ না করলেও চলে। সরকারের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পর যারা সেটা আর পরিশোধ করে না তাদের প্রকৃত নাম হওয়া উচিত ‘ডাকাত’। কিন্তু পৃথিবীজুড়ে তাদেরকে একটি ভদ্র নামে ডাকা হয়। সেটা হল ‘ঋণখেলাপী’। এই ঋণখেলাপীরা হল বৃহত্তর জনগণের জঘণ্য শত্রু। কিন্তু বেশীরভাগ মানুষ এদের সম্পর্কে সচেতন নয়।

ঋণখেলাপীরা সরকারের যে টাকা নিয়ে যায় তা হয় দশকের পর দশক ধরে অনাদায়ী থেকে যায় অথবা সরকার সে ঋণ মওকুফ করে দিয়ে দেয়। ঋণখেলাপীদের এই অর্থ আসলে কার? যদি আপনি মুদ্রাস্ফীতির ব্যাপারটা বুঝে থাকেন তাহলে আপনি এই প্রশ্নেরও উত্তর পেয়ে গেছেন। হ্যাঁ, ঋণখেলাপীদের লুট করা অর্থ আমাদেরই। আপনি- আমি সকলেই এই অর্থের মূল্যের যোগানদাতা। ঋণখেলাপীদের গ্রহিত অর্থ যে মুদ্রাস্ফীতি ঘটাচ্ছে তা সকলের ওপরেই কার্যকর।

এখানে সাধারণ পাঠকের একটি বিষয় বুঝতে হয়তো অসুবিধা হবে। সাধারণ পাঠক হয়তো মনে করতে পারেন, ঋণখেলাপীরা তো আর আমাদের কাছ থেকে সরাসরি টাকা নিয়ে যাচ্ছে না। তারা তো টাকা নিচ্ছে সরকারের কাছ থেকে। তাহলে তাদের ঋণের টাকা আমাদের হয় কীভাবে? প্রিয় পাঠক, তাদের ঋণের টাকাটা আপনারই টাকা। বাজার থেকে যে বর্ধিত দামে আপনি জিনিস ক্রয় করছেন সেই বর্ধিত দামের মধ্যেই সেই টাকাটা রয়েছে।

দশ বছর আগের দশ টাকার জিনিসের দাম যদি এখন হয় বিশ টাকা তাহলে দশ বছরে দাম বাড়ল কত? দশ টাকা? না তা নয়। প্রযুক্তি তথা পুঁজি তো এই দশ বছরে অনেক বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচও তো কমছে। দশ বছরে কি উৎপাদন ক্ষেত্র আরও অটোমেটেড, যন্ত্রসমৃদ্ধ এবং আরও অধিক উৎপাদনশীল হয়নি?  তাহলে তো দশ বছর পরে সেই জিনিসটির দাম হওয়া উচিত ছিল পাঁচ টাকা। আবার দশ বছরে দেশে যে সম্পদ বেড়েছে তাতে তো মুদ্রা সংকোচন হওয়ার কথা।

দশ বছর আগে দেশে যতো মুদ্রা ছিল সেই একই পরিমাণ মুদ্রা যদি হতো বর্তমান সম্পদের মূল্য তাহলে ব্যাপক মুদ্রা সংকোচন ঘটতো। অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে এখন আরও বেশী সম্পদ পাওয়া যেতো। দশ বছর আগে পাঁচ টাকায় যা পাওয়া যেতো, দেশে সম্পদ বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন তো তার চেয়ে দুই-আড়াই গুণ বেশী জিনিস পাওয়ার কথা। ধরা যাক, মুদ্রা সংকোচন আড়াই গুণ হয়েছে। অর্থাৎ, আগের পাঁচ টাকায় যা পাওয়া যেতো তা এখন দুই টাকায় পাওয়া যায়।

কিন্তু বাস্তবে কী হল? আমরা দেখলাম যে, দশ বছরের উৎপাদনশীলতা এবং সম্পদ বৃদ্ধির বিচারে আগের দশ টাকার জিনিসের প্রকৃত মূল্য এখন দুই টাকা। কিন্তু সেটা বেড়ে দাড়িয়েছে বিশ টাকায়। এর মানে হল, দশ বছরে জিনিসটির দাম বেড়েছে আঠারো টাকা। এই দামবৃদ্ধির পেছনে কারণ কী? অবশ্যই মুদ্রার পরিমাণ অনেকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এমন হয়েছে। দশ বছরে মুদ্রার পরিমাণ কয়গুণ হয়েছে? আমাদের আলোচ্য জিনিসটির দাম বৃদ্ধিতে অন্য উপাদানসমূহের ভূমিকাকে শূণ্য ধরে নিলে দশ বছরে দেশে মুদ্রার পরিমাণ বেড়েছে নয়গুণ।

ধরা যাক, এই নয়গুণ বর্ধিত মুদ্রার মধ্যে চারগুণ মুদ্রা সরাসরি সরকারী ঋণ হিসেবে অর্থনীতিতে ঢুকেছে এবং এর মধ্যে তিনগুণ হচ্ছে খেলাপী ঋণ। এর মানে হল, বিশ টাকার পণ্যে আপনার ছয় টাকাই হল খেলাপী ঋণের মাশুল। এই হিসাবটি অবশ্য বেশ কাল্পনিক এবং ব্যাখ্যাটাও বেশ সরল। তবে এই কাল্পনিক হিসাবটি আমাদেরকে অর্থনীতির জটিল আলোচনা ছাড়াই এটা বুঝতে সাহায্য করছে যে, ঋণখেলাপীদেরকে ঋণ দিয়ে সরকার কীভাবে শোষণে জড়িয়ে পড়ে।

ঋণ মঞ্জুরী এবং মুনাফার বৈধতা প্রদানের পাশাপাশি দেশের ভূ-প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরেও শোষকশ্রেণির দখল-লুন্ঠনকে সরকার বৈধতা ও নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। দেশের ভূ-প্রাকৃতিক এবং খনিজ সম্পদগুলিকে সরকার নাম মাত্র মূল্যে কিংবা বিনামূল্যে পুঁজিপতিদের হাতে তোলে দিয়ে দেয়। সকল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের ওপর পুঁজিপতিদের নিরংকুশ আধিপত্য কায়েমে সরকার সবচেয়ে বড়ো সহায়ক শক্তির ভূমিকা পালন করে। এভাবে জনগণের সম্পদ লুট করে একটি শ্রেণি সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে কিন্তু জনগণ তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারে না। কারণ তাদের পেছনে সরাসরি সরকারী মদদ রয়েছে।

সরকার কীভাবে শোষণের সবচেয়ে বড়ো সহায়ক শক্তি হয়ে ওঠে এবং আমাদের ওপর কীভাবে শোষণ চাপিয়ে দেয় তা এতক্ষণের আলোচনায় মোটামোটিভাবে স্পষ্ট হওয়ার কথা। পুরো আলোচনাটি বুঝতে যদি সমস্যা হয় তাহলে শুধু একটি কথা বুঝলেই চলবে। সেটি হল, পৃথিবীতে যতো মনুষ্যসৃষ্ট সম্পদ আছে তার সবই এসেছে মানুষের শ্রম থেকে। কিন্তু সেই সম্পদের মালিকানা শ্রমজীবীদের হাতে নেই। সম্পদের মালিকানা চলে গেছে আরেকটি শ্রেণির হাতে।

সেই শ্রেণিটি তাদের এই শোষণ ও দমনমূলক কর্তৃত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য একটি সংগঠন গড়ে তোলেছে। এর নাম সরকার। অর্থাৎ সরকার হল, মালিকশ্রেণির একটি সংগঠন। মালিকশ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করাই এর মূল কাজ। মালিকশ্রেণি যে মুনাফা অর্জন করে তার একটি অংশ পায় সরকার। এর নাম ট্যাক্স। ট্যাক্সের টাকা ছাড়াও সরকারের নিজেরও কিছু ব্যবসা রয়েছে যা থেকে অর্জিত মুনাফা সরকারের তহবিলে জমা হয়। এসব অর্থ দিয়ে সরকার চলে।

এখন প্রশ্ন হল, এই মালিকশ্রেণির সংগঠন অর্থাৎ সরকার না থাকলে কী হবে? একদম সোজা উত্তর হল, সরকার না থাকলে সমাজে গণ-মানুষের সংগঠন অর্থাৎ গণসংগঠন বিরাজ করবে। এধরণের সংগঠন ‘ফেডারেশন’ নামেই পরিচিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে এবং পরে ইউরোপীয় শ্রমিক আন্দোলনের পটভূমিতে অনেক বড়ো বড়ো শ্রমিক ফেডারেশন গড়ে উঠেছিল। তখন অনেকে এসব ফেডারেশনকেই সরকারের বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার আন্দোলনে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু সরকারী ক্ষমতার কাছে অনেক ক্ষেত্রেই তাদেরকে পিছু হটতে হয়েছিল।

তখনকার শ্রমিক আন্দোলনে দুটি ধারা ছিল। একপক্ষ মনে করতেন শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক পার্টি গঠন করে ক্ষমতায় যাওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণির সরকার গঠনের আন্দোলনে তারা নিয়োজিত ছিলেন। আরেকপক্ষ মনে করতেন, বৃহত্তর শ্রমিক ফেডারেশন এবং কনফেডারেশনের হাতে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া তথা অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ তোলে নিতে পারলে সরকারের কোন প্রয়োজন নেই। এসব দ্বিধাবিভক্তি অবশ্য শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষতির কারণ হয়েছিল।

বর্তমান সময়ে সমাজে মধ্যবিত্তদের বিপুল উপস্থিতি রয়েছে। কেবল শ্রমিকশ্রেণিই নয়, মধ্যবিত্তসহ সমাজের অধিকাংশ মানুষই এখন বেকারত্বসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। সরকারকে ব্যবহার করে একটি ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর অস্বাভাবিক সম্পদ লুন্ঠণের ফলেই সমাজে বেকারত্বসহ নানা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। সুতরাং সরকারের বিকল্প হিসেবে জনগণের বৃহত্তর ফেডারেশন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আজকের যুগে শ্রমিক শ্রেণির পাশাপাশি অন্যান্য দুর্বল শ্রেণিকেও সংগঠিত করার প্রয়োজন অনিবার্য।

আসিফ আযহার

সরকার না থাকলে সমাজের আয়-উৎপাদন ও অর্থনীতি পরিচালনা করবে কে? আপনার মনে এ প্রশ্নটি জাগা খুবই স্বাভাবিক। এবার দেখা যাক, অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকা কী এবং সরকার না থাকলেও কেন অর্থনীতি টিকে থাকবে। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে, সরকারের হাতে আমরা যেভাবে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তোলে দেই তাতে আমরা সরকারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ি। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপারই ঘটে। সরকারের হাতে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ থাকা মানে হল, সরকার যেভাবে খুশী আমাদের ওপর শোষণ চাপিয়ে দিবে কিন্তু আমরা সরকারের কিছুই করতে পারব না।

সরকার অর্থনীতিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে? প্রথমত, বিনিময়ের মাধ্যম অর্থাৎ মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, ট্যাক্স আরোপের মাধ্যমে, তৃতীয়ত, অর্থনীতির জগতে সর্বোচ্চ আইনী ও প্রশাসনিক ক্ষমতা খাটানোর মাধ্যমে এবং চতুর্থত, ভূ-প্রাকৃতিক সম্পদ অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের ব্যাপারে যেকোন সরকারি সিদ্ধান্ত কায়েমের ক্ষমতা সংরক্ষণের মাধ্যমে। এখানে একটা ব্যাপার দেখুন, সরকার কোন কিছু সৃষ্টি করছে না- সরকার খালি নিয়ন্ত্রণই করে যাচ্ছে। কিন্তু সম্পদ সৃষ্টিতে সরকারের কোন ভূমিকা নেই।

এখন কথা হলো, সম্পদ সৃষ্টি হয় কীভাবে? কারা সম্পদ সৃষ্টি করে? সম্পদ কীভাবে সৃষ্টি হয় সেটি একটি উদাহরণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যাক। ধরুন, একটি দেশে যতো সেলাইয়ের মেশিন রয়েছে তা বিগত দশ বছরে কোন একটি কোম্পানি উৎপাদন করেছে। বিগত দশ বছর ধরে সেলাইয়ের মেশিন বিক্রয় করে ঐ কোম্পানির মালিকরা মোট এক হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। এবার কিছু হিসাব-নিকাশে যাওয়া যাক। সেলাইয়ের মেশিন উৎপাদনের জন্য কোম্পানিটি মোট তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটিয়েছে:

১. জমিসহ সকল প্রাকৃতিক উপাদান যেমন আলো, বাতাস, পানি প্রভৃতি। কোম্পানিটি জমি হয় কিনেছে অথবা ভাড়া করেছে। জমিসহ সকল প্রাকৃতিক উপকরণর পেছনে কোম্পানিটির যে খরচ তাকে খাজনা বলতে হবে।

২. বাজার থেকে ক্রয়কৃত সকল ‘মনুষ্যনির্মিত’ উপাদান, যেমন- সকল প্রকার মেশিনারি, কল-কব্জা, গৃহ-উপকরণ, যান-বাহন, জ্বালানী, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, ডিজাইন, ফর্মুলা প্রভৃতি। এসকল উপকরণের পেছনে কোম্পানিটির যে খরচ তাকে ‘পুঁজি’ বলতে হবে। পুঁজি মানে হলো, উৎপাদনের সেই সকল উপকরণ যা অন্য কেউ ‘উৎপাদন’ করেছে, প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য যে, খনি থেকে যেসব কাঁচামাল আসে ওগুলোও ‘উৎপাদিত’ উপকরণ। এমনকি পানি এবং বাতাসকেও যদি পরিশোধনের মাধ্যমে বোতলে ভরে বিক্রয় করা হয় তাহলে তা আর প্রাকৃতিক থাকে না, তা ‘উৎপাদিত’ পণ্য হিসেবেই গণ্য হবে। যে ‘উৎপাদিত’ পণ্য কোন কিছু উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হবে তাকে ‘পুঁজি’ বলতে হবে। অন্যথায় তা হবে কেবলই ‘ভোগ্যপণ্য’।

৩. কোন কিছু উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক উপাদান এবং ‘মনুষ্যনির্মিত’ উপাদানের সাথে আরেকটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটাতে হবে। সেটা হল, শ্রম। উৎপাদনক্ষেত্রে মূল শ্রমই আসে শ্রমিকদের কাছ থেকে। কিছুটা শ্রম আসে কর্মচারী, কর্মকর্তা, সুপারভাইজার, টেকনিশিয়ান, ইঞ্জিনিয়ার প্রভৃতি লোকজনের কাছ থেকে।

এবার ধরুন তো, এ তিনটি উপকরণের পেছনে বিগত দশ বছরে কোম্পানিটির মোট খরচ এক হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম দুটি অর্থাৎ খাজনা এবং পুঁজি বাবদ কোম্পানির খরচ পাঁচশ’ কোটি টাকা এবং শ্রমের মজুরি বাবদ কোম্পানির খরচ আরও পাঁচশ’ কোটি টাকা। অন্যদিকে সেলাই মেশিন বিক্রয় করে গত দশ বছরে তাদের আয় হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কোম্পানির মুনাফা এক হাজার কোটি টাকা।

ব্যাপারটাকে খুব সহজভাবে নিবেন না। এখানে একটি শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। এই ফাঁকিবাজীর ব্যাপারটাই আপনাদের সামনে তোলে ধরার জন্য এতো উদাহরণ টেনে আনা হয়েছে। আপনারা দেখেছেন যে, এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের উপকরণ সমাজে দুই হাজার কোটি টাকার সম্পদ সৃষ্টি করেছে। এই বাড়তি এক হাজার কোটি টাকা কার প্রাপ্য বলে আপনি মনে করেন? দুই হাজার কোটি টাকার সম্পদ উৎপাদনে কোম্পানি মালিকরা পাঁচশ’ কোটি টাকার পুঁজি ও খাজনা সরবরাহ করেছে।

অন্যদিকে শ্রমিকরাও পাঁচশ’ কোটি টাকার শ্রম দিয়েছে। এক্ষেত্রে তো উভয়পক্ষেরই অংশগ্রহণ সমান। তাহলে মুনাফার অংশটি কেবল মালিকরাই পাচ্ছে কেন? শ্রমিকরা কেন মুনাফার অধিকারী হল না? মুনাফা ব্যাপারটাই বা কী এবং এটা আসলে কার পাওয়া উচিত ছিল? যদি আপনারা শ্রমিকশ্রেণির মানবেতর জীবনের দিকে তাকান তাহলে এ প্রশ্নের উত্তর কিছুটা হলেও পেয়ে যাবেন। সারা জীবন ধরে হাড় ভাঙ্গা খাটুনি খেটেও কেন শ্রমিকরা দরিদ্র থেকে যায় তার কারণ এখানেই নিহিত। সম্পদ সৃষ্টি করছে তারাই। শ্রমই উৎপাদনের একমাত্র উপকরণ। তাই তথাকথিত ‘মুনাফা’ তাদেরই প্রাপ্য।

হ্যাঁ, আপনি প্রথম দুটি উপকরণের কথা মনে করিয়ে দেবেন। বলবেন যে, প্রথম দুটি উপকরণও তো সম্পদ সৃষ্টি করছে! এবার দেখা যাক, প্রথম দুটি উপকরণের সাথে শ্রমের সম্পর্ক কী? প্রথম যে উপকরণের সাথে আমাদের পরিচয় হয়েছে অর্থাৎ উৎপাদনের প্রাকৃতিক উপকরণসমূহ- এগুলোকে কেউ সৃষ্টি করে না। এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই পাওয়া যায়। এগুলোকে উৎপাদনের উপযোগী বানাতে শ্রমের প্রয়োজন। যদি শ্রম দেওয়ার কেউ না থাকে তাহলে এগুলোর কোন মূল্য থাকে না। দ্বিতীয় যে উপকরণের সাথে আমাদের পরিচয় হয়েছে অর্থাৎ ‘পুঁজি’ বা ‘মনুষ্যনির্মিত’ উপাদান- সেগুলো পুরোপুরিভাবেই মানুষের শ্রমেরই সৃষ্টি।

আপনার মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে, উৎপাদনের দ্বিতীয় উপকরণ অর্থাৎ ‘পুঁজি’ সৃষ্টিতেও তো অন্য যন্ত্রের ভূমিকা থাকতে পারে। তাহলে সেগুলো ‘পুরোপুরিভাবে’ শ্রমের সৃষ্টি হয় কীভাবে? হ্যাঁ, আপনার এ প্রশ্নেরই উত্তর এখন খুঁজে বের করব। তবে তার আগে দেখা যাক ‘পুঁজি’ ব্যাপারটা কী? ‘পুঁজি’ বলতে আমরা এমন কিছু বুঝি যা খাটালে তা থেকে আরও কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই অর্থ যথার্থ। কারণ- উৎপাদনের সেসব উপকরণকেই আমরা ‘পুঁজি’ বলছি যেসব উপকরণকে নতুন জিনিস উৎপাদনের ক্ষেত্রে খাটানো যায়।

অনেকে পুঁজি বলতে জমানো টাকা বুঝে থাকেন। হ্যাঁ, পুঁজি বলতে আপনি টাকাকেই বুঝতে পারেন তবে সেই টাকাকে এমন টাকা হতে হবে যা আপনি দৈনন্দিন প্রয়োজনে ব্যবহার করেন না অথবা কোন ভোগ্যপণ্য ক্রয়েও এর ব্যবহারের সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ সেই টাকা আপনি বাণিজ্যিক উৎপাদনে খাটাবেন অথবা তা দিয়ে কোন বাণিজ্যিক উৎপাদনের অংশীদার হবেন। এর মানে হল, এই অর্থ দিয়ে উৎপাদনের উপকরণ ক্রয় করা হবে। উৎপাদনের উপকরণ ক্রয়ে যে টাকার ব্যবহার হবে তাকে ‘পুঁজি’ বলা যেতে পারে।

এবার মূল বিষয়ে আসি। উৎপাদনের ‘মনুষ্যনির্মিত’ উপাদান বা ‘পুঁজি’ পুরোপুরিভাবেই মানুষের শ্রমের সৃষ্টি কিনা তা খতিয়ে দেখা যাক। আমরা ইতোপূর্বে যে সেলাইয়ের মেশিনের উদাহরণ এনেছি সেটা দিয়েই ব্যাখ্যা করা যাক। আমাদের উদাহরণে যেসব সেলাই মেশিনের কথা এসেছে সেগুলো যন্ত্রপুঁজি হিসেবেই বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত হবে। আবার এসব সেলাই মেশিন সৃষ্টিতেও যন্ত্রের ভূমিকা রয়েছে। সেসব যন্ত্র বানাতেও যন্ত্র লেগেছে।

মানুষের শ্রমে যন্ত্র সৃষ্টি হয়। সেই যন্ত্র হয়ে যায় ‘পুঁজি’। সেই পুঁজির সাথে আবার শ্রম যোগ হয়ে সৃষ্টি হয় নতুন ‘পুঁজি’। সেই নতুন পুঁজির সাথে আবারও শ্রম যোগ হয়ে সৃষ্টি হয় আরেক নতুন ‘পুঁজি’। এভাবে পুঁজি থেকে পুঁজির সৃষ্টি হয়। কিন্তু মূলত তা শ্রমেরই অবদান। কারণ প্রতিটি ধাপেই শ্রম পুঁজিতে রূপ নিচ্ছে। নতুন পুঁজি থেকে যদি আপনি শ্রমটাকে বাদ দিয়ে দেন তাহলে কী থাকে? পুরাতন পুঁজিই তো! পুরাতন পুঁজির সাথে শ্রম যুক্ত হয়েই তো নতুন পুঁজির সৃষ্টি।

সেই পুরাতন পুঁজি থেকে শ্রমকে বাদ দিয়ে দিলে পাওয়া যাবে তার চেয়েও পুরাতন পুঁজি। ঐ পুরাতন পুঁজি থেকে শ্রমকে বাদ দিয়ে দিলে…….। এভাবে শেষ পর্যন্ত কী পাওয়া যাবে? পুঁজি কি শেষ পর্যন্তও থাকবে? না। পুঁজি শেষ পর্যন্ত থাকতে পারে না। কারণ প্রকৃতি কোন পুঁজি সৃষ্টি করেনি। প্রকৃতিতে কোন পুঁজি নেই। মানুষের হাতেই পুঁজি সৃষ্টি হয়। তাই শেষ পর্যন্ত যা পাওয়া যাবে তা হল মানুষের শ্রম।

মানুষের শ্রম থেকেই পুঁজির সৃষ্টি হয় এবং এরপর সেই পুঁজির সাথে আরও শ্রম যুক্ত হয়ে নতুন পুঁজির সৃষ্টি হয়। প্রতিটি ধাপেই পুরাতন পুঁজির সাথে শ্রম যুক্ত হয়ে নতুন পুঁজিতে রূপ নিচ্ছে। এভাবে সমাজে পুঁজির পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। শ্রম এবং পুঁজি মিলে যদিও নতুন পুঁজি সৃষ্টি করে কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আগের পুঁজিটাও শ্রমেরই সৃষ্টি। তাই সকল পুঁজিই শ্রমের সৃষ্টি। তাই শ্রমই হল উৎপাদনের মূল উপকরণ এবং বাকী উপকরণগুলোকে বিচার করতে হবে শ্রমের মূল্যেরই নিরিখে।

মানুষ একসময় তাদের শ্রম দিয়ে মূলত ভোগ্যপণ্য এবং খুব সাধারণ কিছু পুঁজি সৃষ্টি করত। যেমন- কাঁচামাল, কৃষি উপকরণ, নৌকা, ঘোড়ার গাড়ী, হাতিয়ার, সরল যন্ত্র প্রভৃতি হস্তনির্মিত উপকরণ। যখন উৎপাদনক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যাবহার প্রসার লাভ করল অর্থাৎ পুঁজি সৃষ্টিতে ব্যাপকভাবে পুঁজির ব্যবহার হতে লাগল তখন এ যুগটিকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা শুরু হল। যথা- আধুনিক যুগ, যান্ত্রিক যুগ, সভ্যতার যুগ প্রভৃতি। কিন্তু অর্থনীতিবিদরাই এর প্রকৃত নামকরণ করলেন- পুঁজিবাদ।

পুঁজিবাদী সমাজে যদিও শ্রমনির্ভর উৎপাদনের চেয়ে পুঁজিনির্ভর উৎপাদনই বেশী, কিন্তু পরোক্ষভাবে এই পুঁজিবাদ শ্রমের কাছেই ঋণী। কারণ সমাজে যে বিপুল পুঁজির জন্ম হয়েছে তা দীর্ঘ সময়ের শ্রমেরই অবদান। বর্তমান সময়েও শ্রম থেকেই প্রতিনিয়ত নতুন পুঁজি জন্ম নিচ্ছে। শ্রম ছাড়া পুঁজির কোন উৎপাদনক্ষমতা নেই। তাই পুঁজিবাদকে সবসময়েই শ্রমের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে।

আমরা দেখলাম যে, উৎপাদনের প্রথম দুটি উপকরণের সম্পদ সৃষ্টির যে ক্ষমতা তা শ্রমই এনে দিয়েছে। শ্রমই প্রাকৃতিক উপকরণকে উৎপাদনের উপযোগী বানায় এবং শ্রমই পুঁজিতে রূপ নিয়ে নতুন উৎপাদনে অংশ নেয়। তাই এটা বললে ভুল হবে না যে, উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ হল শ্রমেরই বিশেষ রূপ মাত্র। প্রকৃতিপ্রদত্ত বিষয়গুলো ছাড়া বাকী যা আছে তার সবই শ্রমের সৃষ্টি। সুতরাং পৃথিবীতে সবকিছুর ওপর সবচেয়ে বেশী হকদার হল শ্রমিকশ্রেণির মানুষ।

কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটাই দেখা যায়। শ্রমিকশ্রেণিই সবচেয়ে হতদরিদ্র এবং সবচেয়ে মানবেতর জীবন তাদেরকেই যাপন করতে হয়। এর কারণ কি? এর কারণ হল মুনাফা। আমরা দেখেছি যে, সম্পদ সৃষ্টিতে একমাত্র ভূমিকা পালন করে শ্রমিকশ্রেণি অথচ সম্পদের একটি বিশাল অংশ মুনাফা হয়ে গুটিকতক মানুষের পকেটে চলে যায়। এরা কারা? এরা হল পুঁজিপতি গোষ্ঠী অর্থাৎ পুঁজির মালিকপক্ষ।

এদের হাতে পুঁজি এলো কী করে? সকল সম্পদই শ্রমের সৃষ্টি। সকল পুঁজিই শ্রমের সৃষ্টি। তাহলে শ্রমিকদের হাত থেকে পুঁজির মালিকানা এদের হাতে চলে এলো কী করে? এর উত্তরও মুনাফা। অর্থাৎ শ্রমিকদের হাতে সৃষ্ট পুঁজি সর্বদাই মুনাফা হয়ে পুঁজিপতিদের হাতে চলে যায়। এখন দেখা যাক, মুনাফা ব্যাপারটা কী? পুঁজিবাদীরা মুনাফার একটি ব্যাখ্যা দাড় করিয়েছে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী পুঁজিপতিরা নিজেরাও নাকি উৎপাদনের একটি উপকরণ এবং এই উপকরণের প্রাপ্য হল মুনাফা!

কিন্তু উৎপাদনের ক্ষেত্রে পুঁজিপতিদের ভূমিকাটা কী তা কোন পুঁজিপতিই ঠিকমতো বলতে পারবে না। অথচ উৎপাদনের সবচেয়ে বড়ো অংশটিই তাদের পকেটে চলে যায়। এই অংশটা কিন্তু পুঁজির মূল্য নয়। আমরা সেলাই মেশিন কোম্পানির উদাহরণে দেখেছি, খাজনা এবং পুঁজি বাবদ কোম্পানির যে পাঁচশ’ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল তা তাদের মোট দুই হাজার কোটি টাকার আয় থেকে পূরণ হয়ে গিয়েছে। বাকী পনেরশ’ কোটি টাকা পেয়েছে শ্রমিকপক্ষ ও পুঁজিপতি মালিকপক্ষ।

পুঁজিবাদীদের কথা অনুযায়ী যদি আমরা উৎপাদনের চারটি উপকরণ ধরে নিই তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, প্রথম দুটি উপকরণ পেয়েছে মোট পাঁচশ’ কোটি টাকা আর পরের দুটি উপকরণ পেয়েছে পনেরোশ’ কোটি টাকা। পরের দুটি উপকরণের প্রাপ্যতা কে নির্ধারণ করল? বিপুল সংখ্যাক শ্রমিক পাবে মাত্র পাঁচশ’ কোটি টাকা আর মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি পাবে এক হাজার কোটি টাকা- এটা কে নির্ধারণ করে দিচ্ছে?

উত্তর হল- পুঁজিবাদী মালিকপক্ষ, তাদের ক্ষমতা, তাদের সরকার এবং তাদের সরকারের আইনই শ্রমিকদেরকে অল্প মজুরি নিতে বাধ্য করছে। উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত গুটিকয়েক পুঁজিপতি বড়ো অংশটাই নিয়ে যাবে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক পাবে ক্ষুদ্র অংশ- এ নিয়ম পুঁজিপতিরাই তৈরী দিচ্ছে। এর কারণ তাদের হাতে রয়েছে পুঁজি, ক্ষমতা, আইন ও সরকার। এটা ঠিক যে, পুঁজিপতিদের পুঁজি ছাড়া শ্রমিকরা কিছু উৎপাদন করতে পারবে না।

কিন্তু এটাও তো সত্য যে, শ্রমিকদের শ্রম ছাড়া পুঁজিপতিরাও কিছু উৎপাদন করতে পারবে না। উৎপাদনের ক্ষেত্রে পুঁজিপতিদের পুঁজি এবং শ্রমিকদের শ্রম- দুটোই প্রয়োজন। তাহলে মুনাফা খালি পুঁজিপতিরাই নেবে কেন? শ্রমিকরা কেন নেবে না? এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর পুঁজিবাদ দিতে পারে না। পুঁজিবাদ দাড়িয়ে আছে মুনাফার ওপরেই। মুনাফা নেই মানে পুঁজিবাদ নেই। মুনাফা আছে মানে পুঁজিবাদও বেঁচে আছে।

মুনাফার অস্তিত্ব থাকার কারণেই পুঁজির মালিকানা চক্রবৃদ্ধি হারে শ্রমিকদের হাত থেকে মালিকদের হাতে চলে যায় । আমরা পূর্ববর্তীতে যে সেলাইয়ের মেশিনের উদাহরণ এনেছি সেটা দিয়েই ব্যাখ্যা করা যাক। আমরা জানি যে, আমাদের উদাহরণে যেসব সেলাই মেশিনের কথা এসেছে সেগুলোর মোট মূল্য দুই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এক হাজার কোটি টাকা মালিকপক্ষের হাতে রয়েছে। আরও পাঁচশ’ কোটি টাকার পুঁজি অর্থাৎ কারখানা ও প্রাকৃতিক স্থাপনা তাদের হাতেই রয়েছে।

এবার ধরা যাক, এই মোট পনেরোশ’ কোটি টাকাকে তারা আরও দশ বছর পুঁজি হিসেবে খাটাল। শ্রমের মজুরি বাবদ তাদের আরও পাঁচশ’ কোটি টাকা খরচ হল। এই দুই হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে তারা চার হাজার কোটি টাকার সেলাই মেশিন উৎপাদন করল। এর মধ্যে তাদের মুনাফা দুই হাজার কোটি টাকা। এবার আপনি বলুন তো, এই দুই হাজার কোটি টাকার মুনাফার পেছনে কত টাকার পুঁজি ও খাজনা জড়িত? পনেরোশ’ কোটি টাকা নাকি পাঁচশ’ কোটি টাকা?

কিছু বুঝতে পারলেন? যতোই পেছনে যাবেন ততোই পুঁজি ছোট হয়ে আসবে। শেষ পর্যন্ত পুঁজি শূণ্য হয়ে আসা ছাড়া কি আর কোন উপায় আছে। যদি পুঁজি শূণ্য হয়ে যায় তাহলে প্রাকৃতিক উপকরণ আর শ্রম ছাড়া কী থাকে? আবারও কি প্রমাণ হল না যে, শ্রমই পুঁজিতে রূপান্তরিত হয় এবং সেই পুঁজিকে মুনাফা বানিয়ে লুটে নেয় ক্ষমতাধর শ্রেণি? মাত্র পাঁচশ’ কোটি টাকার পুঁজি ও খাজনা নিয়ে চালু হওয়া ব্যবসাটা এই যে চার হাজার কোটি টাকায় এসে পৌঁছাল তাতে শ্রম ছাড়া আর কীসের প্রয়োগ হয়েছে?

আমরা দেখলাম যে, পুঁজি থেকে মুনাফা হয় আর এই মুনাফাকে আবার নতুন পুঁজি হিসেবে খাটানো হয়। অর্থাৎ, পুরাতন পুঁজি এবং শ্রমের যৌথ প্রয়াসে সৃষ্ট নতুন পুঁজিই হল মুনাফা। আজকের দিনে পুঁজিপতিদের হাতে যে বিপুল পুঁজি জমা হয়েছে তা মুনাফা হয়েই তাদের হাতে এসেছে। অত্যন্ত বর্ধনশীল হারে পুঁজি বেড়েই চলেছে। কিন্তু মুনাফা হয়ে তা প্রতিনিয়ত পুঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রণেই চলে যাচ্ছে। শ্রমিকরা যে অর্থ পায় তা দিয়ে তারা কোনমতে টিকে থাকে। এসব অর্থ পুঁজি হিসেবে খাটানোর প্রশ্নই আসে না।

শ্রমিকদের শ্রমেই মুনাফা সৃষ্টি হয়। সেই মুনাফার সাথে আবার শ্রম যোগ হয়ে সৃষ্টি হয় নতুন মুনাফা। সেই নতুন মুনাফার সাথে আবারও শ্রম যোগ হয়ে সৃষ্টি হয় আরও নতুন মুনাফা। এভাবে মুনাফা থেকে মুনাফার সৃষ্টি হয়। কিন্তু মূলত তা শ্রমেরই অবদান। কারণ প্রতিটি ধাপেই শ্রম মুনাফায় রূপ নিচ্ছে। নতুন মুনাফা থেকে যদি আপনি শ্রমটাকে বাদ দিয়ে দেন তাহলে কী থাকে? পুরাতন মুনাফাই তো! পুরাতন মুনাফার সাথে শ্রম যুক্ত হয়েই তো নতুন মুনাফার সৃষ্টি।

সেই পুরাতন মুনাফা থেকে শ্রমকে বাদ দিয়ে দিলে পাওয়া যাবে তার চেয়েও পুরাতন মুনাফা। ঐ পুরাতন মুনাফা থেকে শ্রমকে বাদ দিয়ে দিলে…….। এভাবে শেষ পর্যন্ত কী পাওয়া যাবে? মুনাফা কি শেষ পর্যন্তও থাকবে? না। মুনাফা শেষ পর্যন্ত থাকতে পারে না। কারণ প্রকৃতি কোন মুনাফা সৃষ্টি করেনি। প্রকৃতিতে কোন মুনাফা নেই। মানুষের হাতেই মুনাফা সৃষ্টি হয়। তাই শেষ পর্যন্ত যা পাওয়া যাবে তা হল মানুষের শ্রম।

মানুষের শ্রম থেকেই মুনাফার সৃষ্টি হয় এবং এরপর সেই মুনাফার সাথে আরও শ্রম যুক্ত হয়ে নতুন মুনাফার সৃষ্টি হয়। প্রতিটি ধাপেই পুরাতন মুনাফার সাথে শ্রম যুক্ত হয়ে নতুন মুনাফাতে রূপ নিচ্ছে। এভাবে সমাজে মুনাফার পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। শ্রম এবং মুনাফা মিলে যদিও নতুন মুনাফা সৃষ্টি করে কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আগের মুনাফাটাও শ্রমেরই সৃষ্টি। তাই সকল মুনাফাই শ্রমের সৃষ্টি।

যদি শ্রম থেকেই মুনাফা সৃষ্টি হয় তাহলে এটা কার প্রাপ্য বলে আপনি মনে করেন? পুঁজিবাদ যে কতোটা অন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত তা কি আপনি এখন অনুধাবন করতে পারেন? যদি পুঁজিবাদ না থাকত তাহলে কী হতো? এর উত্তর খুবই সহজ। যদি পুঁজিবাদ না থাকত তাহলে যারা সম্পদ সৃষ্টি করছে তারাই সম্পদের মালিক হতো। পুঁজিবাদ না থাকলে যাদের শ্রমে নতুন পুঁজি সৃষ্টি হয় তারাই সেই নতুন পুঁজির মালিক হতো। সমাজে বিলাসিতা ও অভাব থাকত না। সমাজে সবসময়েই একটি সমতা বজায় থাকতো।

প্রশ্ন হল, পুঁজিবাদকে আমরা টিকিয়ে রাখছি কেন? এর উত্তরও সহজ। পুঁজিবাদীদের ক্ষমতা ও কৌশলের কাছে আমরা পরাজিত। দেশের সরকার হচ্ছে তাদের হাতের মুঠোয়। তারাই ট্যাক্স দিয়ে সরকারকে পুষছে। আর সরকার পুষছে পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনী যারা যেকোন সময়েই মালিকশ্রেণির পক্ষে মাঠে নামতে প্রস্তুত। মেহনতী মানুষদের যেকোন আন্দোলনকে গুড়িয়ে দিতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী সদা প্রস্তুত থাকে। এদের সবচেয়ে বড়ো কাজ হলো, মালিকশ্রেণির নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং মুনাফা ব্যবস্থাকে সমাজে বলবৎ রাখা।

পুঁজিপতিরা এবং পুঁজিপতিদের সরকার কোন সম্পদ সৃষ্টি করছে না। তাদের কাজ হল, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব তাদের হাতেই রাখা এবং মুনাফার নামে সমাজের বৃহত্তর অংশকে শোষণ করা। মুনাফার নামে পুঁজিপতিরা যে সম্পদ কুক্ষিগত করে তাকে তারা সবসময়ই যে নতুন পুঁজি হিসেবে খাটায়- তা নয়। এ সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয় তাদের আমোদ-স্ফূর্তি ও বিলাসীতায়। অন্যদিকে সমাজের নিচের তলার মানুষের জীবন কেটে যায় হাহাকার আর দারিদ্রতার মধ্যে।

এ বৈষম্য যাতে চিরস্থায়ীভাবে টিকে থাকে সেজন্য পুঁজিপতিরা তাদের নিজেদের সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে রাখে। অবশ্য তারা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দলের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু যে দলের সরকারই ক্ষমতায় আসুক, সকল পুঁজিপতিদেরই স্বার্থ রক্ষা করা তাদের প্রধান কাজ। এটাই হল সরকার এবং পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর মধ্যকার সম্পর্ক। পুঁজিবাদীদের স্বার্থে সরকার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

এ অর্থনীতি হল শোষণের অর্থনীতি। সরকার কীভাবে শোষণে সহায়তা করে তার কিছু চিত্র আমরা দেখব। প্রথমত, সরকার শোষণের সবচেয়ে বড়ো সহায়ক শক্তি হয়ে ওঠে মুনাফার বৈধতা দিয়ে। শ্রমিকদের শ্রমেই সৃষ্ট সম্পদকে যাতে মুনাফা বানিয়ে পুঁজিপতিরা অবাধে লুন্ঠন করতে পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান কাজ। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন যাতে কোনভাবেই মাথা তোলে দাড়াতে না পারে সেটা দেখা সরকারের প্রধান কর্তব্য।

দ্বিতীয়ত, ঋণখেলাপীদেরকে ঋণ দিয়ে সরকার সরাসরি শোষণে জড়িত হয়ে পড়ে। এ ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক। আমরা জেনেছি যে, সরকার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। মুদ্রা বা টাকা আসলে কী? মুদ্রা হল কিছু কাগজের টুকরো বা ধাতব বস্তু মাত্র। যদি সরকার এগুলোকে মূল্যহীন ঘোষণা করে তাহলে এগুলোর কোন মূল্যই থাকবে না। সরকার এগুলোকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে চালু রেখেছে বলেই এগুলোর মূল্য রয়েছে।

অনেক সময় সরকার বড়ো নোট বাতিল করে দেয়। তখন এগুলোর কোন মূল্যই থাকেনা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে বড়ো নোট বাতিল করে দিয়েছিল। সরকারী ঘোষণার সাথে সাথেই বড়ো নোটগুলি অপ্রয়োজনীয় কাগজে পরিণত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সরকারও বড়ো নোট বাতিলের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এসব উদাহরণ আমাদেরকে এটাই বুঝিয়ে দেয় যে, নোটের কোন শক্তি নেই- যদি না সরকার এর মূল্য স্বীকার করে।

কোন দেশ যদি অন্য দেশের দখলে চলে যায় তাহলে সেই দেশের মুদ্রারও পতন ঘটে যায়। ১৯৯১ সালে যখন ইরাক কুয়েত দখল করেছিল তখন কুয়েতী মুদ্রার মূল্য অনেক নিচে নেমে আসে। আবার ২০০৩ সালে যখন আমেরিকা ইরাক দখল করে তখন ইরাকী মুদ্রাও প্রায় অচল হয়ে যায়। এর কারণ হল- মুদ্রার কার্যকারিতা সরকারের অস্তিত্বের ওপরেই নির্ভর করে। দেশে সরকারের অস্তিত্ব থাকলে মুদ্রাও সচল থাকে। দেশের সরকার উৎখাত হয়ে গেলে সরকারের মুদ্রাও অচল হয়ে যায়।

সরকারী মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষেত্রে এমন এক অনিবার্য মাধ্যমে পরিণত হয় যে, সারা দেশের যতো সম্পদ আছে তার মূল্য ঐ সরকারী মুদ্রাই বহণ করে। বিনিময়ের মাধ্যম হয়ে উঠায় মুদ্রার সাথে বিনিময়যোগ্য জিনিসের যে মূল্য- মুদ্রারও সেই একই মূল্য আছে বলে ধরা হয়। দেশের সকল সম্পদের মূল্য ঐ মুদ্রা দিয়েই পরিমাপ করা হয়। একটি সম্পদের সাথে আরেকটি সম্পদের সরাসরি বিনিময় হয় না। বিনিময় হয় মুদ্রার মাধ্যমে। একারণে মুদ্রা যে ছাপাতে পারে আর যে বাতিল করতে পারে সে সমাজের সকল সম্পদের ওপরেই পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে বসে থাকে।

আপনি আপনার বেতনের টাকা দিয়ে কিছু ক্রয়ের অর্থ হল, আপনি প্রথমে টাকার সাথে আপনার শ্রমের বিনিময় করেছেন এবং পরে সেই টাকার সাথে ক্রয়কৃত জিনিসটির বিনিময় ঘটিয়েছেন। এ প্রক্রিয়ায় আপনি দু’বার টাকার মূল্য স্বীকার করেছেন: একবার শ্রমের বিনিময়ে টাকা নিয়ে এবং আরেকবার পণ্যের বিনিময়ে টাকা দিয়ে। এখানে দু’বার টাকা বিনিময়ের মাধ্যম হয়েছে এবং মোট তিনটি পক্ষ টাকাকে মূল্যের বাহন বানিয়েছে।

এই বিনিময়যোগ্যতার কারণেই টাকার নিজস্ব কোন মূল্য না থাকলেও তা এর সাথে বিনিময়যোগ্য বস্তুর সমান মূল্যই বহণ করছে। মুদ্রা দিয়ে যেকোন মুহুর্তে যেকোন কিছু কেনা যায় বলেই ক্রয়যোগ্য বস্তুর মূল্য আর মুদ্রার মূল্য একই হয়ে যায়। এক লক্ষ টাকার সমপরিমাণ স্বর্ণের যে গুরুত্ব এক লক্ষ টাকারও সেই একই গুরুত্ব। এ ব্যাপারটাই সরকারের হাতে প্রভূত অর্থনৈতিক ক্ষমতা এনে দেয়, সরকারকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে নিরংকুশ ক্ষমতাবান করে তোলে।

আপনার সম্পদের যে গুরুত্ব এবং দেশের সকল সম্পদের যে গুরুত্ব তার সমান্তরালে সরকারের মুদ্রারও সেই একই গুরুত্ব রয়েছে। একারণে সরকার কোন সম্পদ সৃষ্টি না করেও কেবল মুদ্রা ছাপিয়েই সম্পদের মালিক হয়ে যেতে পারে। আপনি যতো সম্পদেরই মালিক হোন না কেন সরকার নীরবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়ে আপনার সম্পদে ভাগ বসিয়ে দিতে পারে। সম্পদ সৃষ্টি না করেও কেবল মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে সরকার কীভাবে সম্পদের মালিক হয়ে যেতে পারে তা একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাক।

ধরুন, একটি দেশে যতো সম্পদ রয়েছে তার মূল্য একশ’ বিলিয়ন ডলার। দেশে মুদ্রাও আছে একশ’ বিলিয়ন ডলার। এখন সরকার ভাবল, দেশে তো প্রচুর সম্পদ। এর অর্ধেক কীভাবে দখল করা যায়! সরকার দেশের সম্পদ দখল করার জন্য খুবই সহজ এক পদ্ধতি বেছে নিল। সরকার আরও একশ’ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা ছাপিয়ে নাগরিকদের সম্পদ কিনতে শুরু করল। দেশের অর্থনীতিতে নতুন একশ’ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হওয়ায় মোট মুদ্রা হয়ে গেল দুইশ’ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যাপারটার নাম মুদ্রাস্ফীতি।

বাজারে নতুন মুদ্রা ছেড়ে দেওয়ার যে মুদ্রাস্ফীতি ঘটল তাতে মুদ্রার মান গেল কমে। আগের একশ’ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের দাম বেড়ে গিয়ে এখন হয়ে গেল দুইশ’ বিলিয়ন ডলার। সেই সম্পদের অর্ধেকের দাম হল এখন একশ’ বিলিয়ন ডলার। এই অর্ধেক সম্পদ অর্থাৎ বর্তমান মুদ্রামান অনুযায়ী একশ’ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ চলে গেল সরকারের হাতে! বিনিময় মাধ্যম অর্থাৎ মুদ্রার ওপরে নিয়ন্ত্রণ থাকায় সরকার কতটুকু ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে পারে তা এই উদাহরণটি থেকে সহজেই বুঝা যায়।

পুঁজিবাদী সরকার অবশ্য এভাবে সরাসরি মুদ্রাস্ফীতি ঘটায় না। কারণ সরকার যে শ্রেণির হয়ে ক্ষমতায় বসেছে- এই মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব সেই শ্রেণির সম্পদের ওপরেও পড়ে। যে শ্রেণির গুটিকতক লোককে নিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে সেই শ্রেণিটির স্বার্থরক্ষা করাই সরকারের প্রধান কাজ। সেই শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সরকার ঋণ কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে। সরকার নোট ছাপিয়ে তা দিয়ে সম্পদ কেনে না। সরকার সেই নোটগুলি যা করে তার চেয়ে সম্পদ কিনলেই ভালো হতো।

সরকার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের নোট ছাপিয়ে তা তোলে দেয় পুঁজিপতিদের হাতে। সরকার এটার নাম দিয়েছে ‘ঋণ’। কিন্তু এটা এমন এক ঋণ যা পরিশোধ না করলেও চলে। সরকারের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পর যারা সেটা আর পরিশোধ করে না তাদের প্রকৃত নাম হওয়া উচিত ‘ডাকাত’। কিন্তু পৃথিবীজুড়ে তাদেরকে একটি ভদ্র নামে ডাকা হয়। সেটা হল ‘ঋণখেলাপী’। এই ঋণখেলাপীরা হল বৃহত্তর জনগণের জঘণ্য শত্রু। কিন্তু বেশীরভাগ মানুষ এদের সম্পর্কে সচেতন নয়।

ঋণখেলাপীরা সরকারের যে টাকা নিয়ে যায় তা হয় দশকের পর দশক ধরে অনাদায়ী থেকে যায় অথবা সরকার সে ঋণ মওকুফ করে দিয়ে দেয়। ঋণখেলাপীদের এই অর্থ আসলে কার? যদি আপনি মুদ্রাস্ফীতির ব্যাপারটা বুঝে থাকেন তাহলে আপনি এই প্রশ্নেরও উত্তর পেয়ে গেছেন। হ্যাঁ, ঋণখেলাপীদের লুট করা অর্থ আমাদেরই। আপনি- আমি সকলেই এই অর্থের মূল্যের যোগানদাতা। ঋণখেলাপীদের গ্রহিত অর্থ যে মুদ্রাস্ফীতি ঘটাচ্ছে তা সকলের ওপরেই কার্যকর।

এখানে সাধারণ পাঠকের একটি বিষয় বুঝতে হয়তো অসুবিধা হবে। সাধারণ পাঠক হয়তো মনে করতে পারেন, ঋণখেলাপীরা তো আর আমাদের কাছ থেকে সরাসরি টাকা নিয়ে যাচ্ছে না। তারা তো টাকা নিচ্ছে সরকারের কাছ থেকে। তাহলে তাদের ঋণের টাকা আমাদের হয় কীভাবে? প্রিয় পাঠক, তাদের ঋণের টাকাটা আপনারই টাকা। বাজার থেকে যে বর্ধিত দামে আপনি জিনিস ক্রয় করছেন সেই বর্ধিত দামের মধ্যেই সেই টাকাটা রয়েছে।

দশ বছর আগের দশ টাকার জিনিসের দাম যদি এখন হয় বিশ টাকা তাহলে দশ বছরে দাম বাড়ল কত? দশ টাকা? না তা নয়। প্রযুক্তি তথা পুঁজি তো এই দশ বছরে অনেক বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচও তো কমছে। দশ বছরে কি উৎপাদন ক্ষেত্র আরও অটোমেটেড, যন্ত্রসমৃদ্ধ এবং আরও অধিক উৎপাদনশীল হয়নি?  তাহলে তো দশ বছর পরে সেই জিনিসটির দাম হওয়া উচিত ছিল পাঁচ টাকা। আবার দশ বছরে দেশে যে সম্পদ বেড়েছে তাতে তো মুদ্রা সংকোচন হওয়ার কথা।

দশ বছর আগে দেশে যতো মুদ্রা ছিল সেই একই পরিমাণ মুদ্রা যদি হতো বর্তমান সম্পদের মূল্য তাহলে ব্যাপক মুদ্রা সংকোচন ঘটতো। অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে এখন আরও বেশী সম্পদ পাওয়া যেতো। দশ বছর আগে পাঁচ টাকায় যা পাওয়া যেতো, দেশে সম্পদ বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন তো তার চেয়ে দুই-আড়াই গুণ বেশী জিনিস পাওয়ার কথা। ধরা যাক, মুদ্রা সংকোচন আড়াই গুণ হয়েছে। অর্থাৎ, আগের পাঁচ টাকায় যা পাওয়া যেতো তা এখন দুই টাকায় পাওয়া যায়।

কিন্তু বাস্তবে কী হল? আমরা দেখলাম যে, দশ বছরের উৎপাদনশীলতা এবং সম্পদ বৃদ্ধির বিচারে আগের দশ টাকার জিনিসের প্রকৃত মূল্য এখন দুই টাকা। কিন্তু সেটা বেড়ে দাড়িয়েছে বিশ টাকায়। এর মানে হল, দশ বছরে জিনিসটির দাম বেড়েছে আঠারো টাকা। এই দামবৃদ্ধির পেছনে কারণ কী? অবশ্যই মুদ্রার পরিমাণ অনেকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এমন হয়েছে। দশ বছরে মুদ্রার পরিমাণ কয়গুণ হয়েছে? আমাদের আলোচ্য জিনিসটির দাম বৃদ্ধিতে অন্য উপাদানসমূহের ভূমিকাকে শূণ্য ধরে নিলে দশ বছরে দেশে মুদ্রার পরিমাণ বেড়েছে নয়গুণ।

ধরা যাক, এই নয়গুণ বর্ধিত মুদ্রার মধ্যে চারগুণ মুদ্রা সরাসরি সরকারী ঋণ হিসেবে অর্থনীতিতে ঢুকেছে এবং এর মধ্যে তিনগুণ হচ্ছে খেলাপী ঋণ। এর মানে হল, বিশ টাকার পণ্যে আপনার ছয় টাকাই হল খেলাপী ঋণের মাশুল। এই হিসাবটি অবশ্য বেশ কাল্পনিক এবং ব্যাখ্যাটাও বেশ সরল। তবে এই কাল্পনিক হিসাবটি আমাদেরকে অর্থনীতির জটিল আলোচনা ছাড়াই এটা বুঝতে সাহায্য করছে যে, ঋণখেলাপীদেরকে ঋণ দিয়ে সরকার কীভাবে শোষণে জড়িয়ে পড়ে।

ঋণ মঞ্জুরী এবং মুনাফার বৈধতা প্রদানের পাশাপাশি দেশের ভূ-প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরেও শোষকশ্রেণির দখল-লুন্ঠনকে সরকার বৈধতা ও নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। দেশের ভূ-প্রাকৃতিক এবং খনিজ সম্পদগুলিকে সরকার নাম মাত্র মূল্যে কিংবা বিনামূল্যে পুঁজিপতিদের হাতে তোলে দিয়ে দেয়। সকল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের ওপর পুঁজিপতিদের নিরংকুশ আধিপত্য কায়েমে সরকার সবচেয়ে বড়ো সহায়ক শক্তির ভূমিকা পালন করে। এভাবে জনগণের সম্পদ লুট করে একটি শ্রেণি সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে কিন্তু জনগণ তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারে না। কারণ তাদের পেছনে সরাসরি সরকারী মদদ রয়েছে।

সরকার কীভাবে শোষণের সবচেয়ে বড়ো সহায়ক শক্তি হয়ে ওঠে এবং আমাদের ওপর কীভাবে শোষণ চাপিয়ে দেয় তা এতক্ষণের আলোচনায় মোটামোটিভাবে স্পষ্ট হওয়ার কথা। পুরো আলোচনাটি বুঝতে যদি সমস্যা হয় তাহলে শুধু একটি কথা বুঝলেই চলবে। সেটি হল, পৃথিবীতে যতো মনুষ্যসৃষ্ট সম্পদ আছে তার সবই এসেছে মানুষের শ্রম থেকে। কিন্তু সেই সম্পদের মালিকানা শ্রমজীবীদের হাতে নেই। সম্পদের মালিকানা চলে গেছে আরেকটি শ্রেণির হাতে।

সেই শ্রেণিটি তাদের এই শোষণ ও দমনমূলক কর্তৃত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য একটি সংগঠন গড়ে তোলেছে। এর নাম সরকার। অর্থাৎ সরকার হল, মালিকশ্রেণির একটি সংগঠন। মালিকশ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করাই এর মূল কাজ। মালিকশ্রেণি যে মুনাফা অর্জন করে তার একটি অংশ পায় সরকার। এর নাম ট্যাক্স। ট্যাক্সের টাকা ছাড়াও সরকারের নিজেরও কিছু ব্যবসা রয়েছে যা থেকে অর্জিত মুনাফা সরকারের তহবিলে জমা হয়। এসব অর্থ দিয়ে সরকার চলে।

এখন প্রশ্ন হল, এই মালিকশ্রেণির সংগঠন অর্থাৎ সরকার না থাকলে কী হবে? একদম সোজা উত্তর হল, সরকার না থাকলে সমাজে গণ-মানুষের সংগঠন অর্থাৎ গণসংগঠন বিরাজ করবে। এধরণের সংগঠন ‘ফেডারেশন’ নামেই পরিচিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে এবং পরে ইউরোপীয় শ্রমিক আন্দোলনের পটভূমিতে অনেক বড়ো বড়ো শ্রমিক ফেডারেশন গড়ে উঠেছিল। তখন অনেকে এসব ফেডারেশনকেই সরকারের বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার আন্দোলনে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু সরকারী ক্ষমতার কাছে অনেক ক্ষেত্রেই তাদেরকে পিছু হটতে হয়েছিল।

তখনকার শ্রমিক আন্দোলনে দুটি ধারা ছিল। একপক্ষ মনে করতেন শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক পার্টি গঠন করে ক্ষমতায় যাওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণির সরকার গঠনের আন্দোলনে তারা নিয়োজিত ছিলেন। আরেকপক্ষ মনে করতেন, বৃহত্তর শ্রমিক ফেডারেশন এবং কনফেডারেশনের হাতে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া তথা অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ তোলে নিতে পারলে সরকারের কোন প্রয়োজন নেই। এসব দ্বিধাবিভক্তি অবশ্য শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষতির কারণ হয়েছিল।

বর্তমান সময়ে সমাজে মধ্যবিত্তদের বিপুল উপস্থিতি রয়েছে। কেবল শ্রমিকশ্রেণিই নয়, মধ্যবিত্তসহ সমাজের অধিকাংশ মানুষই এখন বেকারত্বসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। সরকারকে ব্যবহার করে একটি ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর অস্বাভাবিক সম্পদ লুন্ঠণের ফলেই সমাজে বেকারত্বসহ নানা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। সুতরাং সরকারের বিকল্প হিসেবে জনগণের বৃহত্তর ফেডারেশন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আজকের যুগে শ্রমিক শ্রেণির পাশাপাশি অন্যান্য দুর্বল শ্রেণিকেও সংগঠিত করার প্রয়োজন অনিবার্য।

0 Comments
Loading...