রুডলফ রকারের এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমঃ তত্ত্ব ও অনুশীলন ( প্রথম অধ্যায়)

প্রথম আধ্যায়ঃ এনার্কিজম বা নিরাজবাদ- উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ হলো আমাদের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ন বুদ্বিবৃত্তিক রাজনৈতিক চিন্তার শ্রুতধারা, যা তাঁর অনুসারীদের মধ্যে  অর্থনৈতিক একচাটিয়াবাদ, রাজনৈতিক এবং সামাজিক নিপিড়ন মূলক প্রতিস্টানের বিলয় ঘটিয়ে দিতে চায়। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি ‘মুক্তসমিতির ফেডারেশনের’ মাধ্যমে সকল প্রকার উৎপাদন পদ্বতি পরিচালনা করতে চায়, যার লক্ষ্যই হবে সমাজের প্রতিটি সদস্যের চাহিদা মেটানো, তা কোন ভাবেই প্রচলিত সমাজের স্বল্প সংখ্যক মানুষের সুবিধা ভোগ ও নিয়ন্ত্রন চলতে দিবে না। প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে প্রানহীন যান্ত্রিক আমলতন্ত্র চলছে তার পরিবর্তে  স্বাধীন, মুক্ত ও প্রাণবন্ত মানুষের সংস্থা গড়ে তুলবে, তবে সকলে সকলের সাথে সামাজিক ও অর্থনৈতি স্বার্থে পারস্পরিক বন্দ্বনে আবদ্ব থাকবে, এবং স্ব স্ব কর্ম সম্পাদনের জন্য তাঁরা স্বাধীন ও স্বেচ্ছাকৃত চুক্তির আওতায় জীবন যাপনে অভ্যস্থ হয়ে উঠবেন।

প্রচলিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি গভীর ভাবে অধ্যয়ন করলে এটা পরিস্কার হয়ে উঠে যে, নিরাজবাদ কোন কল্পনা বিলাশী চিন্তক সংস্কারবাদির ধারনা নয় বা আলস চিন্তার ফসল নয়। এটা হলো সম্পূর্ন যুক্তিভিত্তিক বাস্তব সম্মত ও প্রয়োগ যোগ্য একটি জীবন ব্যবস্থার নাম। যা মানব সমাজকে একটি নয়া ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাবে। সমাজকে সামগ্রীক ভাবে উন্নিত করবে অন্য এক নয়া স্তরে। প্রচলিত একচাটিয়াবাদ, পুঁজিবাদ, এবং কর্তৃত্ববাদি রাষ্ট্র ব্যবস্থা মানুষের জন্য কেবল দুঃখ আর যন্ত্রনাই ডেকে আনছে। মানুষের কষ্ট লাগবে তেমন কোন ভূমিকাই রাখতে পারছে না । যুদ্ব, খুন আর রক্তপাত নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে আছে।

বর্তমান অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থায় মাত্র কিছু মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। স্বল্প সঙ্খ্যার সুবিধা ভোগী মানুষেরা ক্রমাগত ভাবে সাধারন মানুষকে নিঃস্ব থেকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। ফলে মানুষের মাঝে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিদ্রোহের সৃষ্টি হলে, তাঁরা তা নানা কৌশল অবলম্বন ও শক্তি ব্যবহার করে তাদেরকে দমিয়ে রাখার প্রায়স চালায় । এই ব্যবস্থা সামাজিক স্বার্থকে ব্যাক্তি স্বার্থের নিকট বলি দিয়ে দেয়, তা ও করে একটি বিশেষ আইনী কাঠামোর ভেতর দিয়ে। এরা মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ককে উপেক্ষা করে । মানুষ ভুলে যাচ্ছে যে, শিল্পকারখানা কোন চূড়ান্ত বিষয় নয়, জীবনের শেষ পাওয়া ও নয় বরং এটা হলো মানুষের সুন্দর জীবন যাপনের একটি উপায় মাত্র, মানুষকে একটি উন্নত সংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করতে হবে। প্রচলিত ভাবনা মানুষকে আবিস্ট করে রেখেছে এমন ভাবে যে, তাঁরা ভাবতে শুরু করেছে, মানুষ কিছুই নয় শিল্প কারখানাই সব কিছু,  ফলে একটি নির্দয়, নিস্টুর, দয়া, মায়াহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আর রাজনৈতিক পরিবেশ ও সেই ধারায় আবর্তিত হয়ে চলেছে। এই গুলো পরাস্পরিক সমন্বয়ে পরিচালিত হয় এবং একেই বৃত্তে আবর্তিত হয়।

অর্থনৈতিক একচাটিয়াবাদ  কায়েম করে একনাকত্ব আর রাজনৈতিক একনাকত্ব ডেকে আনে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার। উভয়ই সামাজিক উদ্দেশ্যে প্রবৃদ্বি ঘটিয়ে থাকে, এই উভয় উপাদান সমূহ ই সামাজিক ভাবে জীবন কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনার বিপরিতে যান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করে থাকে। ছন্দপতন ঘটায় মানবিক জীবনের।  আধুনিক সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিটি দেশের সমাজ ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে, নানা ভাবে সামাজিক অসন্তোষ ও বিদ্রোহের, ক্ষোভ ও বিক্ষোভের জন্ম দিয়ে চলেছে, সমাজের চলমান সাংস্কৃতিক কাঠামোকে ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলেছে; আমাদের জাতীয় ও সামাজিক জীবনে নানা প্রকার সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ ঘটাচ্ছে। আমাদের হাজার বছরের লালিত  সম্প্রীতির পরিবেশ  ধ্বংস করে দিয়েছে। বিগত বিশ্ব যুদ্বের পর থেকে রাজনৈতিক শক্তি সমূহের মাঝে চলছে হানাহানি, দুনিয়া জুড়ে চলছে একপ্রকার মরন লড়াই, তা প্রায় সকল মানুষকেই কোন না কোন ভাবে প্রভাবিত করছে, এই ধরনের নিস্ফল অনন্ত লড়াই ও যুদ্বের সত্যিকার কোন যুক্তি নেই, যা আমাদেরকে এক প্রকার অপ্রত্যাশিত মহা দুর্যোগের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যদি সামাজিক কোন উন্নয়ন প্রক্রিয়ার উদ্যোগ গ্রহন করা না হয় তবে এই অবস্থার অবসান হবার কোন লক্ষন দেখা যাচ্ছে না । এই পরিস্থিতির কারনে কোন কোন দেশে সামরিক ব্যয় ৮০% থেকে ১০০%+ বাজেট বৃদ্বি করে চলেছে। সামরিক প্রতিরক্ষার নামে বিপুল খরচ করার কারনে যেমন বাড়ছে জাতীয় ঋনের বোঁঝা অন্য দিকে সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছে দেশের সাধারন মানুষ।

প্রানহীন ও যান্ত্রিক আমলাতন্ত্র মানুষের জীবন যাত্রা সহজী করনের পরিবর্তে সামাজিক জীবনে বিভক্তি সৃষ্টি করছে, এরা পারস্পরিক সহযোগীতার ক্ষেত্রকে দুষিত করে দিয়েছে, ফলে সামাজিক উন্নয়নের নয়া পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না । প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতিটি পদক্ষেপ এমন যে, এটা মানুষের মাঝে বিরাজমান পারস্পরিক কল্যাণ কামিতার মনোভাবকে তিরোহিত করে সামাজিক বন্দ্বনকে নষ্ট করে দেয়, এবং এক শ্রেনীর লোক এই সুযোগে ক্ষমতার লোভ লালসাকে চরিতার্থ করতে অর্থ সম্পদ ও  ঐতিহ্যকে স্বীয় স্বার্থ উদ্দারের লড়াইয়ে পরস্পরের বিরুদ্বে ব্যবহার করছে। এই ব্যবস্থাটি অনেক ক্ষেত্রেই শান্তির পথ হিসাবে তথাকথিত বড় বড় বুদ্বিজীবীগন আজ কাল দেখাতে চাইছেন, অথচ এটা হলো এক ধনের আধুনিক ফ্যাসিবাদ, সামাজিক ক্ষমতা কাঠামোকে অবদমন করে নিজেদের নিরংকুশ রাজত্ব কায়েম করে রাষ্ট্রের নামে সকল ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রন বজায় রাখতে চায়। এটা অনেকটা ধর্মীয় ভাবধারার মত, সেখানে বলা হয় সকল কিছুর নিয়ন্ত্রন ইশ্বরের আর এখানে বলা হয় সকল প্রকার নিয়ন্ত্রন রাষ্ট্রের নিকট, মানুষ কিছু নয়; কিছুই করার ক্ষমতা নেই মানুষের। যা ঘটে সবই হয় “প্রভুর ইচ্ছায়”। আর আজ বলায় হচ্ছে যা ঘটে তা হয় “রাষ্ট্রের ইচ্ছায়”। আদতে এই সকল ব্যাখ্যা সম্পূর্ন ভাবে এক শ্রেনীর কায়েমী স্বার্থবাদি চক্রের ব্যাখ্যা । এই ধরনের ব্যাখ্যা  সত্যিকার জ্ঞানকান্ড থেকে বহু দূরে অবস্থিত।

এনার্কিস্ট বা নিরাজবাদি ধারনার ইতিহাস বেশ দির্ঘ, তবে তা এখনো নানা ভাবে মাঠ পর্যায়ে গবেষণার দাবী রাখে। আমরা এখানে চিনের প্রখ্যাত চিন্তক লাওতসের কথা বলতে পারি, এবং তাঁর পরবর্তীতে গ্রীক দার্শনি হেডনিস্ট এবং সিননিক্স যারা “প্রাকৃতিক অধিকার” নিয়ে কথা বলেছেন, তাঁরা জেনুতে প্ল্যাতোর পাশাপাশি স্টোইক স্কুল প্রতিস্টা করেছেন। তাঁরা সেখানে আলেকজান্দ্রীয়াতে  নোইস্টিক ও কারপোক্রেটের শিক্ষায় অভিষিক্ত হয়ে প্রচারনা কালে ফ্রান্স, জার্মানী,হল্যান্ড প্রভৃতি দেশে মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান যাজকদের নিপিড়নের শিকার হন। বোহেমিয়ানদের সংস্কার আন্দোলন কালে ও তাঁরা পিটার চিল্কির চিন্তার সাথে পরিচিত হন, যার কাজের ও চিন্তার ক্ষেত্র ছিলো, “বিশ্বাসের মানবিক সম্পর্কের বুনন” তাঁদের সাথেও চার্চ ও রাষ্ট্রের কর্তা লোকেরা একেই ব্যবহার করেছে। লিও টলস্টয়ের সাথে ও একেই আচরন করেচিলো  সেই মুর্খ চক্র । মহান মানবতাবাদিদের মধ্যে একজন ছিলেন রেবেলিস, তিনি সুখি জীবন যাপনের জন্য  তেলেমে হেপী এব্বে তে যে  বর্ননা দিয়েছিলেন, যার মুল কথা ছিলো সকল প্রকার  কর্তৃত্বতান্ত্রিকতা থেকে মানুষের মুক্তি চাই। উদারবাদী ভাবধারার অন্য অগ্রগামীদের মধ্যে আমরা এখানে কেবলমাত্র লা বোয়েটি, সিলভাইন মারেচ, এবং সর্বোপরি, ডিডরোটের কথা উল্লেখ করব, যার প্রখ্যাত গ্রন্থগুলির মধ্যে সত্যিকারের একটি  মহান  কথা নিবিড়ভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে, তা হলো, কোন কর্তৃত্ববাদীই নিপিড়ন মুলক কার্যক্রম  থেকে মুক্ত ছিল না ।

এদিকে, সাম্প্রতিক কালে নিরাজবাদি ধারনা সামাজিক বিবর্তনের ধারায় প্রয়োগ করার জন্য চিন্তাশীল সমাজবাদিদের মধ্যে প্রকট হচ্ছে। ১৭৯৩ সাল, লন্ডনে, এই ধরনের কিছু  ভালো উদ্যোগ লক্ষ্য করা গেছে উইলিয়াম গডউইনের কাজে, রাজনৈতিক ন্যায় বিচার, সামাজিক মানুষের শান্তির বিষয় গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। আমরা বলতে পারি, গডউইনের কাজ ছিল, এটা দেখানো যে, ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক চরমপন্থার ধারণাগুলির যে দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস যার ফল শ্রুতিতে এই ধারনার উন্মেষ হয়েছে।  যা রিচার্ড হুকার, জেরার্ড উইনস্টিনলি, অ্যালগরনন সিডনি, জন লকে, রবার্ট ওয়ালেস, এবং জন বেলার্স থেকে জেরেমি বেন্টহাম, জোসেফ প্রিস্ট্লি, রিচার্ড প্রাইস, এবং টমাস পেইন প্রমুখ সকলেই একমত ছিলেন। গডউইন খুবই সাহসীকতার সাথে মতামত দিয়েছিলেন   যে, সামাজিক শয়তানীর কারণটি “রাষ্ট্রের আকারে নয়, বরং তার অস্তিত্বের মধ্যে অনুসন্ধান করতে হবে”। ঠিক যেমন রাষ্ট্র প্রকৃত সমাজের একটি নক্সা প্রদর্শন করে, তেমনি এটি মানুষকে তাদের অনন্ত অভিভাবকত্বের অধীনে রাখে, যা তাদের প্রকৃত আত্মার নিছক কণ্ঠস্বর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করে  এবং তাদের স্বাভাবিক প্রবণতাগুলি দমন করে ও তাদের কাজে এমন জিনিসগুলি ধারণ করে যা প্রতিহিংসামূলক নয় বরং ইহা তাদের অভ্যন্তরীণ প্রেরনা । শুধু এই ভাবেই ভালো নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলার জন্য মানুষকে একটি ছাঁচে ফেলা দরকার। যখন কোন সাধারন মানুষকে কোন প্রকার বাঁধা বিপত্তিতে ফেলা হয় না, বা বাঁধা প্রাপ্ত করা হয় না, সে যখন স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে পারে, তখন তাঁর স্বাভাবিক বিকাশ ঘটে। গডউইন দেখিয়েছেন, মানুষ কেবল সম্মিলিত ভাবে সামাজিক জীবন যাপন করতে পারে, যদি তাঁর উপর কোণ প্রকার কর্তৃত্ববাদ বা অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রন আরোপ করা না হয় । যতক্ষন পর্যন্ত তাকে প্রজা বানিয়ে শোষন করা না হয় ততক্ষন সে স্বাধীন ও মুক্ত জীবন যাপন করে। কোন প্রকার চরম পন্থার দিকে প্রায়স অগ্রসর হয় না ।   তাই আমরা প্রস্তাব করি রাষ্ট্র যত বেশী প্রভাব বিস্তার করা থেকে বিরত থাকবে ততই মঙ্গল হয় নাগরিক সমাজের। গডউইনের মতবাদই হলো, রাষ্ট্রবিহীন সমাজ এবং সকল প্রকৃতিক সমপদের উপর সমাজের মালিকানা কয়েম করা, এবং অর্থনৈতিক জীবন যাপনে সম্মিলিত উৎপাদন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা; এই অর্থে গডউইনকে সমাজতান্ত্রিক নিরাজবাদের জনক বলা যায়। গডউইনের কর্মের শক্তিশালী প্রভাব পড়েছিলো ইংরেজ শ্রমজিবী মানুষ ও তাঁদের উদার পন্থী বুদ্বিজীবী মহলে। তাঁর বড় অবদান হলো, তিনি ইংলিশ সমাজে তরুন সমাজের মাঝে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা করতে পেরেছিলেন। সেই আন্দোলনে যারা বিশেষ ভূমিকা রাখেন তাঁরা হলেন, রবার্ট ওয়েন, জন গেরী, এবং উইলিয়াম থমচন, যাদের মাঝে মুক্তিবাদি একটি চেতনা বিরাজ করত, যা আমরা জার্মানী বা অন্যান্য দেশে দেখতে পাইনা ।

তবে, নিরাজবাদ বা এনার্কিজম বিনির্মানের ক্ষেত্রে পেরী জুসেফ প্রুদ র প্রভাব ও ছিলো ব্যাপক হারে সমগ্র ইউরূপ জোড়ে, তিনিবুদ্বি বৃত্তিক জগতে আধুনিক সমাজতন্ত্রকে অধিকতর শক্তিশালী করে গেছেন। প্রুদোয়ান চিন্তার প্রতিফলন আমরা সেই সময়ে দেখতে পাই বুদ্বিজীবী ও সামজিক জীবনে, তিনি সকল সামাজিক জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়ে দিয়ে এই মতবাদকে পরিপূর্নতা দানে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। তাই, তাঁর মূল্যায়ন করতে হলে, তাঁর অগনিত অনুসারীদের দিকে নজর দিতে হবে, যারা তাঁর সমসাময়িক ছিলেন। তাঁর অগনিত সমাজবাদি অনুসারী চিন্তকগন তাঁর প্রচন্ড অনুরাগী ছিলেন, তাঁরা সকলেই বুঝতে পারতেন যে, সমাজটি অসম বা ভুলভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তাঁরা তাঁদের দৃষ্টি ভঙ্গীকে প্রসারিত করে একটি নয়া সমাজের স্বপ্ন ও দেখছিলেন। তিনি প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার প্রতিটি অসংগতি নিয়ে খোলাখুলি সমালোচনা করছিলেন। তিনি দেখাচ্ছিলেন, সামাজিক বিবর্তন সমাজের ভেতর থেকেই উত্থিত হচ্ছে যা আমাদের জীবন যাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে, আমাদেরকে একটি উন্নত সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে টেনে নিয়ে যাবে, সেটা কোন কল্পলোকের বিষয় নয়, সেটা বাস্তব সম্মত ও জীবন ধর্মী বিষয়। চিন্তক প্রুদু জ্যাকবিনদের ঐতিহ্যের বিরুধীতা করছিলেন। সেই সময়ে ফ্রান্সের সমাজবাদি ভাবনার জগতে তা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চলছিলো। যার আলোচ্য বিষয়ই ছিলো কেন্দ্রীয় সরকার ও একচাটিয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক সামাজিক প্রগতি। তিনি বলছিলেন সমাজকে মুক্ত করতে চাইলে সমাজের ভেতরে বেড়ে উঠা  দুটি ক্যানসার কেটে বাদ দিতে হবে- উনবিংশ শতাব্দির বিপ্লবের জন্য তা অতিব জরুরী বিষয়। প্রুদু কমিউনিস্ট ছিলেন না।

তিনি ব্যাক্তিগত সম্পত্তির নিন্দা করতেন, তিনি বলতেন এটা শোষণের হাতিয়ার। তিনি সকল উৎপাদন ব্যবস্থার ও যন্ত্রপাতির মালিকানার শ্রমিকদের জন্য দাবী করেছিলেন। তিনি বলতেন শিল্প কারখানার মালিকানা থাকবে তাঁদের নিকট এরা স্বেচ্ছাকৃত চুক্তির মাধম্যে তা পরিচালনা করবে। কেউ কাউকে শোষণ বা বঞ্চনা করার সুযোগই পাবে না । সকল ক্ষেত্রে মানবিক মার্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের সংস্থা সমূহে সাম্য সমাতা বিরাজমান থাকবে, সকলেই সমান অধিকার, সমসেবা উপভোগ করবেন। কোন পন্যের মূল্য নির্ধারনের জন্য তাঁর উৎপাদন সময়কে বিবেচনায় নেয়া হবে এবং তা বিনিময়ের ক্ষেত্রে ও তা বিবেচ্য হবে। পুঁজি নানা ভাবে মানুষকে শোষণ করে, তাই,  কর্ম সময়কে মূল্যায়ন করা হবে- এই প্রক্রিয়ায় তাঁর লাগাম টানা হবে। এই প্রক্রিয়া সকল জায়গায় শোষন যন্ত্রের উচ্ছেদ চলবে।  প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রাজনৈতিক নিপীড়ন কে উৎসাহিত  করছে। আমাদের সমাজ হবে নানা জাতি গৌস্টির একটি স্বাধীন সম্মিলিত মহাজোট তাঁরা তাঁদের প্রয়োজন ও চাহিদার আলোকে উৎপাদন সহ সকল কিছুর পরিকল্পনা গ্রহন করবে। তাঁরা তাঁদের নিরাপত্তা  নিশ্চিত করবে ও নিজেদের দ্বন্দ্ব নিজেরাই মিটিয়ে নিবে। “ সমাজে স্বাধীন সামাজিক ব্যবসা থাকবে যা সমাজের জন্য ই ভালো হবে”। প্রুদু ফেডারেশনের আওতাভুক্ত সংগঠন সমূহের কর্ম কান্ডকে আগামী বিশ্বের জীবন ধারা হিসাবে দেখেছেন। সেখানে তিনি ব্যাক্তি মানুষের উন্নত একটি স্বাধীন পরিবেশ চিন্তা করেছে। তিনি উন্নয়নের জন্য সুনির্দিস্ট কোন সীমা ঠিক করেন নাই। তিনি বরং সমাজ ও ব্যাক্তির কাজের উন্নয়নের জন্য বৃহত্তর পরিশরের কথা বলেছেন। তিনি ফেডারেশনের ধারনার উন্মেষ ঘটান, একেই ভাবে রাজনৈতিক ঐক্য ও জাতীয়তাবাদের উত্থানে ভূমিকা রাখেন, সেই সময়ে জাতীয়তাবাদের বিকাশে ম্যাজ্জিনি, গ্যারিবালদি, লেলুয়েল এবং অন্যান চিন্তকগন ও কাজ করেন। এই পরিস্থিতিতে তিনি তাঁর সমসাময়িকদের চেয়ে স্পস্ট দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন। প্রুদ সমাজবাদের উন্নয়ন ও বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। তাঁর অবদানে ল্যাতিন আমেরিকার লোকেরা বেশী আলোকিত হয়েছিলেন। কিন্তু তথাকথিত ব্যাক্তিবাদি নৈররাজ্যবাদি, যাদের আমেরিকায় উন্মেষ ঘটেছিলো যেমন, জয়েস ওয়ার্ন, স্টিফেন পিয়ারেল এন্ড্রো, ইউলিয়াম বি, গ্রীন, লিসেন্ডার স্পুনার, ফ্রান্সিস ডি, টেন্ডি এবং বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য ব্যাঞ্জামিন আর, ট্যাকার প্রমুখ একই ধারার লোক। তাঁদের কেহই প্রুদর চিন্তাধারা সাথে একমত হন নাই।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ একটি ব্যাতিক্রম ধর্মী ধারনা পায় ম্যাক্স ট্রেইনেরর নিকট থেকে(জন ক্যাস্পার স্মিথ) ও তাঁর গ্রন্থ সমূহ অধ্যয়ন করে। তাঁর গ্রন্থ  ডার এইঞ্জি এন্ড সিন এইজেন্টাম ( দি এগো এন্ড হিজ উওন) প্রকাশিত হবার পর তা তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি, বরং অল্প সময়ের মধ্যেই তা হারিয়ে যায়, নিরাজবাদি আন্দোলনে ও কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি, কিন্ত মজার বিষয় হলো এই বইটি অপ্রত্যাশিত ভাবে প্রায়  পঞ্চাশ বছর পর পুনঃ জীবন লাভ করে এবং সর্বত্র সাড়া ফেলে দেয়। স্টেইনারের এই বইটি ছিলো প্রথমিক ভাবে একটি দার্শনিক কাজ। এই কাজের মাধ্যমে তিনি দেখান যে, মানুষ প্রায় ৫০ ধরনের উচ্চতর জিনিষের উপর নির্ভরশীল, সে তাঁর পক্ষে যুক্তি তর্ক দিয়ে কথা বলতে ও দ্বিধা করেনা। এই গ্রন্থটি একটি সচেতনতা মূলক গ্রন্থ যা মানুষকে বিদ্রোহী করতে তুলতে পারে, সমজদার পাঠক যে কোন কর্তৃপক্ষকে অস্বীকার করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়, তবে এই গ্রন্থ মানুষকে স্বাধীন চিন্তা ভাবনা করার জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ মাইকেল বাকুনিনের বিপ্লবী চিন্তা চেতনা ও উদ্যোগ থেকে এগিয়ে যাবার প্রেরনা পায়, তিনি প্রুদুর নিকট থেকে যে শিক্ষা পেয়েছিলেন তা ছিল তাঁর কাজের ভিত্তি, তিনি তা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সম্প্রসারিত করেন, প্রথম আন্তর্জাতিকের মধ্যে যারা যৌথতাবাদি ছিলেন তাঁরা ও তাঁর সাথে যুক্ত হন, তাঁদের বক্তব্য ছিলো, ভূমি সহ সকল উৎপাদন উপায়ের উপর সামস্টিক মালিকানা কড়াকড়ি ভাবে কায়েমের জন্য জোর দিতে হবে, অন্যদিকে ব্যাক্তি মালিকানা সীমীত করে দিয়ে নিজের শ্রমের ফল নিজেই যেন ভোগ করতে পারে তাঁর ব্যবস্থা করতে হবে। বাকুনিন কমিউনিজমের বিরুদ্বে অবস্থান নেন, সেই সময়ে কমিউনিজম মানেই ছিলো প্রচন্ড কর্তৃত্ববাদি ব্যবস্থার নাম, যা পরবর্তীতে বলশেভিকবাদ রূপে রাশিয়া সহ নানা দেশে প্রকাশিত হয়। মাইকেল বাকুনিন বার্নে ১৯৬৮ সালে অনুস্টিত শান্তি ও স্বাধীনতা নামক বক্তব্যে বলেন, “ আমি কমিউনিস্ট নই, কারন কমিউনিজম সকল সামাজিক শক্তিকে রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে চাইছে; এই প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের নিকট সকল সম্পদ পুঞ্জীভূত করে দিবে, আমি  চাই সকল রাষ্ট্রের বিলয়, সকল কর্তৃত্ববাদের অবসান, সরকারের মাতুব্বরী বন্দ্ব করতে- এই সব মানুষের নৈতিক শক্তি ও সভ্যতাকে বিনাশ করছে এবং সকলকে দাসত্বে, নিপিড়নে, ও শোষোনের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিচ্ছে”।

মাইক্যাল বাকুনিন একজন সত্যিকার বিপ্লবী চিন্তার মানুষ ছিলেন, তিনি চলমান শ্রেনী দ্বন্দ্বের কোন প্রকার শান্তিপূর্ন সহ অবস্থানে বিশ্বাসী ছিলেন না । তিনি বিশ্বাস করতেন শাসক চক্র কোন ভাবেই সত্যিকার সংস্কার মূলক কাজ করতে দিবে না, এবং একেই ভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সামাজিক বিপ্লবের কথা বলতেন, তিনই বিশ্বব্যাপী সকল প্রকার একনায়কত্ব, আমলাতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থার উচ্ছেদ করে মুক্ত শ্রমজীবী মানুষের ফেডারেশন কায়েম করে শান্তিময় জীবন যাপনের কথা বলতেন। যেহেতু তাঁর সমসাময়িক অনেকেই মনে করতেন যে, দুনিয়া জোরে বিপ্লব খুবই নিকটবর্তী তাই তিনি তাঁর সকল শক্তি দিয়ে বিপ্লব যেন সত্যিকার বিপ্লব হয় সেই দিকে কড়া নজর রাখতেন, সকল মুক্তিবাদি শক্তিকে সংগে নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরের পুরাতন ব্যবস্থার উচ্ছেদের পর যেন সেই ব্যবস্থার কোন প্রকার ক্ষতি বা একনায়কত্বের আভির্ভাব  না হয় তা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। আর সেই জন্যই তাকে আধুনিক এনার্কিস্ট বা নিরাজবাদি আন্দোলনের প্রবর্তক বলা হয়।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদের একজন অন্যতম চিন্তক ছিলেন পিটার ক্রপতকিন, তিনি আধুনিক প্রকৃতিক বিজ্ঞানের সাথে সমাজ বিজ্ঞানের ধারনার সমন্বিত করে নিরাজবাদের ধারনাকে অধিকতর শক্তিশালী করতে চেয়ে ছিলেন। তিনির তাঁর বিখ্যাত তত্ত্ব ‘মিউচুয়াল এইড’ এ বিবর্তনবাদ সম্পর্কিত তথাকথিত সামাজিক তথ্যবাদের তালিকার বিরুধিতা করেন, তিনি প্রমান করতে চেষ্টা করেন ডারউইনবাদের মতে, ‘কেবল দূর্বলদের তুলনায় শক্তিমানরাই ঠিকে থাকে’, এই তত্ত্ব সকল ক্ষেত্রে সঠিক না ও হতে পারে, যেখানে সামাজিক মানুষ হয় এর বিষয় বস্তু, সেখানে কঠিন আইনের যাতাকলে পড়ে অনেক সক্ষম মানুষ ও বিপদাপন্ন হয়ে পড়তে পারে। এই কথা টি ম্যালতুসিয়ান তত্ত্বের দ্বারা বিশেষ ভাবে প্রভাবিত হয়, যেখানে জীবন প্রবাহকে মানুষের সংখ্যা নিয়ন্ত্রন করে ফেলে।  সেই ক্ষেত্রে  বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, মানুষ নিজেই সেই সত্য প্রতক্ষ্য করে থাকে।

ক্রপতকিন দেখিয়ে দেন যে, প্রকৃতির জগতে যেমন একটি অনিশ্চিত লড়াই সংগ্রাম চলে, বাস্তবের জগতেও সেই সংগ্রামই অব্যাহত আছে, সেখানেও চলছে ঠিকে থাকার  এক প্রকারের নির্দয়, নিস্টুর সংগ্রাম। সেই লড়াই ও মরনপন লড়াই, সেখানে ও প্রকৃতিক বিধানের ন্যায় চলছে দূর্বলের উপর সবলের প্রধান্য বজায় রাখার এক নিরন্থর যুদ্ব। সামাজিক বিবর্তন এবং সামাজিক সম্মিলিত সহায়তার মাধ্যমেই মানব সমাজ এখনো ঠিকে আছে।

এই অর্থে মানুষ সমাজের নির্মাতা নয়, বরং সমাজই সৃষ্টি করেছে মানুষকে, ঐতিহাসিক ভাবে নানা ঘাত প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে, নানা জাতি ও প্রজাতির বিবর্তনের মধ্য দিয়ে, একে অন্যের উপর প্রাধান্যের সৃষ্টি করার জন্য শারিরীক বিকাশ ও সামাজিক শাক্তিভিত এবং  উন্নত পরিবেশ গড়ে তুলেছে। মানুষের মাঝে দ্বিতীয় যে প্রবনতাটি লক্ষ্যনীয় তা হলো, তাঁদের বিরুদ্বে কোন আক্রমন ও আগ্রাসনের মোকাবিলা করার প্রবনতা, যা  অন্য কোন প্রজাতির মধ্যে দেখা যায়না, এমন কি তাঁদের শারিরিক শক্তি বেশী হলে ও তাঁরা ক্রমাগত প্রতিরোধের পথে হাঁটে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি  প্রকৃতিক বিজ্ঞানে এখন একটি স্বিকৃত বিষয়ঃ মানব প্রজাতির বিবর্তনের বিষয়ে আজ সামাজিক চিন্তকগন এক নয়া দিগন্তের কিনারায় এসে দাঁড়িয়ে আছেন।

প্রকৃত বিষয় হলো প্রচলিত ব্যবস্থায় মানুষ ব্যাক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুক্তিবাদি সামাজিক চুক্তির দ্বারা আবর্তিত হয়ে থাকে, পরস্পরকে সহযোগিতা করে থাকে, এই সকল উপাদান না থাকলে মানব জীবন অসম্ভব হয়ে পড়বে। সামাজিক মুক্ত চুক্তি যদি বহাল না থাকত তবে রাষ্ট্রের অনেক কঠিন আইন ও সমাজকে বাঁচাতে পারত না । তবে, প্রকৃতিক সেই আচরনিক দিক গুলো মানষের ভেতর থেকেই উত্থিত হয়েছে, যা এখন রাস্ট্রীয় খবরদারী ও অর্থনৈতিক শোষনের কারনে পদে পদে বাঁধা গ্রস্থ হয়ে চলেছে। এই সকল কারনে মানুষের মধ্যে নিস্টুর ও নির্দয় আচরন লক্ষ্য করা যায়, এই অবস্থার অবসান চাইলে কেবল মাত্র সম্মিলিত সহায়তা ও মুক্ত সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ব্যাক্তিগত দায়িত্ববোধ, অন্যান্য মানবিক ভালো গুনাবলী গুলো সূপ্রাচীন কাল থেকে মানব সমাজে চর্চিত হয়ে এসেছেঃ তা মানুষের মাঝে জন্ম দিয়েছে পরস্পরের প্রতি সহানুভুতি, সামাজিক নৈতিকতা এবং সামাজিক ন্যায় বিচার ও স্বাধীনতা।

বাকুনিনের মতই  ক্রপতকিন ও বিপ্লবী ছিলেন। কিন্তু তিনি, এলিজ রিক্লোজ এবং অন্যান্য যারা মনে করতেন বিপ্লব নয় বিবর্তনের ভেতর দিয়ে অন্যান্য প্রজাতির মতই বিপ্লব বা পরিবর্তন  হবে,  তবে তখনই সেই পরিবর্তন  দেখা যাবে যখন সমাজকে প্রকৃতিক পরিবেশের ন্যায় চলতে দেয়া হবে বা কর্তৃত্ববাদি ব্যবস্থা থেকে মানবজাতি  মুক্তি পাবে। বাকুনিন ও প্রদুর মত ক্রপতকিনও সমাজ ভিত্তিক মালিকানার পক্ষে কথা বলেছেন, কেবল উৎপাদন যন্ত্রের উপর নয়, উৎপাদিত পন্যের উপর মালিকানার ও তিনি দাবী করেছেন। তাঁর মতে, প্রচলিত ব্যবস্থায় যে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে এতে একজন শ্রমিকের ব্যাক্তিগত শ্রমের পরিমান তাঁর মূল্য নির্নয় করা বেশ জটিল বিষয় । তাই সকল মানুষের সম্মিলিত মালিকানা কায়েম করলেই সকলের উন্নয়ন ও কল্যাণ হয়। কমিউনিস্ট এনার্কিজম, যার পক্ষে এর আগে যারা কথা বলেছেন, তাঁরা হলেন জুসেফ ডিজাকু, এলিজ রিক্লোজ, এরিক মালাতিস্তা, কার্লো ক্যাপিরো এবং অন্যান্য চিন্তকগন।  এখন এর পক্ষে আরো অনেক বুদ্বিজীবী ও চিন্তককে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে।

সাধারন ভাবে সকল নিরাজবাদি বা এনার্কিস্টদের লক্ষ্য হলো, এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলা যেখানে কোন প্রকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিপিড়ন থাকবে না, কেননা এই সকল নিপিড়ন মূলক কর্মকান্ড মানুষের সত্যিকার উন্নয়নের জন্য কঠিন বাঁধা। এই দিক থেকে দেখা যাবে মিউচুয়ালিজম, যৌথতাবাদ, এবং সাম্যবাদ মানুষের উন্নয়নের জন্য খুবই সহায়ক বিষয়, কিন্তু কেবল অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মানুষের স্বাধীন সমাজ বিনির্মানের জন্য সুরক্ষক হিসাবে কাজ করতে পারে না। আগামীতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানা ধরনের গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করা যেতে পারে, সমাজের ও নানা ধরন ও বিবর্তন হতে পারে, কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে একটি প্রকৃত স্বাধীন পরিবেশ বজায় না থাকলে সত্যিকার মানবিক উন্নয়ন আশা করা যায় না ।

এনার্কিস্ট বা নিরাজবাদিদের মধ্যে সমাজ পরিবর্তন নিয়ে নানা ধরনের মতামত আছে। অনেকেই মনে করেন, একটি প্রচণ্ড লড়াই সংগ্রাম ছাড়া সমাজ বিপ্লব বা সামাজিক পরিবর্তন হবে না । সেই সংগ্রামের তিব্রতা নির্ভর করবে যারা সামাজিক পরিবর্তন চায় না তাঁদের প্রতিরোধের শক্তির উপর, নয়া সমাজ ব্যবস্থা গ্রহনের ক্ষেত্রে তাদের প্রক্রিয়াশীল কর্মকান্ডের আকার ও বিস্তৃতির উপর। স্বাধীনতা ও সাম্যের সমাজ গ্রহনের জন্য সামাজিক নানা স্তরে তাঁর দাবী উত্থোলন আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করার উপর ও নির্ভর করছে সামাজিক পরিবর্তনের সময়ে কেমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমরা চাই সামাজিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে কম মাত্রার ক্ষয় ক্ষতি ও সহিংসতা  যেন বজায় রাখা যায় সেই বিষয়ে সতর্ক থাকতে।

আধুনিক এনার্কিজম বা নিরাজবাদ দুইটি বিরাট ঘটনার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, এর একটি হলো ফ্রান্সের বিপ্লব এবং এবং ইউরূপীয়ান বুদ্বিজীবী মহলের কর্ম প্রয়াসঃ সাম্যবাদ ও মুক্তিবাদ। আধুনিক সমাজবাদ সমাজ জীবন ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে চায়। এটা সরকারের বিলয় ঘটিয়ে সামাজিক প্রশ্নকে উজ্জল করে তুলতে চায় । মানবজাতির মধ্যে সাম্য মৈত্রী কায়েম করে, তত্ত্বগত ধারনার পরিবর্তে বাস্তব দুনিয়ায় একটি উজ্জল দৃস্টান্ত প্রতিস্টা করতে চায়। যা সামাজিক জীবনে এক নয়া দিগন্তের উন্মোচন হবে।  নয়া সমাজে অর্থনৈতিক একচাটিয়াবাদ বিদূরিত হবে, উৎপাদন ব্যবস্থার উপর সাধারন মানুষের মালিকানা কায়েম হবে, এক কথায় সমাজ একেবারে আমূল পাল্টে যাবে, অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য প্রতিস্টান সমূহের ধরন প্রকৃতি ও পরিচালন পদ্বতী বদলে যাবে । কায়েম হবে সত্যিকার সামাজিক ন্যায় বিচার অবসান হবে শোষণের। সকলেই সকলের জন্য কাজ করার পরিবেশে অভ্যস্থ হয়ে উঠবেন। সমাজবাদ একটি আন্দোলনের মত সকল জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে, নানা সমাজে, নানা দেশে ভিন্ন ভিন্ন মতামতের ভিত্তিতে বৈচিত্রময় সামাজিক  পরিবেশে সামগ্রীক সংহতির অভিপ্রকাশ ঘটবে। প্রকৃত ঘটনা হলো প্রতিটি রাজনৈতিক মতবাদই কোন না কোন ভাবে একনায়কত্ব বা ধর্মীয় পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এসেছে, সমাজবাদি আন্দোলন  ও এর দ্বারা একটি অংশ আক্রান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে, রাজনীতির শ্রুতধারায় দুইটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় যুক্ত হয়েছে এবং সমাজবাদি ধারনার উন্নয়ন ঘটিয়েছেঃ মুক্তিবাদ, যা এংলো-সেক্সন দেশ সমূহে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে, বিশেষ করে স্পেনে। আরো স্পষ্ট করে বলতে হলে বলতে হয় গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা যা চিন্তক রুশো তাঁর সামাজিক চুক্তি নামক বইতে বলেছেন, এই চিন্তাভাবনা এক কালে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলো ফ্রান্সের নেতা জে, জ্যাকবিনের উপর। মুক্তিবাদি এই ভাবনা যখন তাত্ত্বিকভাবে প্রচলন হয় তখন বলা হয় রাষ্ট্রীয় প্রভাব কমিয়ে সামাজিক শক্তির উন্মেষ ঘটাতে হবে । রুশো গণতন্ত্রকে একটি সম্মিলিত  ধারনার উপর দাঁড় করিয়ে দেন। তিনি “সাধারনের ইচ্ছে” কথাটির উপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেন, তাঁর এই বক্তব্যকে জাতিরাষ্ট্র বলা হয়েছে।

মুক্তিবাদ এবং গণতন্ত্র রাজনীতির প্রথমিক সবক হিসাবে অভির্ভূত হয়, সেখানেই সংখ্যা গরিস্ট মানুষের মতামতকে গ্রহন করতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়, কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয়কে তার আওতায় আনা হয়নি। বা আজো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরাসরি যুক্ত হয়নি। গণতন্ত্র তাঁর মূলনীতি হিসাবে ঘোষনা করেছে, “আইনের চোখে সকলেই সমান”, এবং তাঁর সাথে মুক্তিবাদ “ প্রতিটি ব্যাক্তি তাঁর নিজের বিষয়ে নিজেই সিদ্বান্ত গ্রহনের অধিকারী”। এই উভয় নীতি ই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করেছে। তাই আমরা দুনিয়ার সকল জায়গায় দেখতে পাচ্ছি, বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ তাঁদের শ্রমশক্তি  অল্প কিছু মানুষের নিকট বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। যদি নিজের শ্রম বিক্রি করতে না পারে, তাঁরা যদি  ক্রেতা না পান, তবে একজন শ্রমিক সমূদ্রের জাহাজের মত তলিয়ে যেতে পারেন। তাই তথাকথিত “আইনের চোখে সকলেই সমান” কথাটি একটি ধান্দাবাজের উপদেশের মতই শোনায়, যারা আইন বানায় তারাই সমাজের সম্পদ ও ক্ষমতার মালিক।  একেই ভাবে একেই কথা প্রযোজ্য হলো, “নিজের বিষয়ে নিজেই সিদ্বান্ত গ্রহনের অধিকার” নীতির প্রশ্নে । এই ধরনের অধিকারের মৃত্যু ঘটে তখনই যখন কোন ব্যাক্তির আর্থিক বিষয়ে অন্যের দয়ার উপর নির্ভর করে সিদ্বান্ত গ্রহন করতে বাধ্য হয়। তখন তাঁর স্বীয় সকল প্রয়াস অর্থহীন হয়ে যায়।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ সাধারন ভাবে সকলের জন্য মুক্তি চায়, সকল ব্যাক্তি মানুষের জন্য প্রগতি ও সুখ কামনা করে এবং সামাজিক সংহতি নিশ্চিত করতে বদ্বপরিকর। স্বাধীন মুক্ত চিন্তার প্রতিফলন সকল স্তরে প্রাসারিত করতে কাজ করে, এটা সরকারি হস্তক্ষেপ তিরোহিত করে দিবে। এই মতবাদের অনুসারীগন সামগ্রীকভাবে যৌক্তিক পরিনতির মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক প্রতিস্টান সমূহের বিলয় ঘটিয়ে একটি জীবন্ত সমাজ কায়েম করবে। যখন জেফার্সন মুক্তিবাদের জন্য কথা বলতে শুরু করেন এই ভাবে, “ সেই সরকারই উত্তম যে সরকার কম হস্তক্ষেপ করে”, আর এর্নাকিস্ট তোরে বলেন, “ এই সরকারই উত্তম, যে সরকার কোন ভূমিকাই রাখেন না, এমানকি সমাজবাদ কায়েমকারীগন ও নয়, নিরাজবাদিদের দাবী হলো তিরীহিত কর অর্থনৈতিক একচাটিয়াবাদ, কায়েম কর ভূমি ও কারখানায় সাধারন জনগণের মালিকানা। যা সকল মানুষের চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখবেঃ সকল মানুষের ব্যাক্তিগত স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক সাম্য নিশ্চিত করবে, এনার্কিস্টদের সমাজবাদি আন্দোলন চায় পুঁজিবাদের উচ্ছেদ করতে এবং সকল যুদ্বের অবসান করতে । রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিস্টানের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, অর্থনৈতিক শোষণ এবং হাতে হাত ধরে চলেছে সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়ন। মানুষ মানুষকে শোষন করছে, মানুষ মানুষের উপর প্রভু হয়ে বসেছে, এই চিত্র চলে এসেছে দির্ঘ কাল ধরে।

যতদিন সমাজে প্রভূত্ব বিস্তারকারী শ্রেনী বা যারা তেমন প্রভাবশালী নন এমন লোকদের মাঝে একটা বিরুধীয় বা দ্বন্দ্ব  চলতে থাকে। যখন একটি রাষ্ট্রে কতিপয় লোক বা একটি স্বল্প জনগৌস্টির লোক অন্যদের উপর সুযোগ নেবার তালে থাকে। ততক্ষন এক পক্ষ অন্য নিরিহ পক্ষকে শোষন করবেই। তাই এই ধরনের পরিবেশ সমাজ থেকে বিতারন করতে হবে, তখন কারো আলাদা কোন সুযোগ সুবিধা থাকবে না, মানুষের উপর প্রশাসনের ও খবরদারী করার দরকার নেই, সেই  প্রসঙ্গে সাধক সিমন বলেছিলেন, “ একদিন এমন এক সময় আসবে যখন সরকার বলে কোন বস্তু থাকবে না, একটি নয়া ব্যবস্থা তাঁর জায়গা দখল করবে, সেই ব্যবস্থার দ্বারাই সকল কিছু পরিচালিত হবে”।

সেই ধারনার মতই কার্ল মার্ক্স একটি নয়া ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, তিনি প্রলেতারিয়েতদের একনাকত্বের ধারানার প্রবর্তনের প্রস্তাব দেন, তিনি বলেছিলেন, একটি শ্রেনীহীন সমাজ বিনির্মানের জন্য এটা হবে একটি অন্তর্বতীকালিন ব্যবস্থা। তিনি আরো প্রস্তাব করেন, শ্রেনীর দ্বন্দ্ব, শ্রেনী স্বার্থ যখন থাকবে না তখন রাষ্ট্র আপনা আপনিই বিলয় হয়ে যাবে। এই ধরনের ধারনা সামগ্রীক ভাবে ছিলো ভূলে ভরা, ঐতিহাসিক ভাবে রাষ্ট্রের যে ধর্ম, ধরন বা প্রকৃতি যেখানে সর্বদা বিরাজ করে রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চা। তথাকথিত অর্থনৈতিক বস্তুবাদের যৌক্তি দিয়ে বলা হয়েছিলো উৎপাদন ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে একটি সমাজের “ রাজনৈতিক ও বিচারিক উপরি কাঠামো” গড়ে উঠে, “অর্থনৈতিক কাঠামোর” উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে সামাজিক সৌধ। একটি ঐতিহাসিক তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে এইরূপ ভাবনার জন্ম হয়। বাস্তবতা হলো, ইতিহাসের নানা বাঁকে আমরা দেখতে পাই নানা সময়ে অর্থনৈতিক পঠ পরিবর্তন হয়েছে, কখনো এগিয়েছে আবার পিছিয়ে , কিন্তু রাজনৈতিক ধরন প্রকৃতির তেমন কোন উল্লেখ যোগ্য পরিবর্তনই ঘটে নাই।

আমরা স্পেনের দিকে যদি দৃষ্টি দেই তবে দেখব যে, সেখানে যখন রাজতন্ত্র অনেক শক্তিশালী অবস্থায় বিরাজমান ছিল তখন ও সেখানে অর্থনীতির বিশাল অংশ দখল করে ছিলো শিল্পের প্রধান্য। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিল্প ভিত্তিক অর্থনীতি বিরাজ করছিলো। এমন কি ইউরূপের প্রতিটি দেশের তুলনায় এরাই ছিলো অগ্রগামী। কিন্তু রাজতন্ত্র যখন তাঁর হস্তক্ষেপ করা বাড়িয়ে দেয় তখনই শিল্পে ধ্বংস নেমে আসে। শিল্প গুলো ঘুড়িয়ে দেয়া হয় এমন কি আদি যুগের দিকে ফিরে যেতে থাকে। কৃষি বিনষ্ট হয়ে গেল, উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেল। পানির জন্য তৈরী করা খাল, নালা, বন্দ্ব করে দেয়া হলো, কৃষি ভূমি পরিণত হল মরুভূমিতে।  সেই যে স্পেনের পিছিয়ে পড়া যা আজো পুরন করতে পারে নাই। একটি সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য একটি বিশাল জাতি শত শত বছর ধরে অর্থনৈতিক  অভিশাপের শিকার হয়।

ইউরূপের একনায়কত্বের স্বৈরতান্ত্রিকতা, “ অর্থনৈতিক নীতিমালা” এবং “ শিল্প আইনঃ” যা দাসত্বের জন্য শাস্তির বিধান রাখলে ও উৎপাদন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করে আবার আগ্রসনকে ও প্রশ্রয় দেয়া হয়, সেই জঠিল বিধি বিধান দির্ঘকাল ইউরূপের শিল্প উন্নয়নকে বাঁধা গ্রস্থ করে দেয়, এটা সকল কিছুর স্বাভাবিক বিকাশকে থামিয়ে রেখেছিলো। সেখানে রাজনৈতিক শক্তির কোন প্রকার তোয়াক্কাই করা হয়নি, তা বিশ্ব যুদ্বের পর যখন সামগ্রীক ভাবে অর্থনৈতিক সঙ্কট চলছিল তখনো রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত্বদেরকে সুরক্ষা দেয়া হয়। তারাই ফ্যাসিবাদি চক্রকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে তাঁদের কু কর্মের রাস্তা প্রসারিত করে দেয়। আধুনিক অর্থনীতি যে ধরনের রাজনীতি প্রত্যাশা করে তা সেখানে ছিটেফোঁটা ও দেখা গেল না ।

রাশিয়াতে তথাকথিত “প্রলেতারিয়েত একনায়কত্বের” নামে বাস্তবতাকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে একটি দলীয় একনায়কত্ব কায়েম করা হয়, যেখানে কোন প্রাকার সামাজিক শক্তির উন্মেষ ঘটতে দেয়া হয়নি, যারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের বা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারত। অথচ উন্নয়নের নামে পুরোজাতির শ্রমজীবী মানুষকে এক প্রকার কারাগারে নিক্ষেপ করে দাসে পরিণত করে দিয়ে নোংরা রাস্ট্রীয় পুঁজিবাদ কায়েম করে ফেলে। সেই “প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব” জাতির সামগ্রীক অবস্থাকে নড়বরে করে দেয়, ফলে সতিকার সমাজবাদ  কায়েম  করা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি।বরং ক্রমে সেখানে এক বীভৎস স্বৈরাচার কায়েম হয়,  ফলে রাশিয়া একটি ফ্যাসিবাদি দেশ ছাড়া আর কিছুই হতে পারেনি।

বলা হয়ে থাকে যে, রাষ্ট্রের উচিৎ হলো শ্রেনী সংগ্রামকে চালু রাখা, যত দিন শ্রেনীর অবসান না হবে। নির্মূল না হবে শ্রেনী ভাবনার। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বলে, আসলেই এই সকল কথা হলো এক প্রকার বাজে কৌতুক। প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তিই হলো এক প্রকার দাস তৈরীর কারখানা, রাষ্ট্রের রক্ষনাবেক্ষনের জন্য তাদেরকে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়। বাহ্যিক ভাবে বলা হয়, একটি রাষ্ট্র আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের জন্য কৃত্রিম বিরোধের সূত্রপাত করে থাকে, যা মূলত নিজেদের স্বার্থকে উর্ধে তুলার জন্য বা অস্থিত্ব প্রমান করার জন্য। অথচ স্ব স্ব দেশে নানা প্রকারের সামাজিক, অর্থনৈতিক, ও সাংস্কৃতিক শ্রেনী বিদ্যমান রয়েছে। রাষ্ট্র এক দিকে নাগরিকদের অধিকার রক্ষার কথা বলে আবার অন্য দিকে অধিকার কেড়ে নেবার আয়োজন করে; এটা করতে করতেই  রাষ্ট্র ক্লান্ত  হয়ে পড়ে ।

একটি বড় রাষ্ট্র যখন বিপ্লবের মধ্যদিয়ে সরকার বদল হয় বা অস্থিত্ব লাভ করে তখনই তাঁর পুরতান সুবিধা ভোগী শ্রেনী তাঁদের নিজেদের আখের গুছিয়ে নেবার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়, এরা নিজের প্রভূত্ব বজায় রাখার জন্য নানা কৌশল অবলম্ভন করে । আমরা রাশিয়ার ক্ষেত্রে ও তাই দেখতে পাই,   বলশেভিক দের উত্থানের পর একটি  ক্ষুদ্র শাসক চক্র প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বের নামে ক্ষমতায় অধিস্টিত হয়, তাঁরা সমগ্র রাশিয়ার জনগণের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব কায়েম করে বসে, সেখানে আগের মতই ভিন্নমাত্রার এক প্রভুত্বের রাজত্ব চলতে থাকে। এই নয়া শাসক শ্রেনী, অল্প সময়ের মধ্যেই এক আভিজাত্যের রূপ ধারন করতে থাকে। তাঁরা নিজেদেরকে শ্রমিক শ্রেনী থেকে  পৃথক করে সুবিধা ভূগী শ্রেনীতে পরিণত হয়। সাধারন মানুষের সাথে এঁদের কোন সম্পর্কই আর থাকে না ।

এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, রাশিয়ার কমিশারতন্ত্র এবং তাঁদের গৌস্টির লোকেরা অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশের শিল্প কারখানের  মালিকদের চেয়ে কোন ভাবেই পিছিয়ে ছিলো না । এই প্রসঙ্গে কোন প্রকার সমালোচনা বা আপত্তি গ্রহণযোগ্য ছিলো না । তাঁদের অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহনের মাত্রা যতই বাড়তে থাকে তাঁদের অধীন সাধারন জনগণের জীবন যাত্রার মান ততই কমতে থাকে । প্রভাব ফেলতে থাকে তাঁদের দৈনিন্দিন জীবনে। আমেরিকার একজন সাধারন শ্রমিক, ভালোভাবে কাজ করলে এবং যথাযথ নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন করলে খাদ্য, কাপড়, গৃহ সহ মানবিক জীবন ধারন করতে কোন অসুবিধা হয় না । কিন্তু তাঁদের  পক্ষে মিলিয়নার হওয়া বেশ কঠিন বিষয়। এমন কি যারা ছোট খাট আমলা তাঁদের পক্ষে ও তা সম্ভব হয় না । এমন কি লোকেরা স্বচ্ছল জীবন হারানোর ভয়ে থাকে, বসবাসের জন্য অচেনা লোকের সাথে গৃহ বেচে নিতে হয়, যারা অধিক উন্নত উৎপাদন কর্মে নিয়োজিত তাঁদের ক্ষমতা হয়ত কিছু বেশী। কিন্তু উঁচু যারা শ্রেনীর লোক তাঁদের তুলনায় এঁদের কিছুই নেই। একেই অবস্থা তখন রাশিয়ায় ও চলছিলো পুঁজিবাদী দেশের অবস্থা আর তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্যই ছিলো না । বরং পুঁজিবাদী দেশের জনগণ প্রতিবাদ ও সমালোচনা করতে পারত আর রাশিয়ায় ধনীক শ্রেনীর বিরুদ্বে কথা বলা মানেই ছিল জীবনের ঝুকি নেয়া ।

তবে তুলনা মূলক ভাবে রাশিয়ার অর্থনৈতিক জীবনে গুনমান অনেক উন্নত ছিলো, কিন্তু রাজনৈতিক নিপিড়নের মাত্রা ছিলো মারাত্মক। অর্থনৈতিক সাম্য কোন ভাবেই রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে অস্বীকার করতে পারেনা । এই জিনিষটা মার্ক্সবাদি ও অন্যান্য  কর্তৃত্ববাদি সমাজবাদিরা কোন ভাবেই বুঝতে চায়নি। এমন কি জেল খানা, সেনা ব্যারাক, বা লঙ্গর খানায় একেই রকমের খাদ্য, পোষাক, একেই রকমের থাকার জায়গা, এমন কি প্রায় একেই রকমের  কাজ কর্ম দেয়া হয় । কিন্ত তা মানুষ স্বাভাবিক ভাবে নেয় না । প্রাচীন পেরুর ইনকা জাতি, এবং প্যারাগোয়ের জেসুইট  জাতির মধ্যে ও অর্থনৈতিক সাম্য ছিলো। কিন্তু তাঁদের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীকার ছিলো না ফলে জনগণ সেই ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট ছিলো না । ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র চালনায়  জনতার বিদ্রোহ দেখা দেয় বার বার। চিন্তক প্রুদু বলেছেন বলেই নয় যে, স্বাধীনতাহীন “সমাজবাদ” দাসত্বের চেয়ে ও ক্ষতিকর একটি মতবাদ। তাই সাধারন মানুষের আকাঙ্ক্ষা হলো সামাজিক ন্যায় বিচার কার্যকরী করতে হবে, তার মাধ্যমে অবশ্যই মানুষের স্বাধীকার নিশ্চিত করতে হবে । সমাজবাদ হবে অবশ্যই স্বাধীন পরিবেশে, নইলে তা সমাজবাদই নয়। কোন মিথ্যাকে প্রতিস্টা করার জন্য অন্য আরো কোন গভীর মিথ্যার আশ্রয় গ্রহন করা অপরাধ। নিরাজবাদই কেবল মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে ।  উপহার দিতে পারে স্বাধীন ও সাম্যের সমাজ বিধান।

সামাজিক প্রতিস্টান সমূহ এমন ভাবে কাজ করে, যেমন এটি একটি মানব দেহে নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাজ করে থাকে; সেই প্রতিস্টান গুলো হল সামাজের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। অঙ্গ গুলো কোন পারস্পরিক আপোষ রফার মাধ্যমে তৈরী করা হয় না, বরং শরীরের অতি প্রয়োজনেই সেই গুলো তৈরি ও কাজ করে চলে। গভীর সমূদ্রের মাছ সমূহের চোখ বিশেষ  ধরনের হয়ে থাকে। যা প্রচলিত সাধারন ভাবে বসবাসকারী প্রানীদের মত নয়, এর ও কারন হলো প্রানী সমূহের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে পারার জন্যই এমন হয়ে থাকে। পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে গাছ ও প্রানীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও পরিবর্তিত হয়ে থাকে। কিন্তু প্রতিটি অঙ্গই স্ব স্ব কাজ চাহিদা অনুসারে করে থাকে। যদি পরিবেশ পাল্টায় তবে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও পালটায়, এমন কি অনেক সময় অনেক অঙ্গ বিলুপ্ত ও হয়ে যায়। কিন্তু কোন অঙ্গ অদরকারী অবস্থায় ঠিকে থাকার বা কাজ করার চেষ্টা করে না । সামাজিক অনেক প্রতিস্টানের ক্ষেত্রে ও একেই কথা প্রযোজ্য। সেই প্রতিস্টান গুলো ও ঠিকে থাকতে চায় না, তবে তাদেরকে ঠিকিয়ে রাখায় প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।

প্রতিটি সামাজিক চাহিদারই  একটি লক্ষ্য থাকে। এই ভাবেই আজ আধুনিক রাষ্ট্র সমূহ অর্থনৈতিক একচাটিয়াবাদের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এর সাথে আছে সামাজিক শ্রেনী বিভাগ। এই সবের সাথে আছে সামাজিক নানা প্রকার রচম রেওয়াজ ও রীতিনীতি। সমাজে মালিকানার বিকাশ হয়েছে, তাকে সুরক্ষা দিয়ে তৈরী হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতার, সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার ভীত নির্মান করা হয়েছে। এই ভাবেই নানা প্রকার বিবর্তনের ভেতর দিয়ে আজ আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তুলা হয়েছে। এইটা আসলে রাজনৈতিক কর্ম কান্ডের একটি বিশেষ অঙ্গ। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা চর্চা করা সহজ ।  এই কাঠামোর ভেতর দিয়ে মালিকানার অধীকারী লোকেরা নিজেদের মালিকানা সুরক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে। এই ধরনের কাজ গুলো রাজনৈতিক রাষ্ট্র সমূহের আসল কাজ। এই কাজের জন্যই আদতে রাষ্ট্র ঠিকে আছে। এই ধরনের কাজের জন্যই রাষ্ট্র নিজেদেরকে বিশ্বস্থ প্রমান করেছে, নইলে এইই রাষ্ট্র যন্ত্র ঠিকতে পারত না । পারবে না ।

দুনিয়ায় ঐতিহাসিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বাহ্যিক ভাবে নানা প্রকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু তাঁর কার্যক্রমে ধরন প্রকৃতি আগের মতই নিপীড়ন মূলক রয়ে গেছে। শাসকগন  ও তাঁদের সমর্থকদের বা অধিনস্থদের  কর্মপরিধি  বাড়িয়েছে। রাষ্ট্র সে গণপ্রজাতন্ত্রী হোক, বা রাজতান্ত্রিক হোক ইতিহাসের কোন কালেই তাঁরা নিপীড়ন মূলক কার্যক্রম থেকে বেড়িয়ে আসতে পারে নাই। তাঁদের জাতীয় সংবিধানের পরিবর্তন আনয়ন করে ও তাঁদের চরিত্রগত পরিবর্তন সাধন করতে পারেনি। বিজ্ঞানের বদৌলতে, গাছ, পালা, পশু, পাখী ও মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরিবর্তন করা যায় । পরিবর্তন করলে ও চোখ, কান, নাক বা অন্যান্য অঙ্গের যে ধরনের কাজ তাঁর কোন পরিবর্তন হয় না ।। তেমনি সামাজিক প্রতিস্টান সমূহের মাঝে পরিবর্তন সাধন করে ও তাঁদের কাজের ধরনের কোনই পরিবর্তন হবে না । সামাজিক মুক্তি আসবে না । রাষ্ট্র যা তাই ই থেকে যাবে চিরকালঃ এটা গন মানুষের শোষকদের রক্ষা করে, সুবিধা ভোগী সৃজন করে, নতুন শ্রেনী ও স্বার্থবাদি গৌস্টির জন্ম দান করে থাকে। যারা রাষ্ট্রের এই চরিত্রটা সঠিক ভাবে অনুধাবন করতে পারেন না, তাঁরা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার প্রকৃত রূপ বুঝতে পারবেন না । তাঁরা সামাজিক পরিবর্তনের সত্যিকার পথ ও পন্থা নির্ধারন ও করতে পারবেন না ।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ মানব সমস্যার সমাধানের জন্য কোন চিরন্তন বানী নয়, এটা আবার কোন কল্পনা প্রসূত মতবাদ ও নয়, এই মতবাদ যেকোন চিরন্তন বানী বা মতবাদ বিরুধী। এটা কোন চিরন্তন সত্যে বিশ্বাসী নয়, বা মানবজাতির চূড়ান্ত মতবাদ হিসাবে ও দাবী করে না । এটা মানুষের জীবন যাত্রার কিছু সুনির্দিস্ট ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব হাজির করে, যাতে উন্নততর চিন্তা চেতনার প্রকাশ ঘটায়, আর সেই কারনেই আগে থেকেই সকল কিছু বলে দেয়া সমীচীন নয়; বা চূরান্ত লক্ষ্য স্থির করা ও প্রায় অসম্ভব। প্রতিটি রাষ্ট্রের সব চেয়ে বড় খারাপ অপরাধটি হলো সামাজিক বৈচিত্রকে উপেক্ষা করে নির্ধারিত একটি কাঠামোকে বাস্তবায়নে অনমনীয় মনোভাব প্রকাশ করে ।  এটা মানুষের ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনাকে প্রতিনিধিত্ব করে না । মানুষের অবেগ অনুভূতিকে একেবারেই গুরুত্ব দিতে চায় না । রাষ্ট্র তাঁর সমর্থক ও সহযোগীকে অধিকতর শক্তিশালী করতে থাকে, তাঁর উত্তরাধিকারীকে সামাজিক ভাবে নানা কার্যক্রমের ভেতর দিয়ে সুপ্রতিস্টিত করে থাকে। সকল সময়েই সৃজনশীল মানুষকে চেপে রাখার প্রবনতা দেখিয়ে এসেছে রাষ্ট্র শক্তি, এটা সামগ্রীকভাবে কোন যুগকে কখনই বুদ্বিবৃত্তিক ভাবে উপলব্দি  করতে চায়নি বা পারেও নি ।

বর্তমানে তথাকথিত একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র সমূহ সাধারন মানুষের মাথার উপর ঝেঁকে বসে আছে, জনগনের জ্ঞান, বুদ্বি ও সকল প্রচেস্টার কোন মূল্য এই রাষ্ট্র যন্ত্রের নিকট নেই, এই রাষ্ট্র গুলো যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি বিশেষ রাজনৈতিক ধরনের ছাঁচে সকল কিছু কে বিবেচনায় নিয়ে থাকে । এটা মানুষের আকাঙ্ক্ষা কে নির্দয় ভাবে উপেক্ষা করে চলে । এই সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র সমূহ ক্রমে জন সমর্থন হারাচ্ছে, এর স্পষ্ট ও ভয়ঙ্কর আচরন এবং বর্বরতা প্রকাশিত হচ্ছে, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য কিছু লোক তা ব্যবহার ও করছেন, মানবিক চিন্তার যৌক্তিকতা, অনুভূতি, ও আচার আচরনকে একেবারেই তোয়াক্কা করছে না । আদতে এই প্রক্রিয়াটা হলো মানুষের বুদ্বি বৃত্তিকে হত্যার শামিল ।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ সত্যিকার ভাবে মানুষের চিন্তা, চেতনা ও অনুভূতির সঠিক মূল্যায়ন করে থাকে, তা হোক প্রতিস্টানে বা সামাজিক পরিমণ্ডলে। এই মতবাদ বা পথ ধারা সুনির্দিস্ট বা স্থিরীকৃত নয়, এটা ঐতিহাসিক প্রয়োজনে মানুষের চিন্তাধারার বিবর্তনের ফলে বিকশিত হয়েছে। এটা মানুষের মাঝে সুপ্ত প্রতিভা এবং যোগ্যতাকে বিকশিত করে ব্যাক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে প্রস্ফুটিত করতে চায়। যদি ও স্বাধীনতা একটি আপেক্ষিক বিষয়। তা কোন ভাবেই চিরন্তন বিষয় নয়। তবে তা ক্রমাগত বিস্তৃত ও পরিশিলিত হয়ে জীবনের চারিদিককে প্লাবিত করে দিতে পারে। একজন এনার্কিস্ট বা নিরাজবাদির জন্য স্বাধীনতা কোন কল্পনা বিলাশ বা দর্শনের বিষয় নয়, এর মৌলিক চিন্তাই হলো মানুষে পরিপূর্ন উন্নয়ন ও বিকাশ । রাজনৈতিক প্রভূত্ব ও চাপের কারনের মানুষের স্বাভাবিক বিকাশ বাঁধা গ্রস্থ হয়, কিন্তু  মানুষ যদি একটি সংহতি পূর্ন পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারে তবে তাঁদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্বিবৃত্তিক বিকাশ অনেক ভালো হয় ।

সেই কারনেই বলা হয়ে থাকে, ইতিহাসে যত সাংস্কৃতিক অবনতি হয়েছে তা রাজনৈতিক দূর্বলতার কারনেই হয়েছে। এবং এটা ছিলো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যত যান্ত্রিকতা লক্ষ্য করা গেছে, তা সামাজিক কারনে ঘটে নাই। রাষ্ট্র ও সাংস্কৃতি পরস্পরের মধ্যে একধরনের সুপ্ত রয়েছে। নিথশে বলেছিলেনঃ

"কেউই শেষ পর্যন্ত তার চেয়ে বেশি ব্যয় করতে পারে না। এটি ব্যক্তিদের পক্ষে ভাল, এটি জনগণের পক্ষে ভাল। যদি কেউ নিজের পক্ষে ক্ষমতা, উচ্চ রাজনীতির জন্য, বাণিজ্যের জন্য,  সংসদীয়, ও সামরিক ফায়দা হাসিলের জন্য ব্যয় করে। তবে, যে পরিমাণ যুক্তি, আন্তরিকতা, ইচ্ছা, আত্ম মর্যাদা, যা দিয়ে নিজের আত্মাকে গঠন করে, সে অন্যের জন্য তা করে না। সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র এক –এই কথায় কেহই প্রতারিত হবেন না- এটা পরস্পর বিরোধী। 'সংস্কৃতিগত রাষ্ট্র' কেবল একটি আধুনিক ধারণা নয়, এটা এটা প্রয়োজনে গড়ে তুলা হয়েছে। এটা ও সত্য যে, একের জীবন যাপনের অন্যতম উপাদান হলো অন্যের সহায়তা, অন্যের সহভাগীতা । একটি সংস্কৃতির দীর্ঘকালীন চর্চা রাজনৈতিক পতনের কারন হতে পারে। একই সংস্কৃত অর্থ মানে হল কোন একটি ভাবধারা বা আচরনিক চর্চাকে যতই মহান যা নৈকট্যবাদী ভাবা হোক না কেন। তা  যদি তা রাজনীতি নিরপেক্ষ ও হয় তবু তাঁর উন্নয়ন ও হাল নাগাদ করনের ব্যবস্থা রাখা একান্ত দরকার। "

একটি রাজনৈতিক শক্তি বিশাল , ক্ষমতাশালী চক্র, একটি উন্নত সংস্কৃতির বিকাশে বাঁধা হতে পারে। যখন রাষ্ট্র তাঁর আভ্যন্তরীণ সমস্যায় আক্রান্ত হয়, তখন রাজনৈতিক শক্তি নানা ব্যবস্থা গ্রহন করে তা উত্তরনের প্রায়স চালায়। তাঁরা সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে, এটা শাসকদের জন্য উপযোগী ব্যাখ্যা দাড় করায়, সামাজিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রে অভিভাবকত্বের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরনের জন্য আমাদেরকে অধিক  সৃজনশীল সংস্কৃতিক চর্চা করতে হবে । যা মানুষের জীবন ও সামাজিক কর্ম কান্ডে প্রতিফলিত হতে পারে। যা মানুষের স্বাধীনতার কথা বলে, বহুমূখী ভাবনার বিকাশ করে আমূল পরিবর্তনের সূচনা করে দেয়।

প্রতিটি সংস্কৃতির  একটি নিজস্ব প্রকৃতি ও শক্তি আছে। কেবল আর্থিক উন্নতি সমাজে ও সংস্কৃতিতে তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না । এটা স্থায়ী রূপ লাভ করে, নিজেকে অনেক ক্ষেত্রেই নবায়ন করে নেয়। এটা অনেক সময় নানা মূখী কর্মের ক্ষেত্র তৈরি করে ফেলে। এটা প্রতিটি সফল কর্মের পর আরও নয়া নয়া ক্ষেত্রের  অনুসন্দ্ব্যান চালায়;  এবং প্রতিটি  জায়গায়ই সে আরো সাফল্য প্রত্যাশা করে থাকে । আদতে রাষ্ট্র কোন সংস্কৃতিরই জন্ম দাতা নয়। এটা আসলে চিন্তাবিহিন এক ধরনের যন্ত্র। এটা যেমন আছে তেমনই থাকতে পছন্দ করে, নিজেকে নিরাপদ রেখে সরল ও সাদাসিদে ভাবে সময় কাঠাতে চায় ।ইতিহাস বলে, প্রতিটি বিপ্লবের পর পরই যত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে ।

ক্ষমতা সকল সময়েই নষ্টামির জন্মদাতা, এটা সকল সময়েই আইনের পোষাক পড়ে মানুষের প্রানবন্ত ভাবধারাকে দমন করে ফেলে। ক্ষমতাবানগন প্রায়স মতান্দ্বতার পরিচয় দেয়, এঁদের দমন প্রক্রিয়া হয় নির্মম। তাঁদের মুর্খতা মূলক কর্মকান্ড, এঁদের সমর্থক শ্রেনীর ক্রিয়া কলাপ নিস্টুর ও মুর্খতামূলক হয়ে থাকে। এরা কূপমণ্ডূক। এরা সত্যিকার জ্ঞানী গুনি  ও বুদ্বিমান লোকদেরকে মূল্যায়ন করেনা। কর্তৃত্বতান্ত্রিক ব্যবস্থা সকল সময়েই যান্ত্রিকভাবে সকল কিছু বিবেচনা করে থাকে,  এরা মানবিকতার কোন  প্রকার তোয়াক্কা করে না ।

এই সকল পরিস্থিতি বিবেচনা করেই একটি নৈতিক ভিত্তি নিয়ে আধুনিক নিরাজবাদের অভিপ্রাকশ হয়েছে, কেবল স্বাধীনতাই মানুষকে একটি মহান ও মহৎ বুদ্বি বৃত্তিক পরিনতির দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম। একটি শাসক চক্রের মানুষের জীবন প্রনালী কোন ভাবেই সুশীল মানুষের জীবনের মত হয় না । শাসক সর্বদা অস্থির থাকে প্রজাদের বা অধীনস্থ শ্রেণির লোকদেরকে কি করে বাধ্য করে রাখা যায়, তাই প্রানহীন যন্ত্রের মত আচরন করে চলে অবিরত, কেননা প্রজাদের আনুগত্যই তাঁদের অস্থিত্বের প্রধান নিয়ামক। এরা স্বাধীন মানুষ পছন্দ করে না । অথচ স্বাধীনতাই হলো জীবনের মৌলিক উপাদান। বুদ্বিবৃত্তিক ও সামাজিক জীবনের উন্নয়ন করতে হলে স্বাধীকারের কোন বিকল্প নেই। মানুষের জন্য সুন্দর আগামী গড়তে হলে এই দৃষ্টিভঙ্গীকে বাদ দিয়ে হবে না।  মানুষের অর্থনৈতিক শোষন, বুদ্বিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে মুক্তি জন্য  বা মানুষের বিশ্বদর্শনের জন্য নিরাজবাদ বা এনার্কিজম হল একটি চমৎকার পথ ও পন্থা। একটি উন্নততর মানবিক সমাজ নির্মান, এবং একটি উন্নত সংস্কৃতিক পরিমন্ডল বিনির্মানের জন্য মানুষের সত্যিকার স্বাধীনতা হল পূর্বশর্ত।

ভাষান্তরঃ  এ কে এম শিহাব

0 Comments 0 Comments
0 Comments 0 Comments