সরকার এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন

সরকার এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন

আসিফ আযহার

এটা হয়তো সম্ভব যে, আমরা সরকারকে সরিয়ে দিতে পারব। কিন্তু যদি সরকার না থাকে তাহলে আমাদেরকে নিরাপত্তা দিবে কে? সরকার নিয়ন্ত্রিত সমাজ অর্থাৎ রাজনৈতিক সমাজের জীবনে আমরা এতোটাই অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি যে, সরকার ছাড়া আমরা কোন সমাজের কথা কল্পনাই করতে পারি না। রাজনৈতিক সমাজের সরকার এবং ক্ষমতাধরদের হাতে আমরা নিজেদেরকে এমনভাবে সঁপে দিয়েছি যে, এদের অনুপস্থিতির কথা ভাবতেও আমরা ভয় পাই।

আমরা ধরে নিয়েছি সরকার-রাষ্ট্র ও রাজনীতিই আমাদের নিরাপত্তার উৎস। এসব না থাকলে অর্থাৎ সরকারবিহীন অরাজনৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের নিরাপত্তা কে দিবে- এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদেরকে আমাদের জীবনের দিকে তাকাতে হবে। আমরা আমাদের নিজেদের জীবনের দিকে তাকালেই এ প্রশ্নটির সবচেয়ে ভালো উত্তর খুঁজে পাব।

সরকার আমাদের জীবনে কী ভূমিকা পালন করে? আমাদেরকে কি সরকারই বাঁচিয়ে রাখে? বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন কি আমরা সরকারের কাছ থেকে পাই? সরকার না থাকলে কি প্রকৃতি আমাদেরকে আলো-বাতাস ও খাবার থেকে বঞ্চিত করত? আপনার জীবনে সরকারের কী প্রয়োজন পড়ে? প্রকৃতির বুকে আপনার বেঁচে থাকার সাথে সরকারের কী সম্পর্ক? প্রকৃতির কোলে বেঁচে থাকার জন্য আপনার যে শারীরিক সামর্থ্য প্রয়োজন তা কি সরকার আপনাকে দিয়েছে?

সরকার কি আপনাকে বার্ধক্য ও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারবে? রোগজীবাণু কি সরকারের কথা শুনবে? আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও কি সরকারের আদেশ অনুযায়ী কাজ করে? যদি এসব প্রাকৃতিক বিষয়ের ওপর সরকারের কোন হাত না থাকে এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রকৃতির হাতেই থেকে যায় তাহলে সরকারের ওপর ভরসা কীসের? সরকার থাকুক কিংবা না থাকুক জীবনের নিয়ন্ত্রণ প্রকৃতির হাতেই- এটা হল ধ্রুব সত্য।

মানুষ ছাড়াও অসংখ্য প্রজাতিকে প্রকৃতি বাঁচিয়ে রেখেছে যাদের কোন সরকার নেই। মানুষের মধ্যেও এমন অসংখ্য গোত্র ছিল যাদের কোন সরকার ছিল না। প্রকৃতিই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। এমনকি আজও অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বেশ শিথিল। কিন্তু জীবন কোথাও থেমে নেই। চরম সত্য হল, সরকার থাকুক কিংবা না থাকুক জীবন কোথাও থেমে থাকে না। জীবন জীবনের নিয়মেই চলতে থাকে।

পৃথিবীতে জীবন এসেছে প্রাকৃতিক নিয়মের পথ ধরেই, কোন সরকারের কথায় আসেনি। কোন সরকার না থাকলেও যে জীবন প্রকৃতির নিয়মেই চলতে থাকবে তাতে কোন সংশয় নেই। বেশীদিন আগে নয়, মাত্র কয়েক শতক পূর্বেই পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে কোন সরকার ছিল না। আফ্রিকা মহাদেশের সিংহভাগ এলাকা, উত্তর আমেরিকা-দক্ষিণ আমেরিকা ও ওশেনিয়া মহাদেশের পুরো অঞ্চল এবং এশিয়া মহাদেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোন সরকারের অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু জীবন কোথাও থেমে ছিল না।

এসব এলাকা ছিল অসংখ্য মানুষে পরিপূর্ণ। কোটি কোটি মানুষের বসবাস ছিল এসব এলাকায়। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান জাতির লোকজন, অস্ট্রেলিয়ার এবরিজিন গোষ্ঠীসমূহ, আফ্রিকার অসংখ্য নিগ্রো জাতির লোকজন, মরুভূমির বেদুইন সম্প্রদায়, পাহাড়ী আদিবাসী গোষ্ঠী, বরফ অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়- প্রভৃতি নৃ-গোষ্ঠী পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে ছিল সরকারবিহীন সমাজব্যবস্থা নিয়ে।

১৪৯২ সালে জলদস্যু কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পথ ধরে এসব অঞ্চলে ইউরোপীয়দের আগমণ শুরু হয়। সেই সাথে এসব অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবনের ওপর নেমে আসে রাষ্ট্রবাদী সভ্যতার চরম অভিশাপ! ইউরোপীয় সরকারগুলো চারটি মহাদেশকেই তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। স্থানীয় মানুষদেরকে তারা হয় মেরে ফেলে অথবা তাদের ক্রীতদাস বানায়।

ইউরোপীয়রা নতুন মহাদেশগুলোর যেখানেই যায় সেখানেই ‘সরকার’ প্রতিষ্ঠা করে। এসব সরকারের প্রধান কাজই ছিল স্থানীয় আধিবাসীদেরকে খতম করা কিংবা ক্রীতদাসে পরিণত করা। কেবল আমেরিকার উদাহরণ দেওয়া যাক। রেড ইন্ডিয়ানদের হাত থেকে আমেরিকা দখল করতে গিয়ে আমেরিকান সরকার কম-বেশী ১৫০০টি যুদ্ধ পরিচালনা করে।

যখন এসব যুদ্ধ শেষ হয় তখন দেখা গেল উত্তর আমেরিকায় রেড ইন্ডিয়ানদের সংখ্যা আনুমানিক দেড় কোটি থেকে মাত্র দুই লক্ষ আটত্রিশ হাজারে নেমে এসেছে। আফ্রিকানদের যেভাবে ক্রীতদাস বানানো হয়েছে তা পৌরাণিক নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়। পৃথিবীর বড়ো অংশ জুড়ে ‘সরকার’ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এমন অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতায় ভরপুর।

চারটি দুর্বল মহাদেশে ইউরোপীয় শেতাঙ্গরা ‘সরকার’ কায়েম করেছিল নৃশংস গণহত্যা, জাতিগত নিধন, অন্যায় আগ্রাসন আর দাসতন্ত্র কায়েমের মধ্য দিয়ে। যদি ঐ দেশসমূহে এভাবে ‘সরকারের’ আগমণ না ঘটতো তাহলে কী হতো? নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, পরাজিত কিংবা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া জাতিগুলো এখনও পৃথিবীর বুকে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারত।

সরকারগুলো এভাবেই হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে শক্তি ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছে। আসলে সরকার কোনভাবেই মানুষের সহায় নয়। মানুষের সহায় হল তাদের সমাজ। অনেকেই সরকার আর সমাজের পার্থক্য বুঝে না। সরকার আর সমাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। সরকার হল সমাজে একটি বাড়তি সংযোজন। এটা না থাকলেও সমাজ স্বয়ংসম্পূর্ণভাবেই চলতে পারবে।

যদি আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে, আমরা নিজেদের জীবনের তাড়নায় এবং নিজেদের জীবনের তাগিদেই অনেক কিছু ভাবি, অনেক কিছু করি, অনেক কিছু শিখি এবং একটি সমাজজীবন গড়ে তুলি। সরকার সেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসে মাত্র। সমাজেরই কিছু লোক নিজেদেরকে ‘সরকার’ ঘোষণা দিয়ে আমাদের কাছ থেকে ‘সম্মতি’ আদায় করে নেয় এবং কতকগুলো নিয়ম-কানুন চালু করে দেয়।

যদি এ সরকার বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে আমাদের জীবনের তাগিদে যেসব কাজ করা দরকার তা আমরা করবই। আসলে আমাদের জীবন, আমাদের বেঁচে থাকা, আমাদের কাজ এবং আমাদের সমাজ কোন সরকারী আদেশের ফলাফল নয় বরং   জীবনের তাগিদে, বেঁচে থাকার স্বার্থে, অস্তিত্বের প্রয়োজনে আমরা যে সমাজের জন্ম দিয়েছি সে সমাজেরই একটি বাড়তি অংশ হল সরকার।

বেঁচে থাকার জন্য সরকার নামক একটি বস্তুর প্রয়োজন- এই ভুল বিশ্বাস সরকারই আমাদেরকে শিখায়। আসলে বেঁচে থাকার সাথে সরকারে কোন সম্পর্কই নেই এবং সরকার আমাদের জীবনে হস্তক্ষেপ না করলে আমরা এর কথা ভুলেই যেতাম। যতক্ষণ না সরকার আমাদের জীবনে ঢুকে পড়ছে, কোন কিছু করতে বাধ্য করছে কিংবা কোনকিছু করতে নিষেধ করছে ততক্ষণ পর্যন্ত সরকারের কথা আমাদের মাথায় আসার কোন কারণ নেই।

এটি অদ্ভূত নয় যে, অধিকাংশ মানুষই মনে করে- আমরা সরকার ছাড়া চলতে পারব না যদিও বাস্তবিক অর্থে মানুষের জীবন সরকার ছাড়াই স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সমাজ জীবনে সরকার কেবলই একটি ‘বাড়তি সংযোজন’ মাত্র। সমাজের কিছু লোক ‘সরকার’ হয়ে বাকীদের জীবনে ‘হস্তক্ষেপ’ করে মাত্র। এখন প্রশ্ন হল, সরকার না থাকলে আমাদেরকে নিরাপত্তা দেবে কে? অপরাধীদের হাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করবে কে?

এ প্রশ্নের উত্তরে একটি পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই। যদি সরকারই অপরাধী হয়ে বসে তাহলে সরকারের অপরাধ থেকে আমাদেরকে রক্ষা করবে কে? চোর-ডাকাত ও ছিনতাইকারিদের হাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করার জন্য আমরা কিছু মানুষকে ক্ষমতায় বসাই। তারাই হল সরকার। এই বাড়তি ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষগুলি অর্থাৎ সরকারের লোকজন যখন সীমাহীন দূর্নীতিগ্রস্থ হয়ে ওঠে এবং জনগণের সম্পদ লুট করতে শুরু করে তখন আমরা কী করি?

তখন আমরা সরকার পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন শুরু করি। ছোটখাটো আন্দোলনে সরকারের কিছুই হয় না। বড় বড় আন্দোলনে অনেক সময় সরকারের পতন ঘটে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন ভালো থাকে। তারপর আগের সরকারের মতোই দূর্নীতিগ্রস্থ ও লুটেরা হয়ে ওঠে। জনগণ আবারও আন্দোলন শুরু করে। এভাবে ক্ষমতার পালাবদল চলতে থাকে কিন্তু জনগণের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না।

সারা দেশে যতো চোর-ডাকাত রয়েছে তারা সারা জীবনে যে পরিমাণ সম্পদ আয় করে- একটি দূর্নীতিবাজ সরকার একদিনেই তার চেয়ে অনেকগুণ বেশী সম্পদ লুট করে। দূর্নীতি, লুটপাট, গুম, খুন, গণহত্যা, পুলিশী অত্যাচার- এ সবই হল সরকারের কাজ। তাহলে সরকারের সাথে জনগণের নিরাপত্তার কী সম্পর্ক থাকল?

যে সরকার মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা সেই সরকারের বিরুদ্ধে যদি জনগণকে আন্দোলন করতে হয় তাহলে সরকারকে দিয়ে লাভটা কী হল? সরকারের দূর্নীতি ও অপরাধ থেকে বাঁচার জন্য যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করতে পারি তাহলে চোর-ডাকাতের মতো মামুলী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কেন আমরা নিজেরাই ব্যবস্থা নিতে পারব না? এ কাজের জন্য কি আদৌ সরকারের প্রয়োজন আছে? একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক।

ধরুন, আপনি আপনার প্রতিবেশীকে বিশ্বাস করেন না এবং আপনার প্রতিবেশীও আপনাকে বিশ্বাস করে না। আপনি সবসময়ই আপনার প্রতিবেশীর তরফ থেকে যেকোন অনাচারের আশংকা করেন এবং আপনার প্রতিবেশীও আপনার তরফ থেকে বিপদের ভয় করে। এমতাবস্থায় মুগুরভাজা শরীর নিয়ে দুজন লোক এসে প্রস্তাব দিল যে, তারা আপনাদের উভয়ের মধ্যে অবস্থান করে আপনাদেরকে নিরাপদে রাখতে রাজী আছে।

তারা উভয়ের ব্যাপারেই নিরপেক্ষ থাকবে এবং কাউকেই অন্যের ক্ষতি করার সুযোগ দিবে না। বিনিময়ে তাদেরকে কিছু সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। আপনারা উভয়েই এ প্রস্তাবে সানন্দে রাজী হয়ে গেলেন এবং উভয়ের মধ্যবর্তী কিছু জায়গা তাদেরকে ছেড়ে দিলেন। কিছুদিন পর দেখা গেল, আপনারা উভয়েই ঐ লোক দুটোর হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন এবং তারা যেভাবে খুশী সেভাবে আপনাদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে।

এই পরিস্থিতিতে আপনি আপনার প্রতিবেশীর সাথে সম্প্রীতি স্থাপনের কথা ভাবতে লাগলেন এবং আপনার প্রতিবেশীও আপনার সাথে সম্প্রীতি স্থাপনের কথা ভাবতে শুরু করল। কিন্তু দেখা গেল, মাঝখানের লোক দুটো কোনভাবেই চায় না যে, আপনাদের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপিত হোক। তারা সম্প্রীতির সকল চেষ্টাই বানচাল করে দিতে শুরু করল।

শেষ পর্যন্ত আপনারা উপলব্ধি করতে পারলেন যে, আপনাদের উভয়ের বড়ো শত্রু হল ঐ বাড়তি লোক দুটো। এবার আপনাদের বিশ্বাস হলো যে, আপনাদের সমস্যা সমাধানে আপনারা নিজেরাই স্বয়ংসম্পূর্ণ, বাড়তি কোন লোকর প্রয়োজন নেই। বাড়তি লোক দুটোর ভূমিকা আপনাদের সমস্যায় কেবলই একটি বাড়তি ‘হস্তক্ষেপ’ মাত্র। আপনাদের নিরাপত্তার মালিক আপনারাই।

আপনাদের উভয়ের মধ্যে একটি ‘আন্তরিক সমঝোতাই’ আপনাদেরকে নিরাপত্তা দিতে পারে। বাড়তি লোকের হাতে নিজেদের নিরাপত্তা তোলে দেওয়ার নাম ‘জিম্মি অবস্থা’। এভাবে নিরাপত্তা অর্জন করা যায় না। এসব উপলব্ধি আপনাদেরকে একটি সমঝোতায় আসতে বাধ্য করল। আপনারা উভয়েই সম্মত হলেন যে, আপনাকে নিজের নিরাপত্তার খাতিরে অন্যের নিরাপত্তার লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকতে হবে।

বাস্তব প্রয়োজনই এভাবে আপনাদেরকে একটি ‘যৌথ অঙ্গীকারে’ আবদ্ধ করল যা একসময় আপনাদের কাছে অসম্ভব মনে হয়েছিল। এই অসম্ভব সম্ভব হয়ে যাওয়ায় আপনাদের আর বাড়তি লোক দুটোর প্রয়োজন হল না। নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারায় ঐ বাড়তি লোক দুটোকে আর কোন সুবিধা দিতে আপনারা উভয়েই অস্বীকার করলেন এবং উভয়ে মিলেই তাদেরকে তাড়িয়ে দিলেন। সরকারকে সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারটাও একইরকম।

পারস্পরিক নিরাপত্তার অঙ্গীকার বা চুক্তিই যদি আমাদের নিরাপত্তার উৎস হয় তাহলে সরকারের কোন প্রয়োজন পড়ে না। যদি সরকার না থাকে আর আপনি যদি কারও গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দেন তাহলে সেও আপনার গালে পাল্টা চড় বসিয়ে দিবে। আর যদি সে দুর্বল হয় তাহলে কি আপনি বেঁচে যাবেন? না, তা নয়। আপনার চেয়ে সবল কেউ এসে আপনার গালে চড় বসিয়ে দিলে আপনি কি করবেন? তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, অত্যন্ত যৌক্তিক কারণেই সবাইকে এই মৎস নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

মৎস নীতি ব্যাপারটা কী? আপনারা দেখবেন, একেবারে ছোট ছোট মাছগুলোকে তাদের চেয়ে বড়ো মাছ এসে টুপ করে খেয়ে ফেলে। সেই বড়ো মাছকে তার চেয়ে বড়ো মাছ এসে টুপ করে খেয়ে ফেলে। আর সবচেয়ে বড়ো মাছটির কী হয়? তাকেও বাগে পেলে অন্য কোন প্রাণী খেয়ে ফেলে। মানুষের যেহেতু মাথা এবং বুদ্ধি আছে সেহেতু তারা নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরে এই মৎস নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য।

‘পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তি’ এবং ‘পারস্পরিক সহায়তা নীতি’ কতোটা স্বাভাবিক এবং কতোটা যৌক্তিক কারণেই অনিবার্য তা বুঝতে নিশ্চয়ই আপনাদের অসুবিধা হচ্ছে না। সরকার নামক একটি বাড়তি উপদ্রব যা কেবল বেইমানী এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মধ্যেই নিমজ্জিত তার হাতে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তোলে দেওয়ার চেয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা ও সহায়তা চুক্তি করে নেওয়াটা কি অনেক বেশী বুদ্ধিমানের কাজ নয়?

তাহলে দেখা গেল, আমাদের নিরাপত্তা আসলে আমাদের হাতেই। অন্য কারও হাতে সেটা তোলে দিলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সরকারের হাতে আমরা যেভাবে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তোলে দেই তাতে আমরা সরকারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ি। নিরাপত্তাবিধানের ক্ষেত্রে একতরফা নীতির কুফল এটা। নিরাপত্তার একতরফা নীতি হল- জনগণের নিরাপত্তা থাকবে সরকারের হাতে কিন্তু সরকারের নিরাপত্তা জনগণের হাতে থাকবে না।

এর ফলে যদি সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বসে তাহলে জনগণের করার কিছু থাকে না। কারণ- জনগণের হাতে ভঙ্গ করার মতো কোন প্রতিশ্রতি নেই; সরকারের নিরাপত্তা জনগণের হাতে থাকে না। সরকারের নিরাপত্তা থাকে সরকারের হাতেই। সরকারী লোকজনের নিজেদের হাতেই নিজেদের নিরাপত্তা থাকায় তারা সংখ্যালঘু হয়েও শক্তিশালী। অন্যদিকে জনগণের নিরাপত্তা নিজেদের হাতে না থাকায় তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও দুর্বল।

সরকারের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের আসল রহস্য এটাই। এখন আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কেন সরকারই সবসময় শক্তিশালী হয়ে থাকে! নিরাপত্তাবিধানের ক্ষেত্রে একতরফা নীতিই এর কারণ। কিন্তু যদি ব্যাপারটা একতরফা না হয়ে দ্বিপক্ষীয় হতো তাহলে কেমন হতো? সেক্ষেত্রে সরকারের কোন ক্ষমতাই থাকত না; সরকারের সকল কর্তৃত্বই লোপ পেয়ে যেতো। কিন্তু এরকম কোন সরকারের অস্তিত্ব সম্ভবই নয়।

কারণ- সরকার মানেই হল: জনগণের চেয়ে এর ক্ষমতা বেশী হবে। জনগণের ওপর সরকারের কর্তৃত্ব থাকবে কিন্তু সরকারের ওপর জনগণের কোন কর্তৃত্ব থাকবে না। পুলিশ, সেনাবাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনীকে সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে, জনগণ নয়। এসব বাহিনীর প্রধান কাজই হবে সরকারকে টিকিয়ে রাখা, জনগণ কিংবা বহিরাগত শক্তির হাত থেকে সরকারকে রক্ষা করা। বিদ্রোহী জনগণের কোন বাহিনীকে সরকার কখনোই মাথা তোলে দাঁড়াতে দেবে না। জনগণের সশস্ত্র অভ্যুত্থানকে সরকার সমসময়ই শক্তি দিয়ে দমন করবে।

যদি এসব শর্তের ওপর কোন সরকার প্রতিষ্ঠিত না থাকে তাহলে সেটাকে আর সরকারই বলা যাবে না। সেটাকে বলতে হবে সামাজিক সংগঠন। ঐ সমাজটিও আর রাজনৈতিক সমাজ থাকবে না। সেটি হয়ে যাবে অরাজনৈতিক সমাজ। সামাজিক প্রয়াসে ‘সামাজিক সংগঠন’ এবং ‘সামাজিক ব্যবস্থাপনা’ দ্বারাই সে সমাজ নিয়ন্ত্রিত হবে। এর প্রতিরক্ষাও নিশ্চিত হবে ‘সামাজিক শক্তি’ দ্বারা।

বিশেষ কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতা এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব তোলে দিয়ে নয়, বরং পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তি এবং পারস্পরিক সহায়তা নীতির ভিত্তিতে সে সমাজ চলবে এবং এর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে। সে সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হবে ‘মিউচুয়াল’ অর্থাৎ যারা নিরাপত্তার কাজ করবে তাদের অস্তিত্বও নির্ভর করবে জনগণের সমর্থনের ওপর। সরকারী কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা সে সমাজে থাকবে না।

আসলে পৃথিবীতে সমাজের উৎপত্তি এবং সামাজিক জীবনের বিকাশ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, মানুষের সমাজ গড়ে ওঠার পেছনে মূল বিষয় হিসেবে কাজ করেছে ‘যৌথ স্বার্থ’ এবং ‘পারস্পরিক সহায়তা’ ও ‘পারস্পরিক নির্ভরশীলতা’। ‘কর্তৃত্ব’ ব্যাপারটা এসেছে অনেক পরে, সমাজ গঠনের জন্য এটা কোন অনিবার্য শর্ত নয়। এটা হল মানুষের সমাজে একটি ‘বাড়তি সংযোজন’।

মানুষকে তাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই সমাজ গড়ে তোলতে হয়েছে। যেসব যৌথ প্রয়োজন এবং স্বার্থে মানুষ সমাজের জন্ম দিয়েছে সেগুলো পূরণের জন্য সরকারের অস্তিত্ব মোটেও জরুরি নয়। যদি সরকার না-ও থাকে, মানুষ যেসব প্রয়োজনে সমাজ গড়ে তোলেছিল সেসব প্রয়োজনেই সমাজকে টিকিয়ে রাখবে। যদি আপনি মনে করেন, সমাজ থেকে সরকারী কর্তৃত্ব দূর হলে সমাজ ভেঙ্গে পড়বে তাহলে আপনি এস্কিমো ও বেদূইনদের সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখুন।

ওদের সমাজে তো সরকার নেই। তাহলে ওদের সমাজ ভেঙ্গে পড়ছে না কেন? সারা দুনিয়াজুড়ে অসংখ্য আদিবাসী, পাহাড়ী, মরুবাসী, বিচ্ছিন্ন দ্বীপবাসী এবং এশিয়া ও আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলজুড়ে বসবাসকারী গ্রামীন সমাজগুলো- যাদের মধ্যে সরকারের অস্তিত্ব খুবই দুর্বল কিংবা প্রায় নেই বললেই চলে- তাদের সমাজগুলো ভেঙ্গে পড়ছে না কেন? কৃষিকাজ, আয়-অর্থনীতি, বিচার, লেনদেন, কলহ নিষ্পত্তি- সবকিছুই তো তাদের সমাজে আছে। সরকার ছাড়াই এতকিছু কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা একবার ভেবে দেখুন।

হ্যাঁ, আপনার কাছে মনে হতে পারে এসব সমাজ তো খুবই অনুন্নত। কিন্তু এই অনুন্নত হওয়াটা কারণটা তো মোটেই সরকারের অনুপস্থিতি নয়। আপনি যদি সমাজ সম্পর্কে নূন্যতমও ধারণা রাখেন তাহলে বুঝতে পারবেন যে, তাদের অনুন্নতির কারণটা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নয়। ঐ সমাজগুলোতে সরকার ও রাজনীতি চাপিয়ে দেওয়ার অর্থ হবে তাদের মাথায় একটি বাড়তি অপচয় ও শোষণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। উন্নতির জন্য তাদের প্রয়োজন হল- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া, উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও সুসংগঠিত করা।

যেসব সমাজে সরকারের অস্তিত্ব দূর্বল কিংবা সরকারের উপস্থিতি নেই সেসব সমাজেও মানুষ নিজেদের প্রয়োজনেই বিচার ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এসব বিচার ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুন্নত হলেও এটুকু প্রমাণের জন্য যথেষ্ট যে, যেখানেই সমাজ থাকবে সেখানেই বিচার ও নিরাপত্তা থাকবে, এর জন্য সরকার গঠনের কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

আপনি আপনার সারা জীবনের অভিজ্ঞতা জড়ো করলে দেখতে পাবেন যে, মানুষ তাদের বাস্তব প্রয়োজনেই সমাজের সাথে এমনভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলে যাতে সমাজের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সহায়তা পাওয়া যায়। সরকার থাকুক বা না থাকুক, সমাজের সকল মানুষ সবসময়ই সামাজিক সম্পর্কের জালে আবদ্ধ থাকে। এই সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেই পারস্পরিক সহায়তা ও নিরাপত্তা নিহিত।

সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠে মানুষের বাস্তব প্রয়োজনে। মানুষ তাদের বস্তুগত এবং মনোজাগতিক প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলে। সরকার সেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসে। সরকার সমাজ সৃষ্টি করেনি, সমাজ সৃষ্টি হওয়ার বহু পরেই সরকারের সৃষ্টি হয়েছে। সমাজ ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠে মানুষের প্রয়োজন ও স্বাধীন ইচ্ছার ভিত্তিতে। অন্যদিকে সরকার বা রাষ্ট্র গড়ে ওঠে সমাজে জোর-জুলুম, ক্ষমতা ও শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

সরকারবিহীন সমাজের সাথে সরকার নিয়ন্ত্রিত সমাজের একটি মৌলিক পার্থক্য হলো, সমাজের বাস্তব প্রয়োজনে জন্ম নেওয়া ব্যবস্থাপনা দ্বারাই সরকারবিহীন সমাজ পরিচালিত হবে, সমাজকে পরিচালনার জন্য কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা তোলে দেওয়া হবে না। আরও দশটি বিষয়ের মতোই বিচারকাজ ও অপরাধ দূরীকরণের কাজটিও সরকারবিহীন সমাজের স্বাধীন ব্যবস্থাপনা দ্বারাই নিশ্চিত করা সম্ভব।

যদি আপনি সরকারবিহীন সমাজের মানুষের ওপর ভরসা না করেন একারণেই যে, তাদের ওপর কোন কর্তৃত্ব ও খবরদারী না থাকায় তারা অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে তাহলে তো বর্তমান সরকারের ওপরেও আপনার ভরসা থাকার কথা নয়। সরকার বলতে তো কিছু মানুষকেই বোঝায়। সেই ক্ষমতাবান মানুষগুলোর ওপরে তো কর্তৃত্ব ও খবরদারী করার কেউ নেই। এদের ওপর কীভাবে আপনি ভরসা রাখতে পারেন?

এবার আপনি ভেবেচিন্তে বলুন তো, মানুষের হাতে ক্ষমতা না থাকলে তার অপরাধী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী নাকি হাতে ক্ষমতা থাকলে তার অপরাধী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে? অপরাধ করেও পার পেয়ে যায় কারা? ক্ষমতাবানরা নাকি ক্ষমতাহীনরা? এবার আপনি বলুন তো, সরকারবিহীন সমাজ অর্থাৎ যে সমাজের মানুষের হাতে কোনরূপ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকবে না সে সমাজের অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার ভয় কি আপনি এখনও করেন?

সরকারবিহীন সমাজের বিচারব্যবস্থা নিয়ে যদি আপনার সংশয় থাকে তাহলে বর্তমান সমাজের বিচারব্যবস্থা নিয়ে কি আপনার দ্বিগুণ সংশয় থাকা উচিত নয়? আপনি যদি সরকারবিহীন সমাজের কর্তৃত্বহীন মানুষের তরফ থেকে অপরাধের ভয় করেন তাহলে বর্তমান সমাজের ক্ষমতাবানদের তরফ থেকে কি আরও বেশী অপরাধের ভয় করা উচিত নয়?

যদি আপনি প্রশ্ন তোলেন যে, সরকারবিহীন সমাজের বিচারব্যবস্থা আপনাকে অপরাধীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে কি না তাহলে বর্তমান সমাজ নিয়েও প্রশ্ন তুলুন যে, এই সমাজের বিচারব্যবস্থা আপনাকে ক্ষমতাবানদের অপরাধ থেকে রক্ষা করতে পারবে কিনা। যদি আপনি সরকারবিহীন সমাজের ব্যাপারে নিশ্চয়তা দাবী করেন তাহলে আপনি বর্তমান সমাজের কাছ থেকেও নিশ্চয়তা দাবী করুন। বর্তমান সমাজ কি আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারবে যে, এই সমাজের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত সরকার কখনও দুর্নীতিবাজ ও অত্যাচারী হয়ে উঠবে না?

সরকারবিহীন সমাজে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের হাতে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তোলে দেওয়া হবে না। সে সমাজের একজন কর্তৃত্ববিহীন মানুষ যদি কোন অপরাধ করেও বসে তাহলে কি সেটা খুব বড় অপরাধের পর্যায়ে যেতে পারবে? হাতে ক্ষমতা না থাকলে একজন মানুষ কতটুকু অপরাধ করতে পারে? সরকারবিহীন সমাজের অপরাধের মাত্রা কি বেশ সঙ্গত কারণেই সীমিত হয়ে পড়ে না?

বর্তমান সমাজে যেভাবে মানুষের হাতে বিপুল ক্ষমতা তোলে দেওয়া হচ্ছে তাতে কি বড় বড় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে না? হাতে বিপুল ক্ষমতা না থাকলে কি কেউ ধরাকে সরা জ্ঞান করে? হাতে ক্ষমতা থাকায় বর্তমান সমাজের অনেকেই বড় ধরণের অপরাধ ও দুর্নীতি করেও রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে ধরার কেউ নেই। বর্তমান সমাজে কি এই মৎস নীতিই চলছে না? আমাদের কি বর্তমান সমাজ নিয়েই সবচেয়ে বেশী শঙ্কিত থাকার কথা নয়?

বর্তমান সমাজে কর্তৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেকেই বলেন যে, সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও অপরাধ দমনের জন্য কিছু মানুষকে ক্ষমতায় বসানো আবশ্যক। কিন্তু এ ধরণের যুক্তি যে কতোটা অসার ও খোঁড়া তা একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই আপনি পেয়ে যাবেন। সমাজের মানুষকে অপরাধ থেকে নিরস্ত করার জন্য যদি ক্ষমতাবান পাহারাদার গোষ্ঠী নিযুক্ত করতে হয় তাহলে সেই পাহারাদার গোষ্ঠীর ওপরেও তো পাহারা বসাতে হবে। কারণ- তারাও তো মানুষ এবং ক্ষমতায় বসে তারাও তো অপরাধ করতে পারে।

কিন্তু বর্তমান সমাজে পাহারাদারদের ওপরে পাহারাদারীর কেউ নেই। তাই তারা ভয়ানক বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। একটা বিষয় মনে রাখবেন, চোরের ভয়ে যদি আপনি ডাকাতকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসেন তাহলে আপনার বাড়িটাই বেদখল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপনার বাড়িতে চুরি হলে বাড়িটা অন্ততঃ বেঁচে যাবে। তাই ডাকাতকে ডেকে আনার চেয়ে অরক্ষিত থাকাই ভালো। ডাকাত দিয়ে প্রতিরক্ষা হয় না।

এই সহজ উপমাটা আপনাকে এটা বুঝতে সাহায্য করবে যে, সরকারবিহীন সমাজ নিয়ে আপনার মনে যতোই অনিশ্চয়তা থাকুক- বর্তমান সমাজের চেয়ে খারাপ কিছু ঘটার সম্ভাবনা সে সমাজে নেই। এই প্রবন্ধের প্রথম দিকে বিভিন্ন মহাদেশে ইউরোপীয় সরকারগুলোর আগ্রাসনের যে নামমাত্র উল্লেখ করা হয়েছে তা যদি বিস্তারিতভাবে আপনার সামনে তোলে ধরা হয় তাহলে আপনি সহজেই স্বীকার করবেন যে, সরকার ছাড়া এতো ভয়ংকর অপরাধ কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

এতক্ষণে আপনি হয়তো অনুধাবন করতে পেরেছেন যে, সমাজ থেকে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দূর হলে অপরাধও দূর হয়ে যাবে। বৃহৎ অপরাধ সরকারের হাতেই সংঘটিত হয়। সরকারকে বিশ্বাস করার অর্থ হল, সমাজকে অবিশ্বাস করা। আর সমাজকে অবিশ্বাস করার অর্থ হল নিজেই নিজেকে অবিশ্বাস করা। আপনিই সমাজ, আপনারা মিলেই সমাজ। সরকারের হাতেই সমাজ সবচেয়ে বেশী অরক্ষিত।

সরকারবিহীন সমাজকে নিয়ে সন্দেহ ও আশংকার মানে হল, নিজেই নিজেকে নিয়ে সন্দেহ ও আশংকা করা। তার চেয়ে বরং সরকারকে নিয়েই আশংকা করুন। সরকার মানেই হল ধোঁকাবাজ, লুটেরা ও নিপীড়ক শক্তি। তাই সরকারের হাতে ক্ষমতা তোলে দেওয়ার আগে একবার ভাবুন যে, আমরা এর হাতে কতোটা নিরাপদ। আসুন, কর্তৃত্ববিহীন সমাজের ক্ষমতাবিহীন মানুষকে নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার আগে ক্ষমতাবান ও বেপরোয়া সরকারকে নিয়ে শঙ্কিত হই।

0 Comments
Loading...